আল মুজাহিদী
কালের বন্দিশে

ও গোলাপ, জীবন্ত সম্ভার
কেন ঝরে পড়ো, এ মানব-ঝাড়
থেকে? - দিবস রজনী
প্রাণের স্পন্দন তোলো। শব্দ, ধ্বনি
পাখির কূজন কত কলস্বর
সুরধুনী বয়ে যায়। কাঁপে থরথর
স্মৃতির পল্লব শির শির করে কাঁপে
- আহা কী কম্পন!

মৃদু শিহরণ
জাগে।- যামিনীর দেহবৃন্ত ছিঁড়ে
ঘনীভূত হয় আরও রাতের আঁধার
কী বন্দিশে জেগে ওঠে হৃৎতন্ত্রী?

আবহ সঙ্গীত শুনি। শুভ বসন্ত বাতাসে সমারোহ
জাগে। সারি সারি ঝাউপাতা, দেবদার-বীথি
কালের কুসুম ফোটে গায় স্তব-গীতি
কোন্ মহাণে
জীবনের? - ও গোলাপ, বারবার
তুমি অংকুরিত হও, মেলো কুঁড়িদল
সমীরণে, মৃদু সমীরণে।

 


হাসান হাফিজ
রক্তরাঙা একাত্তর

একাত্তর, তোমার রক্তের ঢেউ
আতঙ্ক ও আনন্দের নাম
যুগপৎ ভীতি শিহরণ
অবিরল মুক্তির সংগ্রাম
লাখো শহীদের স্মৃতি
তরঙ্গিত দোল খায়
রক্তরাঙা ওই পতাকায়
একাত্তর, তুমি কী নিষ্ঠুর
একাত্তর, তুমি কী উজ্জ্বল
একাত্তর, তুমি তেজিয়ান
একাত্তর, তুমি এক দুর্বিনীত
স্পর্ধা আর অহংয়ের
মুগ্ধ নামান্তর
তুমি এক উদ্দীপিত
লড়াইয়ের জ্বলন্ত প্রতীক

 


দিলীপ কির্ত্তুনিয়া
জীবনটা

জীবনটা ছিল যুদ্ধের মতো
জীবনটা এখনও যুদ্ধের ময়দান ।
জীবনটা হেঁটে যাবে নদীর
সীমানা পর্যন্ত -- ঠিক ততোদূর যুদ্ধ ।

জীবনটা যে ভোরের জন্যে অপো করে
জীবনটা যে দিনের জন্যে স্বপ্ন দেখে
যুদ্ধ ভোর -- যুদ্ধ সময় ।
জলে রাঙা এই জীবন
এই জীবন নদীর জীবন !

বারেবারে পাড়ি দিতে হয় তাকে।
পাহাড়ি পথের আয়নায়
শ্রমের পাল্লায় জীবন
কঠিন রক্ত রণ আর ঘাম ।

 


আবু হেনা আবদুল আউয়াল
অতঃপর

ঝড় আসে বারবার-
উত্তরের ঝড় শেষে শুরু িেদণর ঝড়
অতঃপর
আসে প্রতিঝড় পূর্ব-পশ্চিম থেকে
সেই ঝড়ে সব কিছু লণ্ড ভণ্ড করে দ্যায়
ফ্যাসিস্টের প্রেতাত্মারা ঘোরে চারিপাশে
বড় মুসিবতে আছি জেনেও নিরাশা
লেশ মাত্র নেই মনে

ঐ শুনি জোশধ্বনি ‘ইত্তেহাদ জিন্দাবাদ’
‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’
‘জিন্দাবাদ জিন্দাবাদ’
রাতান্ধকারের শেষে
সুবহে সাদিক অনিবার্য জানি

 


কাজী জহিরুল ইসলাম
এখনো প্রস্তুত

সাংবাদিকে প্রশ্ন করে, প্রশ্ন করে ভিড়
কেন আমার অস্থিরতা, থাকি না গম্ভীর?
বলছি শোনো পথের মিছিল, শোনো জুলাই মাস,
যখন ওরা ক্রমাগত ফেলছে পথে লাশ,
তখন আমার রক্তে আগুন, সবকিছু অস্থির,
বাড়ি আমার পথের মিছিল, বাড়ি আমার ভিড়।

