স্বাধীনতার আগের কথা। আমি তখন স্কুলে যাওয়া শুরুই করিনি। তবে বেশ খানিকটা বড়ো হয়ে গেছি। বুদ্ধিশুদ্ধিও মোটামুটি হয়েছে।
একদিন সকালবেলা মা আমাকে ভাত খেতে দিয়ে বললো, তাড়াতাড়ি খা। খেয়ে তোর নানাবাড়ি যা। তোর নানাবাড়ির উঠানে তোর নানা গরু জবাই করতেছে। গিয়ে দেখ গা।
তখন আমার দাদা-নানা কেউ বেঁচে নেই। আমার বড়ো ফুপির বড়ো ছেলেকে আমার মা আব্বা ডাকে। আমরা নানা ডাকি। সেই নানার আঙিনাতে গরু জবাই হবে, মা সেটাই বললো।
বড়ো ফুপার বিস্তর জমিজমা। একই সাথে কাপড়ের ব্যবসা। বিখ্যাত ধনী হবার সুবাদে তিনিই গোষ্ঠীর বড়ো মাতব্বর, তিনিই সবার মুরুব্বি।
দাদা-দাদী, নানা-নানী বেঁচে না থাকার কারণে তিনিই আমাদের সবার মধ্যে বয়োজ্যেষ্ঠ। তার চুল-দাড়ি সব পাকা। সাদা ফকফকা।
তার বড়ো ছেলে আমার ফুপাতো ভাই ওরফে আমার নানা। তিনিও অনেক বয়সী। তারও চুল-দাড়ি সব পাকা। তার বাপের মতোই।
আমাদের সবার বাড়ি পাশাপাশি। দাদার বাড়ি, নানার বাড়ি, ফুপির বাড়ি, মামার বাড়ি, সবার বাড়ি পাশাপাশি, কাছাকাছি ও লাগালাগি।
আমার নানা তথা ফুফাতো ভাইয়ের বাড়ির উঠোনে গরু জবাই হচ্ছে। আমি তাড়াতাড়ি খাওয়া শেষ করে ছুটলাম সেখানে। মা বললো, খানিক পরে বাড়িতে এসে কাঠা (বেতের তৈরি একপ্রকার পাত্র, বর্তমানের গামলার মতো) নিয়ে যাস গোশত আনার জন্য।
তখন মাসে দুই-তিনবার মহল্লায় গরু জবাই হতো। কখনো কখনো বাজার থেকে কিনে আনা গরু, কখনো কখনো পাড়ারই কোনো কৃষকের গরু দাম নির্ধারণ করে জবাই করা হতো।
বাজারের কিনা গরু হলে সকলেই নগদ টাকা জমা দিয়ে গোশত নিতো। হাতে টাকা না থাকলে কেউ কেউ টাকা হাওলাত করে গোশত নিতো আবার কেউ কেউ টাকা না থাকার কারণে গোশত নিতে বিরত থাকতো।
আর গ্রামের কোনো কৃষকের গরুর একটা দাম নির্ধারণ করে জবাই করলে তৎক্ষণাৎ নগদ টাকা জমা না দিলেও চলতো। দুয়েক দিন পরে টাকা দিবে এমন শর্তেও গোশত নিতে পারতো। তারপর সব টাকা উঠলে একত্র করে গরুওয়ালাকে দেয়া হতো।
বাজার থেকে গরু কিনলে তিন-চারজনে মিলে টাকা দিয়ে কিনতো। তারপর সবাই নগদ টাকায় গোশত কিনে নিলে তাদের টাকা উঠে যেতো।
এভাবেই গ্রামের মানুষের গোশত খাওয়া হতো। বাজার থেকে কিনে খাওয়া খুব একটা হতো না। হঠাৎ হঠাৎ কেউ বাজার থেকে গোশত কিনতো। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া কেউ বাজার থেকে গোশত কিনতো না।
