নাম বিভ্রাট: ছাগল সাংবাদিকতা...
হুডখোলা রিকশা। শ্যামলী-মোহাম্মদপুর সড়ক। হাতের বায়ে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়কে ল্যাং করে সামনে এগোচ্ছে ত্রিচক্রযান। কী এক ভাবনা অতলে হাবুডুবু। যতদূর মনে পড়ে, ভাবছিলাম জীবনানন্দ দাশের কবিতা নিয়ে। ...যতই সময় পেরুচ্ছে, ততই গ্রামে ফিরে যাবার ইচ্ছে তীব্রতর হচ্ছে: আমার চিরচেনা মল্লিকাবনে। শহরে পূজির মেলা পকেট ভারী করার একটা আশ্বাস দেয় বটে, কিন্তু শহর মনকেও ভারী করে দেয় বড়। পুঁজি নিয়ে কাড়াকাড়ির মধ্যে একটু অলস দুপুর খুঁজে নিয়ে মনের ভেতরে ঘুরে আসার অবসরটুকু শহরে মেলে না। অথচ আমি বিশ্বাস করি সেই মানসিক ভ্রমণেই সুখের নিবাস... [অন্ধকারে জলের কোলাহল/জীবনানন্দ দাশ]। কবিতার এই লাইনগুলো অযথাই কাঠবিড়ালের মতো দুষ্টুমি করছিলো ঠোটে।
হঠাৎ একটা ফোনে হুশ ফেরে।
: মানিক ভাই বলছেন?
: বলছি।
: আমি... অমুক ইংরেজি দৈনিক থেকে বলছি। এন্টারটেইনমেন্ট পেইজে কাজ করি।
: বলুন।
: একটা প্রতিক্রিয়া জানতে চাচ্ছিলাম... সময় হবে এখন?
: কী বিষয়ে বলুন?
সংস্কৃতি অঙ্গনে জোরদারভাবে কাজ করার কারণে একজন কণ্ঠশ্রমিক হিসেবে নানা সময়েই নানা পত্রিকায় ইন্টারভিউ দিতে হয়। কাজেই ওই রিপোর্টারের কথায় অপ্রস্তুত হবার প্রশ্নই আসে না। সুতরাং বিপুল আগ্রহে তার প্রশ্নটি জানতে চাইলাম।
: মানিক ভাই, সম্প্রতি আমরা দেখছি ইন্ডিয়া থেকে সিনেমা আমদানি করে বাংলাদেশের হলগুলোতে প্রদর্শন করা হচ্ছে, এটা নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে অনেকেই মন্তব্য করছেন, আপনার মতামত কী?
: দেখুন, ইন্ডিয়ার সিনেমা বাংলাদেশের হলগুলোতে প্রদর্শন করে আমাদের চলচ্চিত্রকে একটা অসম ও অন্যায্য প্রতিযোগিতায় ঠেলে দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশ একটা সার্বভৌম রাষ্ট্র, তার সংস্কৃতি কী হবে, চলচ্চিত্র কী হবে, তা নিজেদের সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে। ইন্ডিয়ার মতো চলচ্চিত্র নির্মাণে মেধা থাকলেও আমাদের প্রযুক্তি ও বাজেট নেই। সুতরাং তাদের সিনেমার মুখোমুখি আমাদের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিকে দাঁড় করিয়ে দেয়া অযৌক্তিক। তাছাড়া ওদের টিভি চ্যানেলগুলো আমাদের এখানে দেদারছে সম্প্রচারিত হলেও, নূন্যতম পশ্চিমবঙ্গেও দেখা যায় না আমাদের চ্যানেল। এই বৈষম্য মেনে নেয়া মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের টোটালি পরিপন্থী। প্রত্যেক রাষ্ট্র তার নিজের মতো করে সাহিত্য-সংস্কৃতিকে গড়বে, এটিই নিয়ম। মালেশিয়া কী করেছে দেখুন, বিবিসি-আলজাজিরা ছাড়া বাইরের দেশের আর কোন চ্যানেলকে তারা অ্যালাউ করেনি। তথ্যমন্ত্রী থাকাকালীন ভারতের টিভিগুলোকে একতরফা প্রচারের অনুমতি দিয়ে ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা আমাদের সংস্কৃতির মস্তিষ্কে সর্বপ্রথম কুঠারাঘাত করেন।
: তার মানে আপনি বলছেন, চলচ্চিত্র আমদানির ব্যাপারে যে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে, সেটা রাষ্ট্রদ্রোহী?
