বিপ্লব মানে পরিবর্তন, বিপ্লব মানে ইনকিলাব। একটি প্রতিষ্ঠিত সভ্যতা, সংস্কৃতি বা শক্তির আদর্শিক পরিবর্তনকেই বিপ্লব বলে। বিপ্লব সাধারণত রাজশক্তি, সভ্যতা বা আদর্শিক কারণে হয়ে থাকে। তবে কোনো প্রতিষ্ঠিত স্বৈরাচার বা স্বেচ্ছাচার যদি জনগণের ওপর ক্ষমতার মসনদে চেপে বসে- তাকে উৎখাতে যে সংগ্রাম বা আন্দোলন চলে তা সফল হলে তাকেও বিপ্লব নামে চিহ্নিত করা হয়। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে যে রক্তক্ষয়ী আন্দোলন ও তার সফলতা তাকেও বিশ্ব মিডিয়া বিপ্লব বলে আখ্যা দিয়েছে।
ক্ষমতার পালাবদল সাধারণত দুই নিয়মে হয়। একটি নিয়মতান্ত্রিক অন্যটি অনিয়মতান্ত্রিক। বাংলাদেশের রাজক্ষমতায় প্রায় দেড় দশকের বেশি সময় জুড়ে স্বেচ্ছাচারী, কর্তৃত্ববাদী সরকার ক্ষমতায় বসেছিল। অবশ্য তারা নামকা ওয়াস্তে সংবিধান অনুসরণের নামে চার চারটি জাতীয় নির্বাচন করেছে। নির্বাচনের নামে প্রহসনে দেশের রাজকোষ থেকে ব্যাপক অর্থ ব্যয় করেছে। সবগুলো নির্বাচনই ছিল জনগণের সাথে তামাসার নির্বাচন।
প্রথম নির্বাচনে ভোট জালিয়াতি, কারচুপি, একের ভোট অন্যে দেয়া ইত্যাদির খেলা চলে। নির্বাচনে পুকুর চুরি থেকে সাগর চুরির মতো ডাকাতিও ঘটে। দ্বিতীয় নির্বাচন হয় অনেকটা প্রার্থীবিহীন। করোনাকালীন অটোপাসের মতো সে নির্বাচনেও ভোট না করেই এমপি পদ ছিনতাই করে অনেক সৌভাগ্যবান (!) রাজনীতিবিদ। তৃতীয় নির্বাচন ছিল আরো হাস্যকর। কৌশলে বিরোধীদলকে নির্বাচনে আনলেও নির্বাচনটি ছিল ভোটারবিহিন। এই নির্বাচনটি সম্পন্ন হয় মূলত ভোটের একদিন আগেই। সরকারের পুলিশ বাহিনী যথা সক্ষমতায় আগের রাতে সব কাজ সম্পন্ন করে স্বৈরাচারের বিজয় নিশ্চিত করে। ফলে জনগণকে আর নির্বাচন কেন্দ্রে যেতে হয়নি। তবে নির্বাচনে ভোটের একটা হাস্যকর হার দেখানো হয়। অবশ্য তাতে কোনো কোনো কেন্দ্রে মোট ভোটারের চেয়ে প্রাপ্ত ভোটের পরিমাণ বেশি হয়ে যায়। আর সর্বশেষ চতুর্থ নির্বাচনে যা হলো- তা আরো ভয়ঙ্কর। মিডিয়া যাকে গায়েবি ভোট বলে আখ্যা দিয়েছে।
এই হলো গত দেড় দশক বা প্রায় দেড় যুগের বাংলাদেশের হালচাল। এই সুদীর্ঘ সময়ে একই রাজনৈতিক মতাদর্শের একই দলের সরকার প্রতিষ্ঠিত ছিল বাংলাদেশের রাজ আসনে। তবে প্রথম নির্বাচনের পর থেকেই সরকারের ক্ষমতাসীন হওয়াকে দেশের বিরোধীদলসমূহ ভালোভাবে গ্রহণ করেনি। বরং নির্বাচনকেই প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন হিসেবে চিহ্নিত করে। সরকারের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক আন্দোলনে রাজপথে সরব থাকে বা সরব থাকবার চেষ্টা করে।