মায়ের তাগাদায় আমি তাড়াতাড়ি ভাত খেয়ে সেখানে গিয়ে দেখি গরু জবাই করা হয়ে গেছে। বড়ো ফুপা চেয়ার বিছিয়ে বসে আছে। হাতের লাঠি চেয়ারে হেলান দেয়া। দাড়ি নাড়িয়ে নাড়িয়ে পান চিবাচ্ছেন তিনি। কয়েকজন গরুর চামড়া ছাড়াচ্ছে। কয়েকজন তামাক খাচ্ছে। একজন খাতায় নাম লেখছে আর টাকা জমা নিচ্ছে।
বাজারে গোশত সের দরে বিক্রয় হয়। কিন্তু গ্রামে সের নয় ভাগা দরে গোশত বিতরণ হয়। এক ভাগা এক টাকা। এক ভাগাতে দেড় সের/দুই সের/আড়াই সের যা হবে তা-ই হবে। পরিমাণের জন্য কারো কোনো আপত্তি করার সুযোগ নেই।
একশত টাকা দিয়ে গরু কিনা হয়েছে। গোশতগুলোকে সমান একশত ভাগা দেয়া হবে। তারপর কেউ এক ভাগা, কেউ দুই ভাগা- এমন করে নিবে। ভাগাগুলো পাল্লা দিয়ে মেপে সমান করা হবে।
যদি দেখা যায় যে সবাই নেয়ার পর পাঁচ-সাত ভাগা বেশি হয়েছে, তাহলে অবস্থাপন্নরা কয়েকজন আরো এক ভাগা করে বেশি নিয়ে শেষ করবে আর কম পড়লে যারা একাধিক ভাগা নিয়েছে তারা কেউ কেউ এক ভাগা করে ছেড়ে দিবে।
ভাগা উদ্বৃত্ত হবে নাকি কম পড়বে তা নাম লেখার সময়ই নির্ধারণ হয়ে যাবে। আর এর সমাধানও হবে তখনই।
গরুটা জবাই করার আগে থেকেই অনেক পোলাপান সেখানে এসে জমায়েত হয়েছে। সবার লক্ষ্য কখন গরুর ভুঁঁড়িটা বের করা হবে।
পুরোপুরি চামড়া ছাড়ানো হয়ে গেলে, গরুটার পেট ফেঁড়ে ভুঁঁড়ি বের করে একটা মইয়ের ওপর তুলে অনেকটা দূরে ফেলে দেয়া হলো। ভুঁঁড়ির সাথে সাথে আমরা পোলাপানরাও ছুটলাম সেখানে।
ভুঁঁড়িকে বেস্টন করে থাকতো চর্বি বা তেলের আবরণ। আমরা সেই চর্বির আবরণকে বলতাম পর্দা।
সব পোলাপান ভুঁড়ির ওপর থেকে পর্দাটাকে ভাগাভাগি করে ছিঁড়ে নিতাম। কেউ কম কেউ বেশি। তারপর সেই পর্দা ভাঙা কলসির গলায় লাগিয়ে ঢোল তৈরি করতাম। ভাঙা কলসির গলাটাকে আমরা বলতাম ‘কান্দা’। কলসির কান্দা।
তারপর ঢোলটা সারাদিন রৌদ্রে শুকিয়ে নিয়ে পাটের শোলা দিয়ে কাঠি বানিয়ে সেটা দিয়ে বাজাতাম ডুগডুগা ডুগডুগ।
পাঁচ-সাতদিন ধরে চলতো সেই ঢোল বাজানি। কারোর কারোরটা প্রথম দিনই ছিঁড়ে যেতো। পর্দাটা ছিঁড়ে গেলে কান্দাটাকে যতœ করে রেখে দিতাম। আবার গরু জবাই হলে আবার বানাবো সেই প্রত্যাশায়।
ভুঁড়িটা যেখানে ফেলা হতো সেখানেই পড়ে থাকতো। কুকুরে ছিঁড়ে ছিঁড়ে খেতো।
বর্তমানে মানুষ ভুঁড়ি কিনে খায়। আমাদের শৈশবে ভুঁড়ি খাওয়ার কথা মানুষের চিন্তাতেও ছিল না।
লেখক : ঊর্ধতন কর্মকর্তা (অব:), বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক
স্বাধীনতার আগের কথা। আমি তখন স্কুলে যাওয়া শুরুই করিনি। তবে বেশ খানিকটা বড়ো হয়ে গেছি। বুদ্ধিশুদ্ধিও মোটামুটি হয়েছে।একদিন সকালবেলা মা আমাকে ভাত খেতে দিয়ে বললো,...
