জায়িদ এবার সপ্তম শ্রেণীতে পড়ে। জায়িদের পুরো নাম জায়িদ ইবনে সাঈদ। জায়িদ বেশ ভাবুক প্রকৃতির ছেলে। কোনো বিষয় একবার মাথায় ঢুকে গেলে সেটি নিয়ে পড়ে থাকে। কোনো প্রশ্ন মাথায় এলে তার একটি জুুঁতসই জবাবের জন্য সম্ভাব্য সব চেষ্টা চালায়। জানার জন্য ঘনিষ্ঠ জনদের কাছে জিজ্ঞাসা করে। ইদানীং ইন্টারনেটে সার্চ দিয়ে আগ্রহের কোনো বিষয় জানারও চেষ্টা করে। পছন্দের বই পড়তে খুব ভালোবাসে। এসব করতে গিয়ে জায়িদ কিন্তু একাকী বা বিচ্ছিন্ন জীবন যাপন করে না। ওর বেশ কয়েকজন ভালো বন্ধু আছে। তাদের সাথে সময় কাটায়। বিশেষ করে স্কুলে বন্ধুদের সাথে গল্প করা। খেলাধুলা করে সুন্দর সময় কাটাতে পছন্দ করে। তবে বন্ধুরা সবাই জানে জায়িদ তার পছন্দের বিষয়গুলোতে ভালো ধারণা রাখে।
স্কুলে বন্ধুদের সাথে মধ্যাহ্ন বিরতিতে সময় কাটানো জায়িদ খুব উপভোগ করে। মধ্য দুপুরের এই সময়টুকু বন্ধুদের সাথে খেলেই পার করে। এ সময় ওরা গাছের ছায়ায় খেলে। রোদ ও গরম এর তীব্রতা কম থাকলে মধ্য মাঠে গিয়েও খেলে। ওর ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের মধ্যে রয়েছে শফিক, ইমরান, রাশেদ। আরো একজনকে জায়িদ এর খুব ভালো লাগে। ওর নাম উমর ফারুক। উমরের সাথে জায়িদের কথা কম হয়। নিয়মিত টুকটাক কথা হলেও গল্প আড্ডা খুব হয় না। উমর ওদের সাথে তেমন খেলেও না। মাঝে মধ্যে ওরা বললে খুব অল্প সময়ের জন্য খেলে। তবুও উমরের প্রতি জায়িদের ভালোলাগা আছে। এর কারণ হলো, উমরের বিনয়ী আচরণ। উমরের ওদের সাথে খেলতে না পারার কারণ হলো- ওই সময়ে উমর জহুরের সালাত আদায় করে। স্কুলে জোহরের সালাতের জামাত হয়।
জায়িদও সালাত আদায় করে। তবে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত নিয়মিত তার আদায় করা হয় না। বাবা-মা পাঁচ ওয়াক্ত সালাত নিয়মিত আদায় করার জন্য বলে। তবে জায়িদ ফজর আর জহুর বেশির ভাগ সময়েই আদায় করে না।
প্রতিদিনের মতো সেদিনও দুপুরের বিরতিতে খেলছিল জায়িদ ও তার বন্ধুরা। ওদের স্কুলে মধ্যাহ্ন বিরতি দুপুর ১ থেকে ২টা। সে সময় অজু করার জন্য জায়িদের পাশ দিয়ে যাচ্ছিল উমর। জায়িদ উমরকে বলল, আসো আমাদের সাথে খেলো। উমর বলল, একটু পরেই সালাতের জামাত শুরু হবে। এখন অজু করে সালাত আদায় করব। অন্য কোনো সময় খেলব। তুমিও সালাত আদায় করতে চলো। জায়িদ বলল, পরে নামাজ পড়ব।
এরপর উমর অজু করার জন্য চলে গেল। জায়িদ খেলতে লাগল।
উমর খেলছিল আর ভাবছিল, আমিও তো নামাজ পড়ি। তবে সব ওয়াক্ত আদায় করি না। বড়রা যেভাবে সব ওয়াক্ত নামাজ পড়ে, আমারও কি পড়তে হবে? এ বিষয়টি জানতে হবে।
জায়িদের ঘনিষ্ঠ বন্ধুরাও সালাত আদায় করে। কিন্তু কেউই নিয়মিত আদায় করে না। রাশেদ প্রতিদিন দুই-তিন ওয়াক্ত সালাত আদায় করে। শফিক ও ইমরান জুমার সালাত আদায় করে। মাঝে মধ্যে অন্যান্য ওয়াক্তের সালাত আদায় করে। তবে খুব কম।
একটু পরে উমর সালাত আদায় করে জায়িদের পাশ দিয়ে ফিরছিল। জায়িদ ডাকল উমরকে। বলল- আচ্ছা, আমরা তো অনেক ছোট আমাদেরও কি বড়দের মতো নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করতে হবে?
