দ্বাদশ জাতীয় সংসদ ভেঙে দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো: সাহাবুদ্দিন। গতকাল মঙ্গলবার বঙ্গভবনের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, রাষ্ট্রপতির সাথে তিন বাহিনীর প্রধান, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, সুশীলসমাজের প্রতিনিধি ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের অনুষ্ঠিত বৈঠকের সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে সংসদ বিলুপ্ত করা হয়েছে। এর ফলে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের পথ খুলেছে এবং এই প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। দু’একদিনের মধ্যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করা হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। আইনবিদদের মতে, এখন দেশের যে অবস্থা এটা একটা গণ-অভ্যুত্থান। রাজপথে ছাত্র-জনতা নেমে এসেছেন। এখন জনতার যে কথা সেটাই চলবে। জনতার কথা হলো একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করো। আর রাষ্ট্রপতি অধ্যাদেশের মাধ্যমে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করতে পারেন। ১৯৯১ সালের রূপরেখা অনুযায়ী, ওই কনসেসাসের ভিত্তিতে অন্তর্বর্তী সরকার গঠন হতে পারে বলে আইনবিদরা উল্লেখ করেন।
এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মহসীন রশিদ বলেন, সংবিধানে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান কোনোটাই নেই। এখানে প্রশ্ন হচ্ছে শেখ হাসিনা চলে গেলেন, তিনি সংবিধান অনুযায়ী যাননি। প্রধানমন্ত্রী ক্ষমতা হস্তান্তর করবেন নতুন প্রধানমন্ত্রীর কাছে। যখন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছিল, তখন যিনি ছিলেন প্রধান উপদেষ্টা তার কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হয়েছে। এখনতো সংবিধানের কোনো বিষয় নেই। আর এই সংবিধান দিয়ে এই দেশ ও রাষ্ট্র আর চলবে না। এই দেশের জন্য নতুন সংবিধান প্রয়োজন। নতুন সংবিধানে একটি ভারসাম্য বা ব্যালান্স থাকতে হবে। তিনি বলেন, এখন যে অবস্থা এটা একটা গণ-অভ্যুত্থান বা রেভুলিউশনারি সিচুয়েশন। দেশের মানুষ নেমে গেছে। এখন জনতার যে কথা সেটাই চলবে। এখন কোনো সংবিধান চলবে না। যেহেতু সংবিধান চলবে না, এটাকে অ্যাবরোগেট করে নতুন সংবিধান আনতে হবে। আর এই সরকারের নাম আমি প্রস্তাব করব, রেভুলিউশনারি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। এটার প্রথম কাজ হবে রাষ্ট্রপতিকে দিয়ে অধ্যাদেশের মাধ্যমে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার করা। আমি মনে করি এই মুহূর্তে প্রথমে ড. মুহাম্মদ ইউনূস সাহেবকে শপথ দিতে হবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান হিসেবে। তিনি বলেন, বর্তমান সংবিধানকে বাদ দিয়ে জাতি একটি নতুন সংবিধান রচনা করবেন। যেখানে ব্যালান্স থাকবে রাষ্ট্রপতি ও সংসদের মধ্যে। অর্থাৎ রাষ্ট্রপতি সরাসরি জনগণের মাধ্যমে নির্বাচিত হবে এবং পার্লামেন্ট থাকবে। সেখানে পাওয়ার শেয়ার করা হবে। এইগুলো আলাপ আলোচনার মাধ্যমে করতে হবে। তিনি বলেন, চিন্তাভাবনা করে সংবিধান রচনা করতে হবে। এটা জনগণের কাছে দিতে হবে। তিনি আরো বলেন, বিচারপতি যারা আছেন তারা যে সংবিধানে শপথ নিয়েছেন, যদি নতুন সংবিধন করা যায় তখন তারা নতুন সংবিধানের অধীনে শপথ নেবেন। কোনো কোনো বিচারপতিকে আমরা রাখতে চাই তাদের চিঠি দেবো। ওই বিচারপতিগণ শপথ নেবেন এবং বিচারের কাজ করবেন। কাজেই আমাদেরকে সব কিছুতে সিস্টেমে আসতে হবে। যদি সিস্টেমে না আসি তাহলে হযবরল অবস্থা হবে।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বলেন, গণ-অভ্যুত্থান কোনো আইন না। সংবিধানের কোথাও গণ-অভ্যুত্থান নেই। সংবিধানে এরকম কিছু নাই। তবে গণ-অভ্যুত্থানে যারা জয়লাভ করে, তাদের ইচ্ছা মতোই সবকিছু হবে। যে ইচ্ছা তারা করবে, সেটা আইনে যাওয়ার সুযোগ আছে। গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে যেটা হবে পরবর্তীতে তা আইনের সাথে অ্যাডজাস্ট করে নিতে হবে।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও বিএনপির আইন সম্পাদক ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বলেন, সংসদ ভেঙে দেয়ার পর সরকার গঠন হবে। ১৯৯১ সালে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের পতনের পর তিন জোটের রূপরেখার ভিত্তিতে তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠা হয়েছিল। তেমনিভাবেই এখন সারা বাংলাদেশের ক্রিয়াশীল রাজনীতিবিদ তথা আমাদের অহঙ্কার বৈষম্যবিরোধী ছাত্রসমাজের প্রতিনিধির মাধ্যমে ১৯৯১ সালের রূপরেখা অনুযায়ী, ওই কনসেসাসের ভিত্তিতে অন্তর্বর্তী সরকার গঠন হতে পারে। তিনি বলেন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্রসমাজের প্রতিনিধি, সিভিল সোসাইটির মেম্বারদের মধ্যে, সাংবাদিক, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী- সবার সমন্বয়ের ভিত্তিতে রাষ্ট্রপতি মিটিং করেছেন। সেই মিটিংয়ের আলোকেই পরবর্তী রূপরেখা আসবে। নিশ্চয় মনে রাখতে হবে, যারা রাষ্ট্রপতির সাথে বসেছিলেন তারা সবাই দেশের মঙ্গলের জন্য বসেছিলেন। তারা চিন্তাভাবনা করে সিদ্ধান্ত নেবেন।
এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার অনিক আর হক বলেছেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করার নজির রয়েছে বাংলাদেশে। আমাদের দেশে বেশ কয়েকবার হয়েছে। পাকিস্তানে বহুবার হয়েছে। পরিস্থিতি যেখানে যেরকম, সেখানে সেই ব্যবস্থা। আমাদের আইনের বইয়ে (সংবিধানে) যা আছে সেটা জনগণের জন্যই করা হয়েছে। ১৯৯০ সালে কিন্তু সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা ছিল না। তখন তত্ত্বাবধায়ক সরকার করা হয়েছিল। সেখান থেকে বা তা অনুসরণ করতে পারি।
উল্লেখ্য, প্রধানমন্ত্রীর পদের মেয়াদের বিষয়ে সংবিধানে বলা হয়েছে- এ বিষয়ে সংবিধানের ৫৮। (৪) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করিলে বা স্বীয় পদে বহাল না থাকিলে মন্ত্রীদের প্রত্যেকে পদত্যাগ করিয়াছেন বলিয়া গণ্য হইবে; তবে এই পরিচ্ছেদের বিধানাবলি-সাপেক্ষে তাহাদের উত্তরাধিকারীগণ কার্যভার গ্রহণ না করা পর্যন্ত তাহারা স্ব স্ব পদে বহাল থাকিবেন।