স্মর্তব্য বিষয় হলো- বাংলাদেশে দেড় দশকের বেশি সময় ধরে একটি মাত্র সরকার ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকে। আরো বেশি সময় থাকবার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখে। সরকারের প্রাথমিক ধারণা ছিল ভিশন ২০২১, পরে তা বেড়ে ভিশন ২০৪১, শেষতক আমৃত্যু ক্ষমতায় থাকবার অভিলাষে আশান্বিত ও প্রত্যয়ী হয়ে ওঠে। ক্ষমতাসীন দল নিজেদেরকে একমাত্র সর্বশেষ সরকার বিবেচনা করতে শুরু করে। এ কারণেই তদানীন্তন সরকার তার কাঠামোর সর্বত্র নিজের মতো করে সজ্জায়নে মনোযোগী হয়। রাষ্ট্রের সব সেক্টর, সব অর্গান, সব কি এবং সাব কি সর্বত্র নিজেদের লোক নিয়োগের সব ব্যবস্থা সুসম্পন্ন করে। প্রয়োজনে অনিয়ম, দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, অব্যবস্থাপনা যেখানে যার প্রয়োজন হয় তা করতে থাকে।
সমাজের মুরুব্বি ও বৃহৎসমাজ মনে করে কোনো সরকারই দেশের শেষ সরকার নয়। আমরাও তাই মনে করি। পৃথিবীতে যত শাসক ছিলেন সবাই তাদের শাসনকালকে প্রলম্বিত করতে নানা কৌশল অবলম্বন করেছে। কিন্তু শেষ রক্ষা কারুরই হয় না। পৃথিবীর ইতিহাস তাই বলে। দোর্দণ্ড প্রতাপশালী সব শাসকের বিরুদ্ধেই বিপ্লব হয়েছে। তাদের সাজানো প্রশাসনকে পরাভূত করেই সাধিত হয়েছে সাধারণ জনতার কাক্সিক্ষত বিপ্লব। এটিই বিপ্লবের মনস্তত্ত্ব যুগে যুগে। এর ব্যতিক্রম বড় বেশি নেই।
বিশ্বের ইতিহাস থেকে আমরা অসংখ্য উদাহরণ উপস্থাপন করতে পারব। তবে আমরা সে প্রলম্বিত আলোচনায় না গিয়ে বিশ্বের মহা ক্ষমতাধর দুজন প্রতাপশালী শাসকের গদি রক্ষার অভিপ্রায় ও তার ব্যর্থতা নিয়ে সামান্য দৃকপাত করে বিশ্বের মোড়লগোষ্ঠীর মনস্তত্ত্ব প্রমাণের চেষ্টা করব।
সে অনেকদিন আগের কথা। মিসর এলাকায় ছিল এক প্রতাপশালী বাদশা। নাম তার নমরুদ। যার তর্জনী হেলনে তার রাজ্যে বাঘে-মহিষে এক ঘাটে পানি খেত। এই নমরুদ একদা এক কৌতুহলি স্বপ্ন দেখে। স্বপ্নের অবয়ব ও বাচনিকতায় নমরুদ ভয় পেয়ে যায়। সে স্বপ্নের ব্যাখ্যা জানতে অস্থির হয়ে পড়ে। রাজ্যের খ্যাতনামা স্বপ্নবোদ্ধাদের ডেকে পাঠান। তার স্বপ্নের আদ্যোপান্ত খুলে বলেন। স্বপ্নবোদ্ধারা ভেবে-চিন্তে বাদশাকে জানান- শীঘ্র আপনার রাজ্যে এক শিশুর জন্ম হবে যে আপনার তখতকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিবে।
এতে বাদশা নমরুদ যারপরনাই ভীত হয়ে পড়েন। তার করণীয় কী হবে তার কূল-কিনারা ঠিক করতে পারে না। তার সভাসদ ও মন্ত্রী পরিষদ নিয়ে বসেন। পরামর্শ করেন। স্বৈরাচার তার বাদশাহীকে নিষ্কণ্টক করতে এক কঠিন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। তারা সিদ্ধান্ত নেন, দেশে সন্তান প্রসব বন্ধ করতে হবে। রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত মোতাবেক দেশে দাম্পত্য মিলনকে নিষিদ্ধ করে ফরমান জারি করা হয়। আর তা পর্যবেক্ষণের জন্য প্রয়োজনেরও অধিক গোয়েন্দা নিয়োগ করা হয়। গোয়েন্দাদের কাজ ছিল তারা রাজ্যের সব গৃহে বিশেষত যে সব গৃহে স্বামী-স্ত্রী একত্র বসবাস করে ওই সব গৃহে রাতব্যাপী কান লাগিয়ে গোয়েন্দারা তার ওপর নজরদারি অব্যাহত রাখবে।
