উন্নত জীবনযাপনের লক্ষ্যে বিজ্ঞানের আবিষ্কারকে ব্যবহারিক জীবনে যখন প্রয়োগ করা হয় তখন তাকে প্রযুক্তি বলে। প্রযুক্তি আগেও ছিল এখনো আছে ভবিষ্যতেও থাকবে। প্রযুক্তির ইতিবাচক ও নেতিবাচক দুই ধরনের প্রভাবই রয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তি মানুষের শারীরিক শ্রম লাঘব করে সময়ের যথোপযুক্ত ব্যবহার করে জীবনযাপনের ধারাকে সহজ ও সমৃদ্ধ করেছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু নিয়ন্ত্রণহীন প্রযুক্তির ব্যবহারের কারণে সৃষ্ট সামাজিক ব্যাধি আজ মহামারী আকারে গ্রাস করে চলেছে আমাদের আদর্শ, নীতি, ধর্মীয় সংস্কার, মূল্যবোধ এমনকি রাষ্ট্রদর্শনকেও। প্রযুক্তির থাবাতলে বন্দী হয়ে গেছে মানুষের চিন্তাশক্তি যার ফলে ভূলুণ্ঠিত হচ্ছে মানবিকতা ও বিলীয়মান নৈতিকতা। এ সময়ে আধুনিক যুগের অত্যাকর্ষক প্রযুক্তি মাদকাশক্তির চাইতেও বেশি নেশা ও পেশাদারিত্বের দাবিদার। বর্তমান প্রজন্ম আলোর নিচে থাকা অন্ধকারে নিমজ্জিত হতে হতে আদিম অন্ধকার গুহায় পতিত হওয়ার উপক্রম। কিন্তু কেন? প্রযুক্তি কি মানুষকে এরূপ অপশিক্ষা দেয়?
না, সব প্রযুক্তিই মানুষ ও মানুষের কল্যাণের জন্য। কিন্তু স্যাটেলাইটের বদৌলতে একটি দেশের ঐতিহ্যগত সংস্কৃতির ওপর বিরূপ প্রতিক্রিয়াশীল অবস্তুগত বিজাতীয় সংস্কৃতির ব্যাপক অনুপ্রবেশ ঘটতে থাকলে স্বদেশীয় সংস্কৃতি লোপ পেতে থাকে। আর অপসংস্কৃতির দৌরাত্ম্যে ব্যক্তি তার সামাজিক জগতের বিভিন্ন বিষয়ের প্রতি বিভ্রান্ত হয়ে বাস্তব দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সরে যায় ও বিশ্বাসের একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্রকে প্রত্যাখ্যান করে। তখনই স্খলন ঘটে নৈতিকতার। আজ আমরা সময়ের তেমনি আতঙ্কিত সোপানে পা রেখেছি। প্রতিনিয়ত একটু একটু করে ধসে পড়ছে পারিবারিক বন্ধন, সামাজিক শিষ্টাচার আর মূল্যবোধ। এ যেন মানুষ নিজের হাতে নিজের মারণাস্ত্র তৈরি করেছে।
ইন্টারনেট বিশ্বকে আমাদের হাতের মুঠোয় এনে দিয়েছে। তথ্যমতে, দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা বিগত ৯ বছরে এক শ’ গুণ বেড়ে দেশে বর্তমানে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা আট কোটি, যা ২০০৮ সালে মাত্র আট লাখ ছিল। ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণে এটি খুশির সংবাদ হলেও ইন্টারনেট আসক্তির দিক থেকে বিবেচনা করলে এ সংখ্যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। ইন্টারনেটভিত্তিক আসক্তির মধ্যে ফেসবুক, বিভিন্ন ভিডিও গেইম, কুরুচিসম্পন্ন ওয়েব সাইটগুলো উল্লেখযোগ্য। ভিন্ন ভিন্ন মাত্রার অসংখ্য গেইম শিশু কিশোরদের আচ্ছন্ন করে রাখে নেশার মতো।
বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারী নারীর মধ্যে ৭৩ শতাংশ নানা ধরনের সাইবার অপরাধের শিকার হচ্ছে বলে জানিয়েছেন ডাক ও টেলিযোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম। তিনি জানান, ৪৯ শতাংশ স্কুল শিক্ষার্থী সাইবার হুমকির শিকার। (৮ মার্চ ২০১৭)।