জবাবে উমর বলল, আমরা মুসলমান এবং আমাদের যে বয়স তাতে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করতে হবে। ইসলামে আমাদের এই বয়সে নিয়মিত সালাত আদায়ের জন্য খুব জোর দেয়া হয়েছে। এরপর জায়িদ উমরকে বিদায় দিয়ে খেলায় মনোযোগ দিলো। কিন্তু জায়িদ পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে খেলতে পারছিল না। বার বার মনে হচ্ছিল আমার যা বয়স, তাতে নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করা উচিত। কিন্তু আমি তো নামাজ নিয়মিত আদায় করি না। একটি অস্বস্তি কাজ করছিল। জায়িদ তখনই সিধান্ত নেয়, এ বিষয়টি নিয়ে ভালোভাবে জানতে হবে।
জায়িদের বাবা কলেজের প্রভাষক। মা গৃহিণী। বাবা-মা দুজনেই নিয়মিত সালাত আদায় করেন। ধর্মীয় বিভিন্ন বিষয় নিয়ে পড়াশোনাও করেন। জায়িদকে নিয়মিত সালাত আদায় করার জন্য বলেন। সেদিন বাড়ি ফিরে আসরের সালাত আদায় করে। সালাত আদায় করে ড্রয়িং রুমে এসে দেখে ওর বাবা পত্রিকা পড়ছেন। বাবার পাশে বসে জায়িদ বাবাকে বলে, বাবা আমার কি অবশ্যই পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ নিয়মিত আদায় করতে হবে? জায়িদের বাবা মিজানুর রহমান জায়িদের নানা রকম প্রশ্নের মাঝে মধ্যেই মুখোমুখি হন। ছেলের নানা বিষয়ে আগ্রহ দেখে তিনি খুশি হন। আজকের প্রশ্ন শুনে একটু বেশি খুশি হলেন। পত্রিকা ভাঁজ করে রেখে জায়িদের দিকে তাকিয়ে বললেন, তোমার এখন বয়স ১৩ বছর। তোমার এখন পাঁচ ওয়াক্ত সালাত নিয়মিত আদায় করতে হবে। ইসলামে এ বিষয়ে খুব গুরুত্ব দিয়ে বলা হয়েছে। এ বিষয়ে ইসলামের বিধান তোমাকে বলছি। বলে তিনি উঠে গিয়ে সালাত বিষয়ে একটি বই নিয়ে আসলেন আলমিরা থেকে। সেখান থেকে সালাত নিয়ে একটি হাদিস পাঠ করে শোনালেন। হাদিসটি হলো, রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন, ‘যখন তোমাদের সন্তানরা সাত বছরে উপনীত হবে, তখন তাদেরকে সালাত পড়ার পরামর্শ দেবে এবং তাদের বয়স যখন ১০ বছর হবে তখন সালাত না পড়লে এ জন্য তাদেরকে মারপিট করো এবং তাদের বিছানা (ছেলে-মেয়েদের) পৃথক করে দেবে।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং-৪৯৫) এরপর জায়িদের বাবা বললেন, বুঝতেই পারছ, তোমার এখন নিয়মিত সালাত আদায় করতে হবে। তোমার এই বয়সে সালাত আদায় না করলে মারপিট করার কথাও বলা আছে। এখন থেকে নিয়মিত সালাত আদায় করো।
এরপর জায়িদের বাবা জায়িদকে সালাত সম্পর্কিত লেখা ছোটদের উপযোগী একটি বই দিয়ে পড়তে বললেন। জায়িদ যাবার আগে বাবাকে বলল, এখন থেকে নিয়মিত নামাজ আদায় করব। নিজ রুমে গিয়ে বইটি খুলে দেখল। এতে সালাতের বিধান, নিয়ম-কানুন, উপকারীতাসহ আরো কিছু বিষয় চমৎকারভাবে দেয়া আছে। জায়িদ বইটি পড়তে শুরু করল।
পরদিন জায়িদের বন্ধুরা মধ্যাহ্ন বিরতিতে খেলার জন্য বের হয়ে গেল। জায়িদ দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে রইল। উমর বের হয়ে আসলে, তাকে বলল চল আমিও সালাত আদায় করব। উমর খুব খুশি হলো। বন্ধুদের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় ওর বন্ধুরা জায়িদকে বলল, তাড়াতাড়ি চলে আয়, আমরা খেলা শুরু করে দিয়েছি। জায়িদ বলল, আমি এখন খেলব না। নামাজ পড়ব। তোরাও আমাদের সাথে চল, নামাজ পড়বি। ওরা সবাই অবাক হলো যে, জায়িদ খেলা রেখে সালাত পড়তে যাচ্ছে। রাশেদ বলল, আমরা এখন খেলব। এরপর জায়িদ আর উমর চলে গেল।
পরদিন মধ্যাহ্ন বিরতিতে বন্ধুরা সবাই জায়িদকে ঘিরে ধরল। শফিক বলল, আমরা তো কিছু কিছু নামাজ পড়ি। আমাদের কি এখনই পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করতে হবে? ইমরান বলল, আমরা তো এখনো অনেক ছোট। জায়িদ এরপর উমরের কাছ থেকে ও সালাত নিয়ে বইটি পড়ে এবং বাবার কাছ থেকে সালাত আদায় নিয়ে শুনে যা জেনেছে তা সংক্ষেপে ওদের বলল। উমর ও কিছু কথা বলল। দুজনেই নিয়মিত সালাত আদায় করার জন্য তাদেরকে বলল। সব শুনে জায়িদের বন্ধুরা বলল, তোমরা নামাজ পড়তে যাও। আমরা পরে পড়ব। আমরা এখন খেলব। এরপর জায়িদ সালাত নিয়ে পড়া তার বইটি শফিককে দিয়ে বলল, তুই এই বইটি পড়িস। পড়ে ওদেরকে পড়তে দিস। এরপর জায়িদের বন্ধুরা মাঠে গিয়ে খেলতে শুরু করল। এত আকর্ষণীয় খেলা খেলতে না পেরে জায়িদের একটুও খারাপ লাগছে না; বরং উমরের সাথে সালাত আদায় করতে যেতেই তার ভালো লাগছে। এখন উমরকে জায়িদের আগের চেয়ে অনেক বেশি আপন মনে হয়। কিছুক্ষণ পর জায়িদ আর উমর সালাত আদায়ের জন্য চলে গেল।
জায়িদ এবার সপ্তম শ্রেণীতে পড়ে। জায়িদের পুরো নাম জায়িদ ইবনে সাঈদ। জায়িদ বেশ ভাবুক প্রকৃতির ছেলে। কোনো বিষয় একবার মাথায় ঢুকে গেলে সেটি নিয়ে পড়ে...
