পুতুল দেখে রূপা খুবই খুশি হলো। অফিসে যাওয়ার পথে বহুবার পুতুলের জন্য বায়না ধরেছে রূপা। কিন্তু রূপার আব্বা নাসিম সাহেবের সময় এবং সুযোগের অভাবে মেয়ের সামান্য আবদার পূরণ করতে অনেকখানি বিলম্ব হলো।
প্রচণ্ড রোদে অথবা কাঠ ফাটা বিকেলে রূপাদের পুতুল খেলার হিড়িক পড়ে যায়। সমবয়সী পিংকু, রিনা, এশা, সাথী, শিহাব এসে ভিড় জমায় রূপাদের বাসার পেছনের বটগাছটার নিচে। জায়গাটা খোলামেলা অথচ রোদমুক্ত এলাকা। চার পাশ ঘিরে রয়েছে অসংখ্য গাছগাছালি, সবুজ গাছেরা সূর্যালোক নিবারণের জন্য শাখা প্রশাখা মেলে দিয়েছে।
রঙিন রঙিন কাপড় পরিয়ে ওরা রঙ- বেরঙের পুতুল নিয়ে আসে বটবৃক্ষের ছায়ায়। খেলার ধরনটাই ভিন্ন প্রকৃতির। কেউ বাবা সাজে, কেউবা মা। বিয়ের প্রাক্কালে নানা রকম কথাবার্তা পাকাপাকি করে নেয় রূপা এবং রিনারা। মিছেমিছি খাওয়া দাওয়ার পর্বও শেষ হয়। বেজায় তৃপ্তির খাওয়া, সবাই এ নিয়ে উল্লাসে ফেটে পড়ে।
শরতের উত্তপ্ত দুপুর। সকালে মৃদু ঠাণ্ডা বাতাস বইলেও এখন আর নেই। প্রচণ্ড গরমে বিয়েবাড়ির লোকজনও অস্থির হয়ে ওঠে।
বাবা-মার চোখ ফাঁকি দিয়ে আজও সেই বটতলায় এসেছে ওরা, সাথে নানা রকম পুতুল।
রিনাও জিদ ধরে আব্বার কাছ থেকে বড় একটি পুতুল আনিয়ে নিয়েছে, প্রতিযোগিতামূলক পুতুল কেনার হিড়িক পড়েছে যেন।
আজকে পুতুলের বিয়ের দিন ধার্য হবে। রূপাকে দেখে আজ খুব মুরব্বি মনে হলো, এক ধরনের ঢং করেই বললÑ
‘এই রিনা, টমি-আর মমিকে এক জায়গায় রাখো, ওরাও পরস্পরকে দেখে নিক।’
রিনা মুরব্বির মতো বলল, ‘আমরা থাকতে ওদের আবার দেখা দেখির প্রশ্ন উঠছে কেন?’
রূপা বলল,
‘আজ কালকার দিনে ছেলেমেয়েদের দেখাদেখি ছাড়া বিয়ে হয় না বুঝলে?
রিনা আর কথা না বাড়িয়ে বললÑ বেশ তবে তাই হোক।
বটগাছটার নিচে টমি এবং মমিকে দেখতে সুন্দর মনে হলো, প্রকৃত অর্থে মনে হলো ওরা যেন নতুন বর-বউ। ওদের ঘিরে রয়েছে ছেলেমেয়ের দল। ওরাও পুতুল খেলা দেখতে এসেছে।
রূপা ছেলেমেয়েদের ভিড় সরিয়ে দিয়ে বললÑ
কি দেখছ তোমরা হাঁ করে, এখানে বিয়ের কথা পাকাপাকি হচ্ছে। তোমাদের থাকার দরকার নেই। তোমরা বরং বিয়ের দিন এসো। কাল ওদের বিয়ে।
রূপার কথা কেউ শুনল না বরং সবাই হো হো করে হেসে উঠল।
রূপার অনেক রাগ হলো, কিন্তু কাউকে কিছু বলল না সে। শুধু সোহাগ করে টমিকে কোলে নিয়ে বলল, ‘টমি কাল তোমাকে শ্বশুরবাড়ি যেতে হবে, ওরা তোমায় খুব যতেœ রাখবে।’
রূপার চোখের পাতা ভারী হয়ে এলো, বিরহের সুর তার মনে বাজতে লাগল।

এ রাত যেন আর পোহাতে চায় না। অবশেষে রাত কাটল। আজ রূপা একটি সুন্দর লাল শাড়ি পরেছে। টমিকেও মনের মতো করে সাজিয়েছে রূপা। এসব দেখে রূপার মা জিজ্ঞাসা করলেনÑ কী ব্যাপার রূপা, পুতুল নিয়ে এভাবে সেজে গুজে কোথায় যাচ্ছ?
রূপা বললÑ ‘আজ আমার টমির বিয়ে’।
কথা শুনে মা কিছুক্ষণ হাসলেন।
অবশেষে টমিকে কোলে নিয়ে রূপা হাঁটল বটতলায়। বটতলার পাশে বড় একটা পুকুর। পুকুরের এ পারে রূপাদের বাড়ি। ওপারে রিনাদের বাড়ি।
নতুন বর-বউ বাড়ি নেয়ার জন্য কলার ভেলার ব্যবস্থা করা হয়েছে। রঙিন কাগজ দিয়ে ঝালর এঁটে দিয়েছে ছেলেমেয়েরা।
বিউটি আর সেতারা বিয়ের গান ধরেছে।
বিয়ের অনুষ্ঠানে আসা ছেলেমেয়েরা মজা করে বিয়ের দৃশ্য উপভোগ করছে।
কলার ভেলায় টমি এবং মমিকে পাশাপাশি বসিয়ে রাখা হলো। এখনই ভেলা ভেসে যাবে নতুন বর-বউকে নিয়ে।
রূপা রিনার হাত দুটো ধরে বললÑ
রিনা আমার টমিকে দেখো, ওকে তোমাদের হাতে সঁপে দিলাম। ওকে যেন কোনো কষ্ট দিও না, ও কিন্তু আমার বড় আদরের। রূপার চোখে জল। রিনাও ছলছল চোখে বললÑ
‘তুমি কোনো চিন্তা করো না রূপা, টমি আমার ওখানে খুব ভালো থাকবে। ওকে কোনো দিন এতটুকু কষ্ট দেব না। রূপা হু হু করে কেঁদে উঠল। টমির মাথায় বারবার হাত বুলিয়ে বলতে লাগল।
‘যাও টমি, আমি তোমাকে দু’দিন পর গিয়ে নিয়ে আসব।’
টমি ও মমির ভেলা চলতে লাগল।
রূপার বুকের এক পাশ ভেঙে গেল। যেন সত্যিকার অর্থে সে কন্যার বিদায়ের ব্যথা অনুভব করতে লাগল। অথচ রূপাও জানে না, তাকেও টমির মতো একদিন কারো হাত ধরে পরের ঘরে যেতে হবে।