: নিঃসন্দেহে। আর কোনো কিছু জানতে চান?
: না ভাইয়া, অনেক ধন্যবাদ আপনাকে, সময় দেবার জন্য। এটা কাল পাবলিশ হবে, দেখবেন প্লিজ।
: ওকে ভালো থাকুন।
২.
ইংরেজি দৈনিকটি সাধারণত পড়া হয় না। পরদিন বিপুল আগ্রহ নিয়ে পত্রিকা কিনলাম। অন্য সব পাতায় না তকিয়ে সোজা এন্টারটেইনমেন্ট পাতায় নিবদ্ধ করলাম চোখ। কিন্তু চোখ তো ছানাবড়া! এ কী! চলচ্চিত্র পরিচালক এফআই মানিকের ছবি দিয়ে তিন কলাম পরিসরে ছাপানো হয়েছে আমাদের দেয়া
প্রতিক্রিয়া। হুবহু। বুঝে গেলাম, ঘটনা কী?
কিন্তু প্রশ্ন হলো, প্রথম সারির একটা দৈনিকের রিপোর্টার কিভাবে এত বড় ভুল করলো? একবার ভাবলাম, ডেইলি স্টারে ফোন দেই। মুহূর্তেই চিন্তায় ছেদ। থাক, রিপোর্টার মহোদয়ের! চাকরিটা হাল্কা করে কী লাভ! এই অদ্ভূত ট্রেন্ডই তো আমাদের মিডিয়া জগতে চলছে। চলুক। মনের আক্ষেপে এই ধরনের রিপোর্টিং এর নাম দিলাম-ছাগল সাংবাদিকতা।
৩.
আমি আবার ফিরে গেলাম জীবনানন্দ দাশে।
- অদ্ভুত আঁধার এক এসেছে এ-পৃথিবীতে আজ,
যারা অন্ধ সবচেয়ে বেশি আজ চোখে দ্যাখে তারা;
যাদের হৃদয়ে কোনো প্রেম নেই-প্রীতি নেই-করুণার আলোড়ন নেই
পৃথিবী অচল আজ তাদের সুপরামর্শ ছাড়া।
যাদের গভীর আস্থা আছে আজো মানুষের প্রতি
এখনো যাদের কাছে স্বাভাবিক ব’লে মনে হয়
মহৎ সত্য বা রীতি, কিংবা শিল্প অথবা সাধনা
শকুন ও শেয়ালের খাদ্য আজ তাদের হৃদয়।
ধাপ্পাবাজি
১.
আড্ডা। সোনালি শেষ বিকেল অথবা বিরহের ঘোর লাগা ঝিম সন্ধ্যার ধূমায়িত চায়ের কাপ যেন আড্ডার কালের সাক্ষী। কথার পরতে কথা জমে জমে বরফ হয়। কালের আয়নায় পড়ে ধুলো। বাঙালির কত মহৎ কর্মের আঁতুড় এই আড্ডা। বিদ্রোহী নজরুল তো আড্ডারই সন্তান। কিন্তু লালনের খবর কেউ জানি না। তিনি কী এরকম প্রথাগত আড্ডায় চায়ের কাপে ঝড় তুলতেন? গবেষকরা বলতে পারবেন কি না তাতেও সন্দেহ আছে।
মান্না দে’র কালবিজয়ী গান-কফি হাউসের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই আজ আর নেই/কোথায় হারিয়ে গেল সোনালি বিকেলগুলো সেই আজ আর নেই, শুনলেই স্মৃতির তন্ত্রিতে নাড়া লাগে, চোখের জমিনে ভেসে উঠে কৈশোরের মেঠো চা-খানার জ্বলজ্বলে ছবি। পুরনো বিউটি বোর্ডিংয়ের চায়ের কাপেরা নিশ্চয়ই জানে, আড্ডা কাহাকে বলে কত প্রকার। এখনো বিউটি বিল্ডিংয়ের সামনে পা রাখলে শামসুর রাহমান, আল মাহমুদের গন্ধ পাওয়া যায়।
২.
