বাংলাদেশ সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান বলেছেন, শেখ হাসিনার পদত্যাগের পর সব দলের সাথে আলোচনা করে তারা একটা অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এবং সেই সরকারের মাধ্যমেই দেশ পরিচালনা করা হবে। তিনি বলেছেন, একটা অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করব এবং এই সরকারের মাধ্যমে এ দেশের সব কার্যকলাপ চলবে। আমরা এখন রাষ্ট্রপতির কাছে যাবো। ওনার সাথে আলোচনা করে অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করে দেশ পরিচালনা করব। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের সাথে আলোচনার পর সোমবার বিকেল ৪টায় জাতির উদ্দেশে ভাষণে সেনাপ্রধান এ কথা বলেন।
আইনবিদদের মতে প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করায় এখন অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করার বিষয়ে রাষ্ট্রপতি সিদ্ধান্ত নেবেন। উল্লেখ্য, কেননা একদিকে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করেছেন। এ অবস্থায় সাংবিধানিক দায়িত্ব রাষ্ট্রপতির। আইনবিদদের মতে, এখন যেটা ঘটেছে সেটা একটা গণঅভ্যুত্থান। এই ক্রান্তিকালে গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে যেটা হবে সেটাই আইন। এই অবস্থা, স্বাভাবিক অবস্থার সাথে মিলালে হবে না।

গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে যেটা হবে পরবর্তীতে তা আইনের সাথে অ্যাডজাস্ট করে নিতে হবে।
অন্তর্বর্তী সরকার গঠন কোনো প্রক্রিয়ায় হতে পারে সে বিষয়ে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি ব্যারিস্টার এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেন, রাষ্ট্রপতি অধ্যাদেশ জারি করে অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করতে পারেন। তিনি বলেন, জাতীয় প্রয়োজনে এটি হবে। ১৯৯১ সালে তো সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান ছিল না। এখন রাষ্ট্রপতি অধ্যাদেশ জারি করবেন। তিনি আরো বলেন, এখন প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করায় সংসদ নেতা কে সে দাবি কেউ করছে না। কাজেই রাষ্ট্রপতি সংসদ ভেঙে দিতে পারেন।

এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট মনজিল মোরশেদ বলেন, এখানে যেটা হয়েছে, সংবিধানে এরকম নির্দেশনা নেই। এটা একটা গণঅভ্যুত্থান। এই ক্রান্তিকালে গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে যেটা হবে সেটাই আইন। এই অবস্থা, স্বাভাবিক অবস্থার সাথে চিন্তা করলে হবে না। গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে যেটা হবে পরবর্তীতে তা আইনের সাথে অ্যাডজাস্ট করে নিতে হবে।
তিনি আরো বলেন, এখন তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা নেই। প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করলে মন্ত্রিপরিষদ থাকে না। সংসদ এখনো আছে। এখন সংসদ নেতা নির্বাচনের প্রশ্ন আসে। এখন গণ অভ্যুত্থানের মাধ্যমে যেটা হবে পরবর্তীতে সেটা রেটিফাই করতে হবে। তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশে সংসদীয় ব্যবস্থা বিদ্যমান। সংসদীয় ব্যবস্থায় গণ অভ্যুত্থানের কথা চিন্তা করা হয়নি।

এ বিষয়ে জাতীয় আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের সাবেক সদস্য সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট শাহ মো: খসরুজ্জামান বলেন, প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করায় এখন অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করার বিষয়ে রাষ্ট্রপতি সিদ্ধান্ত নেবেন। কারণ একদিকে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে একদিকে প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করেছেন। এ অবস্থায় সাংবিধানিক দায়িত্ব রাষ্ট্রপতির।

এছাড়া জাতীয় আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট শাহ মো: খসরুজ্জামান এ বিষয়ে এক বিবৃতিতে বলেন, দেশের ক্রান্তিকালে বিরাজমান অবস্থার সমাধানের লক্ষ্যে দক্ষ, সৎ ও নির্দলীয় ব্যক্তিত্বের সমন্বয়ে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করার সেনাপ্রধানের প্রস্তাবকে সমর্থন ও অভিনন্দন জানাই। তিনি ছাত্র-জনতার এই ঐতিহাসিক আন্দোলনে যারা শহীদ হয়েছেন তাদের রূহের মাগফিরাত কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর দুঃখ ও সমবেদনা জ্ঞাপন করেন। বিবৃতিতে তিনি আরো বলেন, দেশে শান্তি ফিরিয়ে আনা এবং চলমান অর্থনৈতিক সঙ্কট সমাধানকল্পে মুদ্রাবাজারে অর্থ সরবরাহ বৃদ্ধি এবং নিত্যপণ্যের মূল্য রোধ করাই এখন প্রস্তাবিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মূল দায়িত্ব হবে। তিনি জরুরি ভিত্তিতে ব্যবস্থা গ্রহণ কল্পে নতুন সরকারকে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করার আহ্বান জানান।

তবে সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী জেড আই খান পান্না অন্তর্বর্তী সরকারের বিপক্ষে অভিমত ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, পার্লামেন্টারি সিস্ট বজায় রাখতে হলে ভারত ও ইংল্যান্ডের নিয়ম অনুসরণ করতে হবে। এখন একটি সংসদ বিদ্যমান রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করেছেন এখন নিয়ম হচ্ছে রাষ্ট্রপতি সংসদের বিরোধী দলের নেতাকে ডাকবেন। এখন এটা ব্রিটিশ ও ভারতীয় পার্লামেন্টারি সিস্টেম অনুসরণ করতে হবে। তিনি বলেন, আমাদের অন্তর্বর্তীকালীন কোনো ব্যবস্থা নেই। তিনি আরো বলেন, এখন লুটতরাজ বন্ধ করতে হবে। তা না হলে এর দায় রাজনৈতিক দলের এবং যারা মিটিংয়ে অংশ নিয়েছেন তাদের ওপর বর্তাবে।
প্রধানমন্ত্রীর পদের মেয়াদের বিষয়ে সংবিধানে যা বলা হয়েছে- এ বিষয়ে সংবিধানের ৫৮। (৪) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করিলে বা স্বীয় পদে বহাল না থাকিলে মন্ত্রীদের প্রত্যেকে পদত্যাগ করিয়াছেন বলিয়া গণ্য হইবে; তবে এই পরিচ্ছেদের বিধানাবলি-সাপেক্ষে তাহাদের উত্তরাধিকারীগণ কার্যভার গ্রহণ না করা পর্যন্ত তাহারা স্ব স্ব পদে বহাল থাকিবেন।