২০ বছর আগে ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট রাজধানীর বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা শেখ হাসিনার সমাবেশে ভয়াবহ গ্রেনেড হামলা চালানো হয়। ১৪ বছর পর নৃশংস সেই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় বিচারিক আদালতে রায় হয়। মামলাটি এখন হাইকোর্টে চূড়ান্ত নিষ্পত্তির অপেক্ষায় আছে। বর্তমানে আসামিদের মৃত্যুদণ্ডাদেশ অনুমোদন (ডেথ রেফারেন্স) ও আপিলের ওপর হাইকোর্টে শুনানি চলছে।
বিচারপতি সহিদুল করিম ও বিচারপতি মো: মোস্তাফিজুর রহমানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চে এ সংক্রান্ত মামলাা ডেথ রেফারেন্সসহ আসামিদের আপিল শুনানি চলছে। ইতোমধ্যে আসামিদের আপিল শুনানি শেষ পর্যায়ে রয়েছে। আজ রোববার হাইকোর্টের এই বেঞ্চে এ মামলার অন্যাতম আসামি সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরের পক্ষে শুনানি রয়েছে।
এর আগে গত মঙ্গলবার সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরের পক্ষে শুনানি করেন সিনিয়র আইনজীবী এস এম শাহজাহান ও মো: শিশির মনির। এর আগে এ মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত চারজন আসামির পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী মোহাম্মদ আলী।
এ বিষয়ে আইনজীবী মো: শিশির মনির জানান, শুনানির শুরুতে আমরা দু’জনসহ আসামির স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দীতে সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরের বিষয়ে এসেছে, সে বিষয়ে বলেছি। এ দু’জন হলেন, মাওলানা আবদুস সালাম ও মুফতি আবদুল হান্নান। রোববার আমরা সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরের পক্ষে শুনানি করব।
এ বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ডেপুর্টি অ্যাটনি জেনারেল বশির আহমেদ বলেন, ২০২২ সালের ডিসেম্বর মাস থেকে এ মামলার শুনানি শুরু হয়েছে। এখন শেষ পর্যায়ে আসামিপক্ষের শুনানি চলছে। এখন সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরের পক্ষে শুনানি চলছে। আরো দুই থেকে তিনজন আসামির পক্ষে শুনানি বাকি আছে। তিনি বলেন, আমরা রাষ্ট্রপক্ষে শুনানির জন্য প্রস্তুত আছি। আসামিপক্ষের শুনানি শেষ হলে আমরা শুরু করব।
২০১৮ সালের ১০ অক্টোবর ওই ঘটনায় বিচারিক আদালত সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর ও বিএনপি নেতা আবদুস সালাম পিন্টুসহ ১৯ জনের মৃত্যুদণ্ড দেন।
একই সাথে বিএনপির তৎকালীন সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান এবং বর্তমানে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ ১৯ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়। বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেয়া হয় অপর ১১ আসামিকে।
পরে ওই বছরের ২৭ নভেম্বর এ মামলার বিচারিক আদালতের রায় প্রয়োজনীয় নথিসহ হাইকোর্টের ডেথ রেফারেন্স শাখায় এসে পৌঁছে। নিয়ম অনুযায়ী ফৌজদারি মামলায় বিচারিক আদালত যখন আসামিদের মৃত্যুদণ্ড দেন, তখন ওই দণ্ড কার্যকরের জন্য হাইকোর্টের অনুমোদনের প্রয়োজন হয়।
এজন্য সংশ্লিষ্ট বিচারিক আদালত ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৭৪ ধারা মোতাবেক মামলার সব নথি হাইকোর্টে পাঠিয়ে দেন। যা ডেথ রেফারেন্স নামে পরিচিত। ওই নথি আসার পর হাইকোর্টের ডেথ রেফারেন্স শাখা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সংশ্লিষ্ট মামলার পেপারবুক প্রস্তুত করে। পেপারবুক প্রস্তুত হলে মামলাটি শুনানির জন্য প্রস্তুত হয়।
আইনজীবীরা জানান, প্রায় ৩০ হাজার পৃষ্ঠার এ মামলার নথি পড়া শেষে আসামি পক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপনও শেষ পর্যায়ে রয়েছে। আসামি পক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ হলে রাষ্ট্রপক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শুরু হবে।
মামলার বিবরণী থেকে জানা যায়, ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট রাজধানীর বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের সমাবেশে ভয়াবহ গ্রেনেড হামলাটি চালানো হয়। অল্পের জন্য ওই হামলা থেকে প্রাণে বেঁচে যান বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি, তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা শেখ হাসিনা। তবে হামলায় আওয়ামী লীগের মহিলাবিষয়ক সম্পাদক, সাবেক রাষ্ট্রপতি (মরহুম) জিল্লুর রহমানের স্ত্রী আইভী রহমানসহ ২৪ জন নিহত হন। আহত হন দলের তিন শতাধিক নেতাকর্মী। ঘটনার পরদিন মতিঝিল থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) ফারুক আহমেদ বাদি হয়ে মামলা করেন।
তদন্ত শেষে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ২০০৮ সালের ১১ জুন দেয়া অভিযোগপত্রে বিএনপি নেতা আবদুস সালাম পিন্টু, তার ভাই মাওলানা তাজউদ্দিন ও হুজি নেতা মুফতি আব্দুল হান্নানসহ ২২ জনকে আসামি করা হয়।
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনের পর অধিকতর তদন্তের নির্দেশ দেন আদালত। দুই বছর তদন্তের পর ২০১১ সালের ৩ জুলাই ৩০ জনকে আসামি করে সম্পূরক অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। এর ফলে এ মামলায় মোট আসামির সংখ্যা হয় ৫২।
মোট ৫২ আসামির মধ্যে আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ ও মুফতি হান্নান এবং তার সহযোগী শাহেদুল ইসলাম বিপুলের মৃত্যুদণ্ড অন্য মামলায় কার্যকর হয়। তিনজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ায় এ মামলার আসামির সংখ্যা দাঁড়ায় ৪৯ জনে।
বিচারিক আদালত ১৯ জনের মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেন। তারা হলেন সাবেক প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, সাবেক উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টু, প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থার (ডিজিএফআই) সাবেক পরিচালক মেজর জেনারেল (অব:) রেজ্জাকুল হায়দার চৌধুরী, জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) সাবেক মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব:) আবদুর রহিম, হানিফ পরিবহনের মালিক মো: হানিফ, মাওলানা তাজউদ্দিন, মাওলানা শেখ আবদুস সালাম, মাওলানা শেখ ফরিদ, মাওলানা আবু সাঈদ, মুফতি মঈনউদ্দিন শেখ ওরফে আবু জান্দাল, হাফেজ আবু তাহের, মো: ইউসুফ বাট ওরফে মাজেদ বাট, আবদুল মালেক, মফিজুর রহমান ওরফে মহিবুল্লাহ, আবুল কালাম আজাদ ওরফে বুলবুল, মো: জাহাঙ্গীর আলম, হোসাইন আহমেদ তামিম, রফিকুল ইসলাম ওরফে সবুজ ও মো: উজ্জ্বল ওরফে রতন। তাদের মধ্যে ১৪ জন হুজির নেতাকর্মী। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের মধ্যে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব:) আবদুর রহিম ও হুজির সাবেক আমির শেখ আবদুস সালাম ২০২১ সালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন।
এ ছাড়া যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের মধ্যে রয়েছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, বিএনপির নেতা হারিছ চৌধুরী, কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসাইন, আরিফুল ইসলাম, মুফতি আবদুর রউফ, হাফেজ ইয়াহিয়া, মুফতি শফিকুর রহমান, মুফতি আবদুল হাই, মাওলানা আবদুল হান্নান ওরফে সাব্বির, মুরসালিন, মুত্তাকিন, জাহাঙ্গীর বদর, আরিফ হাসান ওরফে সুমন ওরফে আবদুর রাজ্জাক, আবু বকর সিদ্দিক ওরফে হাফেজ সেলিম হাওলাদার, মো: ইকবাল, রাতুল আহমেদ, মাওলানা লিটন, মো: খলিল ও শাহাদত উল্লাহ ওরফে জুয়েল।





