বাংলাদেশে গত এক দশকে সর্বক্ষেত্রে যে সঙ্কট, গণতন্ত্র ধ্বংস, গুম-খুন, রাজনৈতিক অস্থিরতা হয়েছে তার সবকিছুর মূল নায়ক সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধানসংক্রান্ত সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল করে তার দেয়া রায়ের কারণেই বাংলাদেশের নির্বাচনব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে বলে আইনবিদরা মনে করেন। তাদের মতে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করার মাধ্যমেই ধ্বংস হয় দেশের গণতন্ত্র। তখন থেকেই শুরু হয় দেশ, জাতি ও গণতন্ত্রের জন্য অশনি সঙ্কেত। এর মূলে রয়েছেন সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক। আপিল বিভাগ কর্তৃক নিয়োগকৃত আটজন অ্যামিকাস কিউরির মধ্যে সাতজন তত্ত্বাবধায়ক সরকার বহাল রাখার পক্ষে মতামত প্রদান করলেও সাতজনের মতামত উপেক্ষা করে বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল করেন এবং অবসরে যাওয়ার ১৬ মাস পরে অর্থাৎ ২০১২ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর সংক্ষিপ্ত আদেশ বদলিয়ে সরকারের ইচ্ছানুযায়ী পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করেন।
প্রকাশ্যে আদালতে ঘোষিত রায় পরিবর্তন করে তিনি দণ্ডবিধির ৪০৬ ধারা অনুযায়ী অপরাধজনিত বিশ্বাস ভঙ্গ করেছেন। একই সাথে তিনি শপথ ভঙ্গ করেছেন। এ জন্য তার বিচার হওয়া উচিত বলে আইনবিদরা মনে করেন।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে আপিল বিভাগ ওপেন কোর্টে ২০১১ সালের ১০ মে যে রায় দিয়েছিলেন, তাতে পরবর্তী দু’টি নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হতে পারে বলে উল্লেখ ছিল; কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকার ওই রায় বলবৎ থাকাকালীন আপিল বিভাগের রায় অমান্য করে ২০১১ সালের ৩০ আগস্ট সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধান সংশোধন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করে, যা সংবিধানের আর্টিক্যাল-১১১ পরিপন্থী এবং মহামান্য সর্বোচ্চ আদালতের রায়ের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। ওই সরকার নিরঙ্কুশ ক্ষমতাবলে, পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হওয়ার আগেই অর্থাৎ সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করে। এভাবেই গণতন্ত্র ধ্বংসের স্থায়ী ব্যবস্থা করে তৎকালীন ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ।
পরবর্তী সময়ে সরকারের ইচ্ছা অনুযায়ী, তৎকালীন প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক ২০১১ সালের ১৭ মে অবসর গ্রহণের ১৬ মাস পরে সর্বোচ্চ আদালতের প্রকাশ্য রায়ের অংশ পরিবর্তন করে পূর্ণাঙ্গ রায় প্রদান করেন, যা মূল রায়দাতা বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের বিরুদ্ধে সংক্ষিপ্ত আদেশ বদলিয়ে ফেলার অভিযোগ খোদ আপিল বিভাগের বিচারপতিদের মধ্য থেকেই উত্থাপিত হয়েছে। প্রবীণ তিনজন আইনজীবী মরহুম বিচারপতি টি এইচ খান, মরহুম ব্যারিস্টার রফিক-উল হক ও ড. কামাল হোসেন এ ঘটনাকে বিচারিক অসদাচরণ ও বিচ্যুতি বলে অভিহিত করেছিলেন বলে সুপ্রিম কোর্ট বারের সাবেক সভাপতি জয়নুল আবেদীন তার তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে লেখা বইয়ে উল্লেখ করেছেন।
এ মামলায় এমনকি শুনানির সময় মরহুম সিনিয়র আইনজীবী টি এইচ খান চরম হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছিলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল হলে দেশে বিপর্যয় তৈরি হবে, গৃহযুদ্ধ লেগে যাবে; কিন্তু বিভক্ত রায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল হয়ে গেল। যেখানে বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক মুখ্য ভূমিকা রাখেন। ত্রয়োদশ সংশোধনী মামলায় প্রকাশ্যে আদালতে ঘোষিত রায়ে সুপ্রিম কোর্ট দুই মেয়াদ তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বহাল রাখার পথ খোলা রেখেছিলেন; কিন্তু প্রধান বিচারপতি খায়রুল হক ১৬ মাস পর যে রায় প্রকাশ করলেন সেখানে তিনি এ অংশটি রাখেননি। আপিল বিভাগের দুইজন বিচারপতি এ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন।
এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্ট বারের সাবেক সভাপতি জয়নুল আবেদীন বলেন, এই দেশের গণতন্ত্রের যত হানাহানি ও বিশৃঙ্খলা সবকিছুর মূলে আছেন বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক। তিনি বিচারবিভাগীয় অসদাচারণ করেছেন। ওপেন কোর্টে রায় দিয়ে সেটি আবার শেখ হাসিনার কথামতো পরিবর্তন করেছেন। তার রায়ের কারণে শেখ হাসিনা দেশের গণতন্ত্র নিয়ে ছিনিমিনি খেলেছেন। আজকের এই অবস্থার সবকিছুর জন্য তিনি দায়ী। তিনি বলেন, আমরা কেন পৃথিবীর গণতন্ত্রকামী সব মানুষই তার বিচার দাবি করে।
এ বিষয়ে বিএনপির আইন সম্পাদক ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বলেন, স্বাধীনতাপরবর্তী বাংলাদেশে বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক যে পরিমাণে ক্ষতি করেছেন, অন্য কেউ তা করতে পারেনি। তিনি বিচারকের আসনে থাকার পরও উনার প্রত্যেকটা কার্যক্রমে মনে হয়েছে তিনি শেখ হাসিনার চেয়ে বড় আওয়ামী লীগ। তিনি শুধু তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাই বাতিল করেননি। একটি সিনেমা হলের মামলায় সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী অযাচিতভাবে বাতিল করেছেন। তিনি বলেন, বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক সাহেব শুধু আওয়ামী লীগ এবং শেখ হাসিনার নির্দেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করেন। বাতিল করার পর আজ পর্যন্ত যতগুলো হত্যা হয়েছে, গুম হয়েছে, রাজনৈতিক অস্থিরতা হয়েছে তার সবকিছুর মূল নায়ক বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক। তাকে আইনের আওতায় এনে বিচার করা সমায়ের দাবি শুধু নয়, দেশের আবাল বৃদ্ধ বনিতার দাবি। তার এমন শাস্তি হওয়া উচিত, যেন পরবর্তী সময়ে অন্য কোনো মাননীয় বিচারপতি এমন কোনো কাজ না করেন যা দেশের স্বার্থবিরোধী। যাতে অন্যান্য বিচারপতি মনে রাখেন। তাকে আইন কমিশনের চেয়ারম্যান করা হয়, এটা তো কিছু না ঘুষ দেয়ার মতো। যে তুমি আমার জন্য এটা করেছ। তার প্রতিদান হিসেবে এটা। তার শাস্তি হওয়া উচিত, যাতে এটা বিচার বিভাগে অনন্য নজির হয়ে থাকে।
এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মুহাম্মদ শিশির মনির বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধানসংক্রান্ত সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী মামলায় সবার সামনে যে দিন রায় হয় এ দিন তিনি যে আদেশ দিয়েছেন, লিখিতভাবে যখন পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করা হয় সেটিতে আগের আদেশের পরিপূর্ণ প্রতিফলন হয়নি। দেখা গেছে কিছু পরিবর্তন হয়ে গেছে। তিনি বলেন, বিচারকের ভিত্তি হলো আস্থা ও বিশ্বাস। এই ট্রাস্ট অ্যান্ড কনফিডেন্স যদি বিচারক আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থীদের মধ্যে না থাকে তা হলে এটা একটা ক্রিমিনাল বিচ অব ট্রাস্ট হয়। ক্রিমিনাল বিচ অব ট্রাস্ট বা অপরাধমূলক বিশ্বাস ভঙ্গ দণ্ডবিধির ৪০৬ ধারা অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এখানে তিনি দুটো কাজ করেছেন। একটি হলো বিচারকদের যে আচরণবিধি আছে ৪১ দফা বিশিষ্ট এই আচরণ বিধি অনুযায়ী ওপেন কোর্টে তিনি যেটা বলেছেন পরবর্তী সময়ে তা তিনি পরিবর্তন করতে পারেন না। তাহলে তিনি শপথ ভঙ্গ করেছেন। দ্বিতীয় হলো, তিনি যে রায়ের অংশটুকু পরিবর্তন করে দিলেন। এই পরিবর্তন করে দেয়ার কারণে তিনি যে অপরাধ করেছেন, এটা দণ্ডবিধির ৪০৬ ধারা অনুযায়ী অপরাধজনিত বিশ্বাস ভঙ্গ। এটা কোনোভাবে গ্রহণযোগ গতে পারে না। তিনি বলেন, বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক বিচারকের আচরণবিধি লঙ্ঘন করেছেন এবং তিনি শপথ ভঙ্গ করেছেন। এ জন্য তার বিচার হওয়া উচিত।
বিচারপতি খায়রুল হকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সরকারকে আইনি নোটিশ : সাবেক প্রধান বিচারপতি ও আইন কমিশনের সদ্য পদত্যাগী চেয়ারম্যান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সরকারকে আইনি নোটিশ দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের এক আইনজীবী। রোববার আইন উপদেষ্টা ও আইন সচিব বরাবর এ নোটিশ দেন সুপ্রিম কোটের আইনজীবী ও ফাউন্ডেশন ফর ল অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (ফ্লাড) চেয়ারপারসন ফাওজিয়া করিম ফিরোজ।
আইনজীবী ফাওজিয়া করিম ফিরোজ জানান, আমরা সাবেক আইন কমিশন চেয়ারম্যান, যিনি প্রধান বিচারপতি ছিলেন খায়রুল হক সাহেবের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনগত ব্যবস্থা নিতে নোটিশ দিয়েছি। কারণ, ‘হি ইজ এ আর্কিটেক্ট অব অ্যাবুলোশিং দ্য হোল ডেমোক্র্যাটিক সিস্টেম ইন বাংলাদেশ। তার বিরুদ্ধে যথাথথ আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে এই নোটিশ।
মামলা নেয়ার আবেদন খারিজ : তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধানসংক্রান্ত সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল করে দেয়া রায় পরিবর্তনের জন্য প্রতারণা, বিশ্বাসভঙ্গ ও জালিয়াতির অভিযোগে সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের বিরুদ্ধে মামলার আবেদন খারিজ করে দিয়েছেন আদালত। রোববার ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট দিলরুবা আফরোজ তিথির আদালতে এ মামলা করেন অ্যাডভোকেট ইমরুল হাসান। মামলায় গ্রহণযোগ্য উপাদান না থাকায় আদালত মামলাটি খারিজ করে দেন।
শাহবাগ থানায় মামলা : তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধানসংক্রান্ত সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল করে দেয়া রায় পরিবর্তনের জন্য দুর্নীতিমূলক ও বিদ্বেষমূলকভাবে বেআইনি রায় প্রদান ও জাল রায় তৈরির অভিযোগে সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। গতকাল রোববার সন্ধ্যায় রাজধানীর শাহবাগ থানায় এ মামলা দায়ের করেন আইনজীবী মুজাহিদুল ইসলাম শাহীন।
তিনি বলেন, বিচারক হিসেবে দুর্নীতিমূলক ও বিদ্বেষমূলকভাবে বেআইনি রায় প্রদান ও জাল রায় তৈরির জন্য দণ্ড বিধির ২১৯ ও ৪৬৬ ধারায় সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খাইরুল হকের বিরুদ্ধে শাহবাগ থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছে।
মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, আসামি এ বি এম খায়রুল হক লোভের বশবর্তী হয়ে দুর্নীতিমূলক ও বিদ্ধেষাত্মকভাবে ২০১১ সালের ১০ মে তারিখে উন্মুক্ত আদালতে দেয়া সংক্ষিপ্ত রায় পরিবর্তন করে ২০১২ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর বেআইনিভাবে পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করে দণ্ডবিধির ২১৯ ধারায় উল্লেখিত অপরাধ সংঘটন করেছেন। এ বি এম খায়রুল হক এহেন বেআইনি রায়ের মাধ্যমে দেশের নির্বাচনব্যবস্থা ধ্বংস করে দেয় এবং রায় পরবর্তীতে দেশে একতরফা নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ভোট কারচুপি করে শেখ হাসিনাকে পরপর তিনবার বেআইনিভাবে সরকার গঠন করার সুযোগ করে দেয়। অতঃপর ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে গত ৫ আগস্ট তারিখে শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী পদ থেকে পদত্যাগ করে দেশ থেকে পলায়ন করেন।





