বাংলাদেশে এর আগের সংসদ নির্বাচন হয়েছিল ২০১৪ সালে- কিন্তু তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি না মানায় তা বর্জন করেছিল প্রধান বিরোধীদল।
তার ফলে দেড় শতাধিক আসনে কোনো ভোটগ্রহণ হয়নি এবং প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সেসব আসনে নির্বাচিত হয়ে গিয়েছিলেন। এবারের নির্বাচনের আগেও নির্দলীয়-নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন করার দাবি তুলেছিল বিএনপি।
এ নিয়ে তারা দীর্ঘদিন আন্দোলন করেছিল- কিন্তু সরকার সে দাবি মানেনি।
তবে ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠন এবং সরকারের সাথে কয়েকদফা সংলাপ- পরিস্থিতিকে পাল্টে দেয়। বিএনপিসহ প্রায় সব দলই এই নির্বাচনে অংশ নিতে রাজী হয়।
সেদিক থেকে এবারের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশে গত তিন দশকের রাজনৈতিক ইতিহাসে কতখানি গুরুত্বপূর্ণ?
এ বিষয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষক আফসান চৌধুরী জানান, এবারের নির্বাচন বেশ কয়েকটি কারণেই বেশ গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, ১৮ বছর পর এই প্রথম কোন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বেসামরিক সরকারের অধীনে। দ্বিতীয়ত, নির্বাচনটি পুরোপুরিভাবে অংশগ্রহণমূলক এবং তৃতীয়ত, এবার প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের মধ্যে এখনও সাংঘর্ষিক মনোভাব বিরাজ করছে।
তারা নির্বাচনকে ঘিরে একে অপরের বিরুদ্ধে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ করেই চলছে। অথচ এমন সাংঘর্ষিক পরিস্থিতিতেও সব পক্ষকে নিয়ে একটা নির্বাচন করছে তারা।
আফসান চৌধুরী জানান, ২০০৮ এর নির্বাচন হয়েছিল সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে। তারপর ২০১৪ সালে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ কোন নির্বাচন হয়নি। সেই থেকেই রাজনৈতিক সংকট ঘনীভূত হতে থাকে।
তাই ২০১৮ সালে সবপক্ষের অংশগ্রহণে এই নির্বাচনকে বেশ গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন তিনি। তার মতে, শেষ পর্যন্ত নির্বাচন যদি সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন না হয় সেটা নিয়ে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মধ্যেই দুশ্চিন্তা রয়েছে। এ কারণে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেই হবে না। সেটা সঠিকভাবে সম্পন্ন হওয়াটা খুব গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন তিনি।
নির্বাচনটি ভোটারদের কাছে কতোটা গুরুত্ব পাচ্ছে?
এমন প্রশ্নের জবাবে মিস্টার চৌধুরী ইশতেহার প্রসঙ্গটি তুলে আনেন।
সম্প্রতি নির্বাচনী ইশতেহারের ওপর প্রকাশিত খবরগুলো ঘেঁটে দেখা যায় যে সাধারণ মানুষের কাছে এ ইশতেহারের গুরুত্ব খুব কম। তার মতে রাজনৈতিক দলগুলো ইশতেহারকে গুরুত্ব দিলেও সাধারণ মানুষ ইশতেহার দেখে ভোট দেয় না।
তিনি বলেন,‘এবারে বড় দলগুলোর নির্বাচনী ইশতেহার অনেক শেষ মুহূর্তে এসেছে। এতে বোঝা যায়, আমাদের দেশের রাজনীতির জগতে এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ না।’
আফসান চৌধুরী মনে করেন, বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের চাওয়া পাওয়া খুবই সীমিত। তাদের মূল চাওয়া একটু শান্তিপূর্ণ পরিবেশ, স্বস্তিমূলক পরিস্থিতি এবং রাজনৈতিক উন্নতি।
তরুণদের প্রভাব
এবারের নির্বাচনে তরুণ ভোটারের সংখ্যা আগের যেকোনবারের চাইতে অনেক বেশি হওয়ায় তাদের প্রভাবকেও তিনি বেশ গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন।
মিস্টার চৌধুরী বলেন,‘এই তরুণদের প্রধান চাওয়াগুলো মধ্যে রয়েছে এমন একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা যাতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি মানুষের যেন কর্মসংস্থানের সুযোগ পায়। তারা যেন নিরাপদে রাস্তাঘাটে চলাচল করতে পারে এবং কোথাও যেন কোন সহিংসতা না হয়।’
ফল মেনে নিতে অস্বীকার করলে?
অতীতে এমনটা দেখা গিয়েছে যে, নির্বাচনে যারা পরাজিত হয়েছে তারা সেই ফল মেনে নিতে অস্বীকার করেছে। তা নিয়ে নতুন রাজনৈতিক সমস্যা দেখা দিয়েছিল। এবারও কি এমন হতে পারে?
এ প্রসঙ্গে আফসান চৌধুরী জানান যে, এরইমধ্যে বিএনপি বলেছে যে নির্বাচনে যদি এরকম দুই নম্বরি হয়, তাহলে তারা সেটা মেনে নেবে না।
অন্যদিকে আওয়ামী লীগ বলেছে, বিএনপি এরইমধ্যে প্রস্তুত হয়ে গিয়েছে নির্বাচনের ফলাফলকে অস্বীকার করার জন্য।
কাজেই এই দুর্ভাবনা থেকেই যায় যে আজকের নির্বাচনে কোন একপক্ষ যদি সিদ্ধান্ত নেয় যে আমরা নির্বাচন করবো না, তাহলে সেটাতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই, বলছিলেন মি. চৌধুরী।
নির্বাচনের পরিস্থিতি কেমন হলে এর ফলাফল মেনে নিতে কারোই কোনো সমস্যা হবে না? এ ব্যাপারে আফসান চৌধুরী মনে করেন যে, স্বাভাবিক, কাঠামোগত, পরিপক্ব নির্বাচন হলেই মানুষ সেটা মেনে নিবে।
তিনি বলেন,‘এই নির্বাচন থেকে মানুষের অসাধারণ গণতান্ত্রিক অভিজ্ঞতা নেয়ার কোন ইচ্ছা নেই। মানুষ শান্তিপূর্ণভাবে তাদের ভোটটা দেবে, সেই ভোটটা গণনা হবে। তারা এটাই চায়। এই চাওয়া ছাড়া তাদের আর কিছু করারও নেই।’
বিরোধীদলের পক্ষ থেকে এরইমধ্যে অভিযোগ করা হচ্ছে যে ভোট কারচুপি শুরু হয়ে গিয়েছে। আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকেও বিরোধীদের বিরুদ্ধে সহিংসতার অভিযোগ তোলা হয়েছে।
তবে নির্বাচন কমিশন ও আইন শৃঙ্খলা বাহিনী শুরু থেকেই বলে আসছে যে এবারে শান্তিপূর্ণভাবে ভোট হবে। সব মিলিয়ে আশা, নিরাশা আর দুর্ভাবনা নিয়েই মানুষ এই নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে বলে জানান রাজনৈতিক বিশ্লেষক আফসান চৌধুরী।









