মানুষ স্বাধীন থাকতে চায় ব্যক্তিগতভাবে, সামাজিকভাবে ও রাষ্ট্রনৈতিকভাবে। স্বাধীনতা যেকোনো জাতির পরম আকাক্সিত বিষয়। আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার লাভ, গণতান্ত্রিক সুশাসন প্রতিষ্ঠা, ন্যায়নীতিভিত্তিক সমাজ গঠন, অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জন, জানমালের নিরাপত্তা বিধান, ধর্মপালন, নিজস্ব সংস্কৃতি-মূল্যবোধ-বিশ্বাসের অবারিত চর্চা নিশ্চিত করা প্রভৃতি সাধারণ জাতীয় আকাক্সা বাস্তবায়নের জন্য স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব প্রতিটি জাতির জন্য অপরিহার্য।
স্বাধীনতা মানুষের মৌলিক ও মানবিক অধিকার। দীর্ঘ সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় অনেক সংগ্রাম-আন্দোলন, ত্যাগ-তিতিা ও অসংখ্য প্রাণের বিনিময়ে রক্তয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে ১৯৭১ সালে অর্জিত হয়েছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা। বিশ্ব মানচিত্রে অস্তিত্বময় হয় বাংলাদেশ। পুরো জাতির অপরিসীম ত্যাগের বিনিময়েই স্বাধীনতার স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয়।
ভাষা আন্দোলন, স্বায়ত্তশাসন ও স্বাধিকার আন্দোলনের পথ ধরে ১৯৭১ সালে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে অবতীর্ণ হতে হয়। বাংলাদেশকে পরাধীনতার শৃঙ্খলামুক্ত করতে সামরিক-বেসামরিক নির্বিশেষে সব পেশা ও বয়সের মানুষ ঝাঁপিয়ে পড়েছিল স্বাধীনতা সংগ্রামে। শরীরের রক্ত ঝরানো ছাড়াও তাদের সহ্য করতে হয়েছে বহু জুলুম, নির্যাতন ও নিপীড়নের অব্যক্ত যন্ত্রণা। দীর্ঘ ৯ মাসের রক্তয়ী লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে যে বিজয় অর্জিত হয় তাতে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে। লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে টানা ৯ মাসের মরণপণ লড়াই ও সশস্ত্র প্রতিরোধ যুদ্ধের পর সাড়ে সাত কোটি মানুষ পেয়েছিল নিজস্ব মানচিত্র, নিজের মতো করে একটি লাল-সবুজ পতাকা। অযুত জনতার আপসহীন মনোভাব ও বুকের তাজা রক্তের বিনিময়ে বাংলাদেশ আজ স্বতন্ত্র স্বাধীন জাতিসত্তায় বিশ্ববুকে অধিষ্ঠিত।
প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির প্রসঙ্গ উঠলে দেখা যাবে, বিগত আটচল্লিশ বছরে বাংলাদেশের অর্জন একেবারে কম না হলেও যতটা হওয়ার সম্ভাবনা ও সুযোগ ছিল, ততটা অর্জিত হয়নি। স্বাধীনতা সংগ্রামের পেছনে রাজনৈতিক আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার, গণতান্ত্রিক অধিকার, অর্থনৈতিক মুক্তি নিশ্চিত করা এবং বৈষম্যমুক্ত সমাজ, সুশাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন সক্রিয় ছিল। প্রায় পাঁচ দশক সময় অতিক্রান্ত হলেও গণতন্ত্র শক্ত ভিতে দাঁড়িয়েছে, বাস্তবতার আলোকে তা বলার সময় আসেনি। সহনশীলতা, ধৈর্যশীলতা, সবার জন্য আইনের সমপ্রয়োগ নিয়ে এখনো প্রশ্ন তোলার সুযোগ মেলে। সঙ্ঘাত-সহিংসতা ও প্রতিহিংসার রাজনীতি থেকে এখনো বেরিয়ে আসা যায়নি। জনগণ এখনো রাজনীতি নিয়ে উদ্বেগ ও শঙ্কা প্রকাশ করে থাকেন। নাগরিকদের আত্মরা ও প্রতিরোধ চেতনা গড়ে ওঠার জন্য প্রয়োজন উদ্বেগ ও শঙ্কামুক্ত, ঐকমত্যের বলীয়ান শক্তির। প্রয়োজন আস্থাবান ও সততার নেতৃত্ব।
স্বাধীনতা অর্জনের জন্য বেশি প্রয়োজন সংগ্রাম ও শক্তির। আর স্বাধীনতাকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন প্রযুক্তি, কৌশল, ঐক্য ও ন্যায়বোধ। এ ছাড়া স্বাধীনতাকে রা করতে জ্ঞান, বুদ্ধি, শিা ও সৎ বিবেচনাকে কাজে লাগানো একান্ত অপরিহার্য। জনগণ যথেষ্ট সচেতন ও সঙ্ঘবদ্ধ না হলে স্বাধীনতাকে রা করা যায় না। স্বাধীনতা রার জন্য স্বাধীনতাকে মর্যাদা দিতে হয় এবং সদা সতর্ক থাকতে হয়। স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব সংরণের এই মৌল চেতনায় সবাইকে অনুপ্রাণিত হওয়ার বিকল্প নেই।
বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছিল এক রক্তয়ী সর্বাত্মক জনযুদ্ধের মধ্য দিয়ে। কিন্তু এ লড়াই, এ বিপুল আত্মত্যাগ নিছকই একটা ভূখণ্ড, জাতীয় সঙ্গীত, পতাকা বা মানচিত্রের জন্য ছিল না। সুদীর্ঘকাল শোষণ ও বঞ্চনার, বৈষম্য ও বৈরিতার বিপরীতে মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে জাতি হিসেবে বাংলাদেশের জনগণ নিজেদের জন্য এমন একটি রাষ্ট্রকাঠামো পেতে চেয়েছিল, যা কতগুলো সুনির্দিষ্ট আদর্শ ও মূল্যবোধকে ধারণ করবে। নাগরিকদের মধ্যে সেগুলো নির্বিঘœ চর্চার পরিসর তৈরি করবে। পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মধ্যে সেসব আদর্শ ও স্বপ্নের বাস্তবায়ন সম্ভব ছিল না বলে পাকিস্তান রাষ্ট্র হিসেবে টেকেনি। মুক্তির সংগ্রাম অনিবার্য হয়ে উঠেছিল।
মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ নামে সার্বভৌম জাতি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ইতিহাসে একটি অনন্য ও অভিনব বাস্তবতা তৈরি হয়। মুক্তিযুদ্ধের সাফল্য এক দিকে বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীকে একটি স্বাধীন জাতি হিসেবে অভিষিক্ত করে, অন্য দিকে নতুন রাষ্ট্রকাঠামোর ভেতরে দীর্ঘ সংগ্রামের ফসল হিসেবে পাওয়া সেসব আদর্শ ও মূল্যবোধ চর্চার এক কঠোর দায় আরোপ করে এবং অবারিত সম্ভাবনার সুযোগ করে দেয়। মুক্তিযুদ্ধ তাই একাধারে এক দীর্ঘ রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক লড়াইয়ের সমাপ্তি এবং আরেকটি আত্মমর্যাদা লাভের দীর্ঘ লড়াইয়ের সূচনা।