এর ফলে তার রাজ্যে শিশু জন্ম মারাত্মকভাবে হ্রাস পায়। শুধু তাই নয় শিশু জন্মের হার নেমে আসে শুণ্যের কোঠায়। কিন্তু স্রষ্টার ইচ্ছা তো ভিন্নতর। এরই মধ্যে জন্ম নেয় শিশু ইবরাহিম। তার জন্ম রোধ করা নমরুদের জন্য সম্ভব হয়নি। কারণ তার পিতা ছিল মহামান্য আজর। যে ছিল নমরুদ মন্ত্রিসভার প্রভাবশালী সদস্য।
দিনে দিনে বড় হতে থাকে ইবরাহিম। পরিণত বয়ষে পৌঁছায়। নমরুদের অত্যাচারে বিক্ষুব্ধ হয় সে। ইবরাহিম মুখোমুখি হন নমরুদের। তাকে কল্যাণের প্রতি আহ্বান করেন। আল্লাহর অনুগত হওয়ার দাওয়াত দেন। কিন্তু কে শোনে কার কথা? ইবরাহিম আর নমরুদের মাঝে বাঁধে সংঘর্ষ। চলে অনেক বিতর্ক। আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব ও মূর্তিপূজার অসারতা প্রমাণে সক্ষম হন নবী ইবরাহিম আ:। নমরুদ রাগে, ক্ষোভে ফেটে পড়ে। তাকে হত্যা করতে উদ্যত হয়।
এ সবের শেষ পরিণতি কী হয়েছিল? আমরা সবাই তা জানি। নমরুদের কোনো কৌশলেই কাজ হয়নি। এটিই সত্য যে- তার শাসনদণ্ড ভেঙে পড়ে ইবরাহিমের হাতেই। দম্ভ এবং অহঙ্কার কারো ক্ষমতাকেই চিরস্থায়ী করতে পারে না।
আমরা দ্বিতীয় যে গল্পটির অবতারণা করতে চাই সেটি হলো-
সর্বকালে ও সর্বশ্রেষ্ঠ স্বৈরাচারী ও স্বেচ্ছাচারী রাজা মিসরের প্রতাপশালী শাসক ফেরাউন। ফেরাউন তো অনেক ছিল। আমরা সব ফেরাউন উদ্দেশ্য করছি না। বরং আমরা উদ্দেশ্য করছি সেই ফেরাউনকে যে মুসা আ:-এর সমসাময়িককালে মিসরের রাজ আসনে সমাসীন ছিল।
এই ফেরাউনের রাজক্ষমতা ছিল অত্যন্ত ভয়ঙ্কর টাইপের। কাউকে পরোয়া করার সময় তার ছিল না। তার রাজ অঞ্চলের প্রত্যেকেই তার নির্দেশ মানতে বাধ্য ছিল। কোনো প্রতিবাদ কিংবা নির্দেশের ব্যত্যয় ঘটানোর কোনো সুযোগ কারুরই ছিল না। তার ক্ষমতার হাত এতটাই প্রলম্বিত ছিল যে, সে এক পর্যায়ে নিজেকে আল্লাহ বলে দাবী করতে শুরু করে। তার জুলুমবাজি শাসনে জনগণ অতিষ্ঠ থাকলেও তার বিরুদ্ধে টু শব্দটি করার সাহস কারো ছিল না।
ক্ষমতার মোহ তাকে পাগল বানিয়ে দেয়। তাকে অতিমাত্রায় দাম্ভিক ও অহঙ্কারী করে তোলে। তার অহঙ্কারের মাত্রা সীমা ছাড়িয়ে যায়। ধরাকে সরা জ্ঞান করতে শুরু করে। নিজেকে সে আজীবনের রাজা ভাবতে থাকে। তার রাজত্বের পর আর কোনো রাজত্ব এই দুনিয়ায় আসবে না মর্মে আপন বিবেচনাকে পোক্ত করে। তার সর্বৈব অহঙ্কার আল্লাহর কাছে অপছন্দনীয় হয়।