একের পর এক পড়ছে দেহ রক্তে মাটি লাল
কেমন করে শান্ত হবো মিছিল যে উত্তাল।
আবেগে নয় বিবেক দিয়ে বলছি শোনো এই,
দেশ বাঁচাতে প্রাণ দেব না এমন ভীতি নেই।

হাত গেছে এক অন্যটিও রেখেছি প্রস্তুত
তখন আমি আন্দোলনে, অস্থিরতার দূত।
কী নির্ভয়ে এসব কথা বলছে আতিকুল
আমরা কি সব ঠিক শুনেছি? শুনছি কিছু ভুল?

ল এমন আতিক গাজী, এখনো প্রস্তুত
এতোই সহজ তুলবে মাথা স্বৈরাচারের ভূত?

 

 

আবদুল হাই শিকদার
ভ্রমণবিদ্যা

আমরা ঘুরতে বেরিয়েছিলাম অতিথি পাখিদের সাথে।
প্রজাপতির মতো উড়েছিলাম দেশ থেকে দেশান্তরে।
কথা ছিল আমরা ঘুরতেই থাকবো,
এবং ঘুরতেই থাকবো,
যতণ না আমাদের জুতা ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়।

জুতা ছিঁড়ে যায়নি এমন কি ছিন্নভিন্নও হয়নি,
তার আগেই তুমি ওপারে ভাসালে ভেলা।

আর এখন আমি খেয়া নৌকার মাঝি,
প্রতিদিন সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত
বসে থাকি সেই স্রোতবাহী নদীর কিনারে,
যেখানে এসে থেমে গিয়েছিল আমাদের ভ্রমণ।

 


হোসাইন আলমগীর
আজ মধ্যদুপুরে ফুটেছে নাইট কুইন

হে বাংলাদেশ, চোখ মেলে দেখো
বকের পরের মতো ধবধবে শাদা নাইট কুইন.....
'রাতের পদ্ম' ফুটেছে তোমার বিমুক্ত আঙিনায়
এখানে এখন হেমন্তের গান..ডালে ডালে ছাতিমের ফুল
নবান্নের ধুম....
এসবে কারো আগ্রহ নেই!
কোটি কোটি মানুষের দৃষ্টি আটকে গেছে নিকুঞ্জে
নাইট কুইনের প্রতি।
বারোটি বসন্ত অতিক্রম করে আজ
মধ্য দুপুরে ফুটেছে নাইট কুইন।
মানুষের চোখেমুখে কি গভীর তৃপ্তির হাসি
ভরদুপুরে নিশিপদ্মের অকস্মাৎ
ফুটে ওঠা
মনে হলো,
মেঘের চাদর ছিন্ন করে সমগ্র উঠোন জুড়ে
উঠেছে ঈদের চাঁদ
উৎসুক জনতার দৃষ্টি নিবদ্ধ ছিলো সে চাঁদের ওপর।
আমি তাঁকে আসতে দেখেছি
তাঁর এ হাসির দীপ্তি ছড়িয়ে পড়তে দেখেছি বাতাসে
উন্মত্ত জনতা কাঁপছিল অব্যক্ত উল্লাসে
সীমাহীন প্রতীার পর আজ বাংলাদেশ হেসে উঠেছিল
অসম্ভব কান্ত মানুষের বুকে
নাইট কুইন..এক ঝলক শান্তির পরশ ছড়িয়ে ছিল
মানুষ দেখলো, কী সুন্দর এ বাংলাদেশ
পৃথিবী দেখলো, তুমিই বাংলাদেশ.........

