বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করেছেন। দীর্ঘ ১৫ বছরের স্বৈরাচারী শাসনের অবসানে দেশজুড়ে চলছে বিজয় উদযাপন।
সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকের-উজ-জামান সোমবার এক বিবৃতিতে বলেছেন, একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার অবিলম্বে ক্ষমতা গ্রহণ করবে। সেজন্য তিনি নাগরিকদের সেনাবাহিনীর উপর আস্থা রাখার অনুরোধ করেছেন।
জামান বলেন, ‘আমি আপনাদের সবাইকে একটু ধৈর্য ধরার অনুরোধ করছি। আমাদের কিছু সময় দিন। একসাথে বসে আমরা সব সমস্যার সমাধান করতে পারব। দয়া করে সহিংসতার পথে যাবেন না। অহিংস ও শান্তিপূর্ণ পথে ফিরে আসুন।’
সরকারি চাকরিতে কোটার বিরুদ্ধে কয়েক সপ্তাহের বিক্ষোভের পর দেশব্যাপী অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়ে। এতে বাধ্য হয়ে পদত্যাগ করেন হাসিনা। সরকার বিক্ষোভের দমন-পীড়নে কমপক্ষে ২৮০ জন নিহত এবং হাজার হাজার আহত হয়।
শেখ হাসিনা সোমবার সামরিক হেলিকপ্টারে চড়ে দেশ ত্যাগ করেন। তিনি তার শক্তিশালী মিত্র ভারতে পালিয়েছেন বলে জানা গেছে। স্থানীয় সংবাদ মাধ্যমের ভিডিও প্রতিবেদনে দেখা গেছে, হাজার হাজার মানুষ প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে ঢুঁ মারছে, শ্লোগান দিচ্ছে এবং উদযাপনে গান গাইছে যখন তারা তা ভাঙচুর করছে।
এখানে সেই পটভূমি রয়েছে যা ঐতিহাসিক মুহুর্তের দিকে পরিচালিত করেছিল,
রোববার কী ঘটেছিল
নিরাপত্তা কর্মকর্তা ও বিক্ষোভকারীদের মধ্যে সংঘর্ষ বাড়তে থাকায় এবং হাসিনাকে পদত্যাগ করার আহ্বান জানানোর কারণে শুধুমাত্র রোববারই ৯০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়।
রাজধানী ঢাকার শাহবাগ চত্বরে বিক্ষোভকারীদের ওপর রাবার বুলেট ওকাঁদানে গ্যাস ছোড়ে পুলিশ। উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় জেলা সিরাজগঞ্জেও বিক্ষোভকারীরা একটি থানায় হামলা চালায়। এতে অন্তত ১৩ জন কর্মকর্তা নিহত হয়।
গত মাসে বিক্ষোভ শুরু হওয়ার পর রোববার সর্বোচ্চ মৃত্যু ঘটেছে। কর্তৃপক্ষ রোববার সন্ধ্যা ৬টা থেকে ‘শুট-অন-সাইট’ কারফিউ জারি করে। এতে শৃঙ্খলা পুনরুদ্ধার করতে অনেক পুলিশ ও সামরিক ইউনিট মাঠে নামে। কিন্তু রাজধানীর বাইরে সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেলেও কারফিউ অমান্য করে হাজার হাজার মানুষ সোমবারের প্রথম দিকে ব্যাপকভাবে অনিয়ন্ত্রিতভাবে মিছিল করেছে।
আল জাজিরা প্রতিনিধি তানভীর চৌধুরী ঢাকা জানিয়েছেন, দুপুরের দিকে যখন বিক্ষোভকারীরা সামরিক বাহিনীকে ফুল দিতে শুরু করে এবং অফিসাররা যখন বিক্ষোভকারীদের আলিঙ্গন করে, তখন এটা স্পষ্ট যে কিছু খুব দ্রুত পরিবর্তিত হয়েছে। লোকেরা স্বস্তি পেয়েছে যে এই নৃশংস দমন-পীড়ন শেষ পর্যন্ত শেষ হয়েছে। এটা হাসিনার জন্য খেলা শেষ।’
প্রাথমিকভাবে বিক্ষোভের কারণ কী
গত জুলাই মাসে বিক্ষোভটি ঢাকায় শুরু হয়েছিল। প্রাথমিকভাবে ২০১৮ সালে প্রত্যাহার করা একটি চাকরির কোটা স্কিম পুনঃস্থাপনের জন্য শুরু হয়েছিল। ওই কোটা স্কিমে মুক্তিযোদ্ধাদের বংশধরদের জন্য সরকারি চাকরির ৩০ শতাংশ বরাদ্ধ দেয়া হয়েছিল। এছাড়া আরো ২৬ শতাংশ ছিল নারী, প্রতিবন্ধী ও সংখালঘুদের জন। ফলে সরকারি চাকরিতে কেবল তিন হাজার পদ অবশিষ্ট ছিল। আর ওই পদের প্রতিযোগী প্রায় চার লাখ শিক্ষার্থী।
আন্দোলন শুরু হওয়ার পর হাসিনা বিক্ষোভকারীদের ‘রাজাকার’ হিসেবে উল্লেখ করেন। এতে কোটার বিরুদ্ধে সমাবেশগুলো তীব্র হয়। রাজাকার হলো ১৯৭১ সালের যুদ্ধে যারা পাকিস্তানি বাহিনীকে সহায়তা করেছিল।
হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামলে ১০ জুলাই থেকে ২০ জুলাই পর্যন্ত সময় সবচেয়ে বেশি অস্থিরতা মধ্য দিয়ে গেছে। এ সময় ১৮০ জনেরও বেশি লোক নিহত হয়েছিল। পুলিশ জানিয়েছে, বিক্ষোভকারীরা সম্পত্তি ভাঙচুর করে এবং একটি জাতীয় টেলিভিশন স্টেশনসহ সরকারি ভবনে অগ্নিসংযোগ করে।
সুপ্রিম কোর্ট ২১ জুলাই চাকরির কোটা নীতি প্রত্যাহার করে রায় দেয়। নতুন রায় অনুসারে ৯৩ শতাংশ চাকরি মেধার জন্য রাখা হয়েছে। কিন্তু ছাত্র ও অন্যান্যরা সমাবেশের একটি নতুন তরঙ্গে একত্রিত হওয়ায় বিক্ষোভ অবিরাম চলতে থাকে। তারা নিহতদের জন্য ন্যায়বিচারের দাবি জানিয়েছে। পরে তারা এক দফা দাবি জানিয়ে হাসিনাকে পদত্যাগের আহ্বান জানান।
হাসিনা এবং তার মন্ত্রিসভার সদস্যরা শেষ অবধি প্রতিবাদী ছিলেন। বিরোধী শক্তিকে এই বিক্ষোভে ইন্ধন জোগানোর অভিযোগ তুলেছিলেন। রোববার হাসিনা বিক্ষোভকারীদের ‘সন্ত্রাসী’ বলে অভিহিত করেন।
হাসিনা কেন অজনপ্রিয় হলেন
বিশ্বের দীর্ঘতম নারী সরকার প্রধান হাসিনা (৭৬) বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা। তিনি প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় আসেন। এরপর ২০০৯ সালে নির্বাচিত হয়ে একটানা ২০ বছর শাসন করেন।
যদিও হাসিনা এই বছরের নির্বাচনে টানা চতুর্থ মেয়াদে জিতেছিলেন। তবে তার বিরুদ্ধে বিরোধী দলসহ অন্য দলগুলো বিরোধীদের দমন-পীড়ন, গুম-খুন, সাজানো ও বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগ তুলেছিল। কিন্তু তিনি বরাবরই এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
কিন্তু জুলাই মাসে ছাত্র আন্দোলনকারী অনেক সাহসের পরিচয় দেয়। তারা সরকারের বক্তব্যের প্রতিবাদে স্লোগান দেয়, ‘এক, দুই, তিন, চার, শেখ হাসিনা স্বৈরাচার। ইত্যাদি। বিশ্লেষকরা অনুমান করেছিলেন যে হাসিনা তার শাসনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জে টিকে থাকতে পারবেন না।
বহু বছর ধরে অস্ট্রেলিয়ায় নির্বাসিত রাজনৈতিক বিশ্লেষক মুবাশার হাসান বলেছেন, ‘শেখ হাসিনার পতনের মধ্য দিয়ে একজন স্বৈরশাসকের পতন হয়েছে।’
তিনি সোমবার আল জাজিরাকে বলেছেন, হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির খবর এবং টেলিভিশন ভিজ্যুয়ালে ঢাকায় বিক্ষোভকারীরা হাসিনার বাবার একটি বড় মূর্তির উপরে আরোহণ করতে দেখা গেছে। এক ব্যক্তি একটি কুড়াল দিয়ে তার মাথা চূর্ণ-বিচূর্ণ করছিল।
তিনি আরো বলেন, ‘এটি একটি অবিশ্বাস্য মুহূর্ত। এটা বাংলাদেশের দ্বিতীয় স্বাধীনতার মতো। শেখ হাসিনা ও তার শাসনামলের অত্যাচারে বাংলাদেশকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করে রেখেছিল। আমি ২০১৮ সাল থেকে বাংলাদেশে ফিরে যেতে পারিনি। এখন আশা করি, শিগগির পরিবারের কাছে ফিরে যেতে পারব।’
সেনাবাহিনী মোতায়েন কি টিপিং পয়েন্ট ছিল
হাসান বলেন, বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনী মোতায়েনের সিদ্ধান্তটি হাসিনার শাসনের পতনের টিপিং পয়েন্ট বলে মনে হচ্ছে।
সেনাবাহিনীকে বাংলাদেশে মূলত একটি নিরপেক্ষ সত্তা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বেশিরভাগ মানুষই এটিকে ভালোভাবে বিশ্বাস করে এবং সম্মান করে। ২০০৮ সালে যখন একটি নির্বাচনী সঙ্কট দেশকে একটি রাজনৈতিক অচলাবস্থার মধ্যে ফেলে দেয়, তখন সামরিক বাহিনী পদক্ষেপ নেয় এবং সেই বছরের ডিসেম্বরে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
সর্বশেষ বিক্ষোভ ক্রমবর্ধমান হওয়ার সাথে সাথে সেনাবাহিনী তার বিবৃতিতে সতর্ক ছিল এবং নিরপেক্ষ বলে মনে হয়েছিল।
কিন্তু শুক্রবার সাবেক সামরিক কর্মকর্তারা বিক্ষোভ দমনের জন্য বিজিবি মোতায়েনের সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে বিক্ষোভের প্রতি সমর্থন প্রকাশ করেছেন। সাবেক সেনাপ্রধান ইকবাল করিম ভূঁইয়া সামরিক বাহিনীর সাধারণদের সমর্থন ইঙ্গিত করে তার ফেসবুক প্রোফাইল ছবি লাল করে দিয়েছেন।
আরেকটি টিপিং পয়েন্ট, ইউনাইটেড কিংডমের স্কুল অফ আফ্রিকান অ্যান্ড ওরিয়েন্টাল স্টাডিজের অধ্যাপক নাওমি হোসেন বলেছেন, রোববারের হত্যাকাণ্ড সত্ত্বেও বিক্ষোভকারীরা আবার জড়ো হতে শুরু করায় সোমবার ‘একটি সম্পূর্ণ রক্তপাত’ হওয়ার আশঙ্কা ছিল।
তিনি আরো বলেন, ‘খুব ভয় ছিল যে আজ রক্তাক্ত হতে চলেছে। লোকেরা খুব ভয় পেয়েছিল যে আজ একটি রক্তপাত হবেই। তাই এটি সত্যিই সামরিক বাহিনীকে তাদের কী করা দরকার, তা নিয়ে ভাবতে বাধ্য করেছিল।’
নতুন সরকার কেমন হবে এবং পরবর্তী কী হবে
কিভাবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করা হবে, তার বিশদ বিবরণ এখনো অস্পষ্ট। তবে জামান বলেছেন, তিনি বিরোধী দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলসহ প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে আলোচনা করছেন।
অতীতে বেশ কয়েকটি সামরিক অভ্যুত্থানের মতো সামরিক বাহিনী নিজেই ক্ষমতা গ্রহণ করবে কিনা, তা পরিষ্কার নয়। ছাত্র কর্মীরা বলেছেন, তারা সামরিক শাসন প্রত্যাখ্যান করবেন।
হোসেন বলেন, ‘আমরা এটা বহন করতে পারি না। আমরা সত্যিই আশা করছি যে সেনাবাহিনী শান্তি বজায় রাখতে সক্ষম হবে। একইসাথে এমন কিছু অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা চালু করতে পারবে, যা আমাদের গণতন্ত্রে ফিরিয়ে দিতে পারে।’
জামান আরো বলেন, ন্যায়বিচারের দাবি বাড়ার সাথে সাথে সপ্তাহব্যাপী বিক্ষোভ চলাকালীন মৃত্যুর তদন্ত করা হবে।
জেনারেল বলেন, ‘আমি আপনাদের সকলকে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি যে আমরা সকল হত্যা ও অন্যায়ের বিচার করব। দেশের সেনাবাহিনীর প্রতি আস্থা রাখতে অনুরোধ করছি। আমি সম্পূর্ণ দায়িত্ব নিচ্ছি। আমি আপনাকে হতাশ না হওয়ার আশ্বাস দিচ্ছি।’
এদিকে, হাসিনা তার বোনকে নিয়ে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য ত্রিপুরার রাজধানী আগরতলায় পৌঁছেছেন বলে ভারতীয় গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে।
সূত্র : আল জাজিরা





