জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প, কিন্তু পৌনে সাত বছরেও কাজ শুরু করতে পারেনি। কবে শেষ হবে এই প্রকল্পের কাজ সেটাও আজ অজানা। অথচ পৌনে তিন বছরে এই গুরুত্বপূর্ণ ৩৪টি বাফার গুদাম নির্মাণকাজ শেষ করার কথা ছিল। বর্ধিত সময়ের আর মাত্র এক বছর হাতে আছে। সেখানে প্রকল্পের অগ্রগতি বা খরচ হয়েছে মাত্র ১২.৯৮ শতাংশ। তবে নানান জটিলতা ও প্রতিবন্ধকতার কারণে কাজই শুরু হয়নি। বাস্তব অগ্রগতি মাত্র ৩৩.৫০ শতাংশ। খরচ বেড়েছে ২৫.২০ শতাংশ আর মেয়াদ পৌনে ৪১ শতাংশ। আইএমইডি বলছে, প্রকল্পটি সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প, যা সম্পূর্ণ জিওবি অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন। কিন্তু ভূমি অধিগ্রহণ সংক্রান্ত জটিলতা, একাধিক প্রকল্প পরিচালক পরিবর্তন, দরপত্র চূড়ান্ত মূল্যায়নের পূর্বেই দরপত্রের বৈধতার মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় দরপত্র বাতিল হয়ে যাওয়া, যথাসময়ে আরডিপিপি অনুমোদন না হওয়া, যথাসময়ে অর্থ-বরাদ্দ ও ছাড় না হওয়া ইত্যাদি কারণে প্রকল্পটির অগগ্রতি ধীরগতি হচ্ছে। ফলে প্রকল্পের বাস্তবায়নকাল ৬ বছর অতিবাহিত হলেও এখনও মূল কাজই শুরু করা যায়নি। বিসিআইসি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জমি অধিগ্রহণে জটিলতাই প্রকল্প বিলম্বের মূল কারণ।
শিল্প মন্ত্রণালয়ের প্রকল্প প্রস্তাবনা থেকে জানা গেছে, দেশের বিভিন্ন স্থানে লাখ লাখ মেট্রিক টন সার খোলা আকাশের নিচে পড়ে থাকে। ফলে জমিতে এসব সারের কার্যকারিতা কমে যায়। খোলা জায়গায় রাখার কারণে ইউরিয়া সার জমাট বেঁধে দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়। আর্দ্রতার কারণে সারের গুণগত মানও ঠিক থাকে না। ফলে কৃষকরা সারের প্রকৃত সুফলও পায় না। সে কারণেই সার-সংরক্ষণ ও বিতরণের সুবিধার্থে মজুদ নিশ্চিত করার জন্য ৩৪টি বাফার গুদাম নির্মাণ করা হচ্ছে। বর্তমানে বিএডিসির ২৪টি আপৎকালীন গুদাম আছে। এগুলোতে সাধারণ ও সর্বোচ্চ ধারণক্ষমতা ১ লাখ ৪৫ হাজার ও ২ লাখ ৯৩ হাজার মেট্রিক টন। প্রতি বছর এসব গোডাউন থেকে ১৭ লাখ ১৮ হাজার মেট্রিক টন ইউরিয়া সার কৃষকদের মধ্যে সরবরাহ করা হয়। এর পরেও প্রায় আড়াই লাখ মেট্রিক টন সার খোলা আকাশের নিচে রাখতে হচ্ছে। এরই মধ্যে ১৩টি গোডাউন নির্মাণাধীন রয়েছে। যার প্রকল্প খরচ ৪৮২ কোটি ৪ লাখ টাকা। এই ১৩টি নির্মাণ হলে এক লাখ ৩০ হাজার মেট্রিক টন সার মজুদ রাখা যাবে। তার পরও মজুদ ব্যবস্থা পর্যাপ্ত মনে হচ্ছে না বিধায় মন্ত্রণালয়ের নতুন করে ৩৪টি গুদাম নির্মাণের উদ্যোগ।
পরিকল্পনা কমিশনের (আইএমইডি) তথ্য বলছে, আপৎকালীন ৮ লাখ মেট্রিক টন সারের মজুদ নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে এবং দেশে সারের মজুদ সুনিশ্চিত করে খাদ্য উৎপাদনে দেশের স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের উদ্দেশ্যে শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি) কর্তৃক ‘সার সংরক্ষণ ও বিতরণের সুবিধার্থে দেশের বিভিন্ন জায়গায় ৩৪টি বাফার গুদাম নির্মাণ শীর্ষক প্রকল্পটি জিওবি অর্থায়নে ২ হাজার ৪৮২ কোটি ৮৪ লাখ টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে বর্ধিত সময়ে সেপ্টেম্বর ২০১৮ হতে জুন ২০২৫ মেয়াদে বাস্তবায়নের নিমিত্ত অনুমোদিত হয়, যা সারা দেশের ৭টি বিভাগের ৩৪টি জেলায় বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। প্রকল্পটির প্রধান কাজ হচ্ছে সারা দেশের ৩৪টি জেলায় ৩৪টি বাফার গুদাম নির্মাণ করা। তবে মূল প্রকল্প খরচ ছিল এক হাজার ৯৮৩ কোটি ৪ লাখ টাকা, যা পৌনে তিন বছরে অর্থাৎ সেপ্টেম্বর ২০১৮ হতে জুন ২০২১, ৩৩ মাস মেয়াদে সমাপ্ত করার কথা ছিল। কাজ না হওয়াতে এখন ৮১ মাস বা পৌনে ৭ বছরে উন্নীত করা হয়েছে। বেড়েছে ব্যয়ও।
সরেজমিনে পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০১৯-২০ থেকে ২০২১-২২ এই তিন অর্থবছর পর্যন্ত কোনো অগ্রগতি নেই। গত ২০২২-২৩ অর্থবছরে আরডিপিপি অনুমোদন প্রক্রিয়াধীন থাকায় ওই বছরে কোনো অর্থ বরাদ্দ ও ছাড় হয়নি। চলতি ২০২৩-২৪ অর্থবছরে প্রকল্পের অনুকূলে ৪৫ কোটি টাকা বরাদ্দের মধ্যে মাত্র ১৩ কোটি ৯৫ লাখ টাকা অর্থ-ছাড় হলেও কোনো অর্থ ব্যয় হয়নি। ২০২৪ সালের মে পর্যন্ত প্রকল্পের ক্রমপুঞ্জিত আর্থিক অগ্রগতি ৩২২ কোটি ৪৩ লাখ ৫৪ হাজার টাকা। ১২.৯৮ শতাংশ আর্থিক এবং বাস্তব অগ্রগতি ৩৩.৫০ শতাংশ। ডিপিপি বা আরডিপিপিতে প্রকল্পের আওতায় পণ্য ক্রয়ের ৭টি, কার্য ক্রয়ের ৬টি ও ৩টি সেবা ক্রয়ের প্যাকেজ রয়েছে। পণ্য ক্রয়ের ৭টি প্যাকেজের মধ্যে ৩টি প্যাকেজের ক্রয় কাজ সম্পন্ন হয়েছে। ডিপিপি বা আরডিপিপি অনুযায়ী কার্য ক্রয়ের ৬টি প্যাকেজের আওতায় ১৮টি লটের ৩৪টি সাইটের মধ্যে ২৪টির দরপত্র মূল্যায়ন প্রক্রিয়াধীন। ফলে ৩৪টি বাফার গুদামের নির্মাণকাজ এখনও শুরু হয়নি। সেবা ক্রয়ের একটি প্যাকেজের দরপত্র আহ্বান ও ক্রয় কার্যক্রম সম্পন্ন করা হয়েছে।
প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য হলো, দেশের সারের মজুদ সুনিশ্চিত করে কৃষির উৎপাদন বাড়িয়ে খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন, আপৎকালীন সময়ের জন্য সার মজুদকরণ এবং দ্রুত সময়ে প্রান্তিক কৃষকের মাঝে সার পৌঁছানো।
প্রকল্পের অন্যতম প্রধান কাজ হচ্ছে ৩৪টি জায়গার জন্য ভূমি অধিগ্রহণ সম্পন্ন করা। কিন্তু বাস্তবে মূল ডিপিপি অনুমোদনের প্রায় তিন-চার বছর পর জমির মূল্য পরিশোধের চাহিদাপত্র পাওয়া যায়। চাহিদাপত্র পাওয়ার পর প্রতিটি জায়গায় ভূমির জন্য প্রদানকৃত মূল্যের তারিখ হতে আরো প্রায় ২ হতে ২২ মাস পর্যন্ত বিলম্ব হয়। এখনও ৪টি জেলার (মাদারীপুর, পটুয়াখালী, কুষ্টিয়া ও কুড়িগ্রাম) ভূমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়াধীন। প্রকল্পের আওতায় অধিগ্রহণকৃত জমির মধ্যে বৈদ্যুতিক খুঁটি, রেলওয়ের জমি, খাস জমি, নদী শ্রেণীর জমি, রাস্তা সংক্রান্ত জটিলতা, পরিবেশ ছাড়পত্র প্রাপ্তিতে বিলম্ব, স্থানীয় জনগণ/জনপ্রতিনিধিগণের স্থান পরিবর্তনের প্রস্তাব ইত্যাদি জটিলতা ছিল। কিছু কিছু জায়গার মালিকদের জমি অধিগ্রহণ প্রত্যাহারের আবেদন ও আবেদন নিষ্পত্তিতে সময় ব্যয় হয়েছে বিধায় জমি অধিগ্রহণে