পরবর্তি ঘটনা খুবই হৃদয়বিদারক। একদা ফেরাউন স্বপ্নে দেখেন, বায়তুল মুকাদ্দাসের প্রান্ত হতে এক আগুনের গোলা মিসর অভিমুখে ধেয়ে আসছে যা মিসরের সব কিবতিদের ধ্বংস করে দিচ্ছে। তবে বানু ইসরাইলদের কোনো ক্ষতি করছে না। ফেরাউন স্বপ্নের কারণে চিন্তিত হয়ে পড়ে।
এমতাবস্থায় ফেরাউন স্বপ্নবিশারদদের ডেকে পাঠায়। স্বপ্নের আদ্যোপান্ত শুনে স্বপ্নের অনুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করে স্বপ্নবিদরা ফেরাউনকে জানায়- শীঘ্র তার রাজ্যে এক ছেলে জন্মগ্রহণ করবে। যে ফেরাউনের সাম্রাজ্যকে চ্যালেঞ্জ করবে। স্বপ্নের ব্যাখ্যা শুনে ফেরাউন চিন্তিত হয়ে পড়ে। দীর্ঘদিনের সাজানো সাম্রাজ্য এভাবে এক ছোকরার হাতে শেষ হয়ে যাবে তা হতে পারে না। সে এই রাজ্যের জন্য কী করেনি।
একটি রাজ্যকে হুমকিতে ফেলতে পারে এমন সব রন্ধ্র সে বন্ধ করেছে। সে তার রাজ্য হারানোর সব পথ ও পন্থা হতে রাজ্যকে নিষ্কণ্টক করতে যা করার তা করেছে। নতুন এ উটকো ঝামেলায় বিব্রত বোধ করে ফেরাউন। ফেরাউন তার সভাসদের সাথে পরামর্শ সভায় বসেন। পরামর্শ শেষে এক ভয়াবহ ফরমান জারি করেন। ঘোষণা করেন- তার রাজ্যে কোনো ছেলেসন্তান জন্ম হলে তাকে হত্যা করতে হবে। তবে কন্যাসন্তান জন্ম নিলে তাকে জীবিত রাখা যাবে।
ফেরাউনের এ ফরমানের মধ্যেই এগুতে থাকে রাষ্ট্র। ছেলেসন্তানের জীবন্ত প্রোথিতকরণ অব্যাহত থাকে। দেশে পুরুষের সংখ্যা কমে আসে। এরই মধ্যে জন্ম হয় শিশু মুসার। শিশু মুসার জন্ম খবর গোপন রাখার চেষ্টা করেন। ক্রমে বিষয়টি কঠিন হয়ে উঠতে থাকে। অবশেষে মুসার মা শিশু মুসাকে বাক্সে বন্দী করে পানিতে ভাসিয়ে দেন। ভাসমান বাক্স এক পর্যায়ে বাদশা ফেরাউনের দরবারের কাছাকাছি আসে।
বাক্স উদ্ধার করা হয়। বাক্স হতে এক শিশুকে উদ্ধার করা হয়। বড়ই চমৎকার আর বুদ্ধিদীপ্ত সে শিশু। শিশুটি ছেলে হওয়ায় তাকে হত্যার সিদ্ধান্ত নিতে গেলে ফেরাউনের স্ত্রী শিশুটির প্রতি দয়ার্দ্র হয়। শেষতক শিশুটিকে রাজদরবারে রেখে দেয়ার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। মুসার প্রকৃত মাকেই তার দুধমাতা হিসেবে নিয়োগ দিতে হয়। কারণ শিশু মুসা অন্য কারো স্তনে কোনোভাবেই মুখ লাগায় না।
রাজদরবারের রাজকীয় পরিবেশে মুসা বেড়ে উঠতে থাকে। পরিণত যুবক বয়সে উপনীত হয়। আল্লাহ মুসাকে ফেরাউনের দরবারে ইসলামের দাওয়াতসহ যেতে নির্দেশ দেন। মুসা ফেরাউনের কাছে ইসলামের দাওয়াত নিয়ে যান। ফেরাউন তা প্রত্যাখ্যান করে। মুসাকে চ্যালেঞ্জ করে। মুজিজা দাবি করে। মুসাকে মিথ্যাবাদি সাব্যস্ত করে। মুসাকে ঠেকাতে রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে। মুসাও আল্লাহর নির্দেশে ও তাঁর বিশেষ দয়ায় ফেরাউনের মোকাবেলা করতে থাকেন। মুজিজা প্রদর্শন করেন। ফেরাউনের সব যুক্তি খণ্ডন করেন।
ফেরাউন মুসার ওপর চড়াও হয়। তাকে হত্যা করতে উদ্যত হয়। মুসাকে ধাওয়া করে। মুসা আল্লাহর দেয়া অপার মুজিজা হাতের লাঠি দিয়ে নীল নদে আঘাত করেন। সুপ্রশস্ত রাস্তা বেরিয়ে যায়। মুসা আ: নিরাপদে পার হয়ে যান। ফেরাউনও প্রশস্ত রাস্তা দেখে শক্তিশালী উট নিয়ে মুসার জন্য বানানো রাস্তা ধরে এগুতে থাকে। নীলের মধ্যখানে সহসা রাস্তা বিলীন হয়ে যায়। ফেরাউন নীলের পানিতে ডুবে মরে।
এভাবেই দোর্দণ্ড প্রতাপশালী ফেরাউন মুসার সাথে যুক্তিতে পর্যুদস্ত হয়ে তাকে হত্যা করতে গিয়ে নিজেই নীলের পানিতে ডুবে প্রাণ হারায়।
আর জুলাই বিপ্লব ২০২৪-এর ঘটনার আনুপূর্বিক বিশ্লেষণে আমরা দেখি- এক স্বেচ্ছাচারী শাসকের দেড় দশকের বেশি সময় তার ক্ষমতায় অবস্থান। প্রায় দেড় যুগব্যাপী ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর ক্ষমতা পাকাপোক্ত করার অবিরাম প্রয়াস ও প্রচেষ্টা। একটি সরকার ক্ষমতায় টিকে থাকবার জন্য যত পথ ও পদ্ধতি আছে সবই তারা নিষ্কণ্টক করেছে। একইভাবে একটি সরকারের ক্ষমতা হারাবার যত রন্ধ্র ও ছিদ্র আছে তার সবই বন্ধ করতে তৎপর থেকেছে। কিন্তু ফলাফল হয়েছে শূন্য।
দেশের আইন, বিচার, শাসন ব্যবস্থাকে নিজের মতো করে সাজিয়েছে। রাষ্ট্রীয় সব প্রতিষ্ঠানকে আপন প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছে। ব্যাংক, বীমাসহ সব আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে বিশালাকার ঋণ ও জোর করে অর্থ উত্তোলন করে আর্থিক খাতকে দেউলিয়া করেছে। দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে ধ্বংসের অতলান্তে নিয়ে গেছে।
বিশেষত তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে সেনাবাহিনীর ক্যু হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। বিগত সরকার সেনাবাহিনীকেও সাজিয়েছে এমনভাবে যাতে তারা কোনোরূপ ক্যু করার চিন্তাও না করতে পারে। একইভাবে নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীকেও সাজিয়েছে নিজেদের মতো করে। ব্যবসায়ীদের এমনভাবে হাত করেছে যাতে তাদের দিক হতেও কোনো বিদ্রোহের সুর না ওঠে।
দেশের বিরোধীদল থাকে সরকারের জন্য সব থেকে বড় চ্যালেঞ্জ। এই বিরোধীদলকে এমনভাবে দমন করেছে যে তারা অন্দোলনের সব শক্তি হারিয়ে ফেলেছে। হত্যা, খুন, দমন, গুম, পীড়ন, অযাচিত ফাঁসির নির্দেশ দিয়ে বিরোধী মতকে নিস্তব্ধ করেছে। সব দেশের প্রতিবাদের সব থেকে বড় শক্তি ঐ দেশের ছাত্রসমাজ। সেই ছাত্রসমাজকেও চরমভাবে কোণঠাসা করেছে। গুলি ও অস্ত্রের মুখে তাদের শক্তিহীন করেছে। সরকারকে অপসারণের যত রকম শক্তি আছে এমন সব শক্তিকে স্তম্ভিত করেছিল বিগত সরকার। কিন্তু তাতেও তাদের শেষ রক্ষা হয়নি।
