ঢাকার সাবেক মেয়র, সাবেক মন্ত্রী ও বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান সাদেক হোসেন খোকার ২য় মৃত্যুবার্ষিকী নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে পালিত হয়েছে।
বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজধানীর জুরাইন কবরস্থানে বিএনপি ও এর সহযোগী অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা প্রয়ত এই নেতার কবর জিয়ারত করেন। এ সময় মরহুম সাদেক হোসেন খোকার বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করে দোয়া মোনাজাত করা হয়।
এ সময় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান, বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপি'র আহবায়ক আব্দুস সালাম, বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স, মরহুমের বড় ছেলে ও বিএনপি নেতা ইশরাক হোসেন, ওলামা দলের সভাপতি নেসারুল হকসহ বিভিন্ন পর্যায়ের কয়েক শতধিক নেতাকর্মী উপস্থিত ছিলেন।
বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজধানীর গোপিবাগে বীর মুক্তিযোদ্ধা সাদেক হোসেন খোকা কমিউনিটি সেন্টারে মিলাদ মাহফিল ও দোয়া অনুষ্ঠিত হয়।
এছাড়াও আগামীকাল ৫ নভেম্বর, শুক্রবার দুপুরে দুই মহানগর বিএনপির আয়োজনে ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটে স্মরণ সভা অনুষ্ঠিত হবে।
এ সময় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, নজরুল ইসলাম খান, বিএনপি নেতা শওকত মাহমুদ, আব্দুস সালাম, আমান উল্লাহ আমান, খায়রুল কবির খোকন, হাবিব-উন-নবী খান সোহেল, সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স, মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল, জহিরউদ্দিন স্বপন, নাজিম উদ্দিন আলম, কাজী আবুল বাশার, তাবিথ আউয়াল, যুবদল সভাপতি সাইফুল ইসলাম নীরব, সহ- সভাপতি মোরতাজুল করিম বাদরু, স্বেচ্ছাসেবক দলের সাধারন সম্পাদক আব্দুল কাদির ভুইয়া জুয়েল, যুবদলের সহ- সভাপতি জাহাঙ্গীর, যুগ্ম সম্পাদক গোলাম মাওলা শাহিন, বিএনপি চেয়ারপারসনের মিডিয়া উইং কর্মকর্তা শামসুদ্দিন দিদার, ছাত্রদলের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ইসহাক সরকার, ছাত্রদল সভাপতি ফজলুর রহমান খোকন, সাংগঠনিক সম্পাদক সাইফ মাহমুদ জুয়েল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের আহ্বায়ক রাকিবুল ইসলাম রাকিবসহ সহস্রাধিক নেতাকর্মী উপস্থিত ছিলেন।
উল্লেখ্য, গেরিলা যোদ্ধা সাদেক হোসেন খোকা ছিলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে রণাঙ্গনের অকুতোভয় বীর মুক্তিযোদ্ধা, বরেণ্য রাজনীতিক। গনমানুষের এই নেতা, তাঁর বর্ণাঢ্য জীবনকে স্মৃতির এ্যালবামে বন্দি করে চিরবিদায় নিয়েছেন ২ বছর আগে। আজ তার ২য় মৃত্যু বার্ষিকী।
১৯৫২ সালের ১লা মে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। পৈত্রিক নিবাস মুন্সীগঞ্জে হলেও তাঁর জন্মের সময় থেকেই পুরো পরিবার স্থায়ীভাবে চলে আসেন ঢাকায়।
প্রকৌশলী ও সমাজসেবক এম,এ করিম এবং গৃহিনী সালেহা বেগম দম্পতির ছয় কন্যা ও দুই পুত্র-সন্তানের মধ্যে তৃতীয় সাদেক হোসেন খোকা। বাবার যোগ্য উত্তরসুরী হিসেবে মানুষ, সমাজ ও দেশের উন্নয়নের জন্য তিনি ছিলেন নিবেদিতপ্রাণ।
তরুণ বয়সেই সফল সংগঠক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন সাদেক হোসেন খোকা। শিক্ষা জীবনে মেধার সাক্ষর রাখার পাশাপাশি ছোটবেলা থেকেই ছিলেন ক্রীড়ানুরাগী। ধীরে ধীরে হয়ে উঠেন জাতীয় পর্যায়ের ক্রীড়াঙ্গনের তুমুল জনপ্রিয় এক সাংগঠনিক-ব্যক্তিত্ব।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মনোবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন সাদেক হোসেন খোকা। ১৯৭১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যায়ের ছাত্র থাকাকালীনই অংশ নেন মহান মুক্তিযুদ্ধে।
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানিদের মিথ্যাচারে পূর্ণ তথ্যচিত্র নির্মাণের কেন্দ্র তথ্য অধিদপ্তর বোমা মেরে উড়িয়ে দেন গেড়িলা যোদ্ধা সাদেক হোসেন খোকার দল। সেই খবর বিশ্ব মিডিয়ায় ব্যাপকভাবে প্রচার ও আলোচিত হয়। এছাড়াও ৭১’র রমজান মাসে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অপারেশন হয় রাজারবাগ পুলিশ লাইনের বিপরীতে অবস্থিত তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের নির্বাচনি অফিসে। ঐ দুটি অপারেশন ছাড়াও গেড়িলা যোদ্ধাদের আরও বেশ কিছু অপারেশন নেতৃত্ব দিয়েছিলেন সাদেক হোসেন খোকা। সেসব অপারেশন বিশ্ব মিডিয়ায় ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলেন।
দেশপ্রেম আর অসীম সাহসিকতার পরিচয় দিয়ে তিনি হয়ে উঠেন গেরিলা থেকে গণমানুষের নেতা। তরুণ বয়সেই মজলুম জননেতা মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর রাজনৈকি আদর্শে অনুপ্রণিত হয়েছেন তিনি।
সত্তরের দশকে ছিলেন ছাত্র ইউনিয়নের প্রথম সারির একজন নেতা। আশির দশকে গনতন্ত্র পূনরুদ্ধার আন্দোলনে উত্তাল বাংলাদেশে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার আপোষহীন ভুমিকায় আকৃষ্ট হয়ে রণাঙ্গনের একদল যোদ্ধাদের সাথী করে যোগদেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদি দল বিএনপিতে। যোগদানের পর থেকে দলের সাংগঠনিক কাজে একই সাথে দাবি আদায়ের রাজপথে জোড়ালো ও সাহসী ভূমিকা রাখেন সাদেক হোসেন খোকা। দলের ঢাকা বিভাগীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক, ত্রাণ বিষয়ক সম্পাদক ঢকা মহানগরীর সহ-সভাপতি, আহ্বায়ক সভাপতি সর্বশেষ মৃত্যুর আগ পর্যন্ত দলের ভাইস চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়াও তিনি স্বৈরাচার এরশাদ পতন আন্দোলনের ঢাকা মহানগরীর সংগ্রাম কমিটির নেতৃত্ব দিয়ে ভীত কাঁপিয়েছিলেন সাদেক হোসেন খোকা।
৯০’র এরশাদবিরোধী গণতন্ত্র পূনঃপ্রতিষ্ঠার আন্দোলনে তাঁর ছিল গুরুত্বগূর্ণ ও সক্রিয় আংশগ্রহণ।
১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বচনে সাদেক হোসেন খোকা প্রথমবার পুরান ঢাকার কোতোয়ালী-সূত্রাপুর আসনের তৎকালীন আওয়ামীলীগ সভানেত্রী এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হসিনাকে বিপুল ভোটে পরাজিত করে সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন এবং যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়ীত্ব পান।
পরের ৫ বছরে দেশের খেলাধুলার উন্নয়ন ও সম্প্রসারণের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন তিনি। সংগঠক হিসেবে অর্জন করেন অভূতপূর্ব সাফল্য।
পরবর্তীতে, ১৯৯৬ এবং ২০০১ সালেও তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং ২০০১ সালে মৎস্য ও পশুসম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান। ২০০২ সালে সরাসরি নির্বাচনে জয়লাভের মাধ্যমে অবিভক্ত ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের মেয়র হন। মেয়র হিসেবেও সাদেক হোসেন খোকা ছিলেন রাজধানী ঢাকার উন্নয়নের অন্যতম রূপকার।
নগরীর অবকাঠামোগত ব্যপক উন্নয়নের পাশাপাশি দলমত নির্বিশেষে দেশের সূর্য সন্তান বীর মুক্তিযোদ্ধা ও ভাষা সৈনিকদের স্মৃতি অম্লান রাখতে তাদের নামে ঢাকার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়কের নামকরণ করেছেন তিনি। নদীগুলোকে দখলমুক্ত করতে তিনি সকল ঐক্যবন্ধ করে সাফল্যজণকভাবে কাজ করেছেন। মেয়র হিসেবে ঢাকাকে ডেঙ্গু মুক্ত করতে রাজনৈতিক, সামাজিক শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ করে কাজ করেছেন।
পারিবারিক জীবনে তিনি দুই পুত্র ও এক কন্যা- সন্তানের জনক। তাঁর পুরো পরিবারই উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত। বড় ছেলে ইঞ্জিনিয়ার ইশরাক হোসেন। গত সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে বিএনপির হয়ে মেয়র পদে ঢাকা দক্ষিনে প্রতিদ্বন্দিতা করেছেন।
বিএনপির অন্যতম নীতি-নির্ধারকদের একজন ছিলেন সাদেক হোসেন খোকা। প্রায় দেড় দশক বিএনপির ঢাকা মহানগর কমিটির সভাপতির দায়িত্ব সফলভাবে পালন করেন তিনি। আমৃত্যু ছিলেন, বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান। একজন সাদেক হোসেন খোকা ছিলেন পরোপকারী, দানবীর এবং লক্ষ-কোটি তরুণ-যুবকের অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব। তিনি আজীবন কাজ করে গেছেন মানুষের জন্য, দেশের জন্য। বাংলাদেশকে জাতীয়তাবাদী প্রগতিশীল ও গণতান্ত্রিক চেতনায় প্রতিষ্ঠিত করতে এবং একটি শক্তিশালী জাতি রাষ্ট্র ও ন্যায় বিচার ভিত্তিক শোষণমুক্ত মানবিক ও কল্যাণমূখী সমাজ গঠনে তিনি নির্ভিকভাবে কাজ করে গেছেন। দলমত নির্বিশেষে সর্বমহলে তার গ্রহণযোগ্যতা ছিল ব্যাপক। যেকোনো শুভ উদ্যোগে তার সম্পৃক্ততা ছিল দৃশ্যমান।
দীর্ঘ কয়েক বছর দুরারোগ্য কিডনীর ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি, কিন্তু তাঁর মন ছিল বাংলাদেশে। বাংলাদেশের মাটি ও মানুষের প্রতি অকৃত্রিম টান অনুভব করতেন সর্বদা। মিষ্টভাষী বন্ধুবৎসল, জনদরদী ও বিশাল হৃদয়বান মানুষ বীর মুক্তিযোদ্ধা সাদেক হোসেন খোকা ২০১৯ সালের ৪ নভেম্বর নিউ ইয়র্কের ম্যানহটনের স্লোয়ান কেটেরিং ক্যান্সার সেন্টারে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে





