বিগত শতাব্দীর ১৯৯১ সাল থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত প্রধান নির্বাচন কমিশনারের দায়িত্ব পালন করার সময় থেকে এ দেশে সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য বিভিন্ন প্রকার ব্যতিক্রমধর্মী উদ্যোগ নিতে হয়েছিল। বিশেষ দৃষ্টি রাখা হয়েছিল- কী করে তৃণমূল পর্যায়ে নির্বাচন পরিচালনা প্রক্রিয়ায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সাধারণ ভোটারদের সম্পৃক্ত করা যায়। ওই সময়ের জাতীয় নির্বাচন-উত্তর সময়ে ও বিভিন্ন প্রকার স্থানীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের অভিজ্ঞতা নিয়ে গবেষণামূলক কাজকর্ম শুরু করেছিলাম। ছোট করে একটি নির্বাচন গবেষণাগার ব্যক্তিগত উদ্যোগে স্থাপন করতে পেরেছিলাম। আমার চিন্তাধারার প্রায়োগিক দিকটি বিবেচনা করে ময়মনসিংহ জেলার সদর থানার দাপুনিয়া ইউনিয়ন পরিষদ নির্র্বাচন পুলিশ ম্যাজিস্ট্রেটের সহায়তা ব্যতীত ভোটারদের মাধ্যমে সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হয়েছিল। আমি এই ইউনিয়নের বাসিন্দা। সেহেতু আমার সচিবালয়ের অনেকের মতো আমাকে ভয় করেই এই নির্বাচনটি সুষ্ঠুভাবে শেষ করেছিল। সেই ব্যপারটি সঠিক নয় প্রমাণের জন্য ঢাকা শহরসংলগ্ন টঙ্গী পৌরসভা নির্বাচনও একই প্রক্রিয়ায় সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছিল।

স্থানীয় ভোটারদের দ্বারা নির্বাচন পরিচালনা
দাপুনিয়া ইউনিয়ন পরিষদ মডেল নির্বাচন : দাপুনিয়া ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে তিনটি ওয়ার্ডের ২৭টি গ্রামের ৫৪টি পাড়ার শিক্ষিত যুবক-যুবতীদের সাথে নিয়ে প্রণীত ভোটার তালিকার হালনাগাদকরণ কাজটি করে প্রত্যেককেই ছবিসহ একটি আইডি কার্র্ড করে দেয়া হয়েছিল। ২৭টি গ্রামে ২৭টি ভোটার ক্লাব তৈরি করা হয়। প্রত্যেকটি গ্রামে স্কুল, মক্তব বা কারো বৈঠকখানায় একটি করে মোট ৫৪টি ভোটকেন্দ্র করে দেয়া হয়। আগের নির্বাচনে প্রতিটি ওয়ার্ডের জন্য দু’টি করে ভোটকেন্দ্র স্থাপন করা হতো। নির্বাচন কমিশনের প্রশাসনিক কর্মকর্তারা প্রথমে এত ভোটকেন্দ্র করার বিরুদ্ধে দ্বিমত পোষণ করেন। কারণস্বরূপ তাদের পক্ষ থেকে বলা হয় যে, তাতে করে ব্যয় বেড়ে যাবে। সে অনুপাতে আর্থিক জোগান দেয়া সম্ভব হবে না। আমার পরিকল্পনা অনুযায়ী তাদেরকে একটি ব্যাপারে বুঝাতে পেরেছিলাম যে, নির্বাচনী ব্যয় না বাড়িয়ে স্থানীয় ভোটারদের সহায়তা নিয়েই ওই নির্বাচন করা সম্ভব বলে আমি মনে করি।

