পদার্থবিজ্ঞানী ড. আতিফ ইসলাম ল্যাবরেটরিতে বসে আপনমনে একটা জটিল বিষয় নিয়ে ভাবছিলেন। কেমন করে চৌম্বক শক্তিকে ব্যবহার করে একখণ্ড বরফকে স্থানান্তরিত করা যায়- সেই ভাবনায় তিনি বিভোর। যদি কাজটা করা যেত তাহলে আকাশে ভাসমান মেঘখণ্ডকে যখন তখন
নামিয়ে এনে বৃষ্টি ঝরানো যেত। পদার্থবিজ্ঞানের এই সমীকরণটা তার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। কিন্তু ধরা দিচ্ছে না।
সে সময় তার পুত্রধন বলা নেই কওয়া নেই ল্যাবরেটরিতে এসে প্রবেশ করল। হঠাৎ পুত্রকে দেখে যেন তার ভাবনায় ছেদ পড়ল। নাকের ডগা থেকে পুরো গ্লাসের চশমাটা উপরে তুলে জিজ্ঞেস করলেন, কী ব্যাপার তাসবির! কোনো সমস্যা? তাসবির বলল, বিরাট সমস্যা বাবা।
ড. আতিফ বললেন, কী সমস্যা? খুলে বলো তো শুনি। তাসবির বলল, আমার সময়যন্ত্রটার সেনসর হ্যাঙ্গ হয়ে আছে বাবা। কোনো কাজ করছে না। কী করি এখন বলো তো? মাথায় কিছু আসছে না।
বাবা মৃদু হেসে বললেন, এটা আর এমন কী সমস্যা। দাঁড়াও আমি দেখছি কী করা যায়। বলে তিনি বসা থেকে উঠে তাসবিরের কাঁধে হাত রেখে দাঁড়ালেন। তারপর ধীর পায়ে ল্যাবরেটরি থেকে বেরিয়ে বাসার দিকে হাঁটা শুরু করলেন। পথের দু-ধারে গন্ধরাজ গাছে ফুল ফুটেছে। বাতাসে গন্ধরাজ ফুলের সুবাস ভাসছে। দু’টি ফিঙ্গে পাখি কিচিরমিচির ডেকে ওদের মাথার ওপর দিয়ে উড়ে গেল।
ড. আতিফ ইসলামের একমাত্র ছেলে তাসবির। এসএসসিতে বিজ্ঞান বিভাগে পড়াশোনা করছে। ছেলেটার মন ভরা কৌতূহল। কোনো কিছু একবার দেখলেই হুবহু শিখে ফেলে। ইতোমধ্যে বাবার কাজ দেখে দেখে সে নিজেই একটা সময়যন্ত্র তৈরি করে ফেলেছে। ত্রিকোণাকার বাক্সের মতো
দেখতে যন্ত্রটা। যন্ত্রের ভেতর কেবল দু’জন লোক প্রবেশ করতে পারে। দু’জনেরই এতে বসার ব্যবস্থা রয়েছে। ত্রিকোণ বাক্সটির আশ্চর্য ক্ষমতা। এতে তিনটি বাটন রয়েছে। একেকটি বাটনের নিচে একেকটি নাম লেখা রয়েছে। প্রথম বাটনের নিচে লেখা রয়েছে- অতীতকাল। দ্বিতীয় বাটনের নিচে লেখা রয়েছে- বর্তমানকাল এবং তৃতীয় বাটনটির নিচে লেখা রয়েছে- ভবিষ্যৎকাল। তার মানে এই সময়যন্ত্রে আরোহন করে অনায়াসে ত্রিকাল পরিভ্রমণ করা যায়।
ড. আতিফ ইসলাম সময়যন্ত্রের সেনসরে হাত রাখলেন। সেনসরের নবটা ধরে এদিক ওদিক ঘুরালেন। তারপর কম্পিউটার স্ক্রিনে কিছু একটা পাসওয়ার্ড ইনপুট করলেন। সাথে সাথে সেনসর সচল হয়ে গেল। তাসবিরের মুখে হাসির ঝিলিক দেখা গেল।
বাবা জিজ্ঞেস করলেন, আজ তোমার মিশন কোথায়? তাসবির বলল, আজ আমি শৈশবে গমন করব বাবা। শৈশব মানে তো অতীতকাল। তার মানে তাসবির আজ অতীতকালে ভ্রমণ করতে চাইছে। শোনে বাবা বললেন, ভালো কথা। তোমার মায়ের সাথে দেখা হলে আমার প্রীতি জানিও। তাসবির বলল, জি আচ্ছা বাবা।
তারপর সে সময়যন্ত্রে চড়ে স্টার্ট দিলো। হয়তো অতীতকালের নবটাও ঘুরিয়েছিল। মুহূর্তেই যন্ত্রটা নিরুদ্দেশ হয়ে গেল। হয়তো ওটা অতীতকালেই গমন করে থাকবে। ভ্রমণ শেষে যখন সে ফিরে এলো- তখন বিকেল হয়ে গেছে। সময়যন্ত্রের অবতরণ দেখে তাসবিরের বাবা খুব খুশি হলেন। ছেলেকে কাছে ডেকে বুকে জড়িয়ে নিলেন। জিজ্ঞেস করলেন, কোথাও কোনো সমস্যা হলো কি না। তাসবির মাথা নেড়ে না-করল।
তারপর বাবা জিজ্ঞেস করলেন, শৈশবটা কেমন দেখলে বলো তো শুনি?
