২০ বছর আগে ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট রাজধানীর বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা শেখ হাসিনার সমাবেশে ভয়াবহ গ্রেনেড হামলা চালানো হয়। ১৪ বছর পর সেই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় বিচারিক আদালতে রায় হয়। মামলাটি এখন হাইকোর্টে চূড়ান্ত নিষ্পত্তির অপেক্ষায় আছে। চলছে মৃত্যুদণ্ডাদেশ অনুমোদন (ডেথ রেফারেন্স) ও আপিলের ওপর হাইকোর্টে শুনানি। তবে এ মামলায় ৬১ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ করার পর নজিরবিহীনভাবে নতুন করে তদন্ত করা হয় এবং ষড়যন্ত্রমূলকভাবে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের এ মামলায় আসামি করে সাজা দেয়া হয়েছে বলে আইনজীবীরা অভিযোগ করেন। এ মামলায় সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর ও সাবেক উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুসহ ১৯ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে। এ ছাড়া যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে।
আইনজীবীরা জানান, একই ব্যক্তি একই মামলায় দ্বিতীয় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দেয়া ভারতীয় উপমাহাদেশে ৪০০ বছরের ইতিহাসে কোনো আদালত গ্রহণ করেনি। এই জন্য এই বিচারটা সম্পূর্ণরূপে রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। এজন্য আইনজীবীরা জানান, রাজনীতিবিদদের বাদ দিয়ে, যারা প্রকৃত আসামি তাদের আবার পুনঃতদন্ত করে পুনঃবিচার হওয়া উচিত।
জানা গেছে, বিচারপতি সহিদুল করিম ও বিচারপতি মো: মোস্তাফিজুর রহমানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চে এ-সংক্রান্ত মামলা ডেথ রেফারেন্সসহ আসামিদের আপিল শুনানি চলছে। তবে গত রোববার আদালত বলেছেন, এ মামলার আর শুনানি চালাতে চান না। হাইকোর্ট বেঞ্চের সিনিয়র বিচারপতি অসুস্থ এবং জুনিয়র বিচারপতিকে পরিবর্তন করে অন্য বেঞ্চে দেয়া হয়েছে। যেহেতু বেঞ্চের জুনিয়র বিচারপতি অন্য বেঞ্চে চলে গেছেন তাই নতুন করে শুনানি করতে হবে। এ মামলাটি প্রধান বিচারপতির কাছে পাঠিয়ে দিতে পারেন বলেও বেঞ্চের সিনিয়র বিচারপতি জানিয়েছেন। বিষয়টি এমামলার একজন আইনজীবী নিশ্চিত করেছেন। সুপ্রিম কোর্টের ভ্যাকেশনের দুই সপ্তাহ পরে এই মামলা আবারো শুনানির জন্য আসবে বলে আইনজীবীরা জানিয়েছেন।
এ দিকে এ বিষয়ে রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল মো: আসাদুজ্জামান বলেছেন, আসামিপক্ষ এ মামলার শুনানির জন্য সময় চেয়েছে সুপ্রিম কোর্টের ছুটির পরে করার জন্য। আদালত সময় মঞ্জুর করেছেন। ছুটির পরে আসলে কী অবস্থা দাঁড়ায় তখন আমরা চিন্তা করব। তিনি বলেন, প্রেক্ষাপট পরিবর্তন হওয়ার পর এই মামলার বিষয়ে সিদ্ধান্ত কী হবে? এ প্রশ্নের জবাবে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, এটা রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী বিষয়। আমি রাষ্ট্রের একজন আইনজীবী। রাষ্ট্র আমাকে যেভাবে নির্দেশনা দেবে আমি তা অনুস্মরণ করে মামলা করব।
এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেন, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলাটা আমার সব সময় মনে হয়েছে এটা কোনো গোয়েন্দা সংস্থার কাজ। যারা ঘটনা ঘটিয়েছে তারা শেখ হাসিনাকে মারতে চাননি। তারা চেয়েছে দেশে একটি অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করতে। বিএনপি সরকার যাতে ক্ষমতায় থাকতে না পারে। এই অস্থিতিশীল আবস্থা সৃষ্টি করে ওয়ান-ইলেভেনের সরকার ক্ষমতায় এসেছে। মূলত ওয়ান-ইলেভেন সৃষ্টি করার জন্য ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার ঘটনা। এটা অবশ্যই দুঃখজনক, ন্যক্কারজনক। তবে এ ঘটনা পরিকল্পিত। তিনি বলেন, এ মামলা নজিরবিহীন! মুফতি হান্নান প্রথম যে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দিয়েছেন সেখানে কারো নাম বলেননি। পরে ৬১ জন সাক্ষী হওয়ার পর বিএনপির সময় বরখাস্ত হওয়া আবদুল কাহার আকন্দকে এই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা করা হয়। তিনি প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়ে আবার মুফতি হান্নানকে রিমান্ডে নিয়ে দ্বিতীয়বার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী নেন। এটা নজিরবিহীন। সেখানে তিনি তারেক রহমানসহ রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে জড়িয়েছেন।
এ মামলার অন্যাতম আসামি সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরের আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির বলেন, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলা রাজনৈতিক বিবেচনায় পরিচালনা করা হয়েছে। রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে এ মামলায় আসামি করার জন্য দ্বিতীয়বার যে তদন্ত করা হয়েছে তা সম্পূর্ণভাবে বেআইনি। কারণ ৬১ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ করার পর নতুন করে তদন্ত শুরু হয়েছে এটা নজিরবিহীন। একজন আসামি মুফতি আব্দুল হান্নানের দু’টি স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী নেয়া হয়েছে। প্রথম স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দীতে তিনি কিছু বলেননি। দ্বিতীয় তদন্তের সময় তদন্ত কর্মকর্তা আবদুল কাহার আকন্দ ৬৭ দিন রিমান্ডে রাখার পর দ্বিতীয় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দিয়েছেন।
২০১৮ সালের ১০ অক্টোবর ওই এ মামলায় বিচারিক আদালত সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর ও বিএনপি নেতা আবদুস সালাম পিন্টুসহ ১৯ জনের মৃত্যুদণ্ড দেন।
একই সাথে বিএনপির তৎকালীন সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান এবং বর্তমানে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ ১৯ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়। বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেয়া হয় অপর ১১ আসামিকে।
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনের পর অধিকতর তদন্তের নির্দেশ দেন আদালত। দুই বছর তদন্তের পর ২০১১ সালের ৩ জুলাই ৩০ জনকে আসামি করে সম্পূরক অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। এর ফলে এ মামলায় মোট আসামির সংখ্যা হয় ৫২।





