মিলার বয়স ২৪। ভার্সিটির ছাত্রী। বড় ধরনের শারীরিক সমস্যা না থাকলেও এসিডিটির সমস্যা, দুর্বল লাগা ও একটু কাজ করলেই ক্লান্তিভাব এগুলো লেগেই থাকে। সবগুলো রোজা রাখলেও ইফতারের পরে গ্যাসের বড়ি খেতে হয়। সমস্যা হলোÑ ঈদের দিন সকালে কিছু ভাজাপোড়া জাতীয় খাবার খাওয়ার সাথে সাথেই বমি শুরু হয় এবং পেট ফুলে ওঠে। বমি তিন-চারবার হয়, মিলার নড়াচড়ার মতো শক্তি থাকে না। পরিবারের সবাই মিলে হসপিটালের ইমার্জেন্সিতে নিয়ে যান। সেখান থেকে কিছুটা সুস্থ হয়ে আসতে আসতে সন্ধ্যা হয়ে যায়। মিলার খুব কষ্ট হয়। তার জন্য পরিবারের অন্য সবার ঈদ মাটি হয়ে গেল। কিন্তু মিলা কী করবে? মিলার মায়ের আপত্তি যে, মিলা সবসময় গ্যাসের ওষুধ এবং অন্যান্য ওষুধ নিয়মিত খায় না। পানি পরিমাণমতো খায় না। বাইরের চটপটি, ফুচকা জাতীয় খাবার পারলে প্রতিদিনই খায়। এসব অনিয়মের জন্য মিলার গ্যাসের সমস্যা দিনদিন খারাপ হচ্ছে।
আসমা, বয়েস ৪৮। উচ্চরক্তচাপ এবং ডায়াবেটিসে ভুগছেন গত চার বছর ধরে। তার সমস্যাও একই রকম। ওষুধ খেতে ভুলে যান। মাঝে মধ্যে প্রচণ্ড মাথাব্যাথা, ঘাড়ব্যথা, বুক ধড়ফড়ানি বেড়ে যায় ও হাত-পা অবশ লাগে। এ দিকে, হার্ট ও কোমরের ব্যথা তো আছেই। ডাক্তার বলেছেন, রোজা রাখতে পারবেন। কিন্তু সমস্যা হলো ইফতারের পরে উচ্চরক্তচাপের এবং ডায়াবেটিসের ওষুধ খাওয়া হয় না। স্বাভাবিকই ব্লাডপ্রেসার বেড়ে যায় মাঝে মধ্যে। ঈদের আগের দিন রাত্রেও ওই একই অবস্থা। কিভাবে যে ভুলে গেলেন ওষুধ খেতে মনে করতে পারছেন না। প্রচণ্ড মাথা ব্যথা এবং বমি হয়েছে পাঁচ-ছয়বার। বাথরুমেই পড়ে আছেন। পরিবারের সবাই ধরাধরি করে অ্যাম্বুলেন্সে ঢাকা মেডিক্যালের ইমার্জেন্সিতে নিয়ে যান। কিন্তু ততক্ষণে একটা ব্রেন স্ট্রোক অলরেডি হয়ে গেছে। বাম হাত পা নাড়াতে পারছেন না। মুখ দিয়ে ফেনার মতো ক্রমাগত বের হচ্ছে, বেড়েছে শ্বাসকষ্ট। ইমারজেন্সি ডাক্তার আইসিইউতে ভর্তির জন্য লিখে দিলেন। আগামী ৭২ ঘণ্টা না যাওয়া পর্যন্ত এখানেই থাকতে হবে। পরিবারের সবাই খুবই উদ্বিগ্ন। ঈদের প্রস্তুতি, ঈদ উদযাপন সবই মাটি। হসপিটালেই রাত-দিন পালা করে ডিউটি করতে হচ্ছে। আসমার দুই মেয়ে। বাবা মেয়েদেরকে দোষ দিচ্ছেনÑ কেনো ওষুধপত্র খাবার ব্যাপারে মাকে সাহায্য করেন না। এখন এত ভোগান্তি সামলানো কি মুখের কথা। মেয়েদের অভিযোগ মা তো কারো কথাই শুনতে চান না। ডায়াবেটিস থাকলেও ইফতারিতে সব রকমের মিষ্টিজাতীয় আইটেম একটাও বাদ দেননি। ডাক্তার শারীরিক ব্যয়ামের পরামর্শ দিলেও একটি দিনও হাটেননি। উচ্চতা পাঁচ ফুট হলেও ওজন ৮০ কেজি। কে শুনবে কার কথা। পুরো পরিবারের ঈদ তো গেলই এখন জীবন নিয়ে টানাটানি। আত্মীয় স্বজনেরাও খোঁজখবর নিচ্ছেন হাসপাতালে এসে। মেয়েরা ঈদের পরের দিন সিলেট যাবে বলে অগ্রিম টিকিট কেটে রেখেছিল। ছোট মেয়েটির কান্না পায়। তার মার এখন কি হবে? এই ৮১ কেজি ওজনের একটা মানুষ যদি বিছানায় পড়ে থাকে তবে তাকে সামলানো কি মুখের কথা? কাজে সাহায্য করার মতোন তেমন কোনো লোকও তো ওদের নেই। ডাক্তার অবশ্য আশ্বাস দেন। ফিজিওথেরাপি দিতে হবে। ওষুধপত্রের চার্ট বানিয়ে দেন। সময়মতো নিয়ম করে ওষুধগুলো খেতে হবে। অনিয়ম করলে এবং দ্বিতীয়বার যদি ব্রেইন স্ট্রোক করে তবে তার পরিণতি মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। বড় মেয়েটি কেঁদে ফেলে। ওদের বাবাও রাতে ঘুমাতে পারেন না। তিনি নিজেও উচ্চরক্তচাপ এবং কিডনি সমস্যায় ভুগছেন। ডাক্তার বলেছেন খাবার এবং ওষুধপত্র পত্রে অনিয়ম করলে দুটো কিডনিই বিকল হয়ে যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে ডায়ালাইসিস লাগতে পারে।
আসলে সচেতনতার বিকল্প এই পৃথিবীতে কিছুই হতে পারে না। আসমা যদি আগে থেকেই তার ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতেন, ওষুধপত্র নিয়মিত খেতেন তাহলে এই স্ট্রোক কখনই হতো না। উচ্চরক্তচাপ এবং ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রেখে দীর্ঘদিন সুস্থভাবে জীবনযাপন করা যায়, পরিবারের একজন সদস্য যদি অসুস্থ থাকেন তবে পুরো পরিবারের ওপরেই চাপ পড়ে। দিনের পর দিন অসুস্থ রোগীকে সামলানো রীতিমতো বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। আসমাকে প্রস্রাবের রাস্তায় নল দিলেও সেই ব্যাগে পলি করা, প্রতি দুই ঘণ্টা পরপর শারীরিক পজিশন পরিবর্তন করা ও নাকের নল দিয়ে তরল খাবার দেয়া এগুলোসহ আরো অন্যান্য কাজের জন্য দুই মেয়ে ছাড়া আরো বাড়তি লোকের প্রয়োজন হয়। কিন্তু লোক তো আর চাইলেই পাওয়া যায় না। এজন্য পরিবারের প্রতি সদস্য একজন আরেকজনের সম্পর্কে খোঁজখবর নেবেন। সবাই মিলেমিশে থাকার আনন্দটা যেন মাটি না হয়, সেজন্য সবাইকেই কমবেশি দায়িত্ব পালন করতে হয়। এই দুটি পরিবারে ঈদ আনন্দ হলো না।
