বিশাল বড় হাওর। টলটলে স্বচ্ছ পানি। খালি চোখে তাকালে ধোঁয়া ধোঁয়া দেখা যায়। হাওরের ঠিক মাঝখানে ছোট্ট একটি দ্বীপ। দ্বীপে অসহায়ের মতো দাঁড়িয়ে আছে তিনটি গাবগাছ ও দুটি গামাইর গাছ। দু’টি গাবগাছ পাশাপাশি। আরেকটি একটু দূরে। তাদের সাথে নির্বাসিত জীবন যাপন করছে একটি বড় বক ও দুটি ক্ষুদে মাছরাঙা। পাশাপাশি দুটি গাবগাছের একটিতে বড় বকের বাস। আরেকটিতে একটি মাছরাঙার বাস। দূরের গাবগাছটিতে আরেক মাছরাঙা বাস করে। বড় বকটা অহঙ্কারী ও নিষ্ঠুর। সবসময় রূপের বড়াই করে। মাছরাঙার সাথে বড়াই করে প্রায়ই বলে,‘আমার গায়ে বিশুদ্ধ সাদা পালক। হলুদ ঠোঁট। লম্বা পা। আমি পানিতে হেঁটে হেঁটে শিকার ধরতে পারি। আর তুই কত ছোট্ট! যখন ডালে বসে থাকিস, তোকে দেখাই যায় না।’
বকের কথায় মাছরাঙা মন খারাপ করে না। কারণ সে জানে, সে নিজেও অনেক সুন্দর পাখি। তার শরীর নীল-সবুজে মেশানো। গলা সাদা। দেহের নিচের অংশ কমলা-বাদামি। পা লাল। ভুরু লালচে বাদামি। সুঁচালো ঠোঁট। তা ছাড়া সে দক্ষ শিকারি। শিকার করার জন্য তাকে পানিতে হাঁটতে হয় না। ডালে বসে টহলদার মাছের দিকে তীক্ষè দৃষ্টি রাখে। সই হলে ঝুপ করে ডাইভ মারে মাছের ওপর। এগুলো সে কখনোই বকের সামনে বলে না। বককে সে সবসময় তোয়াজ করে চলে। নানাভাবে বকের মন জয় করার চেষ্টা করে। মাঝে মাঝে দু-একটা মাছ ধরেও তাকে দেয়। কিন্তু কিছুতেই সে বকের মন জয় করতে পারে না। বক তাকে নানা ফাই-ফরমাশ খাটতে দেয়। মাছরাঙা সবই করে দেয়। মুখবুজে সহ্য করে সবই। কখনো কোনো উচ্চবাচ্য করে না। তারপরও সামান্যতেই রেগে যায় বক। নানাভাবে অত্যাচার করে তাকে। লম্বা ঠোঁট দিয়ে ঠোকর দিয়ে তার নীল পালক ছিঁড়ে ফেলে। আর নানাভাবে শাসায়। বলে, তোকে দ্বীপছাড়া করব। মাছরাঙা চমকে ওঠে। তার আদি পুরুষরা এ দ্বীপেই বাস করেছে। এ দ্বীপ তার নাড়িপোতা জায়গা। সে যখন খুব ছোট্ট, ঠিকমতো উড়তে পারে নাÑ তার মা তাকে এ গাবগাছের এ ডাল ও ডাল করে উড়াল শিখিয়েছে। তার সব মনে আছে। এত দিন তার মা-ই তাকে আগলে রেখেছে। হঠাৎ এক ঝড়ে তার মা মারা যায়। তারপর থেকে সে একা। তার থেকে একটু দূরে গাবগাছে যে মাছরাঙা বাস করে, সে খুব সুখে আছে। বক তার কাছে কখনো যায় না। সে তার আত্মীয় না হলেও তো জাতভাই! কিন্তু সে কোনো খোঁজখবর রাখে না।
একদিন বকটা বিনা কারণে মাছরাঙাকে ঠোকরিয়ে রক্তাক্ত করল। আর হুমকি দিলো মেরে ফেলার। মাছরাঙাটা নিরুপায় হয়ে তার জাতভাইয়ের কাছে চলে গেল। তাকে সব খুলে বলল। সে এ ব্যাপারে কোনো আগ্রহ দেখাল না। মাছরাঙাটা তাকে খুব করে বুঝিয়ে বলল, ‘দেখো আমরা জাতভাই। আমার বিপদে তোমার এগিয়ে আসা উচিত। মিলেমিশে একটা প্রতিবাদ করা উচিত। নইলে বেটা বক আমাদের সবার ঘাড় মটকাবে। তা ছাড়া এত ভয়ের কী আছে? আমরা দু’জন এক থাকলে সে আমাদের সাথে পারবে না। সে যখন আমাকে ঠোকরাতে আসবে, তুমি পেছন থেকে তার পিঠের বাহারি পালক ছিঁড়ে ফেলবে। আবার তোমাকে ঠোকরাতে গেলে আমি তার পিঠে ঠোকর বসাব। সে তখন বুঝবে আমরাও আঘাত করতে জানি। আমাদের আর তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করার সাহস পাবে না। আর আমি যদি চলে যাই, সে তোমাকেও আস্ত রাখবে না।’
জাতভাই সব শুনে বলল, ‘তুমি বিপদে পড়ে আমাকেও ফেলতে চাচ্ছ। আমরা প্রতিবাদ করতে গেলে সে মাছের মতো আমাদেরও গিলে খাবে। তখন বুঝবেÑ কত মাছে কত শুঁটকি। তোমার ঝামেলা তুমি মেটাও ভাই। আমি এর আগে পিছে নেই। আমাকে সুখে থাকতে দাও।
বকের ঠোকরে পিঠ রক্তাক্ত হয়েছে। জাতভাইয়ের কথায় মনটা রক্তাক্ত হয়ে গেল। মনের দুঃখে বাপ-দাদার ভিটে ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিলো সে। গাবগাছের ডালে মাথা ঠেকিয়ে বলল, ‘তোমাকে ছেড়ে আমি চলে যাচ্ছি। হয়তো আর তোমার সাথে দেখা হবে না।’ ঝিরঝিরে বাতাসে গাবের কচি লালচে পাতা মাছরাঙার পিঠে পরশ বুলায়। মাছরাঙার চোখে পানি এসে যায়। সে অচেনার উদ্দেশ্যে উড়াল দেয়। বারবার পেছন ফিরে তাকায়। দেখতে দেখতে গাবগাছ অদেখা হয়ে যায়।
কিছু দিন যেতে না যেতেই বক অপর মাছরাঙাকে ডাকল। মাছরাঙা বকের কাছে গিয়ে ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে গেল। বক রক্তচক্ষু করে তাকাল। বলল, ‘তুমি এত নির্বোধ কেন? দেখনি, আগের জনকে কিভাবে তাড়িয়েছি? আমার রাজ্যে বাস করবে, আর আমার ফাই-ফরমাশ খাটবে নাÑ এটা কী করে হয়, বলো? যাও, আজ সারা দিন আমার বাসা গোছাবে। ও আরেকটি কথা, দু’দিন ধরে আমার শরীরটা তেমন ভালো যাচ্ছে না। আমাকে দু’টি মাছ ধরে দিও।
মাছরাঙার মন খুব খারাপ হলো। তার জাতভাইয়ের কথা খুব মনে পড়তে লাগল। সে তো ঠিকই বলেছিল। আমাদের প্রতিবাদই হতে পারত শ্রেষ্ঠ প্রতিষেধক। দু’জনে মিলে প্রতিবাদ করলে মাথা উঁচু করে বাঁচতে পারত। এভাবে অপমানিত হয়ে বেঁচে থাকার কোনো মানে হয় না।