 


মোশাররফ হোসেন খান
স্পর্শ করলেই

শব্দ স্পর্শ করলেই বোমা হয়ে যায়
রাইফেল হয়ে যায়
কার্তুজ হয়ে যায়
জেট বিমান হয়ে যায়
যুদ্ধ জাহাজ হয়ে যায়
শব্দ স্পর্শ করলেই পাখি হয়ে যায় পেণাস্ত্র
আর বাতাস ও বারুদের ভেতর থেকে লাফিয়ে উঠে
সটান দাঁড়িয়ে যায় অসংখ্য বিপ্লবের মহানায়ক
শব্দ স্পর্শ করলেই লিফলেট হয়ে যায়
শব্দ স্পর্শ করলেই চব্বিশের ছত্রিশে জুলাই হয়ে যায়
শব্দ স্পর্শ করলেই কবিতা হয়ে যায়
অনিবার্য বিপ্লবের মুখপত্র...!

 


জামসেদ ওয়াজেদ
ডিসেম্বর মানচিত্র

পৃথিবী এমন কেনো কেউ আছো বলবে সঠিক
মানুষেরা ভুলে যায় পিতা কিংবা পিতামহ নাম
অথচ তাদের প্রতি সহায়ক নমস্য প্রনাম
পলেস্তার অবরনে ষে যায় বালু পাললিক

নিরব চোখের ভাষা কেনোবলো এতটা কঠিন
আমি ও আমার প্রতি’ মানুষের দুর্বলতা খুব
কষ্টায়ত্ত্ব ইতিহাসে কারা জানি দিয়ে আছে ডুব
হেমন্ত কুয়াশা ভোরে হিমহিম তুষার জমিন

এখানে আলোক ঋণ পরিশোধে নেইতো উপায়
জননী মুখেরপানে স্বদেশের প্রিয় প্রতিচ্ছবি
ডিসেম্বর মানচিত্রে রক্তঋণ জুলাই সুরভী
লেখারবে কারোনাম তামা নয় সোনা ও রূপায়

বায়ান্ন ও একাত্তর,চব্বিশের হে শহীদগন
রাষ্ট্র আর জনতার দূরহোক দূরত্ব যোজন

 


শাহীন রেজা
আমার কোনো দুঃখ নেই

আমার কোনো দুঃখ নেই
জোছনা পেয়ালায় চুমুক দিতে দিতে
হেমলক হয়ে গেছে সমস্ত লিকার

বিষ পানে কবির মৃত্যু আছে
কবিতার নেই;
কেন আর খুঁজে পায় না দহন সক্রেটিস চোখ
নত্র জলসায় ফোটে না চন্দ্রকলি–

ভালোবাসার রাত ফুরায় সহজে
দুঃখের ণগুলো দীর্ঘ ক্রমশ;
ছায়ার ঠোঁটের নীচে ক্রমাগত দগ্ধ শ্রাবণ

আমার কোনো দুঃখ নেই–
মেঘগুলো আঁকা থাক ছায়া-ক্যানভাসে।

 


ফজলুল হক তুহিন
আমি বিজয় দেখেছি

ইতিহাসের অনেক পাতায় আমি বিজয়ের রণরক্ত সফলতার গল্প পড়েছি
মায়ের কোলে মাথা রেখে অতীতের বিজয় গাথায় রাত পার হয়ে গেছে জোছনা আর জোনাকির আলোয়
আমাদের মাটিতে বর্গী তাড়ানোর আখ্যান আমি শুনেছি
পদ্মা মেঘনা যমুনার তীরে রজব আলীর সিপাহী বিপ্লবের বারুদমাখা বৃত্তান্ত আমি এখনো টের পাই
তিতুমীর থেকে সুভাষ বসু, হাজী শরীয়ত থেকে জালিয়ানওয়ালাবাগ পর্যন্ত ইতিহাসের ধারায় আমি কখনো ডুবেছে কখনো ভেসেছি।
রফিক বরকত থেকে একাত্তরের মা জননীর গল্পগাথা আমার রক্তে সারাণ বয়ে চলে তিস্তার স্রোতের মতো।
আমি শুধু বিজয় দেখেছি জুলাইয়ের রাজপথে
পলাশের রাঙা রক্তাক্ত পথে বিজয় দেখেছি আমি জুলাই অভ্যুত্থানে
পৃথিবীর আদি থেকে যে লড়াই আমার শণিতের ধারায় বহমান
তারই গান গেয়ে ওঠে জুলাই বিপ্লবের আগুনঝরা প্রাণ।