বাবার প্রশ্নের জবাবে তাসবির মিটিমিটি হাসল। বলল, ওয়ান্ডারফুল বাবা। রংধনুর সাত রঙে রঙিন শৈশব। কতটা বর্ণিল আমি ঠিক বলে বুঝাতে পারব না বাবা। ওখানে আমার শৈশবের প্রায় সব বন্ধু-বান্ধবের সাথে দেখা হলো। আমার দাদা-দাদীর সাথে দেখা হলো। নানা-নানীর সাথে দেখা হলো। আমাকে পেয়ে ওরা যে কত খুশি হয়েছিল বলে বুঝাতে পারব না বাবা।
বাবা বললেন, তোমার মায়ের সাথে কী দেখা-সাক্ষাৎ হলো?
মায়ের কথা মনে করাতে তাসবিরের দু’চোখ ছলছল করে উঠল। ছেলের চোখে জল দেখে বাবা ওকে কাছে টেনে নিলেন। ফিসফিস করে বললেন, দেখা হয়নি নাকি?
তাসবির এবার একটা দীর্ঘশ^াস ছেড়ে বলল, এ তুমি কী করলে বাবা! আমার মাকে তুমি মেরে ফেললে! কেন মেরে ফেললে বাবা? আমার মায়ের কী অপরাধ ছিল বাবা?
ড. আতিফ ইসলাম এবার ওর দুটো হাত ধরে হাঁটু গেড়ে ছেলের সামনে বসে পড়লেন। তারও দু’চোখ অশ্রুতে ভরে উঠল। ধরা গলায় তিনি বললেন, আমার কিছু করার ছিল না-রে বাবা। অনেক চেষ্টা করেও আমি তাকে বাঁচাতে পারিনি।
তাসবির বলল, কেন বাবা? কী হয়েছিল মায়ের?
বাবা বললেন, সে রীতিমতো একটা গল্প। শুনতে চাইলে আমি তোমাকে শোনাতে পারি।
তাসবির বলল, বলো না বাবা শুনি।
ড. আতিফ ইসলাম বলতে লাগলেন। তোর বয়স তখন চার বছর। আমি আয়ু বৃদ্ধির ক্যাপসুলটা কেবল আবিষ্কার করেছি। কিন্তু ভেবে পাচ্ছিলাম না কার ওপর ওটা প্রয়োগ করব। বিষয়টা তোর মা বুঝতে পারল। একদিন সে জানতে চাইল, ব্যাপার কী! আজকাল তোমাকে এত মনমরা দেখায় কেন?