প্রথমত, ভোটার ক্লাবের সদস্যদেরকে তাদের নাগরিক দায়িত্ব পালনে উদ্বুদ্ধ করা হয়। কর্মপ্রক্রিয়া নিয়ে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা থাকে। আমি স্বয়ং উপস্থিত থেকে তাদের প্রশিক্ষণ কর্মশালাগুলো পরিচালনা করি। সংশ্লিষ্ট তরুণ-তরুণীদের মাঝে এক অবিশ্বাস্য সামাজিক দায়িত্বের মনোভাব গড়ে ওঠে। তারা কর্মপন্থা অনুযায়ী গ্রামের প্রতিটি ভোটারকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে তাদের কর্মকাণ্ডে সহায়তা দানে প্রভাবিত করে ফেলে। প্রতিটি ভোটারের সাথে যখন কথা বলেছি তখনই ভোট প্রক্রিয়ায় তাদের দায়িত্ব ও করণীয় সম্পর্কে একটি সুস্পষ্ট ধারণা গড়ে ওঠার লক্ষণ লক্ষ করেছি। কর্মী মেয়েরা গ্রামের অত্যন্ত রক্ষণশীল মহিলাদেরও ছবি গ্রহণ, উচ্চতা নিরূপণ, স্বামীর নাম বলানো, তাদের জন্মতারিখ নির্দিষ্টকরণসহ ইত্যাদি কাজে সক্রিয় করে তোলে। তাতে করে সামাজিক সব বাধা দূরীভূত হয়ে যায়। ভোটাররাও মনে করতে শেখে যে, ভোটার হওয়া এবং নিশ্চিন্তে ভোট দিতে পারা, এটা তাদের জন্য অত্যন্ত গূরুত্বপূর্ণ একটি অধিকার। এই অধিকারকে সংরক্ষণ করা তাদের নিজেরই দায়িত্ব।
গ্রামের বয়স্ক এবং উচ্চশিক্ষিত ভোটারদেরকে ভোটার ক্লাবের উপদেষ্টা ও মুরব্বি হিসেবে দায়িত্ব দেয়া হয়। এই নবীন-প্রবীণ মিলে একটি সুন্দর ও সুশৃঙ্খল নির্বাচনী পরিবেশ গড়ে তোলা হয়।

ভোটারদের জন্মতারিখ নির্ধারণে সারা বছরকে চার মাস করে তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়। যথা : গ্রীষ্ম, বর্ষা ও শীত। প্রথমে তার বয়স কত প্রশ্ন করা হতো। সে যত বছর বলত তা যদি তার চেহারার সাথে মানানসই হতো তাহলে তাই গ্রহণ করা হতো। তা না হলে তার চেহারা ও শারীরিক গড়নের সাথে মিল রেখে একটা বয়স স্থির করা হতো। পরবর্তী প্রশ্ন থাকত- সে তার মাতা-পিতা বা অন্যান্য আত্মীয়ের কাছ থেকে জানতে পেরেছিল কি না, সে গরমকালে, বর্ষাকালে বা শীতকালে জন্মগ্রহণ করেছিল। উত্তর অনুযায়ী তার জন্মতারিখ বয়সের সাথে সমন্বয় করে ওই চার মাসের কোনো এক তারিখে নির্দিষ্ট করে দেয়া হতো। সেই তারিখই বাকি জীবনের জন্য তার অফিসিয়াল জন্মতারিখ হিসেবে নির্দিষ্ট করা হতো। তা ছাড়া ১৯ অঙ্কের একটি ভোটার আইডি নাম্বার তৈরি করা হয়, যাতে করে ওই নম্বর থেকেই বুঝা যেত কে কোন জেলা, করপোরেশন, ওয়ার্ড, মহল্লার পুরুষ/মহিলা কত নম্বর ভোটার। তা ছাড়া তখনকার প্রেক্ষাপটে প্রতিটি সিটি করপোরেশনের জন্য পৃথক পৃথক রঙের আইডি কার্র্ড তৈরির প্রস্তাবনা মূল পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল, যাতে করে রঙ দেখে প্রথম নজরেই কে কোন করপোরেশনের ভোটার তা চেনা যায়। সর্বোপরি সব স্তরের সাধারণ মেধাসম্পন্ন ব্যক্তিও ওই আইডি কার্ডধারীর পরিচিতি অতি সহজেই বুঝে ফেলতে পারে। অর্থাৎ স্বল্পতম সময়ে অতি সহজেই জাতি কাক্সিক্ষত সামাজিক শৃঙ্খলাবোধ ও দায়বদ্ধতা সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠতে পারে। তেমনিভাবে বুঝা যেত কোন জেলার, উপজেলার বা পৌরসভা/ইউনিয়নের, কোন ওয়ার্ড ও কোন মহল্লার/গ্রামের পুরুষ/মহিলা কত নম্বর ভোটার।