স্বাধীনতার পর প্রায় অর্ধশতক পথ আমরা পাড়ি দিয়ে এলাম। আর তিন বছর পর এর স্বর্ণজয়ন্তী। এখন তাই আমাদের সময় হয়েছে, মুক্তি ও স্বাধীনতা সংগ্রামের মধ্য দিয়ে পাওয়া সেসব আদর্শ ও স্বপ্নের দিকে আরেকবার ফিরে তাকানোর, তার কতটা আমরা পূরণ করতে পারলাম বা পারলাম না তার হিসাব কষে দেখার।
১৯৫২ থেকে ১৯৭১ সালের দুই দশকের আন্দোলনের দাবিগুলোর মধ্যে, যুদ্ধদিনে আত্মোৎসর্গের পেছনের অমর স্বপ্নের মধ্যে নিহিত হয়ে আছে সেসব আদর্শ, মূল্যবোধ আর স্বপ্ন তাকে ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ বলে অনুভব করা হয়। ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’র মধ্যে সেসব আদর্শ, মূল্যবোধ আর স্বপ্ন মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা যেসব আদর্শ ধারণ করে তাদের অন্যতম হচ্ছে সব ধরনের শোষণ বঞ্চনা ও বৈষম্য থেকে মানুষের সার্বিক বিকাশের মুক্তি, বিভিন্ন ধর্মীয় ও ুদ্র জাতিসত্তাসহ বাঙালি জাতিসত্তা, উদার উন্মুক্ত গণতন্ত্র, দলমত নির্বিশেষে অসাম্প্রদায়িকতা, মৌলিক অধিকার অর্জনে সাম্য ও মানবাধিকার।
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর থেকেই এর পশ্চিম ও পূর্ব অংশের মধ্যে নানা বৈষম্য স্পষ্ট হয়ে উঠতে শুরু করে। এই দুই অংশে খুব স্পষ্টভাবে দুই বিপরীতমুখী অর্থনৈতিক কর্মসূচি অনুসরণ করা হয়। রফতানিতে এগিয়ে থাকা সত্ত্বেও দেশের পূর্ব অংশে বিনিয়োগ হয় কম। বড় ও ভারী শিল্পকারখানা প্রায় সবই গড়ে ওঠে পশ্চিম অংশে। পূর্ব অংশের ব্যবসায়-বাণিজ্য থেকে শুরু করে অর্থনীতির সার্বিক নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখে পশ্চিমের অল্প কয়েকটি ধনাঢ্য পরিবার। সরকারি চাকরি ও সামরিক বাহিনীতে দেখা দেয় কোটার ব্যাপক বৈষম্য। এ পরিস্থিতির প্রকাশ ঘটে দুই অর্থনীতির তত্ত্বে। অতি দ্রুত বাঙালিদের স্বপ্নভঙ্গ ঘটতে শুরু করে। এর রাজনৈতিক প্রতিফলন দেখা দেয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও আওয়ামী লীগের দেয়া ছয় দফায়। ছাত্রদের ১১ দফা দাবিতে এ বৈষম্য ঘোচানোর দাবি আরো স্পষ্ট রূপ পায়। স্বাধীনতার দাবির সাথে মিলেমিশে যায় বৈষম্য বিলোপের আকাক্সা।
মানুষের জন্য মানুষের ভালোবাসা, সহমর্মিতা ও সর্বোপরি মুক্তির স্পৃহা, যা মুক্তিযুদ্ধের পুরো সময়টায় জনমনে সংহতি নির্মাণ করেছিল, যেসব গুণাবলি দেশের জন্য শীর্ষ ত্যাগে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল তার অনেকটাই ম্লান হয়ে যায় স্বাধীনতার পরপর। এর একটি বড় কারণ হলো যুদ্ধের সময়টায় যে জনগণ অর্থবিত্তের সাথে সম্পর্কহীন ও শেকড়বিহীন অবস্থায় মনোজাগতিক ভূমিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছিল, স্বাধীনতার পরপর তারা ভৌগোলিক ভূমি ও অর্থবিত্তকে অধিকতর গুরুত্ব দেয়। এতে যে মঙ্গলময় চিন্তা ও আকাক্সা আপন আত্মার ুদ্র বলয়কে ছিন্ন করে ব্যক্তিকে সর্বজনীন আবর্তে নিয়ে গিয়েছিল তা স্বাধীনতার পরপর যেমন ছিন্নপত্রের মতো ভেসে যায়, তেমনি বাস্তবতার চাপে স্বার্থান্ধ চিন্তার আবর্তে ব্যক্তির শুদ্ধ অবস্থান ও মূল্যবোধ গভীর অতলে হারিয়ে যায়।
বৃহত্তর চাওয়ার মাঝে যে ুদ্র চাওয়া এবং সঙ্কীর্ণ চিন্তাগুলো চাপা পড়েছিল সেটিই স্বাধীনতার পর মুখ্য হয়ে ওঠে। এতে গৌণ হয়ে ওঠে সর্বজনীন স্বাধীনতা ও ব্যক্তিসত্তার মর্যাদা। শক্তি ও ঔদ্ধত্যের কাছে পরাভূত হয় মানুষের অধিকার ও মর্যাদা; গৌণ হয়ে ওঠে শান্তির অন্বেষণ। যে আকাক্সাকে কেন্দ্র করে দর্শনের চিন্তাগুলো আবর্তিত হয় তা তবিত হওয়ায় গঠনমূলক দর্শন তৈরি অসম্ভব হয়ে ওঠে। স্বাধীনতা-উত্তর সমাজে শূন্যতা, হতাশা, নৈরাজ্য ও মতার ঔদ্ধত্য বা সঙ্ঘাত-সহিংসতার নেতিবাচক দর্শনের চর্চা শুরু হয়। বিচারের প্রতি, জীবনের প্রতি এবং সামগ্রিক জীবনের ইতিবাচক প্রবাহের প্রতি আস্থা হারিয়ে হতাশাগ্রস্ত জাতি কেবল আত্মপরিচয়ের সঙ্কটে নয়, অস্তিত্ব সঙ্কটেও নিমজ্জিত হয়। যে প্রেম ও মানবতা নানামুখী ভেদজ্ঞানকে নি¤œপর্যায়ে এনে বেদনার বাঁধন মাঝে মানবসত্তাকে সমুজ্জ্বল করেছিল, সেই প্রত্য বেদনা নি¤œস্তরে নেমে আসায় বহিরাগত শত্রু অল্য ছায়ামানুষ হয়ে ওঠে আর আপন মানুষগুলোই স্বার্থের টানাপড়েনে নতুন শত্রু হয়ে যায়।
এ প্রক্রিয়ায় যে লুটেরা অর্থনীতির উদ্ভব হয় তা বদলে দেয় সমাজ চিন্তা ও রাষ্ট্রের দর্শন। যাপিত জীবন, সংস্কৃতি, আত্মপরিচয়, জীবনের নানা আকাক্সাসহ সাধারণের অর্থবিত্ত ও সম্পদের যে কাঠামো মানুষের দর্শন ও মূল্যবোধ নির্মাণ করে, সেই স্থানটি একটি স্খলনের মুখে পড়ে। প্রতিটি যুদ্ধই মানুষের স্মৃতি, অনুভব ও বোধকে এমনভাবে নাড়া দেয়, যাতে তার চিন্তার উপাদান ও অলিগলি সবই বদলে যায়। এ কারণে কখনো সে শতবর্ষ এগিয়ে যায় বোধের ভূমিতে, আবার কখনো পিছিয়ে যায় হাজারও বছর। যুদ্ধের ধ্বংস, আঘাত ও চাপিয়ে দেয়া অনিকেত জীবন মুছে ফেলে মানুষের চিন্তার ভূমি; কখনো হারিয়ে যায় কয়েকটি প্রজন্ম।
বাংলাদেশের নতুন অর্থনৈতিক কাঠামোতে নবতর আকাক্সা ও অভাবের জীবনে বেশির ভাগ মানুষ হয়ে ওঠে এমন নুড়িপাথর, যার কাছে শ্যাওলা ও শেকড়ের গন্ধময় হারানো জীবনটি বর্জ্য বৈ কিছুই নয়। লোভ ও ভোগের আবর্তে মানুষ হারিয়ে ফেলে তার অনুসন্ধানের স্পৃহা, নিজের অজান্তে সে হয়ে ওঠে মতাবানদের ক্রীড়নক ও ভোগবাদী সমাজের পণ্য। বিবাদের সময় যেসব মানুষ ইতিবাচক চিন্তা ও বিশ্বাসের মধ্যে মুক্তি খুঁজেছিল, তাদের কেউ কেউ বিকৃত ও অসুস্থ চিন্তা এবং ততোধিক বিকৃত নাস্তিক চিন্তায় মগ্ন হয়ে পড়ে। সর্বোপরি প্রাধান্য পায় স্বার্থচিন্তা ও ভোগবাদ। বেশির ভাগ মানুষ ভোগবাদী সমাজের ক্রীড়নক ও খেলোয়াড় হয়ে ওঠে। অদূরদর্শী চিন্তার কারণে গভীর চিন্তাগুলো ও আত্মার মৌলিক জিজ্ঞাসাগুলো গৌণ হয়ে ওঠে।
আঁধারময় এই শূন্যতা ও হতাশার মধ্যে স্বাভাবিকভাবে নড়বড়ে হয়ে ওঠে মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস। এতে বিপন্ন মানুষ সর্বশক্তি দিয়ে হাতড়ে বেড়ায় একটি আস্থার ভূমি ও আশার সুবর্ণরেখা। নানা অপ্রাপ্তিতে হতাশ হয়ে ইহজাগতিক বিচার না পেয়ে মানুষ যুক্তির পথ ছেড়ে অদৃষ্টবাদিতা ও বিভিন্ন কুসংস্কারের দিকে ঝুঁকে পড়ে। যুদ্ধ-পরবর্তী সময়টাতে কোনো কোনো েেত্র এমনটিই ছিল সাধারণের মনের অবস্থা। যে ইতিবাচক ধর্মচিন্তা মানুষকে ইতিবাচক কাজে প্রণোদনা জোগায়, শুদ্ধ করে, সুন্দর করেÑ তাও বিভিন্ন কারণে সঠিকভাবে বিকশিত হওয়ার সুযোগ পায়নি।
যেসব চিন্তা আপন উপলব্ধির বলয় ছিন্ন করে বৃহত্তর ঐক্য নির্মাণ করে এবং ইন্টিগ্রেশনের মাধ্যমে একটি মহাসমুদ্র সৃষ্টি করে তার মধ্যে ুদ্র ুদ্র মলিনতা গৌণ হয়ে ওঠে। স্বার্থের ুদ্র বলয়ে, রাজনীতির অনুপ্রবেশের সাথে সাথেই লাভের হিসাব এবং পাপের মলিন ছোঁয়া প্রকট হয়ে ওঠে। সমষ্টির বৃহত্তর মঙ্গলের জন্য যে রাজনীতির সূচনা হওয়া উচিত, তা বেশির ভাগ েেত্রই ব্যক্তি অহংবোধ ও স্বার্থচিন্তার আবর্তে হারিয়ে যায়। অমৎবব ঃড় ফরংমৎবব দুশ্চিন্তার বিষয় হয়ে ওঠে। একজন মন্দ শিক তার আপন জ্ঞানকে যাচাই-বাছাই না করে তা সত্য প্রমাণ করতে সচেষ্ট হয়ে ওঠে। এভাবেই স্বাধীন দেশে মুক্তচিন্তা ও ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য কর্তৃত্ববাদী চিন্তাভাবনার কাছে পরাভূত হয়।
গুটিকয়েক মানুষের অহংপরিপুষ্ট স্বার্থান্ধ চিন্তার কাছে গৌণ হয়ে যায় কোটি মানুষের মঙ্গলভাবনা। সুস্থ প্রাপ্তিতে মানুষের মধ্যে যে সুখ ও তৃপ্তিবোধ সৃষ্টি হয়, সেটি যখন অসুস্থ অর্থনীতির আবর্তে তবিত হয়, তখন স্বাভাবিকভাবে অরাজকতা ও নানা নষ্ট ভাবনায় আচ্ছন্ন হয় সাধারণ মানুষ। দেশের নাগরিকেরা তখন কর্তৃপরে ওপর বিশ্বাস ও আস্থা হারায়। বন্ধুত্বের লেবাসে প্রতিবেশী দেশের আগ্রাসনকে এ দেশের মানুষ যেমন ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করে, তেমনি স্বার্থের খাতিরে সব কিছু দেখেও নীরবে মেনে নিয়ে যারা মাথানত করে থাকে তাদের প্রতি মানুষের অবিশ্বাস জন্মায়। দেশের সম্মানের কথা ভেবে এবং মানুষের ভেতর আস্থা ও বিশ্বাস দৃঢ় করার জন্য হলেও উচ্চপর্যায়ে না হোক, মাঠপর্যায়ে হলেও এর প্রতিবাদ হয়। কিন্তু দুঃখের বিষয়, সে পর্যায়ের ব্যক্তিরা ঠিকমতো কথাও বলতে পারেন না।
আগ্রাসন শুধু রাজনৈতিক মহলেই সীমাবদ্ধ থাকে না। এর বিস্তৃতি ঘটে সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অঙ্গনেও। আগ্রাসনের ইংরেজি প্রতিশব্দ ‘অমমৎবংংরড়হ, যার অর্থ হলো বিনা প্ররোচনায় আক্রমণ। কিন্তু বাংলাদেশে নিকট প্রতিবেশীদের থেকে যে আগ্রাসন অব্যাহত আছে তা শুধু আক্রমণেই সীমাবদ্ধ নেই; খুব পরিকল্পিতভাবে উল্লিখিত গুরুত্বপূর্ণ ত্রেগুলোতে এর অনুপ্রবেশ ঘটে গেছে। আগ্রাসনের যত ধরন আছে তার মধ্যে সবচেয়ে মারাত্মক আগ্রাসন হলো সাংস্কৃতিক আগ্রাসন। সাংস্কৃতিক আগ্রাসন কোনো দেশ বা জাতির কৃষ্টি-ঐতিহ্য, শিল্প-সংস্কৃতি ও সামাজিক মূল্যবোধকে ধ্বংসের পথে ঠেলে দিয়ে আগ্রাসীর সংস্কৃতির আধিপত্য বিস্তার ঘটিয়ে থাকে। তদানীন্তন পাকিস্তানে রাষ্ট্রভাষা বংলা চাই আন্দোলন দানা বেঁধে ছিল বিদেশী ভাষার আধিপত্য থেকে নিজের ভাব প্রকাশের, মতপ্রকাশের অধিকার ও সংস্কৃতিকে সুরক্ষার স্বার্থে।
এটি সবাই নিবিড়ভাবেই প্রত্যক্ষ করেন যে দীর্ঘ দিন ধরেই আকাশ সংস্কৃতির ফাঁদে বাঙালির এত দিনের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক চর্চা আজ বিকৃতি বিনষ্টের পথে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, শুধু রাজধানী শহরে নয়, বাংলাদেশের যেকোনো শহর বা উপশহরে সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, হাই ভলিউমে চটকদার হিন্দি গানের তালে বলিউড স্টাইলে নাচ না হলে আজকাল কোনো অনুষ্ঠানই সম্পন্ন হয় না। ভারতীয় সমাজের টিভি সিরিয়াল বাংলাদেশে ব্যক্তি ও পরিবারের মধ্যে এক উ™£ান্ত মূল্যবোধের বিকাশ ঘটাচ্ছে। ছোট শিশুদের মুখে এখন হিন্দি ভাষার বুলি শোনা যায়। আমরা গর্ব করে বলে থাকি, মাতৃভাষার জন্য এ বাঙালি জাতি আত্মোৎসর্গ করেছে; সে কি উর্দু ভাষাকে তাড়িয়ে হিন্দি ভাষার অনুপ্রবেশ ঘটানোর জন্য? শোনা যায় পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান জেনারেশনও নাকি অনেক আগে থেকেই একই আগ্রাসনে আক্রান্ত।
সাংস্কৃতিক আগ্রাসন ও অর্থনৈতিক আগ্রাসন বস্তুত সমান্তরাল গতিতে চলে। বরং সাংস্কৃতিক আগ্রাসন অনেকটা অর্থনৈতিক আগ্রাসনের ভিত্তিমূল তৈরি করে দেয়। এ আগ্রাসনের ফলে আমাদের প্রাত্যহিক জীবনযাত্রায়, রুচিতে, পোশাকে-আশাকে, ফ্যাশনে ও খাদ্য অভ্যাসে চোখে পড়ার মতো পরিবর্তন ঘটে থাকে। বাংলাদেশের এলিট শ্রেণীর মানুষের ভেতর এর প্রভাব আরো ব্যাপক। এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব সমাজের অন্যান্য স্তরেও পড়তে বাধ্য। এভাবেই সাংস্কৃতিক আগ্রাসন সমাজে বিভক্তি তৈরি করে দেয়। আকাশ সংস্কৃতির বদৌলতে বাংলাদেশে এরই মধ্যে ভারতীয় বিলাসী পণ্যের এক বিরাট বাজার তৈরি হয়ে গেছে। এরই জেরে প্রতি বছর বিভিন্ন উৎসবে বিপুল অঙ্কের মুনাফা সীমান্ত পেরিয়ে ওপারে চলে যাচ্ছে।
বাংলাদেশের উদারনীতির সুযোগে ভারতীয় চ্যানেলগুলোর অবাধ প্রচার ব্যবস্থা চালু আছে এ দেশে। এ কারণে ভারতীয় চ্যানেলগুলো এ দেশের বিভিন্ন কোম্পানির বিজ্ঞাপন প্রচারের সুযোগও পাচ্ছে। খোঁজ নিলে জানা যাবে, যেসব কোম্পানি ভারতীয় চ্যানেলে বিজ্ঞাপন দিয়ে থাকে সেসব কোম্পানিতে উচ্চপদে কোনো না কোনো ভারতীয় কর্তাব্যক্তি বসে আছেন। বিশেষ করে মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিগুলো। এভাবেও বিরাট অঙ্কের অর্থ পাচার হয়ে যাচ্ছে।
বাংলাদেশে ভারতের চ্যানেলগুলোর অবাধ প্রচারের সুযোগ থাকলেও বাংলাদেশের কোনো চ্যানেল ওপারে প্রচারের সুযোগ পাচ্ছে না। ভারতে বাংলাদেশের চ্যানেল প্রচারে সরকারের কোনো আপত্তি নাকি নেই, বরং আন্তরিক ইচ্ছা থাকলেও ওখানকার ক্যাবল অপারেটরদের জন্য নাকি তা সম্ভব হয়ে উঠছে না। পত্রিকান্তরে প্রকাশ বাংলাদেশের চ্যানেল মালিকপ ওদের ক্যাবল অপারেটরদের সন্তুষ্ট করতে পারলে ভারতে প্রচারের প্রবেশাধিকার পাবে। এর জন্য বাংলাদেশের চ্যানেলগুলোকে ওদের অপারেটরদের বার্ষিক দুই থেকে তিন কোটি টাকা চাঁদা দিতে হবে। অথচ বাংলাদেশে সে দেশের ৮০ থেকে ৯০টি চ্যানেল চালু থাকলেও এ জন্য এ দেশের ক্যাবল অপারেটররা কিছুই পায় না। বরং ওদের পে-চ্যানেলগুলোর জন্য বাংলাদেশ থেকে বার্ষিক ২০০০ কোটি টাকা পে করতে হয়।
মিডিয়া সূত্রে জানা যায়, বৈধ ও অবৈধভাবে ভারতীয় নাগরিকেরা বাংলাদেশে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে বছরে বেশ কয়েক বিলিয়ন ডলার ভারতে রেমিট্যান্স হিসেবে পাঠিয়ে থাকে। অবৈধ উপায়ে হুন্ডির মাধ্যমে বিলিয়ন ডলার পাচার হওয়ার হিসাব এর মধ্যে নেই। বিভিন্ন কোম্পানির গুরুত্বপূর্ণ পদে বসে থেকে বাংলাদেশী চাকুরেদের কাজের পরিবেশকে জটিল করে তোলা হয় এ অভিযোগ মাঝে মধ্যে শোনা যায়। তারা তাদের পদের মতাবলে এমন পরিবেশ তৈরি করে, যেন এ দেশের চাকুরেরা কাজের উৎসাহ হারিয়ে ফেলে। চাকরি ছাড়তে বাধ্য হয়। ওই সব শূন্যপদে কর্তৃপকে ম্যানেজ করে তারা নিজ দেশের নাগরিকদের চাকরির সুবিধা করে দিচ্ছে। এ ধরনের ঘটনা মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিগুলোতে বেশি হতে দেখা যায়। বাংলাদেশের মানুষ বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় ভারতের অবদানের কথা শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করে। তবে ওদের প্রতি তাদের এ শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা তত দিনই থাকবে, যত দিন না ভারত বাংলাদশেকে আন্তরিক শ্রদ্ধা জানাবে।
বাংলাদেশের মানুষ কখনই ভারতবিদ্বেষী নয়, তবে তারা সবসময়ই যেকোনো বিদেশী আগ্রাসনবিরোধী।
স্বাধীন বাংলাদেশের অনেক উল্লেখ করার মতো গর্বিত অর্জন রয়েছে। দেশ এগিয়েছে সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ অনুশীলনের দিকে। বাংলাদেশের এ অর্জনকে কোনোভাবেই ম্লান হতে দেয়া যাবে না। অর্জিত স্বাধীনতাকে অর্থবহ করে তুলতে দলমত নির্বিশেষে দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব, শান্তি ও সমৃদ্ধির ধারা অব্যাহত রাখতে ঐক্যবদ্ধভাবে দেশের জন্য কাজ করে যেতে হবে। স্বাধীনতার মূলমন্ত্রÑ গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, আইনের শাসন ও শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে সক্রিয় হতে হবে। তবেই দেশের মানুষ প্রকৃত স্বাধীনতার স্বাদ ভোগ করতে পারবে ইনশা আল্লাহ।
বঙ্গবন্ধু তার ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’-তে যথার্থ বলেছেন, পাকিস্তানের পশ্চিম অংশে কখনো মধ্যবিত্ত গড়ে ওঠেনি। তাই সেখানে সামন্ত, ভূস্বামী, পীর, মোল্লা আর জায়গিরদাররা যা বলে তাই জনগণ শোনে। বাংলাদেশে এখনো প্রচ্ছন্নভাবে হলেও আছে সামন্তবাদী, স্বৈরাচারী, বশংবদ আমলা, বেনিয়া মুৎসুদ্দি মানসিকতার মানুষ। অতীতে তারা সুবিধা করতে পারেনি কেবল পূর্ব বাংলায় সেই উনিশ শতক থেকে একটি ধারালো মধ্যবিত্ত গড়ে উঠেছে বলে। প্রখ্যাত লেখক ও রাজনীতিক হুমায়ুন কবীর তার ‘বাংলার কাব্য’ গ্রন্থে বলেছেন পূর্ব বাংলা হচ্ছে নদীভাঙনের দেশ। পূর্ব বাংলার প্রকৃতির মধ্যে আছে বিদ্রোহ। তার রক্তে আছে নানা মিশ্রণ। পূর্ব বাংলা তাই দখল করতে পারেনি দিল্লি কিংবা ইসলামাবাদ, তারও আগে বিদেশ থেকে আগত বর্গি ও আর্যরা পূর্ব বাংলাকে বোগলদাবা করে রাখতে পারেনি। পূর্ব বাংলা সব সময় শাসকদের নাগালের বাইরে ছিল। মহাবীর আলেকজান্ডারও পাঞ্জাব থেবে পূর্ব বাংলার কিনারায় এসে ফিরে গিয়েছিলেন। বলেছিলেন বিচিত্র এ দেশ, সেলুকাস!
স্বাধীনতার মতো বিশেষ এ নিয়ামতকে সর্বোচ্চ মর্যাদা দান করা উচিত সবার। স্বাধীনতার অর্জন যাতে কোনোভাবেই ম্লান না হয়, সে দিকে বিশেষভাবে ল রাখা উচিত। স্বাধীনতা অর্জন যত কঠিন, স্বাধীনতা রা করা তার চেয়ে বেশি কঠিন। চলমান বিশ্ব প্রোপট এবং দেশিক বাস্তবতায় এ বিষয়টি বিভিন্নভাবে বিবেচিত হওয়ার সুযোগ রয়েছে। জাতির স্বপ্ন ও আকাক্সা বাস্তবায়নের মাধ্যমে জাতীয় নিরাপত্তা ও জাতীয় সমৃদ্ধি নিশ্চিত করা সম্ভব। অর্থনৈতিক শক্তির সমৃদ্ধি ছাড়া স্বাধীনতা টেকসই হতে পারেও না।