বিলম্বিত হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় কার্য ক্রয়ের দুইবার দরপত্র আহ্বান করা হয় এবং ডিপিপি অনুযায়ী প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ায় সিসিজিপির অনুমোদন পাওয়া যায়নি। দরপত্রের বৈধতার মেয়াদ শেষ হওয়ায় দরপত্র বাতিল হয়ে যায়। চলতি অর্থবছরে কার্য ক্রয়ের ৬টি প্যাকেজের আওতায় ১৮টি লটের ৩৪টি সাইটের মধ্যে ২৪টির দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে, যা যথাসময়ে মূল্যায়ন শেষ করাই বড় চ্যালেঞ্জ। এ ছাড়া, এ প্রকল্পের একাধিক প্রকল্প পরিচালক পরিবর্তনে প্রকল্পের অগ্রগতি মন্থর হয়েছে। সরেজমিনে প্রকল্প এলাকা পরিদর্শনে দেখা যায় প্রকল্পের অনুকূলে অধিগ্রহণকৃত জমিগুলোতে এখনও ভূমি উন্নয়নের কাজ শুরু হয়নি।
বিলম্বের কারণ তুলে ধরে প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়ায় যে সব সমস্যার কারণে সময় বেশি প্রয়োজন হয়েছে তন্মধ্যে অন্যতম হলো প্রস্তাবিত জমির মধ্যে বৈদ্যুতিক খুঁটি, রেলওয়ের জমি, খাস জমি, নদী শ্রেণীর জমি, রাস্তাসংক্রান্ত জটিলতা, পরিবেশ ছাড়পত্র প্রাপ্তিতে বিলম্ব, স্থানীয় জনগণ বা জনপ্রতিনিধিদের স্থান পরিবর্তনের প্রস্তাব ইত্যাদি। প্রতিটি জেলায় ব্যাপক সংখ্যক জমি অধিগ্রহণ চলমান থাকায় এই প্রকল্পের জমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া করতে জেলা প্রশাসনের কিছুটা সময়ের প্রয়োজন পড়েছে। কিছু কিছু জায়গার মালিকদের জমি অধিগ্রহণ প্রত্যাহারের আবেদন ও আবেদন নিষ্পত্তিতে সময় ব্যয় হয়েছে বিধায় জমি অধিগ্রহণের সময় কিছুটা বিলম্বিত হয়েছে। ২০২০-২১ অর্থবছরে প্রকল্পটি নিম্ন অগ্রাধিকারভুক্ত করা হয়। একই অর্থবছরের প্রায় ৬ মাস পর অর্থ ছাড় পাওয়া যায়।
আইএমইডির নিয়োগকৃত পর্যবেক্ষক সংস্থা জেটইনকো লিমিটেড বলছে, এখনও ৪টি জেলার ভূমি অধিগ্রহণ সম্পন্ন হয়নি। প্রকল্প দফতর কর্তৃক উক্ত জেলা বা উপজেলা প্রশাসনের সাথে নিবিড় যোগাযোগ বা সমন্বয় বৃদ্ধি করে দ্রুত ভূমি অধিগ্রহণের কাজ সমাপ্তকরণের উদ্যোগ গ্রহণ করা যেতে পারে। প্রকল্পের আওতায় ২ (দুই) বার দরপত্র আহবান করা হয় এবং দরপত্রের বৈধতার মেয়াদ শেষ হওয়ায় দরপত্র বাতিল হয়ে যায়। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে কার্য ক্রয়ের দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। দরপত্র মূল্যায়ন প্রক্রিয়াধীন। দরপত্র মূল্যায়ন কার্যক্রম নির্ধারিত সময়ে সম্পন্ন করে দ্রুত ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান নিয়োগের লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিসিআইসি ও প্রকল্প দফতর কর্তৃক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে। প্রকল্পের একাধিক প্রকল্প পরিচালক পরিবর্তনে প্রকল্পের অগ্রগতি মন্থর হয়েছে। সুতরাং, এ প্রকল্পের সুষ্ঠু বাস্তবায়নের লক্ষ্যে বর্তমান প্রকল্প পরিচালককে প্রকল্প বাস্তবায়ন সময় পর্যন্ত দায়িত্বে বহাল রাখার ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিসিআইসি কর্তৃক উদ্যোগ গ্রহণ করা যেতে পারে।





