নতুন বছরে ভিন্ন কৌশলে এগোতে চাইছে মাঠের বিরোধী দল বিএনপি। এখনই বড় ধরনের কঠোর কর্মসূচি দিয়ে শক্তি ক্ষয় করতে চায় না দলটি। বরং তৃণমূলের নেতাকর্মীদের আরো বেশি উজ্জীবিত রাখতে আপাতত ‘নরম’ কর্মসূচি নিয়েই মাঠে থাকবে। এমনিতে প্রায় দুই মাস ধরে দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি ও উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে প্রেরণের দাবিতে এবং জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদসহ বিভিন্ন জনস্বার্থ ইস্যুতে ধারাবাহিক কর্মসূচি নিয়ে মাঠে রয়েছে বিএনপি। গত বুধবারও ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি একতরফা নির্বাচনের অষ্টম বর্ষপূর্তি উপলক্ষে প্রতিবাদী মানববন্ধন করেছে দলটি। কিন্তু টানা কর্মসূচি চললে নেতাকর্মীরা একসময় আবারো মনোবল হারিয়ে ফেলবেন। যে কারণে এখনই কঠোর কর্মসূচি দেয়া হচ্ছে না। সেই সাথে চলমান কর্মসূচিতে দলের কেন্দ্রীয় ও জেলা নেতাদের কার কী ভূমিকা, সে ব্যাপারেও তথ্য নিচ্ছে বিএনপির হাইকমান্ড।
দলের নীতিনির্ধারকদের মতে, বিএনপিতে পুনর্জাগরণ সৃষ্টি হয়েছে। খালেদা জিয়ার মুক্তি ও বিদেশ পাঠানোর দাবিতে চলমান কর্মসূচিকে ঘিরে দলের নেতাকর্মীরা এখন উজ্জীবিত। কেন্দ্র থেকে তৃণমূলে সৃষ্টি হয়েছে চাঙ্গাভাব। দীর্ঘদিন ধরে হতাশায় থাকা অনেক নেতাকর্মীই গা-ঝাড়া দিয়ে সক্রিয় হয়ে উঠেছেন। তারা খালেদা জিয়া ইস্যুতে ঐক্যবদ্ধ। এমনকি পদবঞ্চিতরাও যোগ দিচ্ছেন এসব কর্মসূচিতে। তারা আরো কঠোর কর্মসূচির দাবি জানাচ্ছেন। যদিও চলমান জেলা সমাবেশ শেষে তৃণমূলে আরো কঠোর কর্মসূচি দেয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত রয়েছে বিএনপি হাইকমান্ডের।
জানা গেছে, গত সোমবার বিএনপির স্থায়ী কমিটির ভার্চুয়াল বৈঠকে খালেদা জিয়ার মুক্তি ও বিদেশে চিকিৎসার দাবিতে বিভিন্ন জেলায় অনুষ্ঠিত সমাবেশ ও নতুন কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা হয়। কর্মসূচি যেকোনো উপায়ে সফল করতে বিএনপির শীর্ষ পর্যায় থেকে দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। ১৪৪ ধারা জারি থাকলেও দলীয় কর্মসূচি যথাথভাবে পালন করতে হবে। কর্মসূচি পালনে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট কমিটি ভেঙে দেয়া হতে পারে। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি ও বিদেশে সুচিকিৎসার জন্য আমাদের আন্দোলন অব্যাহত রয়েছে। ইতিমধ্যে ৩২ জেলায় কর্মসূচি করেছি। অবশিষ্ট ৪০ জেলায় আগামী ১২ জানুয়ারি থেকে সমাবেশ করার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
জানা যায়, বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি ও বিদেশে চিকিৎসার দাবিতে বিএনপির কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত মোতাবেক গত ২৮ ডিসেম্বর নওগাঁয় সমাবেশ হওয়ার কথা ছিল। তবে একই সময় একই স্থানে যুবলীগ ও ছাত্রলীগের কর্মসূচি থাকায় ‘আইনশৃঙ্খলার অবনতি ও জননিরাপত্তা বিঘিœত’ হওয়ার আশঙ্কায় ধারা জারি করে নওগাঁ প্রশাসন। ফলে সমাবেশ করতে পারেনি বিএনপি। নীতিনির্ধারকদের মতে, বিএনপিকে প্রতিহত ও পূর্বঘোষিত কর্মসূচি পণ্ড করতেই ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নওগাঁয় এ ধরনের কৌশল নিয়েছে। যেন আগামীতে বিএনপির চূড়ান্ত ও কঠোর আন্দোলনে নেতিবাচক প্রভাব তৈরি করতে পারে আওয়ামী লীগ। তবে বিএনপির হাইকমান্ড যেকোনো উপায়ে ঘোষিত কর্মসূচি সফল করার নির্দেশ দিয়েছে। নওগাঁয় ফের সমাবেশ করতে দায়িত্বশীল নেতাদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আগামী ১৫ জানুয়ারি সমাবেশ হবে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, বেগম খালেদা জিয়া গুরুতর অসুস্থ। শুধু বিএনপি নয়, সব শ্রেণী-পেশার মানুষ তাকে বিদেশে পাঠানোর দাবি জানিয়ে আসছে। এই দাবিতে বলতে গেলে সারা দেশের মানুষ আজ ঐক্যবদ্ধ। জেল-জুলুম-হুলিয়ার ভয় না করে সরকারের অন্যায় কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদে তারা ঘর থেকে বেরিয়ে আসছে। প্রতিটি সভা-সমাবেশে লাখ লাখ নেতাকর্মী ও মানুষ সমবেত হচ্ছে। ১৪৪ ধারাকেও তারা পরোয়া করছে না। এটাকে তো পুনর্জাগরণই বলা চলে।
এর আগে গত ২৯ ডিসেম্বর প্রশাসনের ১৪৪ ধারা জারি সত্ত্বে¡ও কর্মসূচি করে ফেনী জেলা বিএনপি। তবে নেতাকর্মীদের উপস্থিতি তুলনামূলক কম হওয়ায় কমিটিকে ভর্ৎসনা করা হয়েছে। সেখানে জেলা নেতাদের ব্যাপকভাবে কর্মসূচি করতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এ অবস্থায় দলের কঠোর সিদ্ধান্ত অনুযায়ী গত সোমবার কক্সবাজারে ১৪৪ ধারা উপেক্ষা করে সমাবেশ করেছে জেলা ছাত্রদল ও স্থানীয় বিএনপি।
চলমান সমাবেশগুলোতে মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণকে পুনর্জাগরণ হিসেবে দেখছেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। তিনি বলেন, দলের প্রায় সকল কর্মসূচিতেই সরকারের পেটোয়া আইনশৃঙ্খলাবাহিনী নির্মম নিপীড়ন চালাচ্ছে। কোথাও কোথাও নিষেধাজ্ঞা জারি করা হচ্ছে। তবুও ১৪৪ ধারা ভেঙে বেরিয়ে আসছে মানুষ। বিএনপি যেখানেই সমাবেশ দিচ্ছে সেখানেই মানুষের ঢল নামছে। দুঃশাসনের বিরুদ্ধে জেগে উঠছে মানুষ। কর্তৃত্ববাদী হিংস্র শাসনের বিরুদ্ধে দেশের মানুষ কঠিন সংগ্রামে অঙ্গীকারবদ্ধ। ভোটারবিহীন সরকারের দিন শেষ। গণতন্ত্রের জয় অবিশম্ভ্যাবী।
গত ১৬ ডিসেম্বর খালেদা জিয়ার মুক্তি ও বিদেশে সুচিকিৎসার দাবিতে ৩২ জেলায় সমাবেশ কর্মসূচি ঘোষণা করে বিএনপি। নানা বাধা উপেক্ষা করে যশোর, পটুয়াখালী ও ভোলায় কর্মসূচি করে বিএনপি। দলের শীর্ষ নেতাদের প্রশ্ন- এসব জেলার নেতারা কর্মসূচি করতে পারলে অন্য জেলাগুলো কেনো পারবে না? এরপর সর্বত্র কর্মসূচি করার সিদ্ধান্ত নেয় বিএনপি। দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা জানান, হবিগঞ্জে জেলা বিএনপির সমাবেশে পুলিশের হামলার পরও নেতাকর্মীদের ভূমিকায় বেশ সন্তুষ্ট দলের শীর্ষ নেতারা। এ ছাড়া ঠাকুরগাঁও, টাঙ্গাইল, বগুড়া, দিনাজপুর, গাজীপুর, জয়পুরহাট, জামালপুর, নোয়াখালী, গাইবান্ধা, লালমনিরহাট, ঝিনাইদহ, মানিকগঞ্জ, কক্সবাজার, কিশোরগঞ্জ, সিরাজগঞ্জ, লক্ষ্মীপুর, খাগড়াছড়ি জেলায় সমাবেশে নেতাকর্মীদের উপস্থিতিতে দলের শীর্ষ নেতারা সন্তোষ প্রকাশ করেছেন।
বিএনপির সহসাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট আবদুস সালাম আজাদ বলেন, খালেদা জিয়ার চিকিৎসার দাবিতে নেতাকর্মীরা যেকোনো ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত। সারা দেশে সমাবেশগুলোতে শুধু নেতাকর্মী নয়, সাধারণ মানুষও অংশ নিচ্ছে। আশা করি সামনে গণ-অভ্যুত্থান তৈরি হবে।