ঈদের আনন্দ সবাইকে ভাগাভাগি করে নিতে হয়। পরিবারের সবার প্রতি সবার দায়িত্ব থাকে। সবাইকেই কিছু দায়িত্ব পালন করতে হয়। এজন্য সুস্থ থাকাটা অত্যন্ত জরুরি। উচ্চরক্তচাপ, ডায়াবেটিস, কিডনির সমস্যা, হার্টের সমস্যা ও অতিরিক্ত ওজনের কারণে শরীরে নানা রকমের জটিলতা তৈরি হওয়া এগুলো এক দিনের রোগ নয়; এগুলোকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে হলে প্রতিদিনই নিয়মকানুন মেনে চলতে হবে, আবার অভ্যাস অবশ্যই বদলাতে হবে। ব্যায়ামকে জীবনের সঙ্গী করে নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্যের দিকেও খেয়াল রাখতে হবে। মানসিক স্বাস্থ্য ভালো রাখার জন্যও নিয়মিত পরিবার, বন্ধু বান্ধব, আত্মীয়স্বজনের সাথে ভালো সম্পর্ক রাখতে হবে, এদের সুবিধা অসুবিধায় ভূমিকা রাখতে হবে। একটি ভালো কাজ করলে অবশ্যই মন ভালো হবেই। পরিবারের সবার সাথে ভালো মন্দ সব ধরনের শেয়ারিং এর পরিবেশও তৈরি করে নিতে হবে। আজকাল বেশির ভাগ নিউক্লিয়ার কিংবা ক্ষুদ্র পরিবারের সংখ্যাই বেশি। সে ক্ষেত্রে সবাই সবার সুখ দুঃখে পাশে না থাকলে জীবনটাই তো জটিল হয়ে পড়বে। আপনার জীবনের প্রতি পজিটিভ ধারণা ও উদ্যোগ, সুস্থ শরীর ও মন, অন্য সবার প্রতি স্নেহ মমতা ভালোবাসা আপনাকে শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা এনে দেবে।
এ জন্য প্রতিদিনই সকালে উঠে কাজের পরিকল্পনা করে ফেলুন। নিজেই বলুন আমি ভালো আছি। আমি ভালো কাজে অংশ নেব। অনেকেই যোগ ব্যায়াম করেন কিংবা হাঁটুন। যেকোনো ব্যায়ামকে সঙ্গী করুন।
হঠাৎ করে উত্তেজিত না হওয়া, নিজের রাগকে দমন করা আসলেই কঠিন কাজ। যতটা বলা সহজ ততটাই বাস্তবে কঠিন। ঝগড়াঝাটি, অন্যের ছোট ত্রুটি নিয়ে কঠোর সমালোচনা, কাউকে অপমান করা এসব নেগেটিভ কাজগুলো থেকে যথাসম্ভব দূরে থাকার চেষ্টা করুন। এতে আপনার মানসিক ও শারীরিক দুটো স্বাস্থ্যই ভালো থাকবে।
সবসময় ভালো চিন্তা করুন। ভালো কিছু করার চেষ্টা করুন। সবার সাথে হাসিমুখে কথা বলুন। মনে মনেও ভালো ধারণা পোষণ করুন। জীবন তো একটাই। মন্দকে ভালো কিছুর দ্বারা প্রতিস্থাপন করার চেষ্টা করেই দেখুন না। আপনি ভালো থাকবেনই।
খাবার দাবারের ক্ষেত্রে সচেতন হোন। ওজন বাড়তির দিকে হলে খাদ্যের অভ্যাস পরিবর্তন করুন। বাইরের খাবার, অতিরিক্ত তেল-চর্বি মুক্ত খাবার, ভাজাপোড়া ও এলকোহল এগুলো সবার জন্যই অনুপকারী।
নিজকে সময় দিন। নিজের পছন্দনীয় কিছু কাজ করুন। কেউ বই পড়তে ভালোবাসেন। বই পড়–ন সময় করে। কেউ টিভ দেখতে পছন্দ করেন। পছন্দের সিরিয়াল দেখুন না সময় করে। মনের চাহিদা তো মেটাতে হবে। তবে সেটা যেন নেশায় পরিণত না হয়। কেউ বাগান করতে ভালোবাসেন। কেউ বেড়াতে পছন্দ করেন। ঘুরে আসুন কাছে কিংবা দূরে এ ঈদের ছুটিতে।
অন্যের দোষত্রুটি এবং অন্যের যে কাজগুলো আপনার ভালো না লাগে সেটা যতটা পারেন ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখুন। বোঝানোর চেষ্টা করুন। আপনি উদ্যোগী হয়ে পরিবারের, বন্ধু-বান্ধব ও আত্মীয়স্বজনের প্রয়োজনে কাজ করুন। দেখবেন আপনিই ভালো থাকবেন। মানুষ তো সামাজিক জীব, আল্লাহ এভাবেই মানুষকে বানিয়েছেন। কাজেই সবার সুখ-দুঃখের অংশীদার হয়ে নিজকে আরো শক্তিশালী করে তুলুন।
আপনিই হোন না পরিবারের আত্মীয়-স্বজনের আস্থাভাজন ও মধ্যমণি। জীবনের সবক্ষেত্রে না পারলেও বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই উদার দৃষ্টিভঙ্গী কিন্তু নিজেকেই ভালো রাখে। ভালো চিন্তা, ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখা ও সবার জন্য মঙ্গল কামনাÑ এগুলো ধীরে ধীরে দেখবেন অভ্যাস হয়ে যায়। মানুষের প্রকৃতিই এমন যেভাবে নিজকে চালাতে চায় তার আচার-আচরণ, দৃষ্টিভঙ্গী সেভাবেই তাকে চালায়। কঠোরতা, তীর্যক মন্তব্য, কুধারণা, প্রতিবেশীর সঙ্গে ঝগড়া, জীবনসঙ্গীর প্রতি অবহেলা এবং সন্তানদের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো না থাকলে আপনি যতই আর্থিকভাবে সচ্ছল হোন না কেন, আপনি মানসিকভাবে ভালো থাকবেন না। সবসময় একটি দুশ্চিন্তা আপনাকে কুঁরে কুঁরে খাবে।
জোরে হাসুন, সব কিছু সহজভাবে নিন। দেখবেন জীবনটা ততটা জটিল মনে হচ্ছে না। অসুস্থতা থাকতে পারে চেষ্টা করুন সেটাকে যথাসম্ভব সহজভাবে নিতে। সুস্থ থাকার জন্য কিছু নিয়ম করুণ। ধৈর্য ধারণের অভ্যাস গড়ার চেষ্টা করুন, সেটা সত্যিই কঠিন কাজ। বিপদে-আপদে এবং সব অবস্থায় সৃষ্টিকর্তার সাহায্য চান। কোনো কিছু চাইতে হলে তার কাছেই নিবেদন করুন। আপনি ভালো সময়ে তাকে ডাকুন তিনি সবসময় আপনার পাশে থাকবেন। মানসিক স্বাস্থ্য ভালো থাকার সবচেয়ে উত্তম মাধ্যমই হলো সৃষ্টিকর্তার কাছে নিজকে বিনাশর্তে সপে দেয়া। চিন্তামুক্ত থাকলে জীবনটা সুন্দর হয় অনেকখানি। কাউকে আঘাত দিয়ে কোনো কাজ কিংবা কথা বলার অভ্যাসও আমাদের বদলাতে হবে। সবাইকে খুশি রাখা সত্যিই অসম্ভব এবং কঠিন হলেও চেষ্টা করে যেতে হবে। আমাদের দরদি একটি মন থাকতেই হবে। জীবন তো একটাই। এটাকে যতটুকু উপভোগ করা যায় ততটাই লাভ। তবেই ঈদের দিনের মতো খুশি ও আনন্দময় হয়ে উঠবে আমাদের প্রতিটি দিন। সবাই ভালো থাকুন, শারীরিক ও মানসিকভাবে। আপনাদের ভালো লাগাই হোক ঈদের সর্বোত্তম উপহার।
মিলার বয়স ২৪। ভার্সিটির ছাত্রী। বড় ধরনের শারীরিক সমস্যা না থাকলেও এসিডিটির সমস্যা, দুর্বল লাগা ও একটু কাজ করলেই ক্লান্তিভাব এগুলো লেগেই থাকে। সবগুলো রোজা...
