জীবন মৃতু্যুর সন্ধিক্ষণে, হতাশাগ্রস্ত মনোবল নিয়ে দাঁড়িয়ে বড় বেশি মনে পড়ছে কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বহুল প্রচলিত উক্তি : ‘নীরব কবি কোনো কবিই নন। কবি লেখনীর মাধ্যমে বিপথগামী সমাজের লাগাম টেনে ধরবেন।’ কাব্যাঙ্গনের একজন শ্রমিক হিসেবে এ লেখনীটিই হচ্ছে অনুপ্রেরণার প্রধান নিয়ামক।
চার পাশে ঘটে যাওয়া ঘটনা প্রবাহে আমি শুধু অবাকই নই, রীতিমতো নির্বাক হতবাকও বটে। শিষ্টাচারবহির্ভূত কর্মকাণ্ড আমাদের সমাজব্যবস্থায় নতুন কোনো বিষয় নয়। শিষ্টাচার লঙ্ঘনের বিষয় নিয়ে হয়তো খনার বচনটি এত বেশি সমৃদ্ধ : ‘যার যে কাজ নয়, শেখে বেচে নালী’। ‘গায়ে মানে না নিজেই মোড়ল’। আমার মতো মানুষেরা কাজের চেয়ে গল্প একটু বেশি করেন। যার কারণে এত বিভ্রাট।
আমরা কিন্তু দেখতে পাচ্ছি, সমাজব্যবস্থার প্রায় সব ক্ষেত্রেই এখন লেজে গোবরে অবস্থা। চার দিকে শুধু মিথ্যাচার, পরনিন্দা, হানাহানি, ভোগদখল, দলবাজি এবং খুন-ধর্ষণ নিত্যদিনের ঘটনা। বর্তমান সময়ে ধর্ষণের ক্ষেত্রে নতুন মাত্রায় যুক্ত হয়েছে, চলন্ত বাস।
অনেক ক্ষেত্রে ধর্ষণের সাথে বাসের স্টাফরাও জড়িত। এ যেন তুলকালাম কাণ্ড। মা খুন করছে সন্তানকে, সন্তানরা খুন করছে মা-বাবাকে।
এ যেন এক মগের মুল্লুক। মানুষের এরূপ বিকৃত রুচি হয় কী করে? নিজের সন্তানকেও ধর্ষণ করতে পিতা কুণ্ঠিত হচ্ছেন না। দেশে দিন দিন শিক্ষার হার বাড়লেও প্রকৃত জ্ঞানের চর্চা লোপ না পেলে সমাজের এই বিশৃঙ্খলা হতো বলে আমি মনে করি না।
প্রাচীন কিংবা মধ্যযুগের প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের কথা আমরা জানি। ক্ষমতা, ধন-সম্পদ এবং দাসী-বাদীর লোভে পড়ে বাবাকে হত্যা করে কিংবা বন্দি করে মসনদ দখল করেছেন শাসক। প্রশ্ন হলোÑ এ ব্যাপারটি শুধু দক্ষিণ এশিয়ায় প্রচলিত ছিল এমন নয়। গোটা পৃথিবীতেই এই অসভ্য বর্বরতা ছিল।
দুঃখ এবং পরিতাপের বিষয় হলো, পৃথিবীর অধিকাংশ দেশের মানুষ যেখানে উন্নয়নে মানবিকতায় নজির সৃষ্টি করেছেন, সেই সময়ে আমরা ভারত উপমহাদেশের মানুষ এখনো তুলনামূলক পিছিয়ে আছি। এটাই নির্মম সত্য, এটাই বাস্তবতা। এ সম্পর্কে লেখার মানুষও কমে যাচ্ছে দিন দিন।
প্রশ্ন জাগতে পারে, এই পরিণতির জন্যই কী আমরা মহান স্বাধীনতা সংগ্রামের মধ্য দিয়ে স্বাধীন জাতি হিসেবে আত্মপ্রকাশ ঘটিয়েছিল? বুকের তাজা রক্ত দিয়ে দেশ স্বাধীন করেছি? মোটেও না। গুটিকয়েক মোনাফাখোর, দেশদ্রোহী, ধান্ধাবাজ লোকের অপকর্মের বোঝা আমরা মাথায় নিয়ে কেনো ঘুরব। পাপীষ্ঠ, ঘৃণ্য মানুষদের সামাজিকভাবে বয়কট করার সময় এসেছে। মূল সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সমাধানের রাস্তা আমাদেরই বের করতে হবে। এর জন্য জ্ঞান এবং সচেতনতা প্রয়োজন। অন্যের লেজুরবৃত্তির পথ পরিহার করে লোভ-লালসা, ক্ষমতার মোহ কমিয়ে সত্যিকারের মানুষ হওয়াই শ্রেয়। অপরাধ প্রবণতা অনেক কমে আসবে যদি আমরা সাদাসিধা জীবনযাপন করতে শিখি।
জীবনের চাহিদা মেটাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন, এ কারণেও ঘুষ দুর্নীতি বেড়েছে অনেকাংশে। সর্বোপরি সমাজের সত্য ও মিথ্যাকে সাহসিকতার সাথে বিভাজন করতে পারলে পাপ পঙ্কিলতা কমে আসবে বলে আমার বিশ্বাস। নৈতিকভাবে দুর্বল একটি জাতি নিঃশেষ করার যে সাংস্কৃতিক আগ্রাসন, এটা নতুন কোনো বিষয় নয়। প্রত্যেক মানুষ যদি সচেতনভাবে অন্যায় অবিচারকে মানসিকভাবে প্রত্যাহার করতে ব্রত হন, তাহলে দুর্বৃত্তদের সাধ্য কী আমাদের রোখে?
বাংলাদেশের বৈষম্যমূলক শিক্ষাব্যবস্থা, রাজনৈতিক মিথ্যাচার, হানাহানি ইত্যাদি উন্নয়ন অগ্রগতি এবং সমাজ গঠনে অনেকাংশে বাধা। যাদের দায়িত্বশীল হওয়ার কথা তারা যদি কৌশলী হয়ে অহর্নিশি মিথ্যাচার করতে থাকেন তাহলে তো সমাজের মাথায় পচন ধরবে। এটাই স্বাভাবিক, ইহাই বাস্তব।
গুম, খুন, গদি দখলের রাজনীতি আমাদের জাতিগতভাবে নিঃশেষ করে দিচ্ছে। সাধারণ মানুষকে বোকা ভেবে দেশের নীতিনির্ধারণী মহল লাগামহীন মিথ্যাচার করছেন। তারা কী একবার ভেবেছেন মানুষ আগের চেয়ে অনেকাংশ সচেতন। সব বুঝেও মানুষ মুখে কুলুপ এঁটে বসে থাকার মানে এই নয়, সময়ে সুযোগে তারা কিছু বলবে না। সুযোগের প্রতীক্ষায় অনেকে মৃত্যুকে হাতের মুঠোয় নিয়ে সত্য উচ্চারণ করছেন না।
বিশ্বায়নের এই খোলাবাজার অর্থনীতিতে ধনী হচ্ছেন আরো ধনী, আর গরিব হচ্ছেন নিঃশেষ। হতদরিদ্র মানুষের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান এই মৌলিক বিষয়গুলোর দায়িত্ব পালনে সরকারের সফলতা নেই তা বলছি না। আমরা গরিব জাতি হিসেবে চাহিদার তুলনায় প্রাপ্তি অতি নগণ্য। যেকোনো মূল্যে বিশ্ববাসীর কাছে আমাদের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার জন্য কার্যত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। কথার ফুলঝুরি কিংবা মিথ্যা আশ্বাসে কিন্তু পথশিশু কিংবা বস্তিবাসীরা স্বস্তিতে নেই।
অপব্যাখ্যা দিয়ে সমাজের কর্মকাণ্ড ধামাচাপা দেয়ার যে প্রবণতা এ কারণেও সমাজের খুন-ধর্ষণ হানাহানি বেড়ে যাচ্ছে। এর দায় আইন শৃঙ্খলা বাহিনী কিন্তু অস্বীকার করতে পারেন না। অনেক ক্ষেত্রে প্রকৃত দোষীরা ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে ধরা ছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে, নির্দোষ ব্যক্তি হচ্ছেন দোষী এরূপ দমন পীড়নে কিন্তু সন্ত্রাসবাদের উত্থান হতে পারে, যা আমাদের কাছে সবচেয়ে উদ্বেগজনক ঘটনা।
ধর্মীয় অনুশাসন কিংবা মূল্যবোধ মানুষকে পরিশীলিত জীবনযাপনে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। কোনো ধর্মই মানবিকতার বিপক্ষে অবস্থান করে না কিন্তু দুঃখ ও পরিতাপের বিষয় হলো কিছু স্বার্থবাদী মানুষ তাদের নিজের স্বার্থে ধর্মের অপব্যাখ্যা দেন। সহজ-সরল আবেক প্রবণ মানুষকে ধোঁকা দিয়ে স্বার্থ হাসিল করে থাকেন। বিশেষ করে ইসলাম ধর্মের মূলমন্ত্র হচ্ছে মানবিকতার কথা। ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সমান অধিকারের কথা বলে কোরআন এবং হাদিস। কিছু ভণ্ডপীর বিভিন্ন কায়দায় কোরআন এবং হাদিসের অপব্যাখ্যা দিয়ে নিজের স্বার্থ হাসিল করছেন। হুজুগে অধিকাংশ বাঙালি ছুটেছেনও সে পথে, যার ফলে ধর্মের মূলনীতি থেকে সরে গিয়ে মানুষ হারাচ্ছেন নৈতিকতাবোধ। নীতি-নৈতিকতার অভাবেই সমাজে ঘটছে পাপাচার, অনাচার, অবিচার, বিবেকবর্জিত কাণ্ড।
প্রকৃত অর্থে কোনো কিছুর মৌলিকত্ব থেকে মানুষ ছিটকে পড়লে সুখে শান্তিতে বসবাস করতে পারবে না। এটা দর্শনশাস্ত্র দিয়ে প্রমাণিত।
সময় হয়েছে, আমাদের নিজেদের স্বার্থে অর্থাৎ আমাদের সন্তান-সন্ততিদের এবং আগামী প্রজন্মের জন্য একটি সুখী সমৃদ্ধ সমাজব্যবস্থা নির্মাণ করা প্রয়োজন। হানাহানি, খুন, ধর্ষণ, চাঁদাবাজি, নির্যাতনমুক্ত একটি মানবিক সমাজ তৈরি করা আবশ্যক। রাজনৈতিক যে উত্তাল স্রোত ক্ষমতায়নের অন্ধমোহে আমাদের অক্টোপাসের মতো আটকে ধরেছে, সেই প্রথাকে ভেঙেচুরে খান খান করে নিজের স্বার্থেই সমাজকে সংস্কার করতে হবে। এই শুদ্ধচর্চার আহবানে, কতটুকু সাড়া দেবেন জানি না, তবু কবিতাপ্রাণ একজন মানুষ হিসেবে আমাকে তো নিজের ঢোল নিজেই বাজাতে হবে। আইনের শাসনহীন এই রাষ্ট্রে জানি না, এ লেখাই জীবনের শেষ লেখা কিনা । যদি বেঁচে থাকি, সুস্থ থাকি, তাহলে এ বিষয়ে আরো লেখার ইচ্ছা থাকল। সবার শান্তিময় জীবন এবং মঙ্গলময় ভবিষ্যৎ কামনা করি।