ভোটকেন্দ্র স্থাপনে বাংলাদেশের ভূ-তাত্ত্বিক, সামাজিক ও আঞ্চলিক বিবাদ-বিরোধগুলো এড়িয়ে চলার নীতি গ্রহণ করা হয়। কোনো গ্রামের ভেতর দিয়ে একটি খাল বা রাস্তা চলে গেলে রাস্তা বা খালের এপার-ওপারের লোকের সাথে সামাজিক ব্যাপারে বিবাদ-বিরোধ থাকা বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে মোটেই অস্বাভাবিক কিছু নয়। তাই ওই সব বিবাদ-বিরোধীয় মনোভাবকে নির্বাচন কমিশনে না এনে স্থানীয়ভাবেই সমাধান করে দেয়া হয়।
যেমন- খালের দু’পারে, গ্রামের পশ্চিম পাড়া, পূর্ব-পাড়া, দক্ষিণ-পাড়া ইত্যাদি প্রতি পাড়াতেই একটি করে ভোটকেন্দ্র স্থাপন করে দেয়া হয়। একই সঙ্গে ঐ অঞ্চলের ভোটার ক্লাবের সদস্যদেরকে বলে দেয়া হয় যে, তারা স্থানীয় ভোটারদের সহযোগিতা নিয়ে কেন্দ্রের প্রয়োজনীয় টেবিল, চেয়ার ও অন্যান্য সামগ্রী স্থানীয়ভাবেই সংগ্রহ করে ভোট কেন্দ্রটিকে প্রয়োজনমাফিক সজ্জিত করবে। আবার ভোট গ্রহণ শেষে যার-যার সামগ্রী ফেরত নিয়ে যাবে।
পূর্বের তৈরি জরিপে দেখা যায় যে, ভোটার তালিকায় ঐ ইউনিয়ন পরিষদে ৪৭ হাজার ভোটারের মধ্যে মাত্র ৪৪ হাজার ভোটারকে সরেজমিনে পাওয়া গিয়েছিল। অর্থাৎ তিন হাজার ভোটার ছিল ভুয়া। যদিও আমার নির্বাচন কমিশনে থাকাকালীন ১৯৯২ সালে নতুন ভোটার তালিকা প্রণীত হয়েছিল, তা পরবর্তীতে দু’বছরের মধ্যেই ১৯৯৪ সালে মডেল নির্বাচনের পূর্ব মুহূর্তে সংশোধন করা হয়। এই পরিশুদ্ধ ভোটার তালিকা তৈরি করতে ও আইডিকার্র্ড প্রদানের কাজটি করতে গিয়ে আমার মনে হয়েছে যে, যেহেতু গ্রামের ছেলেমেয়েরা গ্রামের প্রত্যেককে চেনেন এবং তাদের সম্পর্কে জানেন সেহেতু তাদের মাধ্যমে ভোটার শনাক্তকরণের কাজটি অত্যন্ত সহজভাবে সাবলীল ধারায় সম্পন্ন হওয়াটাই স্বাভাবিক। ঠিক এভাবেই কাজটি করা হয়েছিল। তাই সর্বপ্রথম ভোটের জন্য আইডিকার্র্ড ঐ দাপুনিয়া ইউনিয়ন পরিষদের ভোটাররাই বাংলার ভাগ্যবান ভোটার হিসেবে প্রাপ্ত হয়।
ভোটার ক্লাবের সদস্যদের মাধ্যমে ধনী-গরিব নির্বিশেষে অক্ষরজ্ঞানহীন ভোটারদের দু’মাসের মধ্যে নিজ নাম সই করা শেখানো হয়। এ কাজটির জন্য আমার নিজ পকেট থেকেই প্রায় ১০০-এর মত শ্লেট ও পেনসিল কিনে দিয়েছিলাম। মূলতঃ প্রকল্পটি ছিল ‘মাটি ও কাঠি’। অর্থাৎ কাঠি দিয়ে মাটির উপর লেখা শেখানো। ক্লাবের প্রতিটি সদস্যকে ১০-১৫ জন লোককে নাম লেখা শেখানোর দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল। তাদের নির্দেশ দেয়া হয়েছিল যে, সম্ভব হলে বর্ণ শেখাবে নতুবা সরাসরি সংক্ষিপ্ত নাম লেখা শেখাবে।

তারা ভুলে গেলে যেন দেখে-দেখে ঐ নাম লিখতে পারে সেজন্য ঘরের কাঁচা ভিতের একটু অংশে যেভাবে সে নামটি লিখবে সেভাবে লিখে রাখা হতো। সে প্রতিদিন তার নাম লেখার অভ্যাস করেছে কি না সেটা ভোটার ক্লাবের সদস্যরাই নিশ্চিত করতেন। ভোটের সময় প্রত্যেক ভোটার ব্যালট পেপারের মুড়িতে স্বাক্ষর করে ব্যালট পেপার গ্রহণ করেছিলেন। তখন ভোটাররা তার ছবিসহ লেমিনেটেড আইডিকার্ড প্রিজাইডিং অফিসারের সামনে একটি বক্সের মধ্যে রেখে ভোট দেয়ার জন্য পোলিং বুথে ঢুকতেন। ভোট শেষে ভোটার ক্লাবের সদস্যরা বাড়ি-বাড়ি গিয়ে সেই আইডিকার্ড ফেরত দিয়ে আসতেন। এক একটি পাড়াতে নারী-পুরুষ মিলে গড়ে প্রায় ৮০০ ভোটার ছিল। কয়েকটি পাড়া মিলে একটি গ্রাম। ভোটকেন্দ্রের জন্য যে গ্রামে কোনো পাঠশালা পাওয়া যায়নি সে গ্রামের একটি বড় পরিবারের বাড়ির বৈঠকখানায় ভোটকেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছিল। ঐরূপ এক বাড়িতে প্রায় ৩০-৩৫ জন ভোটার ছিলেন। বাড়ির একেবারে পশ্চিমের হিস্যায় একজন সদস্যপদ প্রার্থী ছিলেন। কিন্তু সুষ্ঠুভাবে ভোট হওয়ার দরুন ঐ প্রার্থী নির্বাচিত হতে পারেননি। ঐ ওয়ার্ডের মোট ৭ জন প্রতিদ্বন্দ্বীর মধ্যে অন্যপাড়া থেকে একজন নির্বাচিত হয়েছিলেন। আমার মনে হয়েছে যে, ঐ বাড়ির সদস্যরাই তাদের ঐ বাড়ির প্রার্থীকে যোগ্য বলে মনে করেননি। ঐ ওয়ার্ডের প্রার্থীদের মধ্য থেকে নির্বাচন সম্পর্কে কোনো অভিযোগও উঠেনি।
ঐ ইউনিয়ন পরিষদে অতীতের নির্বাচনগুলোতে ৩টি ওয়ার্ডে দু’টি করে মোট ৬টি ভোটকেন্দ্র থাকত। তাতে যে নির্বাচনী ব্যয় হতো তার চেয়ে কম ব্যয়ে প্রতি ওয়ার্ডে ১৮টি করে মোট ৫৪টি নির্বাচনী কেন্দ্র পরিচালিত হয়েছিল। কারণ, প্রিজাইডিং অফিসার, পোলিং অফিসারদের কোনো সম্মানী ভাতা দেয়ার প্রয়োজন পড়েনি। তারা তাদের নাগরিক দায়িত্ব হিসেবেই বিনা সম্মানীতে তা পালন করেছেন। তা ছাড়া ভোটকেন্দ্রের চারপাশে বাঁশের বেড়া লাগানো বা কাপড়ের পর্দা দিয়ে পোলিং বুথ বানানোতে কোনো অর্থ ব্যয় হয়নি। স্থানীয়ভাবেই এগুলো ব্যবস্থা করা হয়েছিল। ভোটাররা নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় নিজেদের বিভিন্ন সামগ্রী যেমন : চেয়ার, টেবিল, বিছানার চাদর, পর্দা ইত্যাদি দিয়ে এই কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকতে পেরে গর্ব অনুভব করেছিলেন। অর্থাৎ ‘দশে মিলে করি কাজ হারি জিতি নাহি লাজ’।

ভোটগ্রহণের আগের দিন বিকেল বেলায় নির্বাচন কমিশনের জয়েন্ট সেক্রেটারি, যাকে মূলতঃ ঐ মডেল নির্বাচনের প্রজেক্ট ডিরেক্টর হিসেবে দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল- তিনি ব্যালট বক্স, ব্যালট পেপার ও কেন্দ্রের সামান্য খরচ বাবদ কিছু অর্থ বিতরণ করতে অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে কিছুটা সংশয়গ্রস্ত হয়ে পড়েন। যেহেতু ঐ মডেল নির্বাচনের আমিই উদ্যোক্তা, সেহেতু নির্বাচনের আগের দিন থেকেই আমি সেখানে অবস্থান করি। ইউনিয়ন পরিষদের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত দাপুনিয়া হাই স্কুলকে রিটার্নিং অফিসারের অস্থায়ী অফিস হিসেবে স্থির করা হয় এবং জেলা নির্বাচন অফিসারকে ঐ নির্বাচনের রিটার্নিং অফিসার করে দেয়া হয়। কোনো পুলিশ, তদানীন্তন বিডিআর বা আনসার বাহিনীর সদস্যদের বা কোনো ম্যাজিস্ট্রেটকে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব দেয়া হয়নি। কাজেই ঐ প্রজেক্ট ডিরেক্টর রাতের বেলায় ব্যালট বক্স, ব্যালট পেপার ও টাকা-পয়সা ভোটার ক্লাব কর্তৃক নিযুক্ত প্রিজাইডিং অফিসারের কাছে বুঝিয়ে দিতে সাহস পাচ্ছিলেন না। এতে করে ভোটার ক্লাবের সদস্যদের মধ্যে কিছুটা মনঃক্ষুণ্ন্নতা প্রকাশ পায়। আমি পূর্ব থেকেই প্রত্যেকটি ভোটকেন্দ্রের জন্য একজন করে জেলা নির্বাচন অফিসারকে শুধু প্রিজাইডিং ও পোলিং অফিসারদের প্রয়োজনে সহায়তা দানের জন্য নির্দিষ্ট করে রেখেছিলাম। স্ব-উদ্যোগে তাদের কোনো কিছু করা নিষেধ ছিল। ঐ রাতে ঐ সমস্ত নির্বাচনী মালামালসহ প্রিজাইডিং অফিসারের সঙ্গে ঐ জেলা নির্বাচন অফিসারদের যেতে বললে তারাও অনেকটা তাদের সঙ্গে যেতে অনীহা বোধ করেন। কারণস্বরূপ তারা উল্লেখ করেছিলেন যে, ঐ স্থানীয় প্রিজাইডিং অফিসাররা যদি ব্যালট পেপার নিয়ে কারচুপি করে তাহলে দোষটা তাদের কাঁধেই পড়বে। আমি কিন্তু ভোটার ক্লাবের সদস্যদের মনোভাব বুঝতে পেরে পূর্ব থেকেই তাদের উপর প্রদেয় দায়িত্ব পালনে তাদের সততা ও কর্মনিষ্ঠা সম্পর্কে শতকরা ১০০ভাগ নিশ্চিত ছিলাম।

তাই ঐ জেলা নির্বাচন অফিসারদের সকল প্রকার নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিয়ে তাদের সঙ্গে পাঠিয়ে দিয়েছিলাম। তবে অতীতের নির্বাচনে বিভিন্ন রকম কারচুপির কথা চিন্তা করে ঐ শীতের রাতে একটি ওভারকোট গায়ে দিয়ে কেবলমাত্র আমার এক বিশ্বস্ত সাথীকে সঙ্গে নিয়ে চুপি-চুপি নির্বাচনী কেন্দ্রগুলির অবস্থা সম্পর্কে খোঁজ নিতে বের হয়েছিলাম। পূর্বেই আমি একটি ঘোষণা দিয়েছিলাম যে, ভোটার ক্লাবের সদস্যরা ভোট কেন্দ্রগুলিকে নিজ উদ্যোগেই ভোটারদের সুবিধার্থে সাজাবেন। যে ভোটকেন্দ্রটিকে সবচেয়ে বেশি সুন্দরভাবে সাজানো হবে সে কেন্দ্রটিকে আমার নিজ পকেট থেকে বিশেষভাবে পুরস্কৃত করব। পুরস্কারের আশায় সকলেই খুব সুন্দরভাবে প্রত্যেকটি কেন্দ্রকে সারা রাত ধরে সাজিয়েছিলেন। আমি প্রায় সারা রাত ধরে ঘুরে মনে-মনে আশ্বস্ত হয়েছিলাম যে, এ দেশের মানুষ অন্তর্নিহিতভাবেই সুশৃঙ্খল পরিবেশ সৃষ্টির পক্ষে। প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে প্রিজাইডিং ও পোলিং অফিসারসহ ভোটার ক্লাবের সদস্যদের সারা রাতব্যাপী ভোটকেন্দ্র সাজানোর কাজে ব্যস্ত দেখতে পেয়েছিলাম। তারা অবশ্য আমার উপস্থিতি অনুধাবন করতে পারেননি। যদিও পূর্ব রাতে ঐ সমস্ত জেলা নির্বাচন কর্মকর্তারা অত্যন্ত সংশয়চিত্তে সংশ্লিষ্ট প্রিজাইডিং অফিসারের সঙ্গে তার নিজ বাড়িতে অবস্থান করেছিলেন; কিন্তু পরের দিন সকালে আমি যখন ঐ জেলা নির্বাচন কর্মকর্তাদেরকে তাদের গত রাতের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে বলি, তখন তারা বলেছিলেন যে, তারা জীবনেও এমন সুন্দরভাবে কোথাও রাত কাটাননি। তাদের বর্ণনা মতে, ঐ সব প্রিজাইডিং অফিসাররা যে ঘরে তাদের থাকার ব্যবস্থা করেছিলেন সে ঘরে একটি আলমারি দিয়ে তার ভেতর সমস্ত ব্যালট বাক্স, ব্যালট পেপার ও টাকা-পয়সাসহ অন্যান্য দ্রব্যাদি রেখে তালা লাগিয়ে চাবিটি ঐ জেলা নির্বাচন কর্মকর্তাদের দিয়ে নিজেরা ভোটকেন্দ্র সাজানোর কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। খুব ভোরে ফিরে এসে তাদেরকে নাস্তা করিয়ে ভোটকেন্দ্র তদারকি এবং ভোটগ্রহণ শুরু করার ব্যবস্থা করেছিলেন। দুপুর বেলায়ও তাদের খাবারের ব্যবস্থা করেছিলেন। ভোর ৭টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত ভোটগ্রহণের সময় দেয়া হয়েছিল। বাড়ির কাছে ভোটকেন্দ্র পেয়ে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকল ভোটার এক উৎসবমুখর পরিবেশে ঐ নির্ধারিত সময়ের পূর্বেই শতকরা ৯৯ জন ভোট দিয়ে দেন। বেলা ২টার মধ্যে ভোট গণনা শেষ করে কেন্দ্রের ফলাফল ঘোষণা করা হয়। বেলা ৩টার মধ্যে সকল কেন্দ্রের ভোট গণনার ফলাফল একত্র করে রিটার্নিং অফিসার চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণা করে দেন।

এই উৎসবমুখর মডেল নির্বাচন দেখার জন্য ময়মনসিংহ শহর ও আশপাশের ইউনিয়ন পরিষদ ও থানাগুলো থেকে হাজার-হাজার দর্শক এসে ভিড় করেন। এ সম্পর্কে একটি ভিডিও চিত্র তৈরি করা হয়েছিল। এ নির্বাচন দেখার জন্য আমার আমন্ত্রণে তদানীন্তন American Ambassador Mr. Mylum স্ব-স্ত্রীক ও আরো কয়েকটি বিদেশি দূতাবাসের সদস্যবৃন্দ, জাতিসঙ্ঘের স্থানীয় প্রতিনিধি, UNDP, Unicef-এর প্রতিনিধিরাও আসেন। তাদেরকে কোনোরূপ শর্ত আরোপ না করে সকল ভোটকেন্দ্র দেখতে দেয়া হয়। আমি কোনো ভোটকেন্দ্রে যাইনি। যাতে করে কেউ বলতে না পারে যে, আমার ভয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ স্বচ্ছতার সঙ্গে এ নির্বাচন পরিচালনা করছে। ঐ সমস্ত আমন্ত্রিত ব্যক্তিবর্গ নির্বাচন কেন্দ্রগুলি পরিদর্শন করে এসে আমার সঙ্গে চা-চক্রে মিলিত হন। আমার নির্দেশে পূর্ব থেকেই সকল পদের প্রার্থীরাই নিজ নিজ ভোটকেন্দ্রে ভোট দিয়েই আমার অতিথি হিসেবে রিটার্নিং অফিসারদের অফিসে এসে অপেক্ষা করেন। আমি সারাক্ষণ তাদেরকে চা-নাস্তা ও আলোচনার মাধ্যমে ব্যস্ত রেখেছিলাম। ঐ সকল বিদেশি অতিথিরা প্রতিটি ভোটকেন্দ্রের সুন্দর পরিবেশ এবং ভোটারদের মাঝে ভোট দেয়ার স্বতঃস্ফূর্ততা দেখে ও অনুধাবন করে অভিমত প্রকাশ করেছিলেন যে, সত্যিকার অর্থেই আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও ম্যাজিস্ট্রেট ছাড়াই ঐ নির্বাচন একটি আদর্শ নির্বাচনরূপে অনুষ্ঠিত হয়েছে। তারা ঐ নির্বাচন প্রক্রিয়াকে তৃতীয় বিশ্বের জন্য একটি মডেল নির্বাচন হিসেবে ব্যবহার করার উদ্যোগ গ্রহণের আশ্বাস দিয়েছিলেন।

মডেল নির্বাচন পরিকল্পনার শুরু থেকেই তদানীন্তন নির্বাচন কমিশন সচিব বিরূপ মনোভাব ব্যক্ত করতে থাকেন। তাঁর কথামতো নির্বাচন কমিশন ১৯৯১ সালে সংসদ-নির্বাচন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে যথেষ্ট খ্যাতি অর্জন করেছে। তা ছাড়া সাধারণ মানুষের কাছ থেকে যথেষ্ট আস্থাও অর্জন করেছেন। এ পর্যায়ে পরীক্ষামূলকভাবে কোনো নির্বাচন অনুষ্ঠানে যাওয়া নির্বাচন কমিশনের পক্ষে সমীচিন নয়। তা ছাড়া যেহেতু নির্বাচন বিষয়টি অত্যন্ত স্পর্শকাতর সেহেতু তৎকালীন আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ম্যাজিস্ট্রেট এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাহায্য ছাড়া কোনোভাবেই কোনো নির্বাচনের ব্যবস্থা করা ঠিক হবে না। পরিকল্পনাটি একটি আত্মঘাতী রূপ নেয়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। আমি সচিব মহোদয় ও সচিবালয়ের অন্যান্য অফিসারদেরকে এই মর্মে বুঝানোর চেষ্টা করেছি যে, অতীতে বিভিন্ন ব্যক্তি বা সরকারের প্রভাবাধীনে যেভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করা হয়েছিল তাতে করে নির্বাচন অনুষ্ঠানে নির্বাচন কমিশন তেমন কোনো কৃতিত্বের পরিচয় কুড়াতে পারেনি। ভবিষ্যতেও যে পারবে তার-ই বা নিশ্চয়তা কোথায়? তাই বলে কি আমরা শুধু হাত-পা গুটিয়েই বসে থাকব, নাকি কোনো একটা উপায় উদ্ভাবনের চেষ্টা করব? লেংটির হারাবার ভয় কি? পরিকল্পনামাফিক আমাদের চেষ্টা করে দেখতে দোষ কি? শেষ পর্যন্ত যদি বুঝি যে, ভোটারদের দিয়ে ভোট অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করা কোনোমতেই সম্ভব হচ্ছে না তাহলে আমাদের শেষ অস্ত্র হিসেবে ভোট বন্ধ করে দেয়ার ব্যবস্থা তো আমাদের হাতেই থাকবে।

ঐ পরিকল্পনামাফিক কাজ শুরু করার পর আমাকে একবার কমনওয়েলথ সচিবালয় কর্তৃক আয়োজিত কমনওয়েলথ দেশগুলোর নির্বাচন প্রধানদের এক কর্মশালায় যোগ দেয়ার জন্য দিন দশেক লন্ডনে থাকতে হয়েছিল।
ঐ সময় সচিব মহোদয়কে নির্দেশ দিয়েছিলাম তিনি যেন একবার দাপুনিয়া ইউনিয়নে গিয়ে ভোটার ক্লাবের সদস্যদের কার্যকলাপ সম্পর্কে খোঁজ-খবর নেন এবং আমাকে জানান। আমি লন্ডন থেকে ফিরে এসে যা বুঝতে পেরেছিলাম তা হচ্ছে, সচিব মহোদয় আমার নির্দেশ মোতাবেক দাপুনিয়া ইউনিয়নে গিয়েছিলেন কিন্তু তার কথাবার্তায় সংশ্লিষ্ট ভোটার ক্লাবের সদস্যবৃন্দ অনেকটা নিরুৎসাহিত হয়ে পড়েছিলেন। আমাকে আবার নতুন করে তাদের মধ্যে আত্মবিশ্বাসের ধারা তৈরি করতে হয়েছিল। অবশ্য সচিব মহোদয়ের এই কাজটি আমি কোনোরূপ বিরূপ দৃষ্টিকোণ থেকে দেখিনি। সচিব হিসেবে এই পরিকল্পনার মন্দ দিকগুলি তিনি তুলে ধরে তার সঠিক দায়িত্বটুকু পালন করেছেন বলে আমি ধরে নিয়েছিলাম। তা ছাড়া সিনিয়র আমলা হিসেবে তাঁর সততা এবং কর্মনিষ্ঠার প্রতি আমার প্রগাঢ় বিশ্বাস ও আস্থা ছিল। সচিব মহোদয়ের পক্ষ থেকে যে সমস্ত কথা উঠেছিল সেগুলো আমাকে আরো আত্মপ্রত্যয়ী করে তুলেছিল। কারণ, সে সমস্ত বিষয়গুলিকে আরো নিগূঢ়ভাবে বিবেচনায় এনে মডেল নির্বাচনটিকে সত্যিকার অর্থে মডেল হিসেবে অনুষ্ঠানের জন্য আমাকে আরো বেশি যত্নবান করে তুলেছিল।

ভোটের দিন বেলা ২টার মধ্যেই সমস্ত কেন্দ্র থেকে ভোট গণনার কাগজপত্র রিটানিং অফিসারের কাছে পৌঁছে যায়। সঙ্গে-সঙ্গে বেলা ৩টার মধ্যে ভোটের ফলাফল ঘোষণা করে দেয়া হয়। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হয়েছিল এই যে, ঐ ফলাফলে বিজয়ী এবং পরাজয়ী প্রার্থীবৃন্দ আমার উপস্থিতিতেই একে অপরের সঙ্গে কোলাকুলি করে অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে ফলাফল গ্রহণ করেছিলেন। আমি কোনো প্রার্থীর মধ্যেই ক্ষোভের চিহ্ন দেখতে পাইনি। ভোটের দিন অথবা পরবর্তীতে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর তরফ থেকেও কোনো অভিযোগ উঠে নি। এই নির্বাচনে আরো একটি উল্লেখযোগ্য দিক ছিল যে, কোন প্রার্থীরই নির্বাচন খরচ ১০০০ টাকার উপরে উঠেনি। এক প্রার্থীর পোষ্টার অপর প্রার্থীর তরফ থেকে নষ্ট করা হয়নি। প্রত্যেক ওয়ার্ডে একটি করে প্রজেক্শন মিটিং করে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীদেরকে পরিচয় করিয়ে দেয়া হয়েছিল। নির্বাচনের বিধান মোতাবেক কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী অপর কোনো প্রার্থীর নামে কোনো মিথ্যা প্রচারণা বা কুৎসা রটনাও করেননি। ভোটাররা প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদেরকে সবদিক থেকে চুলচেরা বিচার করে নিজেদের পছন্দমতো ভোট দিতে পেরেছিলেন। তাদের প্রদেয় ভোট গণনা শেষ হওয়া অবধি সকল ভোটার সেখানেই আনন্দ-উৎসবে মেতেছিলেন।
ভোটের ফলাফল ঘোষণার পর নির্বাচন কমিশনের সচিব ও অন্যান্য কর্মকর্তাবৃন্দ স্বতঃস্ফূর্তভাবে স্বীকার করেছিলেন যে, নির্বাচনটি সবদিক দিয়েই সুষ্ঠু এবং সুন্দর হয়েছিল।
লেখক : সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার