রাষ্ট্রায়ত্ত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে পাওনা আদায় করতে পারছে না সরকার। দায়-দেনা ও লোকসানের লাগাম টেনে ধরতে পারছে না। বছর পেরুতেই এই দায়-দেনার অঙ্কের পরিমাণ বাড়ছে। আদায়ের ব্যর্থতায় গত এক বছরে ১৪২টি রাষ্ট্রীয় সংস্থায় সরকারে এই পাওনা সুদাসলে বেড়েছে ১১ হাজার ৩২২৫ কোটি ৯১ লাখ টাকা। ঠিক মতো পরিশোধ না করায় দায়-দেনা (ডিএসএল) বা পাওনা বকেয়ার পরিমাণ স্তূপ হয়ে আছে। আর গত সাত বছরে ১৭ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে ভর্তুকির পরিমাণ বেড়েছে ২৪৬ কোটি ১৭ লাখ টাকা। তবে সর্বোচ্চ পাওনা বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) কাছে বেড়ে ৭৬ হাজার ৮৫৫ কোটি ৭০ লাখ টাকা এখন। এ ছাড়া বিপিসির কাছে ১৯ হাজার ২৯০ কোটি টাকা, পিজিসিবির ১৪ হাজার ৯৩২ কোটি টাকা এবং বিসিআইসির কাছে ১৩ হাজার ৯৪৬ কোটি টাকা পাওনা রয়েছে বলে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্যে প্রকাশ করা হয়েছে।
সরকার বিভিন্ন স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা, আধা-স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা, পাবলিক সেক্টর করপোরেশন এবং রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানিগুলোকে তাদের উন্নয়ন প্রকল্প ও অনুন্নয়নমূলক কাজে অর্থায়ন করে থাকে। আর ডিএসএল হলো সরকারের সেই পাওনা অর্থ। উন্নয়ন প্রকল্প ও অনুন্নয়নমূলক কাজের অর্থের উৎস দু’টি- বাংলাদেশ সরকারের নিজস্ব অর্থ এবং উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে প্রাপ্ত প্রকল্প সহায়তা। উভয় ক্ষেত্রেই সরকার চুক্তির মাধ্যমে ঋণস্বরূপ এই অর্থ উক্ত সংস্থাসমূহকে প্রদান করে থাকে। ঋণগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠান কর্তৃক চুক্তির শর্তানুসারে পরিশোধ সূচি অনুযায়ী কিস্তিভিত্তিক সুদসহ অথবা সুদ ব্যতীত এই অর্থ সরকারকে ফেরত প্রদান করতে হয়। কিন্তু শর্ত পালন না করায় এবং পাওনা অপরিশোধিত থাকায় এই দায়ের পরিমাণ বছর বছর বৃদ্ধি পাচ্ছে। রাষ্ট্রায়ত্ত এই সব সংস্থা, আধা-স্বায়ত্তশাসিত, স্থানীয় সরকার সংস্থা প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক সঙ্কটের কারণে সরকার এসব ঋণ বিভিন্নভাবে প্রদান করে থাকে।
অর্থ বিভাগের হালনাগাদ তথ্য থেকে জানা গেছে, সরকারের দায়-দেনা পাওয়া প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও বেড়েছে। আগে যেখানে ১১৬টি প্রতিষ্ঠান ছিল, বর্তমানে তা ১৪২টিতে উন্নীত হয়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত ১৪২টি প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার কাছে ২০২৩ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত সরকারের মেয়াদোত্তীর্ণ বকেয়ার পরিমাণ ৪ লাখ ২১ হাজার ৩৫ কোটি ৮৩ লাখ টাকা, যা এক বছর আগে ছিল দুই লাখ ৩৪ হাজার ৮৫২ কোটি টাকা। বেড়েছে এক লাখ ৮৬ হাজার ১৮৪ কোটি টাকা। বছর শেষে বর্তমানে সুদাসল মিলে বকেয়া পাওনা সরকারের এখন ১১ হাজার ৩২৫ কোটি ৯১ লাখ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে মোট পাওনা এক লাখ ৯৪ হাজার ১৭০ কোটি ৩৬ লাখ টাকা।
অন্য দিকে, রাষ্ট্রীয় ৩০ প্রতিষ্ঠান বা সংস্থার কাছে রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকের গত ২৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত পাওনা বা ঋণ বেড়ে হয়েছে পাঁচ হাজার ৩৫৮ কোটি টাকা, এক বছরে বেড়ে হয়েছে ৬৫ হাজার ৮৯ কোটি ৪৮ লাখ টাকা, যা গত বছর ছিল ৫৯ হাজার ৭৩০ কোটি ৯৬ লাখ টাকা। আর শ্রেণিকৃত ঋণ হলো ১৮৩ কোটি ৬২ লাখ টাকা। এ ছাড়া ১৭ প্রতিষ্ঠানে সাত অর্থবছরে ভর্তুকির পরিমাণ উত্থান-পতনের পর এখন এক হাজার ৫০৭ কোটি ৭১ লাখ টাকা। তবে এক বছরে বেড়েছে ৩৩ কোটি টাকার কিছু বেশি বলে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্য থেকে জানা গেছে।
সমীক্ষা বলছে, রাষ্ট্রায়ত্ত ১৭ প্রতিষ্ঠানকে চালানোর জন্য সরকাকে গত ২০১৬-১৭ অর্থবছরে মোট এক হাজার ১০৯ কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হয়েছে, যা গত চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছর সাময়িক পরিমাণ এক হাজার ৪২২ কোটি ৩০ লাখ টাকায় পৌঁছেছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে এই ভর্তুকির পরিমাণ এক হাজার ৫০৭ কোটি ৭১ লাখ টাকা। এবার সর্বোচ্চ ৫২৯ কোটি ৭৪ লাখ টাকা ভর্তুকি দিয়েছে বিআইডব্লিউটিএকে। কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনকে ৪৬০ কোটি ৪৩ লাখ টাকা, বিসিককে ১৮৯ কোটি টাকা ভর্তুকি বা অনুদান দিয়েছে সরকার।
চলতি সময়ে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার কাছে সর্বোচ্চ ঋণের টাকা পাবে ৬৫ লাখ টাকা, বিপিসির কাছে ৯ হাজার ৮৬৩ কোটি ৫৮ লাখ টাকা, বিএসএফআইসির কাছে ৮ হাজার ৫৯৭ কোটি ১৪ লাখ টাকা, বিপিডিবির কাছে ৬ হাজার ৭০২ কোটি ৭৭ লাখ টাকা, টিসিবির কাছে ৭ হাজার ৪৪৬ কোটি টাকা, বিবিসির কাছে ৪ হাজার ৪৮২ কোটি টাকা, বিআইডব্লিউটিসির কাছে ৪ হাজার ৪৮২ কোটি টাকা। শ্রেণিকৃত ঋণ আছে বিজেএমসি, বিএডিসি, বিটিএমসির কাছে প্রায় ১৭৮ কোটি টাকা। যেসব প্রতিষ্ঠানের কাছে সরকারের পাওনা (ডিএসএল) রয়েছে সে প্রতিষ্ঠানগুলো হলো- আরইবি, ডিপিডিসি, আরপিসিএল, পিজিসিবি, ডেস্কো, ইজিসিবি, আশুগঞ্জ পাওয়ার, নর্থ ওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন, কয়লা বিদ্যুৎ উৎপাদন, নেসকো, পেট্রোবাংলা, বিপিসি, তিতাস, সুন্দরবন গ্যাস, গ্যাস ট্রান্সমিশন, বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ড, কর্ণফুলী গ্যাস, বিসিআইসি, বিএসইসি, বিসিক, বিএসইসি, বিআইডব্লিটিএ, বিআইডব্লিউটিসি, মংলা বন্দর, চট্টগ্রাম বন্দর, বিজেএমসি ইত্যাদি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এইসব রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের পাওনা দীর্ঘদিন ধরে পরিশোধ না করে সরকারের কাছ থেকে ঋণ নেয়ায় দায়ের পরিমাণ লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। এদের মধ্যে বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানই এখনো লাভের মুখ দেখেনি।