বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদের ‘মই’ প্রতীকের প্রার্থীরা নির্বাচনে বিজয়ী হলে পার্লামেন্ট সদস্যদের সর্বসম্মত বা সংখ্যাগরিষ্ঠতার সমর্থনের ভিত্তিতে মন্ত্রীসভা ও রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করার ব্যাপারে ভূমিকা রাখা হবে। মন্ত্রীসভার সদস্যদের সর্বসম্মত বা সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত করা হবে। এছাড়া রাষ্ট্রপতিকে আইনের ও জবাবদিহিতার উর্দ্ধে রাখা হবে না। প্রধানমন্ত্রীর যে কোনো পরামর্শ রাষ্ট্রপতির জন্য শিরোধার্য থাকবে না। তিনি যদি অনুমোদনযোগ্য মনে না করেন তবে মন্ত্রীসভায় এবং পার্লামেন্টে বিতর্কের জন্য তা উত্থাপন করতে পারবেন। বিলে স্বাক্ষর না করলে ১৫ দিন পর আপনা আপনি অনুমোদিত বলে গণ্য হওয়ার বিদ্যমান বিধান বাতিল করা হবে।

আগামী ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিতব্য আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদের নির্বাচনী ইশতেহারে এসব প্রতিশ্রুতি উঠে আসে। আজ শনিবার সেগুনবাগিচাস্থ স্বাধীনতা হলে (৩য় তলায়) এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে এই ইশতেহার ঘোষণা করেন বাসদের সাধারণ সম্পাদক খালেকুজ্জামান।

এসময় উপস্থিত ছিলেন বাসদ কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য বজলুর রশীদ ফিরোজ, রাজেকুজ্জামান রতন, ঢাকা-৭ আসনের প্রার্থী খালেকুজ্জামান লিপন, ঢাকা-৮ আসনের প্রার্থী শম্পা বসু, ঢাকা-১৭ আসনের প্রার্থী এস. এম. আহসান হাবিব বুলবুল, নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের প্রার্থী আবু নাঈম খান বিপ্লব, বাসদ কেন্দ্রীয় বর্ধিত পাঠচক্র সদস্য নিখিল দাস, আবদুর রাজ্জাক, রওশন আরা রুশো, ইমরান হাবিব রুমন, প্রগতিশীল আইনজীবী ফ্রন্টের সদস্যসচিব জহিরুল ইসলাম মোল্লা।

বাসদের ঘোষণা করা ইশতেহারে আরো বলা হয়, মন্ত্রীসভার আসন সর্বোচ্চ ২০টিতে সীমাবদ্ধ রেখে মন্ত্রণালয়ের অধীনে সমগুরুত্ব দিয়ে অধিদপ্তর-বিভাগীয় কার্যক্রমে অপরাপর রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম পরিচালনার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। মাথাভারি প্রশাসন কমিয়ে কার্যকারিতাসম্পন্ন ব্যয় সংকোচন ও কাজের গতি বৃদ্ধি করা হবে।

এছাড়াও রিমান্ডে ও পুলিশ হেফাজতে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন বন্ধ করা, বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুম, খুন বন্ধ, অতীতের বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ডের বিচার, দুর্নীতি বন্ধ, আয়ের সাথে সঙ্গতিহীন সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা, বিদেশে পাচারকৃত টাকা ফেরৎ আনা, বাণিজ্যিক ব্যাংকের সংখ্যা ৫৯ থেকে কমিয়ে আনা, সংখ্যানুপাতিক নির্বাচনসহ নির্বাচন ব্যবস্থার আমূল সংস্কার, না ভোটের বিধান চালু, প্রতিনিধি প্রত্যাহারের বিধান চালু, সংসদ সদস্যদের শুল্ক মুক্ত গাড়ি আমদানীর সুযোগ বন্ধ, সর্বজনীন শিক্ষা চালু, শিক্ষাখাতে জিডিপির ৬% বরাদ্দ, ডাকসুসহ সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রসংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান, পিইসি, জেএসসি পরীক্ষা বাতিল, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে অভিন্ন টিউশন ফি নির্ধারণ, সকলের জন্য স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত, জিডিপির ৫% স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ, উন্নয়ন বরাদ্দের ৪০% কৃষি খাতে বরাদ্দ, কৃষি খাতে ভর্তুকী বাড়ানো, ক্রয়কেন্দ্র চালু, ফসলের লাভজনক দাম নিশ্চিত, উৎপাদক ও বিক্রেতা সমবায় গড়ে তোলা, গ্রাম-শহরের শ্রমজীবীদের জন্য আমিং রেটে রেশনিং চালু, পরিবেশ রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ, বন, পাহাড়, নদী দখল ও দূষণ মুক্ত করা, পুনর্বাসন ছাড়া বস্তি-হকার, রিক্সা উচ্ছেদ না করা, জাতীয় স্বার্থবিরোধী সকল চুক্তি বাতিল করা, সুন্দরবন-বিনাশী রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র বাতিল, ঝুঁকিপূর্ণ রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্র বাতিল ও জাতীয় কমিটির বিকল্প জ্বালানি নীতি বাস্তবায়ন, সকল যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, সাম্প্রদায়িক রাজনীতি ও রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার নিষিদ্ধ, পাহাড় ও সমতলের আদিবাসীদের ভূমির অধিকার নিশ্চিতসহ তাদের জীবনের বিকাশের পথ অবারিত করা, সাংবিধানিক স্বীকৃতি প্রদান, কোটার যৌক্তিক সংস্কার, নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের ৬ দফা বাস্তবায়ন, তিস্তাসহ অভিন্ন নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়, ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার কমানো, পানিনীতি প্রণয়ন, যুবক ও তারুণ্যের শক্তিকে মাদক, হতাশা, অনিশ্চয়তা মুক্ত করে দেশ গড়ার কাজে নিয়োগ, অপসংস্কৃতি-অশ্লীলতা রোধ, পর্ণোগ্রাফী, অশ্লীল চলচ্চিত্র, পর্ণো পত্রিকা তৈরি ও আমদানী বন্ধ করা, জোট নিরপেক্ষ পরারাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করাসহ ইশতেহারে ১৭দফা অঙ্গীকার ও করণীয় ঘোষণা করা হয়।

ইশতেহার ঘোষণার প্রাক্কালে খালেকুজ্জামান বলেন, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হতে যাচ্ছে আগামী ৩০শে ডিসেম্বর। এই মাস আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের মাস। স্বজন হারানোর অসীম বেদনা, জীবনবাজী রাখা অসম সাহসী লড়াই শেষে আমরা ১৯৭১ সালের এই মাসে স্বাধীনতার বিজয় পতাকা উড়িয়েছিলাম। এখন স্বাধীনতার ৪৮ বছর হতে চললো। দেশবাসী আশা করেছিল মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আকাঙ্খা পূরণের একটা উঁচু শিখরে উঠে আমরা অনেক গ্লানি ব্যর্থতার কালিমা মুছে উজ্জ্বল আলোকে আমাদের অঙ্গীকার শোষণমুক্ত গণতান্ত্রিক ধর্মনিরপেক্ষ স্বাধীন জাতীয় বিকাশের বাংলাদেশের ভাবমূর্তি বিশ্বের সামনে তুলে ধরতে পারবো। কিন্তু ভ্রষ্ট পথে পরিচালিত নষ্ট রাজনীতি করতে গিয়ে শাসক বুর্জোয়া শ্রেণি গোটা জাতিকে আবারও লজ্জিত করলো। জনগণের ক্ষমতায়ন অর্থে গণতান্ত্রিক শাসন প্রতিষ্ঠা তো দূরের কথা ভোটার ভোটকেন্দ্রে যেতে পারবে কিনা, গেলে ভোট দিতে পারবে কিনা, ভোট কেন্দ্রগুলো ২০১৪ সালের দশম সংসদ নির্বাচনের সময়কার চেহারা নেবে কিনা, হামলা-মামলা, গ্রেপ্তার বাণিজ্য, ভীতিকর পরিবেশ এইভাবে চলতে এবং বাড়তে থাকবে কিনা এইসব আতঙ্ক ও সংশয় বাড়ছে দিনকে দিন। অথচ নির্বাচন অনুষ্ঠানের আর মাত্র ৭দিন বাকি আছে।
সংবাদ সম্মেলন থেকে বাসদ মনোনীত প্রার্থীদের ‘মই’ প্রতীকে ভোট দিয়ে ও ভোটের খরচ যুগিয়ে গণআন্দোলনের শক্তি বৃদ্ধি ও মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত চেতনার বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে শামিল হওয়ার আহ্বান জানানো হয়।