আমরা বা আমাদের প্রজন্ম ধুম আড্ডার স্বাদ কখনোই পাইনি। রোবটিয় ব্যস্ততা কেড়ে নিয়েছে আমাদের প্রিয় প্রিয় অনেক অনুসঙ্গ। তবুও কখনো সখনো হঠাৎই অকারণে হয়ত অফিস চত্বরে অথবা অন্য কোথাও জমে উঠে ফুরুত ফুরুত আড্ডা। সেইসব আড্ডার দৈর্ঘ্য খুব বেশি না হলেও প্রস্থ একেবারেই ছোট্ট না। এখনকার আড্ডাগুলোও আর জন্ম দেয় না প্রতিভার আকাশ। তাই ব্যক্তিগত আঙিনাতেই এখন প্রতিভার স্ফুরণ ঘটে।
দিনক্ষণ ও ঘড়ির কাঁটার ওঠানামা মনে নেই। কোনো এক সন্ধ্যা। কয়েকজন উঠতি তরুণ। প্রত্যেকেই গণমাধ্যমের কর্মী। কেউ কেউ মূলধারার, দু-একজন অপরিচিত ভুঁইফোড় সাপ্তাহিকের। কী জন্য আমাদের এই জটলা হয়েছিলো তাও ঠিক মনে নেই। পল্টনে সংবাদ অফিসের চা-চত্বরে। চা খেতে খেতে দাড়িয়ে দাড়িয়ে আলাপ। অনেক প্রসঙ্গ, কিছু অপ্রসঙ্গও। মূল আলাপ ছিল, কোন টিভি চ্যানেল কেমন করছে তা নিয়ে। কথার প্যাঁচে হঠাৎই মাই টিভির প্রসঙ্গ এলো। তখন সবেমাত্র মাই টিভি আনুষ্ঠানিক সম্প্রচারে এসেছে।
আমি বললাম, মাই টিভিতে কারা কারা আছেন? আমার তো একটা মাধ্যম দরকার, অন্য একটা কাজে। হঠাৎ আড্ডার অপাঙ্ক্তেয় এক সাপ্তাহিক পত্রিকার একজন বলে উঠল- মানিক ভাই, কোনো চিন্তা করবেন না, মাই টিভির ম্যানেজমেন্টের সাথে আমার খুব নিবিড় সম্পর্ক, আমি আপনার বিষয়ে বলে দেবো।
কার সঙ্গে আপনার সম্পর্ক আছে? আমি জানতে চাইলাম।
সে বলল-সাথী আপার সঙ্গে।
-উনি কে?
- উনি মাই টিভির চেয়ারম্যান। আপার সঙ্গে আমার নিয়মিত কথা হয়, মাই টিভির যেকোন কাজের বিষয়ে বলবেন আমাকে, আমি ব্যবস্থা করে দেবো।
বিস্ময়ের সাথেই ভনিতা করে আমি বললাম, তাই না কি !
- হ্যাঁ ভাই...জানাবেন দরকার হলে...
- সাথী আপার পুরো নাম জানেন?
- না, মানে ইয়ে উনি সাথী নামটাই লেখেন...