টিভিতে শিশুতোষ কার্টুনের নামে যা দেখানো হচ্ছে তাতে শৈশব থেকেই শিশুরা অভিভাবকদের প্রতি অবজ্ঞা, বড়দের মতামতকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করা, বন্ধুদের অসম্মান করার মতো মানসিকতা নিয়ে বড় হচ্ছে। উদ্বেগের বিষয় যে, আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম পরিবারের সদস্যদের প্রতি বাড়তি আকর্ষণ বোধ করে না যতটা করে অনলাইনে। স্মার্টফোন কিংবা কম্পিউটারে তারা উপভোগ করছে বিভিন্ন মেজাজের গেইম। যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা, কার রেস, কার ক্রাশ, প্রতিপক্ষ সেজে গেইমের নির্ধারিত চরিত্রকে ধরে তাকে নাজেহাল করা ইত্যাদি। এ জাতীয় খেলায় বুঁদ হয়ে থাকছে শিশু-কিশোররা। সমাজবিচ্ছিন্ন আত্মকেন্দ্রিক প্রাণীর মতো জীবনাচরণ তাদের। প্রতিবেশীদের সাথে মেলামেশা করে না, বাসায় আত্মীয়স্বজন এলে ভ্রুক্ষেপ করে না, সামাজিক আচার অনুষ্ঠান, খেলাধুলা থেকেও বিচ্ছিন্ন রাখে নিজেদের। ফলে তাদের মধ্যে সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়াটি ঘটছে না বললেই চলে। এমনকি ভালো মন্দের প্রভেদ করার মতো ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে উঠছে না। ফলে মা-বাবা বা বড়দের ভালো উপদেশে তারা নিজেদেরকে অপমানিত বোধ করে পরিবারের সদস্যদের সাথে সম্পর্কের দূরত্ব বাড়িয়ে চলতে চেষ্টা করছে। বিদ্যালয়ে শিক্ষকেরা পড়াশোনার জন্য তাগিদ দিলে প্রতিবাদমুখোর হয়ে উঠছে। আন্তরিকতাশূন্য হয়ে অজান্তেই হয়ে উঠছে অসহিষ্ণু।
চীনের একদল বিশেষজ্ঞ বলেছেন, সাধারণত আসক্তরা ইন্টারনেটে পাঁচ ধরনের কাজে বেশি ডুবে থাকেÑ
১. অনলাইন গেম খেলতে খেলতে কারো সময় কেটে যায়,
২. কেউ সুপ্ত অথবা বিকৃত আকাক্সক্ষা মেটাতে বিরতিহীন ঘুরে বেড়ায় পর্নোগ্রাফির সাইটগুলোতে,
৩. বাস্তব জীবনে লাজুক কিংবা অন্তর্মুখী কেউ নতুন বন্ধুদের নিয়ে নিরবচ্ছিন্ন আড্ডায় মেতে ওঠে সোস্যাল নেটওয়ার্কিং সাইটে,
৪. ইন্টারনেট শপিং হয়ে ওঠে কারো ধ্যান-জ্ঞান,
৫. কেউ বা এমনিতেই ঘুরে বেড়ায় সাইবার দুনিয়ার অলি-গলিতে।
ভার্চুয়াল জগতে থাকাকালীন বাস্তবের কেউ যদি তার সামনে আসে যেমন, মা-বাবা কোনো কথা বলতে আসেন বা মোবাইল ফোনটাও বেজে ওঠে, তাহলে আসক্ত ব্যক্তির মেজাজ রুক্ষ হয়ে ওঠে।
ফেসবুক, টুইটার ও মাইস্পেসসহ ইন্টারনেটভিত্তিক সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলো আমাদের সামাজিক ব্যাধিগুলোকে দুরারোগ্য ক্ষততে পরিণত করে তুলেছে। আদৌ এ থেকে পরিত্রাণ সম্ভব কি না তা কেউ জানে না। জালের মতো এটি শিশু থেকে বৃদ্ধ পর্যন্ত মানুষের চিন্তা, মনন আর সৃজনশীলতাকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছে। আবালবৃদ্ধবনিতাসহ সব স্তরের নারী-পুরুষেরাই ফেসবুকের নতুন নতুন কৃত্রিম বন্ধুদের মাঝে জীবনের আস্বাদন সন্ধানে ব্যস্ত। পারিবারিক বন্ধনে শৈথিল্য, পেশাগত কিংবা সেবামূলক কাজে অনীহা ছাড়াও সমাজের মানুষের সাথে অসৌহার্দ পূর্ণ আচরণ, পরশ্রীকাতরতা, উচ্চাভিলাষ এবং প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে মিথ্যাচার এখন সমাজের প্রচলিত প্রথায় পরিণত হয়েছে। অবাধ যোগাযোগের কারণে মানুষ নিজের অবস্থান ও পরিচিতি ভুলে সম্পৃক্ত হচ্ছে অপরাধমূলক ও অনৈতিক কর্মকান্ডে। বিবেকবোধ জলাঞ্জলি দিয়ে হিংস্রতা, সন্ত্রাস আর আধিপত্যবাদের দিকে ঠেলে দিচ্ছে সমাজকে। এ নেশা মাদকের মতোই ভয়ঙ্কর।
একজন মাদকাসক্ত ব্যক্তির যেমন মাদক সংগ্রহ ও গ্রহণকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয় দৈনন্দিন চিন্তা ও জীবন এবং ধ্বংস হতে থাকে তার শিক্ষাজীবন, ব্যর্থতা বাড়তে থাকে কর্মক্ষেত্রে, সামাজিক জীবনে তেমনি একই ঘটনা আমরা দেখতে পাই ফেসবুক ব্যবহারকারীদের ক্ষেত্রেও। ফেসবুক আসক্তদেরও তৈরি হয় ‘টলারেন্স’। প্রতিদিন একটু একটু করে বাড়তে থাকে ফেসবুকে কাটানো সময়ের পরিমাণ। মানসিকভাবে পুরোপুরিভাবে এর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে তারা। মাদকাসক্তদের যেমন কয়েক ঘণ্টা মাদক না নিলে দেখা দেয় শারীরিক-মানসিক নানা উপসর্গ যা উইথড্রল সিম্পটম নামে পরিচিত, ফেসবুক আসক্ত ব্যক্তিরাও বেশিক্ষণ অফলাইনে থাকলে অস্থির, উদ্বিগ্ন ও খিটখিটে মেজাজের হয়ে যায়। নেশাগ্রস্ত ব্যক্তির মাদক গ্রহণের মতোই ফেসবুক আসক্ত ব্যক্তিও অনলাইনে ফিরতে পারলেই স্বস্তিবোধ করে থাকে।
অন্য যেকোনো আসক্তির মতো প্রযুক্তির মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার মানুষের বাস্তব জীবনে বিরূপ প্রভাব ফেলেছে। স্বামী-স্ত্রী, বাবা মা, প্রিয়জনের মধ্যে অহেতুক ঝগড়া, বাক-বিতণ্ডা এবং পরিণামে আস্থা ও বিশ্বাসের সঙ্কট।
অনেক রাত জেগে নেটে-সার্ফিং করায় অনিন্দ্রা জন্ম দেয়, হয় আরো নানা সমস্যা। চুল পড়ে যাওয়া, স্থূল হয়ে যাওয়া, ব্যাকপেইন ও মাথাব্যথা জাতীয় বহুবিধ সমস্যা। একজন ইন্টারনেট ব্যবহারকারী যেকোনো বয়সেই ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হতে পারে বলে দাবি করেছেন যুক্তরাজ্যের একদল গবেষক। চার হাজার ৫০০ শিশুর ওপর পরিচালিত ওই গবেষণায় দেখা যায়, দুই ঘণ্টার বেশি সময় ধরে যেসব শিশু প্রযুক্তির পর্দার সামনে বসে থাকে তাদের শরীরে টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা প্রকট।
একবিংশ শতকের লক্ষ-কোটি সম্ভাবনার উদাত্ত আহ্বানে সাড়া দেয়া যেমন সময়ের দাবি, তেমনি প্রযুক্তির অপব্যবহার রোধ করে অবক্ষয়মুখী সমাজকে সুস্থ, সুন্দর আর পরিশীলন করে গড়ে তোলাও আজ সময়েরই দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
খুব বেশিদিন আগের কথা নয়। জমি কর্ষণ করার ট্রাক্টর প্রযুক্তি ব্যবহার করে বাংলাদেশের মানুষের হাতেই তৈরি হয়েছিল নসিমন, ভটভটি ইত্যাদি মানুষবাহী যান। ওইসব গাড়ি রাস্তায় চলাচলের অনুপযোগী হওয়ায় প্রায়ই দুর্ঘটনায় পতিত হয়ে মানুষের প্রাণনাশের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। সে সময় বাংলাদেশ সরকার আইনগতভাবে সব নসিমন জাতীয় ট্রাক্টরচালিত গাড়ি নিষিদ্ধ করে দেয়। তবে আজ আমাদের সামাজিক অবক্ষয়ের হাত হতে রক্ষা করতে খারাপ প্রভাব সৃষ্টকারী ওয়েবসাইটগুলো বন্ধ করতে সরকারি উদ্যোগ নেই কেন? প্রাণঘাতী গেইম জেনেও কেন চিরতরে বন্ধ না করে মাত্র ছয় মাসের জন্য ব্লু হোয়েল জাতীয় গেমের লিংক বন্ধ করা হলো? কেন নিশ্চিত করা যাচ্ছে না ইন্টারনেটের সুনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার? ট্রাক্টরচালিত গাড়ি জনমানুষের প্রাণ নিয়েছে আর সুলভ অবাধ ইন্টারনেট সেবা এ দেশ ও এ জাতিকে হত্যা করে চলেছে। তবে আমরা কেন জেগে ঘুমাচ্ছি? হ