কোনো সমস্যা! সমস্যাটা কী? জবাবে আমি বললাম, সমস্যা তেমন কিছু না। আমি একটা ক্যাপসুল আবিষ্কার করেছি। মানুষের আয়ু বাড়ানোর দাওয়ায়। এটা পরিমিত খেলে যেকোনো মানুষ কয়েকশ’ বছর আয়ুষ্কাল লাভ করবে। ষাট-সত্তর বছর বাঁচার চেয়ে দুই-আড়াইশ’ বছর বেঁচে থাকা নিশ্চয়ই কম কথা নয়।
কথাটা শোনামাত্র তোর মা বলল, কোথায় ওটা? সবার আগে আমি ওটা গ্রহণ করতে চাই। আমি দীর্ঘায়ু লাভ করতে চাই। তোমার আবিষ্কারের জন্য ধন্যবাদ। আমাকে ওটা দাও। আমি এখুনি ওটা গ্রহণ করব।
তোর মায়ের ছেলেমানুষি কথা শুনে আমি রীতিমতো ভয় পেয়ে গেলাম। বললাম, এখনো ওটা কারো ওপর ট্রায়াল করিনি। খাওয়ার পর যদি কোনো প্রকার রিয়েকশন হয়। যদি বিরূপ প্রভাব পড়ে! তাই এটা তোমার খাওয়া চলবে না। আমি অন্য কারো ওপর এটা আগে প্রয়োগ করে দেখি কী ফলাফল দাঁড়ায়।
আমার কথা শুনে তোর মা গোঁ ধরে বলল, না। আমি থাকতে তা অন্য কারো ওপর প্রয়োগ করতে দেবো না। কারণ আমি নিজেই এটা গ্রহণ করতে চাই। গ্রহণ করে যদি দীর্ঘায়ু লাভ করি, তাহলে নিজেকে পরম ভাগ্যবতী মনে করব। আর যদি মরে যাই, তাহলে বিজ্ঞানের ইতিহাসে অমর হয়ে থাকব। দুনিয়াবাসী জানবে আমি তাদের আয়ু বাড়ানোর জন্য নিজের জীবনটাই উৎসর্গ করে গিয়েছি।
তোর মায়ের যুক্তির কাছে আমি হেরে গেলাম। তোর মা জোর করে আমার হাত থেকে ক্যাপসুলের পাতাটা ছিনিয়ে নিলো। আমি বললাম, একটির বেশি খেয়ো না, খেলে ক্ষতি হবে। কিন্তু তোর মা আমার কথা শুনল না। তারপর সে পরপর পাঁচটি ক্যাপসুল গিলে ফেলল। সাথে এক গ্লাস পানিও পান করল। তোর মায়ের কাণ্ড দেখে আমি রীতিমতো হতবাক। ভরকে গেলাম আমি। কী করব আমি অধীর হয়ে ভাবতে থাকি। পরে মনে হলো- তাড়াতাড়ি ওকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়াই ভালো। হাসপাতালে নিতে দেরি হলে সে আর বাঁচবে না। সাথে সাথে আমি রোবট অ্যাম্বুলেন্সকে ফোন করি। রোবট অ্যাম্বুলেন্সটা মুহূর্তেই চলে এসেছিল। এসে তোর মাকে হাসপাতালে নিয়ে গেল।
দু’জন রোবট ডাক্তার ওর পাকস্থলী ওয়াস করল। কিন্তু কেন জানি হঠাৎ তার প্রেসার নামতে শুরু করল। ডাক্তাররা বিচলিত হয়ে উঠলেন। কিন্তু কিছুতেই প্রেসার উঠাতে পারলেন না। এটুকু বলে ড. আতিফ ইসলাম কান্নায় ভেঙে পড়লেন। তাসবির বাবার মনোভাব আঁচ করতে পারল। সে একটা টিস্যু পেপার দিয়ে বাবার চোখের জল মুছে দিলো। আর বলল, আমি বুঝতে পেরেছি বাবা। মায়ের মৃত্যুতে তোমার কোনো হাত ছিল না। তুমি নির্দোষ। মায়ের খেপামো স্বভাবের কারণেই তাকে অকালে মৃত্যুবরণ করতে হলো।
বাবার চোখে জল দেখে তাসবিরের মনও আর্দ্র হয়ে উঠেছিল। পরক্ষণে সে ভাবল- এ মুহূর্তে বাবার মনে অনাবিল প্রশান্তি দরকার। বাবার মনকে ফুরফুরে করে তোলা দরকার। পরে সে কী মনে করে যেন বাবাকে টেনে নিয়ে তার সময়যন্ত্রে বসিয়ে দিলো। পাশে সেও বসল।
তারপর সে সময়যন্ত্রের তিন নম্বর বাটনটায় চাপ দিলো। অমনি যন্ত্রটা আশ্চর্য একপ্রকার গমগম আওয়াজ তোলে ভবিষ্যতের পথে পাড়ি জমালো। ভবিষ্যৎ অমিত সম্ভাবনার কাল। অনাগত দুঃখ-জরা অতিক্রম করে তারা সুখের স্রোতে ভেসে চলল।