মুখ ফসকে একটা জোরালো হাসি বের হয়ে এলো আমার। হাসির গমগম আওয়াজে সবার মনোযোগ নিবদ্ধ হলো এই আলোচনায়।
- আরে ভাই, উনি আপা না, উনি হলেন ভাই, উনার পুরো নাম নাসির উদ্দিন সাথী।
এ কথা শুনার সঙ্গে সঙ্গে মাকাল ফলের মতো মুখখানা লালবর্ণ ধারণ করলো তার। লজ্জায় মুখ কোথায় লুকাবে তার জায়গা খুঁজছিলো সম্ভবত।
ব্যাপারটা বুঝতে পেরে অন্যরাও হো হো করে হাসল। যাক ছেলেটার সম্মান বাঁচাতে আমি নিজেই অন্য প্রসঙ্গ পাড়লাম।
আড্ডা শেষ। মুদ্রা বিনিময়ের পর চা-ওয়ালা জনৈক রিপোর্টারকে জোরেই বললেন, ভাই সাংবাদিকতা করেন ঠিকাছে, কিন্তু ধাপ্পাবাজি কইরেন না।
৫ হাজার থেকে ৫ কোটি...
১.
কেউ যদি প্রশ্ন করে একজন সাংবাদিকের শ্রেষ্ঠ শত্রু কে?
সোজাসাপ্টা উত্তর হবে- সাংবাদিক। একটা কথা জার্নালিস্ট কমিউনিটিতে ব্যাপক প্রচলিত যে, কাকের মাংস কাক না খেলেও সাংবাদিকের মাংস সাংবাদিক খায়। তা ছাড়া কেউই বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবে না-তার প্রফেশনে কোন অসৎ ব্যাক্তি নেই বা অসততা নেই। সুতরাং জার্নালিস্ট এরিনাতে লাম্পট্য ও ভণ্ডদের পদচারণা আছে, এটা সূর্যের মতো স্পষ্ট। “সাগর-রুনির বিচার না হওয়ায় সাংবাদিক সমাজ ক্রমান্বয়ে মেরুদণ্ডহীন প্রজাতিতে পরিণত হচ্ছে”-একজন সাংবাদিক হিসেবে, এই মতামত দায়িত্ব নিয়েই করছি। সাংবাদিকতায়- কেউ বড় হয় খেটে, কেউ বড় হয় চেটে, দুই টাইপেরই লোক পাবেন। আমি প্রথম শ্রেণীতে থাকার নিরন্তর লড়াই করে যাচ্ছি।
২.
টিভি সাংবাদিকতায় তখন আমি সদ্যপ্রসূত, ভার্জিন। বুকের ভেতরে আকুলি বিকুলি নানান স্বপ্ন। ভালো কিছু দিয়ে কালোকে সরাবার স্বপ্ন। স্বপ্ন না বলে এটাকে উত্তেজনাও বলা যায়। বৈশাখী টিভিতে যুক্ত হবার পর প্রথমেই আমাকে দেয়া হলো ক্রাইম বিট। সিএমএম ও জজ কোর্ট এই বিটেরই একটা পার্ট। সেই সুবাদে ঢাকা চিফ মেট্রোপলিটন কোর্টে আমার যাতায়াত। এক দিনের ঘটনা। কোন এক মামলায় হাজিরা দিতে বাংলাদেশের শীর্ষ একটি দলের এক নেতা কোর্টে এলেন। বেশ হামবড়া হাব নিয়ে তিনি এজলাসে ঢুকলেন। তার শীষ অনুসারীরা ব্যাপক শোডাউন করলো। হৈ হুল্লোড় আর হাম্বি তাম্বি দেখে আমার ক্যামেরাম্যান ভাবলো, হয়তো হোমরা-চোমরা গোছের বড় কোনো নেতা হবে। তাই আদালতে নেতার আগমনের পুরো দৃশ্য তিনি ভিড়-ভাট্টা ঠেলে অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে ধারণ করে। ভাবসাব এমন, যেনো এক্সক্লুসিভ কিছু। আমি মুখ টিপে টিপে হাসি ! নেতা এজলাসে প্রবেশ করলেন। ক্যামেরাম্যান রাজ্যজয়ের উচ্ছ্বাস নিয়ে বললেন, ভাই পাইছি, খুব ভালো ফুটেজ পাইছি। আমি কৌতুকপূর্ণ কণ্ঠে বললাম, বিশাল কর্ম করেছেন।
খানিক পরে জামিন নিয়ে বীরদর্পে বিচারকক্ষ থেকে বেরিয়ে এলেন নেতা। নেতার পিএস আমাকে আগে থেকেই লক্ষ্য করছিলেন। চোর চোর ভাব নিয়ে তিনি আমার কাছে এলেন। হাতে একগোছা টাকা। কানের কাছে মুখ লাগিয়ে ফিস ফিস করে বললেন, নেন ভাই, পাঁচ হাজার আছে, নেতা দিছে, ছবিটা টিভিতে দ্যাখাইয়া দিয়েন।
সাংবাদিকতার পেশায় এটিই আমার কাছে আসা প্রথম ঘুষের অফার। মুহূর্তে মাথায় আগুন ধরে গেল। আমি চিৎকার করে উঠলাম।
-ফাজলামো পাইছেন। টাকা দিয়ে সাংবাদিক কিনতে চান। প্রতিষ্ঠান আমাকে প্রতিমাসে ভালো বেতন দেয়। আলতু ফালুত লোক ! যত্তসব !
পিএস সাবেহ তো থ। লাজওয়াব।
আমার উচ্চকণ্ঠ নেতার কানেও পৌঁছাল। তিনি আড় চোখে তাকালেন। মৃদু স্বরে বললেন- এ্যাই আয় !
বাসায় এসে এ ঘটনা নিয়ে অনেকক্ষণ ভাবলাম। নিজেকে হিরো হিরো মনে হলো। ঘুষের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে পেরে বেশ ফুরফুরে লাগল।
৩.
এর অনেক দিন পর। ৬-৭ বছর হবে। এই সময়ের মধ্যে আমার সুনাম ও অবস্থান তৈরি হয়ে গেছে। হাইকোর্টে দাপটের সঙ্গে রিপোর্টিং করি। বিচারাঙ্গন নিয়ে বেশ কিছু বিশেষ প্রতিবেদন করার কারণে আমার নাম ছড়িয়ে গেছে বিচারপতিদের কাছেও। বিচারের দীর্ঘসূত্রতা, জামিন নিয়ে অনিয়ম, বেঞ্চ অফিসারদের দুর্নীতি, হাইকোর্টের দালাল চক্র, উচ্চআদালতে অসহায় গরীব বিচারপ্রার্থী, রাতের আদালত চত্বরে অপরাধের রামরাজত্ব,অ্যাটর্নি অফিসের সিন্ডিকেট- এ ধরনের সিরিজ রিপোর্টগুলো আইনজীবীদের মধ্যে ব্যাপক পরিচিতি এনে দেয়। কোর্টের পিয়ন থেকে শুরু করে প্রধান বিচারপতি; সবাই এক নামে আমাকে চেনে। ড. কামাল হোসেন, ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম, ব্যারিস্টার রোকনউদ্দিন মাহমুদ, এএফ হাসান আরিফসহ অনেক সিনিয়র আইনজীবীর সঙ্গে তখন আমার হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক। ব্যারিস্টার রফিক-উল হক আমাকে ছাড়া ব্রিফিং করেন না, কোনো কোনো বিচারপতি দুপুরের খাবার নিয়ে অপেক্ষা করেন- এ রকম ব্যাপার স্যাপার আর কি !
প্রায় প্রতিদিনই সকাল দশটা টু বিকাল চারটা। এজলাসের ঝাঁপি বন্ধ না হওয়া পযন্ত হাইকোর্ট-ই যেনো বাড়িঘর। এক বিষন্ন বিকেল। আকাশে ঘনমেঘ। সন্ধ্যার আভা কেবল বাহু বাড়াচ্ছে। আমি কোর্ট চত্বর থেকে অফিসমুখী হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছি। এমন সময় আমার বয়সী একজন এসে বললো, আপনি মানিক ভাই না? আমি মাথা নাড়লাম।
- ভাই, আপনার সাথে জরুরি কিছু আলাপ ছিল, অনেকক্ষণ ধরে অপেক্ষা করছি।
- কী আলাপ? বলুন...
- না একটু আলাদা বলতে হবে।
- তাহলে কাল বলব, সকালে চলে আসেন।
- ভাই, আজকেই বলতে চাই, পাঁচ মিনিট সময় চাই।
লোকটার জোরজুরিতে রাজি হলাম। হাঁটতে হাঁটতে এনেক্স ভবনে সামনে গেলাম। কথা শুরু করলো আগন্তুক।
- ভাই, আমি একটা কাজ নিয়ে আসছি। চট্টগ্রাম পোর্টে একশ কোটি টাকার একটা চালান আটকে আছে।
- তো কি হয়েছে?
- না, মানে একটা রিটের কারণে মালগুলো আটকে গেছে। শোকজ রুল দিয়েছে ... এর আদালত। মুশকিল এখানেই। রিট পিটিশনটা যদি খারিজ হয়ে যায়, তাহলে মালগুলো খালাস করা যাবে।
- তো আমি করবো?
- না মানে, ... ডিভিশন বেঞ্চের সিনিয়র বিচারপতির সঙ্গে তো আপনার খুব ভালো সম্পর্ক, আপনি যদি বলে দেন...
- বলে দেন মানে?
- আপনি একটু রিকুয়েস্ট করলেই হয়ে যায়। ও নিয়ে আপনি চিন্তা করবেন না আপনি। আমরা পুশিয়ে দেবো। ক্লায়েন্টের সঙ্গে আমার আলাপ হয়েছে। অ্যাটর্নি জেনারেলের অফিস আমরা ম্যানেজ করবো। আপনি শুধু জাস্টিস এর বিষয়টা দেখবেন। দুই জাজের জন্য আলাদা বাজেট। যা চায় তারা। আপনার জন্য ৫, মানে ৫ কোটি।
লোকটা এক নিশ্বাসে বলে ফেলে সব। বিস্ময়ে হা হয়ে গেলাম। আবার বলা শুরু করলো।
- যেদিন খারিজ করে দেবে মামলা, ওই দিনই অ্যাকাউন্টে চলে যাবে। এখানে উল্টাপাল্টা কিছু হবে না। প্রয়োজনে আগে চেক দিয়ে দেবো।
রাগ এবং ক্ষোভে শরীরের প্রত্যেকটা লোম তখন দাড়িয়ে গেছে। দাতে দাত কামড়ে ধরে কোর্ট চত্বরে এই প্রথম কাউকে গালি দিলাম।
- শুয়োরের বাচ্চা, শিক্ষিত দালাল, পাছায় লাত্থি মাইরা পুলিশে ধরাই দিমু। আমারে চিনস্...কারে কী কস্...
আমার কথার তেজ দেখে আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা করলো না। সাই সাই করে পেথ হাটা ধরল সে।
আদালত থেকে প্রস্থানরত একটা প্রিজন ভ্যানের কারণে আড়াল হয়ে গেলো লোকটা। চোখ পড়ল ভ্যানের নীল শরীরে। ওখানে তখন একটা স্পষ্ট লেখা আরো স্পষ্ট হয়ে ধরা দিলো যেনো- রাখিব নিরাপদ, দেখাবো আলোর পথ।
লেখক: প্রতিষ্ঠাতা, চেঞ্জটিভি.প্রেস
