শ্রমিক-কর্মচারীদের কল্যাণ তহবিলের ২৫ কোটি ২২ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলায় শান্তিতে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ গ্রামীণ টেলিকমের চেয়ারম্যান ড. মুহাম্মদ ইউনূসসহ ১৪ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরু করার আদেশ দিয়েছেন আদালত। একই সাথে আগামী ১৫ জুলাই তাদের বিরুদ্ধে এ মামলার সাক্ষ্য গ্রহণের দিন ধার্য করা হয়েছে। বুধবার ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৪ এর বিচারক সৈয়দ আরাফাত হোসেনের আদালত এ আদেশ দেন।
আদেশের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসসহ ১৪ জনের কাছে জানতে চাওয়া হয় আপনারা দোষী না নির্দোষ। জবাবে ড. ইউনূসসহ ১৪ জন আদালতে নিজেদের নির্দোষ দাবি করে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি চান। এর আগে আদালতের নির্দেশে দুদকের আইনজীবী মোশাররফ হোসেন কাজল অভিযোগগুলো পাঠ করে বলেন, আপনারা দোষী না নির্দোষ। আপনারা কি বিচার চান। তখন লোহার খাঁচার তৈরি আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়ানো ড. ইউনূসসহ ১৪ জনই বলেন, আমরা নির্দোষ।

আদেশের সময় যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, ইইউ, নরওয়ে, অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকরা উপস্থিত ছিলেন।
লোহার খাঁচার তৈরি আদালতের কাঠগড়ায় ড. ইউনূস : বুধবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে আদালতে আসেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস। সকাল ১০টা ৪৫ মিনিটে ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৪ এর বিচারক সৈয়দ আরাফাত হোসেনের আদালতে ড. মুহাম্মদ ইউনূসহ অন্য আসামিদের বিরুদ্ধে দুদকের মামলার কার্যক্রম শুরু হয়। এ সময় আদালত ড. ইউনূস বাদে অন্য আসামিদের আদালতে স্থাপিত লোহার খাঁচার কাঠগড়ায় দাঁড়াতে বলেন। তখন ড. মুহাম্মদ ইউনূস অন্য আসামিদের সাথে আদালতে স্থাপিত লোহার খাঁচার কাঠগড়ায় দাঁড়ান। এরপর বেলা ১১টার দিকে অভিযোগ গঠন করে আদেশ দেয়ার পর আদালত সবাইকে বসতে বলেন। এরপর ড. মুহাম্মদ ইউনূস অন্য সবাইকে নিয়ে আদালতে থাকা সিটে বসেন। এরপর ড. ইউনূসের আইনজীবী ব্যারিস্টার আবদুল্লাহ আল মামুন আদালতে বলেন, আমরা এই অভিযোগ গঠনের আদেশ বাতিল চেয়ে হাইকোর্টে আবেদন করব। তিনি আরো বলেন ড. ইউনুস মিউনিখ অলিম্পিকসহ বিদেশে বেশ কিছু অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করবেন। আগামী ১১ জুলাই তিনি একটি আন্তর্জাতিক কনফারেন্সে যাবেন। দেশে ফিরতে ওনার সময়ের প্রয়োজন হবে। এ জন্য তিনি সাক্ষ্যগ্রহণের আগে দুই মাস সময় আবেদন করেন।

অপর দিকে দুদকের আইনজীবী মোশাররফ হোসেন কাজল এই আবেদনের বিরোধিতা করেন। তিনি বলেন, উনাদের কোনো আবেদন থাকলে ধার্য তারিখে এসে আবার আবেদন করবেন। আদালত উভয়পক্ষে শুনানি শেষে আগামী ১৫ জুলাই সাক্ষ্যগ্রহণের তারিখ ধার্য করেন। এ দিকে বেলা সোয়া ১১টার দিকে আদালত থেকে বের হয়ে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন ড. ইউনূস। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, মানিলন্ডারিং, অর্থ আত্মসাৎ, প্রতারণা- এসব শব্দের সাথে পরিচিত নই। অথচ এসব শব্দ আমার ওপর আরোপ করা হচ্ছে। আমাদের হয়রানি করা হচ্ছে।
ড. ইউনূস বলেন, সারা জীবন তো আমরা মানুষের সেবায় কাটিয়েছি। আমরা নিজেদের অর্থ ব্যয় করে এসেছি। এটাই আমাদের ইতিহাস। কিন্তু আমাদের বুঝে আসছে না কেন এই হয়রানি করা হচ্ছে?
মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, আমি রক্তচোষা, আমি সুদখোর, আমি দেশের শত্রু, আমি পদ্মা সেতুর অর্থ আটকে দিয়েছি, চার দিকে ষড়যন্ত্র করে বেড়াই কথার কথা এভাবেই বলা হচ্ছে। এগুলোই হচ্ছে হয়রানি। আমাকে জোর করে গ্রামীণ ব্যাংক থেকে বের করে দেয়া হয়েছে। হয়রানির কারণ সম্পার্কে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এত বছর পর কেন রাজনীতির প্রসঙ্গ আসছে। আমি তো বারবার বলেছি, রাজনীতি আমার বিষয় নয়। তারপরও প্রতি বছর নতুন নতুন কাহিনী আমার নামে রচনা করা হচ্ছে। হয়তো দেব-দেবীরা তার ওপর ক্ষুব্ধ বলে মন্তব্য করেন তিনি। তবে সেই দেব-দেবী কারা, জানতে চাইলে তিনি কোনো মন্তব্য করেননি।

আদালতের লোহার খাঁচার আসামির কাঠগড়ায় দাঁড়ানো সম্পার্কে তিনি বলেন, একজন নিরপরাধ নাগরিককে লোহার খাঁচার (আসামির কাঠগড়া) মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে শুনানির সময়, এটা আমার কাছে অত্যন্ত অপমানজনক। এটা গর্হিত কাজ। এটা যেন কারো ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য না হয়। একটা পর্যালোচনা হোক। তিনি আরো বলেন, একটা সভ্য দেশে কেন একজন নাগরিককে পশুর মতো দাঁড়িয়ে থাকতে হবে শুনানির সময়। যেখানে একজন নাগরিক দোষী সাব্যস্ত হননি। অনেক আইনজ্ঞ আছেন, বিচারপক্ষের সাথে যুক্ত ব্যক্তিরা পর্যালোচনা করে দেখবেন, এটা রাখার দরকার আছে কি নেই? সারা সভ্য দুনিয়ায় যেভাবে হচ্ছে, সেভাবে হবে। আমরা সভ্য দেশের তালিকায় থাকতে পারি। ড. ইউনূস বলেন, আজকে আমরা অনেকক্ষণ খাঁচার (আসামির কাঠগড়া) মধ্যে ছিলাম। বলা হয়েছিল, আপনি থাকেন। কিন্তু আমরা সারাক্ষণ লোহার খাঁচার মধ্যে ছিলাম। আমি আগেও প্রশ্ন তুলেছি, এটা ন্যায্য হলো কি না? আমি যত দূর জানি, যত দিন আসামি অপরাধী হিসেবে দোষীসাব্যস্ত না হচ্ছে, তত দিন তিনি নিরপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবেন। এরআগে গত ২ জুন দুদকের পক্ষে অভিযোগ গঠনের আবেদন এবং ড. মুহাম্মদ ইউনূসসহ অন্য আসামিদের পক্ষে অব্যাহতি চেয়ে আবেদনের শুনানি গ্রহণ করে আদালত ১২ জুন আদেশের দিন ধার্য করেন।

আদালতে ড. ইউনূসের পক্ষে আইনজীবী ছিলেন ব্যারিস্টার আবদুল্লাহ আল মামুন। সাথে ছিলেন ব্যারিস্টার খাজা তানভীর আহমেদ ও অ্যাডভোকেট এস এম মিজানুর রহমান। অন্য দিকে দুদকের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী মোশাররফ হোসেন কাজল।
গ্রামীণ টেলিকমের কর্মীদের লভ্যাংশের ২৫ কোটি ২২ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে করা এই মামলায় গত ১ ফেব্রুয়ারি ঢাকার সিনিয়র স্পেশাল জজ আছাদুজ্জামানের আদালতে চার্জশিট দাখিল করেছেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা। অন্য দিকে গত ২৯ জানুয়ারি দুদকের প্রধান কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত কমিশন বৈঠকে ড. ইউনূসসহ ১৪ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট অনুমোদন দেয়া হয়।
চার্জশিটভুক্ত ১৪ আসামি হলেন- গ্রামীণ টেলিকমের চেয়ারম্যান ড. মুহাম্মদ ইউনূস, ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাজমুল ইসলাম, পরিচালক ও সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক আশরাফুল হাসান, পরিচালক পারভীন মাহমুদ, নাজনীন সুলতানা, মো: শাহজাহান, নূরজাহান বেগম ও পরিচালক এস এম হাজ্জাতুল ইসলাম লতিফী, অ্যাডভোকেট ইউসুফ আলী, অ্যাডভোকেট জাফরুল হাসান শরীফ, গ্রামীণ টেলিকম শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নের সভাপতি মো: কামরুজ্জামান, সাধারণ সম্পাদক ফিরোজ মাহমুদ হাসান, শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নের দফতর সম্পাদক কামরুল হাসান ও প্রতিনিধি মো: মাইনুল ইসলাম। দুদকের উপপরিচালক গুলশান আনোয়ার প্রধান বাদি হয়ে গত বছরের ৩০ মে মামলাটি করেন। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আসামিরা ২৫ কোটি ২২ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেছেন। অবৈধভাবে অর্থ স্থানান্তর করা হয়েছে, যা মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে অপরাধ।