যেই সেনাবাহিনীকে তারা যে সাজিয়েছিল তারাও শেষাবধি তাকে কোনো সময় দেয়নি। যেই বিডিআর বাহিনীকে অবনমন করে বিজিবি তৈরি করেছিল সেই বিজিবি তার প্রেতাত্মাদের সীমান্তে আটক করে দেশের কাছে জমা দিয়েছে। যেই নৌবাহিনীকে নানাভাবে নিজেদের লোকজন পদায়ন করেছে সেই নৌবাহিনীর সদস্যরা স্বৈরাচারের দোসরদের গ্রেফতার করে তাদেরকে বিচারের মুখোমুখি করেছে। যেই বিমানবাহিনীকে নানান কৌশলে নিজের লোকদের পদায়ন করেছিল সেই বিমান বাহিনীর লোকেরাই স্বৈরাচারের রাঘব বোয়ালদের বিমানবন্দরে আটকে দিয়ে স্বৈরাচারকে চরমভাবে বেইজ্জতি করেছে। যেই পুলিশ বাহিনীকে অচিন্ত্যনীয় অন্যায় সুযোগ সুবিধা দিয়ে আঙুল ফুলে কলা গাছ বানিয়ে দিয়েছে সেই পুলিশ বাহিনীও তাকে রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছে।
প্রায় দেড় দশকের পুঞ্জিভুত নিরব প্রতিবাদ, অত্যাচার পীড়িত জনতার আর্তনাদ, অধিকার বঞ্চিতদের তীব্র রোষ, সব শ্রেণী-পেশার মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ছাত্র-জনতার ঐক্য সর্বশেষ জুলাই-আগস্ট-এর মাত্র ৩৬ দিনের আন্দোলনে অযুত জনতার স্লোগানে, অজস্র প্রাণের বিণিময়ে এক অভুতপূর্ব বিজয় অর্জন করে বীর বাঙালি জনতা।
আবারো প্রমাণ হয় কোনো সরকারই শেষ সরকার নয়। স্বৈরাচারের কোনো আয়োজনই তার পতন রোধ করতে পারে না।
ইতিহাসের অনিবার্য দু’টি পাঠ আমাদের যে শিক্ষা দিয়েছিল ২০২৪-এর প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা সেই পাঠকেই আরো শাণিত করে।
যুগে যুগে বিপ্লবের মনস্তত্ত্ব¡ এটিই যে, স্বৈরাচারের প্রতাপ যতই বেশি হোক আসন্ন বিপ্লবে সে মুখ থুবড়ে পড়বেই। অত্যাচারীর খড়গ যতই ধারালো হোক জনতার সম্মিলিত প্রচেষ্টার সামনে সে বেকারার হবেই। স্বেচ্ছাচারীর শক্তি যত বেশিই হোক ছাত্র-জনতার তীব্র প্রতিরোধে তার ক্ষমতা অসার হবেই।
স্বৈরাচারী যত বেপরোয়া হয় বিপ্লব তত ঘনীভূত হয়। স্বেচ্ছাচারী যত দুর্বিনীত হয় বিপ্লব তত সমাসন্ন হয়। ক্ষমতাসীন যত দাম্ভিক ও অহঙ্কারী হয় পতন তার তত নিকটবর্তি হয়। বেপরোয়াবাজি যত ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করে নিপীড়িত জনতা তত বেশি বিপ্লবোন্মুখ হয়।
এটিই বিশ্বের শাশ্বত নিয়ম।
এটিই মানবতার ইতিহাসের বিপ্লব মনস্তত্ব।
ইতিহাসের এই পাঠ হতে আমরা শিক্ষা নিতে পারলেই মানবিকতার উত্তরণ দ্রুততর হওয়া সম্ভব। বিপ্লব মনস্তত্বের সুমহান শিক্ষা হোক আমাদের অস্তিত্ব ও ব্যক্তিত্বের স্মারক।
লেখক : গবেষক, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক
