ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নিয়ে মন্ত্রিসভায় আলোচনা না হওয়ায় ‘তিন মন্ত্রী কথা রাখেননি’ বলে সম্পাদক পরিষদের বক্তব্যকে হৃদয়বিদারক ও দুঃখজনক বলে মন্তব্য করে তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বলেছেন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নিয়ে যেকোনো সময় মন্ত্রিসভায় আলোচনা হবে বলে আশা করছি। আর আলোচনা করলে আবারো এডিটর্স কাউন্সিল ও সাংবাদিক নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে মিলিত হব। আলোচনাটা চালু আছে, বন্ধ হয়ে যায়নি।

তিনি বলেন, ডিজিটাল নিরাপত্তা বিলে সই করা রাষ্ট্রপতির রুটিন কাজ। আমাদের কাজ যদি সংশোধন করতে হয় করব। সংসদ তো আছে, সরকার তো আছে। সুতরাং আলোচনাটা হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ। রোববার সচিবালয়ে নিজ দফতরে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে সম্পাদক পরিষদের আপত্তির বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীকে ‘পরিস্থিতিটা’ অবহিত করা হয়েছে জানিয়ে তথ্যমন্ত্রী ইনু বলেন, কিন্তু মন্ত্রিসভায় আলোচনার পরিবেশটা ছিল না বলে হয়নি। সম্পাদক পরিষদের মানববন্ধন কর্মসূচি ঘোষণার বিষয়ে তিনি বলেন, আমরা তো গণতান্ত্রিক পরিধির ভেতর কাজ করছি। সাংবাদিকরা মানববন্ধন করবেন, কোনো দাবি লিখিতভাবে করতে পারেন, সাংবাদিক সম্মেলন করে করতে পারেন, মিছিল, মানববন্ধন করে করতে পারেন- এগুলো সব দাবি তোলার পন্থা। এগুলো গণতান্ত্রিক পন্থা, সেই পন্থা অবলম্বন করলে আমাদের তো এ ব্যাপারে কোনো মন্তব্য নেই। আমরা শুধু বলব যে আপনি মানববন্ধ করুন, আর মানববন্ধন না করুন আমরা আলোচনায় আছি, আলোচনার ভেতরে থাকব।

তথ্যমন্ত্রী বলেন, বিভিন্ন বিষয়ে যে প্রশ্ন উত্থাপন করা হয়েছে আলোচনার মধ্য দিয়ে সেসব বিষয়ে একটা দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করতে সক্ষম হব বলে বিশ্বাস করি। সুতরাং তিনমন্ত্রী কথা রাখেননি এ মন্তব্যটা আমাদের কাছে হৃদয়বিদারক মন্তব্য, দুঃখজনক। আশ্বাস দেওয়ার পরেও ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নিয়ে মন্ত্রিসভায় আলোচনা না হওয়ায় এই আইনের বিতর্কিত নয়টি ধারা সংশোধনের দাবিতে আগামী ১৫ অক্টোবর জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধনের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে সম্পাদক পরিষদ। সম্পাদক পরিষদ ৮, ২১, ২৫, ২৮, ২৯, ৩১, ৩২, ৪৩ ও ৫৩ ধারাগুলো নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে আসছে।

সম্পাদক পরিষদ এর আগে একই কর্মসূচি দিলেও তথ্যমন্ত্রীর অনুরোধে তা স্থগিত করা হয়। পরে সম্পাদকরা তথ্যমন্ত্রী, আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার এবং প্রধানমন্ত্রীর তথ্য বিষয়ক উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরীর সঙ্গে বৈঠক করেন। ওই বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছিল ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে সম্পাদক পরিষদের আপত্তির বিষয়টি মন্ত্রিসভায় আলোচনার জন্য তোলা হবে এবং মন্ত্রিসভায় আলোচনার পর আবারও তিন মন্ত্রী সম্পাদক পরিষদের সঙ্গে বৈঠকে বসবেন। ওই সিদ্ধান্তের পর মন্ত্রিসভার দুটি বৈঠক হলেও কোনোটিতেই ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নিয়ে আলোচনা হয়নি। এরমধ্যে গত ৮ অক্টোবর ডিজিটাল নিরাপত্তা বিলে সই করেছেন রাষ্ট্রপতি। এর পরিপ্রেক্ষিতে শনিবার সংবাদ সম্মেলনে সম্পাদক পরিষদের সদস্য ও দৈনিক ভোরের কাগজ সম্পাদক শ্যামল দত্ত জানান, পরিষদ মনে করে এটি প্রতিশ্রুতির বরখেলাপ। এর আগে স্থগিত হওয়া মানববন্ধনটি সম্পাদক পরিষদ ১৫ অক্টোবর পালন করবে।

এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বলেন, আমরা এডিটর্স কাউন্সিল, বিএফইউজে, ডিইউজে ও ডিআরইউ নেতাদের সঙ্গে বসেছিলাম। সেখানে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নিয়ে যেসব প্রশ্ন তারা উত্থাপন করেছিলেন সেটা আমরা শুনেছি, লিপিবদ্ধ করেছি এবং একটা কথা বলেছিলাম- এই যে আলোচনার সূত্রপাত হলো তা অব্যাহত রাখবো।

তিনি বলেন, এটার জন্য আমরা প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিপরিষদকে অবহিত করে, এ বিষয়ে তারা কি দিক-নির্দেশনা দেয় সেই ভিত্তিতে আবার বসবো। আমরা এটাও বলেছিলাম, এটা (ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন) রাষ্ট্রপতি দস্তখত করলো কী করল না ওটার সঙ্গে এটার কোনো সম্পর্ক নেই। যেকোনো আইন সংশোধন হতে পারে, যেকোনো আইন পরিমার্জন-পরিবর্ধন করা যায়। সুতরাং রাষ্ট্রপতির দস্তখত করা রুটিন কাজ। রুটিন কাজ সংসদ পাস করেছে। রুটিন কাজ উনি করছেন। তিনি বলেন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন যদি সংশোধন করা প্রয়োজন হয়, করবে, সংসদ তো আছে, সরকার তো আছে। সুতরাং আলোচনাটা হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ। আমরা আলোচনাটা অব্যাহত রাখার অঙ্গীকার রেখে পরবর্তী বৈঠকের জন্য সময় চেয়ে নিয়েছিলাম। এও বলেছিলাম, আপনারা নির্দিষ্ট সময় বেধে দেবেন না।

এটা জোট নয়, ঘোট
জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট’-এর নেতৃত্বে থাকা ড. কামাল হোসেন ‘জঙ্গি-দুর্নীতিবাজ’ বিএনপির আশ্রয়ন সংস্থা বলে মন্তব্য করে তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বলেছেন, এটা জোট নয়, এটা ঘোট। এই ঘোট পাকানোর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে একটি অস্বাভাবিক পরিস্থিতি তৈরি করতে চাচ্ছে।

তথ্যমন্ত্রী বলেন, জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ৭ দফা দাবি ও ১১ লক্ষ্যের মধ্যে কিছু অমিশন আছে, কিছু কমিশন আছে। কিছু জিনিস উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কামাল হোসেন ও বিএনপির ওনারা বাদ দিয়েছেন, কিছু জিনিস উদ্দেশ্যমূলকভাবে যোগ করেছেন। তিনি বলেন, কি কি বিষয়ে এই জোট নীরব সেই বিষয়ে আমি বলব- রহস্যজনকভাবে তারা বিএনপি ও জামায়াতের সঙ্গে দৃঢ় ঐক্যের বিষয়ে নীরব। বিএনপি রাজাকারদের সম্পর্কের ব্যাপারে নীরব। বিএনপি সব জঙ্গি সন্ত্রাস হত্যা-খুনের পৃষ্ঠপোষকতা করে আসছে দীর্ঘদিন ধরে- সেই ব্যাপারে ঐক্যফ্রন্ট নীরব। বিএনপি সংবিধানের চার নীতিকে সরাসরি অস্বীকার করে, সেই ব্যাপারেও ঐক্যফ্রন্ট নীরবতা পালন করেছে। বিএনপি সরাসরি ৩০ লাখ শহীদের ব্যাপারটিকে বিতর্কিত করেছে, সেই ব্যাপারেও নীরবতা পালন করেছে ফ্রন্ট।

জাসদ সভাপতি ইনু বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও স্বাধীনতার ঘোষণা সম্পর্কে বিএনপির ন্যক্কারজনক ভূমিকা সম্পর্কেও নীরবতা পালন করেছে ঐক্যফ্রন্ট। ঐক্যফ্রন্ট তারেক, কোকা, খালেদা জিয়ার মহাদুর্নীতির ঘটনা অমিশন বা বাদ দিয়েছেন। আর কমিশন হচ্ছে, বিএনপি-জামায়াত-রাজাকার-জঙ্গি ও সব অপরাধীদের হালাল করার একটা প্রস্তাব হচ্ছে ৭ দফার প্রস্তাব। আমি অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে জানাতে চাচ্ছি- জঙ্গি, সন্ত্রাসবাদ, যুদ্ধাপরাধী, স্বীকৃত দুর্নীতিবাজদের সঙ্গে নিয়ে গণতন্ত্র উদ্ধারের ঘোষণাটা হচ্ছে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের জাতির সঙ্গে একটা ঠাট্টা-মশকরা। আমি মনে করছি- এই ৭ দফা দাবি ও ১১ লক্ষ্যের আড়ালে জঙ্গি-সন্ত্রাসী, দুর্নীতিবাজদের রাজনীতিতে ফিরিয়ে আনার এটা প্রকল্প। একটি অস্বাভাবিক সরকার আনার প্রস্তাব। গণতন্ত্রকে জিম্মি করে সব ধরনের অপরাধীদের মুক্ত করার, পুনর্বাসন করার, রাজনীতি করার এটা ব্যবস্থা।

তথ্যমন্ত্রী বলেন, আমি মনে করি বিএনপি হচ্ছে রাজাকার-জঙ্গি জামায়াতের আশ্রয়ন প্রকল্প বা সংস্থা, আর ড. কামাল হোসেন এই জঙ্গি, সন্ত্রাসী, দুর্নীতিবাজ, স্বাধীনতাবিরোধী বিএনপির আশ্রয়ন সংস্থা হিসেবে ভূমিকা রাখা শুরু করেছেন। তিনি বলেন, বিএনপি ১৯৭৫ এর পর ধারাবাহিকভাবে মুক্তিযুদ্ধের মীমাংসিত বিষয় অমীমাংসিত করেছে। বিএনপি হচ্ছে মীমাংসিত বিষয় অমীমাংসিত করার মাস্টার। একাত্তরের পর জেনারেল জিয়া যেভাবে মুক্তিযোদ্ধা-রাজাকার-খুনীদের সহাবস্থানের রাজনীতি-অপরাজনীতি অনুসরণ করেছেন এই কামাল হোসেন ও বিএনপির ঐক্য ফ্রন্ট ঠিক সেই সহাবস্থানের প্রস্তাব জাতির সামনে হাজির করলেন।

তথ্যমন্ত্রী বলেন, যে ঐক্যের যাত্রা শুরু হল এর সঙ্গে কোন সুশাসন, গণতন্ত্র, দুর্নীতিমুক্ত সমাজের কোন সম্পর্ক নেই। আমি পরিস্কার বলছি- বাংলাদেশে কোন রাজবন্দী নেই, যারা আছে সব অপরাধী। খালেদা জিয়া একজন চিহ্নিত দুর্নীতিবাজ সাজাপ্রাপ্ত আসামী। তারেক একটা চিহ্নিত দুর্নীতিবাজ খুনী অপরাধী।