বাংলা কাব্যকুঞ্জে এমন এক পটভূমিতে নজরুলের আবির্ভাব ঘটে যখন রবীন্দ্র প্রতিভার দ্যুতি-দীপ্তিতে বাংলা সাহিত্যের ভুবন ছিল আলোকোজ্জ্বল। নবজাগ্রত বাঙালি মানসকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল রবীন্দ্রনাথের বহুমুখী সৃজনী ক্ষমতা। সেই মুগ্ধতার সুতীব্র ঘোর থেকে বেরিয়ে আসা যে কতটা কঠিন হয়ে পড়েছিল সে কথা নজরুলকে নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে চমৎকারভাবে বলেছেন বুদ্ধদেব বসু। এই অসম্ভব কাজটি নজরুল ইসলাম সম্ভব করতে পেরেছিলেন দু’টি কারণে। প্রথমত, তিনি এসেছিলেন গ্রামীণ পটভূমি থেকে; দ্বিতীয়ত, মুসলিম সমাজ ও সংস্কৃতির আইডেনটিটি নিয়ে তিনি বেড়ে উঠেছিলেন। তাঁর আত্মা ছিল স্বচ্ছ ও পরিশুদ্ধ। কারণ মধ্যস্বত্বভোগী হিসেবে বেড়ে ওঠার সুযোগ তাঁর ছিল না। গ্রামীণ জীবনের সততা এবং মুসলিম জীবনের দৃঢ়তা তাঁর মধ্যে অটুট ছিল বলেই তিনি নিজে যেমন বীরের মতো মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পেরেছিলেন তেমনি তাঁর পাঠকদেরও মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর দিক-নির্দেশনা দিতে সক্ষম হয়েছিলেন।
রণাঙ্গন থেকে ফিরে এসে খুব অল্প সময়ের মধ্যে নজরুলের পক্ষে বাংলা কবিতার পাঠক-পাঠিকাদের তাঁর কবিতার অনুরাগী করে তোলার কাজটি মোটেই সহজ ছিল না। একমাত্র একজন দুর্লভ প্রতিভার অধিকারী কবির পক্ষেই সেই কাজটি করা সম্ভব ছিল। আজ এ কথা দৃঢ়তার সঙ্গে বলা যায় যে, নজরুল ছিলেন উঁচু মাপের একজন প্রতিভাধর কবি। তাই অবিভক্ত বাংলার বিদ্যোৎ সমাজ কবি হিসেবে আত্মপ্রকাশের এক দশকের মধ্যে তাঁকে মৌলিক কবি এবং বিদ্রোহী কবি হিসেবে স্বীকার করে নিয়েছিল। কলকাতার এলবার্ট হলে বাঙালি জাতির পক্ষ থেকে তাঁকে সংবর্ধনা জানানো হয়েছিল।
নজরুল যখন যা লিখেছেন কিংবা যে কাজে হাত দিয়েছেন, তাতেই সমস্ত মন-প্রাণ ঢেলে দিয়ে করেছেন। সিদ্ধি লাভের জন্য সাধকেরা যেমন সাধনা করেন, নজরুলও তেমনি একের পর এক কাব্যসাধনা, সুর ও সঙ্গীতের সাধনা, শক্তির সাধনা, সত্য ও সুন্দরের সাধনা চালিয়ে গেছেন। তাঁর সাধনা ব্যক্তিগত মোক্ষ লাভের সাধনা ছিল না, তাঁর চিন্তায় ছিল একটা সুন্দর সমাজ ও দেশ গঠনের আকাক্সক্ষা। আর এই আকাক্সক্ষা পূরণের জন্য সাম্য ও স্বাধীনতার প্রয়োজন তীব্রভাবে অনুভব করেছিলেন তিনি। কারণ বিদেশি শাসন ও শোষণে ভারতীয় জীবনের বিস্তীর্ণ ভূ-ভাগ মরুভূমির মতো রুক্ষ হয়ে যাচ্ছিল, যা তার পক্ষে নীরবে মেনে নেয়া সম্ভব ছিল না। তাঁর স্বদেশকে সুজলা-সুফলা ও প্রাণময় করার স্বপ্নে তিনি বিভোর ছিলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় সেই উদার ও মহান স্বপ্নের বাস্তব রূপ দেয়ার আগেই তিনি বাকরুদ্ধ ও অসুস্থ হয়ে পড়েন। ফলে সম্ভাবনার আকস্মিক ট্র্যাজিক পরিণতি ঘটে।
এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, বাংলা সাহিত্যের ঐতিহ্যের সঙ্গে সঙ্গতি রেখেই নজরুলের সাহিত্যপ্রতিভা বিকাশ লাভ করেছে। অধ্যাপক ক্ষেত্রগুপ্ত যথার্থই বলেছেন, ‘বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগোষ্ঠীকে তিনিই বাংলা সাহিত্যের পাঠক ও অনুরাগী করে তুলেছিলেন।’ আর এই মহতি লক্ষ্য অর্জনে তিনি মুসলিম সমাজে ব্যবহৃত আরবি, ফারসি শব্দসম্ভার বাংলা কবিতায় সার্থকভাবে ব্যবহার করেন। এর ফলে বাংলা ভাষার দীপ্তি ও দৌলত যেমন বাড়ে তেমনি বাড়ে কবিতার সৌন্দর্য ও পাঠকপ্রিয়তা। নজরুল ‘বিশ্ব কাব্যলক্ষ্মীর মুসলমানী ঢং’ সম্পর্কে সম্যকভাবে সচেতন থেকেই বাংলা কাব্যলক্ষ্মীকে দু’একটি ইরানি ‘জেওর’ পরিয়ে দেখতে চেয়েছিলেন তাকে কতটা খুবসুরত দেখায়। যদিও সৌন্দর্য সৃষ্টিই নজরুলের প্রধান লক্ষ্য ছিল না। নজরুল চেয়েছিলেন কবিতার মাধ্যমে পাঠক মনে জরাজীর্ণ সমাজের সবকিছু পুনর্গঠন করার আকাক্সক্ষা সঞ্চার করতে। তাঁর সৎ, আন্তরিক ও নির্ভীক উচ্চারণ তরুণ প্রজন্ম ও প্রগতিবাদীদের মন কেড়ে নিয়েছিল। তাই অল্প সময়ে অসাধারণ জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন নজরুল। কেবল দ্রোহের জন্য নয়, প্রেমের জন্যও তিনি শ্রোতা ও পাঠকপ্রিয় ছিলেন। কবিতায় ও গানে সমানে তাঁর এই প্রেম ও দ্রোহ প্রকাশ পায়। এ দুটি বিপরীত প্রবণতার সমন্বয়ে গড়ে ওঠে কবি নজরুলের রোমান্টিক ব্যক্তিত্ব। তাই জোর দিয়েই বলা যায় ‘এক হাতে মম বাঁশের বাঁশরী আর হাতে রণতূর্য’, বিদ্রোহী কবিতায় এই আত্মপরিচয় তুলে ধরার মধ্যে নজরুলের কোনো অতিশয়োক্তি ছিল না। আবার ‘তুমি আমায় ভালোবাস তাই তো আমি কবি’ এই চরণটিতে নজরুলের সৃজনী ক্ষমতার অন্যতম উৎস যে নারীর ভালোবাসা, সে কথাই সুন্দরভাবে প্রকাশ পেয়েছে। এখানেই মহাকবি গ্যাটের সঙ্গে নজরুলের কবি স্বভাবের মিল বিদ্যমান। বিদ্রোহী কবিতায় ‘আমি’র মধ্যে দিয়ে যে বিদ্রোহী মনোভাবের উদ্ভাসন ঘটেছিল তারই রূপান্তর ঘটতে দেখা গিয়েছিল গানের সুমধুর সুরের মধ্যে। সঙ্গীতের বাণী ও সুরে মুগ্ধ হয়ে তাঁর ভক্ত ও প্রেমিক-প্রেমিকারা আন্তরিকভাবে তাঁকে স্বাগত জানিয়েছিল। নজরুলও তাঁর ভালোবাসায় মোড়ানো বৈচিত্র্যময় সঙ্গীত প্রিয়জনদের অকৃপণভাবে উৎসর্গ করেছিলেন। তবে দুর্ভাগ্যের বিষয় হচ্ছে, উনিশ শতকের শেষ প্রহরে জন্ম নিয়ে বিশ শতকের ২০ থেকে ৪০ মাত্র দু’টি দশক নজরুল তাঁর সৃজনশীল কারুকাজ দেখাবার সময় পেয়েছিলেন। বস্তুত এই স্বল্প সময় সীমার মধ্যে দেশী-বিদেশী অপশক্তির বিরুদ্ধে জাগরণ সৃষ্টিতে তিনি তাঁর প্রতিভার পূর্ণ সদ্ব্যবহার করেছিলেন। তারুণ্যের শক্তি ও প্রগতিশীল নর-নারীর অকুণ্ঠ সমর্থন ও আন্তরিক ভালোবাসা তাঁকে অদম্য শক্তি ও সাহস জুগিয়েছিল। কবি হিসেবে যেমন সাংবাদিক হিসেবেও, তেমনি সংবাদের অভিনব শিরোনাম দিয়ে এবং রসালো ও বিদ্রƒপাত্মক মন্তব্য ও সম্পাদকীয় লিখে তিনি পাঠকসমাজের অকুণ্ঠ প্রীতি ও ভালোবাসা পেয়েছিলেন।
সাহিত্যাঙ্গনে নজরুলের আত্মপ্রকাশ আকস্মিক হলেও রবীন্দ্রনাথ তাঁর প্রতিভা ও স্বকীয়তা চিনতে ভুল করেননি। তিনি নিজে যা দিতে অক্ষম তাই আশা করেছিলেন নজরুলের কাছ থেকে। এ জন্যই তিনি ধূমকেতুর সারথিকে আশীর্বাণী পাঠিয়েছিলেন। আবার ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ শীর্ষক কবিতা লিখে নজরুল জেলে গেলে এবং জেলের অনিয়মের প্রতিবাদে অনশন করলে তা ভাঙার জন্য তাঁকে অনুরোধ জানিয়ে টেলিগ্রাম পাঠিয়েছিলেন। সর্বোপরি ‘জাতীয় জীবনে বসন্ত আনার জন্য’ নজরুলের নামে তাঁর ‘বসন্ত’ গীতিনাট্য উৎসর্গ করে নিজ স্বাক্ষরিত বইটির একটি কপি কল্লোল যুগের সাহিত্য ব্যক্তিত্ব পবিত্র বাবুকে দিয়ে কারারুদ্ধ কবির হাতে পৌঁছে দেয়ার ব্যবস্থা করেছিলেন। এ থেকে বোঝা যায় অনুজের প্রতি অগ্রজের ভালোবাসার গভীরতা। দুর্মুখেরা যে যা-ই বলুন আর যে যা-ই রটান না কেন, বাংলা সাহিত্যে নজরুলের অবস্থান ও দানকে রবীন্দ্রনাথ যথার্থভাবে উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়েছিলেন; যদিও নজরুল রবীন্দ্রানুসারী কবি ছিলেন না। কিন্তু তাতে কিছু যায় আসে না। কারণ এ ব্যাপারে বাংলা সাহিত্যের কল্যাণচিন্তাই চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছিল। এ প্রসঙ্গে রবীন্দ্রমানসের কিঞ্চিৎ বিশ্লেষণ করলেই ব্যাপারটি পরিষ্কার হয়ে উঠবে। রবীন্দ্রনাথের মানসলোক তাঁর একটি গানে চমৎকারভাবে প্রকাশ পেয়েছে। গীতবিতানের ‘প্রকৃতি’ পর্যায়ের আট নম্বর গানটির কথাই এখানে বলা হচ্ছে: ‘আকাশ ভরা সূর্য তারা, বিশ্বভরা প্রাণ,/ তাহারি মাঝখানে আমি পেয়েছি মোর স্থান,/ বিস্ময়ে তাই জাগে আমার গান ॥’। এই গানটির শেষ ক’টি চরণে কবির কার্যক্রম চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছেÑ “কান পেতেছি, চোখ মেলেছি, ধরার বুকে প্রাণ ঢেলেছি,/ জানার মাঝে অজানারে করেছি সন্ধান/ বিস্ময়ে তাই জাগে আমার গান।”
ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে যোগদানের কারণ যা-ই হোক না কেন, নজরুল কিন্তু সামরিক শৃঙ্খলা মেনে সাধারণ সৈনিক থেকে কোয়ার্টার মাস্টার হাবিলদার পদে উন্নীত হয়েছিলেন। প্রশিক্ষণের চাপের মধ্যে থেকে নজরুল কিভাবে গল্প, কবিতা লেখা আর গান-বাজনার তালিম নিলেন সেটা রীতিমতো ভাবার ব্যাপার। নজরুলের ভেতর একটা স্বপ্ন ছিল। আর তাঁর অভিজ্ঞতায় ছিল গ্রামীণ লেটো দলনেতার স্বভাবকবিত্ব শক্তি। এরপর সৈনিক জীবনের কঠোর শৃঙ্খলার মধ্যে যেটুকু সময় নজরুল পেতেন তার সবটাই সাহিত্য সাধনায় ও সঙ্গীতের রেওয়াজে ব্যয় করতেন। নজরুলের পৌত্রী খিলখিল কাজীর একটি লেখায় পড়লাম করাচি সেনানিবাসে নজরুল সঙ্গী হিসেবে পেয়েছিলেন শম্ভু রায়, মণিভূষণ মুখোপাধ্যায় ও হাবিলদার নিত্যানন্দ দে প্রমুখকে। নজরুলকে অরগ্যান বাজানো শিখিয়েছিলেন নিত্যানন্দ দে।
নজরুল সেনাবাহিনীতে যোগ দেন ১৯১৭ সালে। ফিরে আসেন ১৯২০ সালে। তাঁর এই তিন বছরের সৈনিক জীবন ‘বিস্ময়কর সময়’ হিসেবে বিবেচিত হওয়ার দাবি রাখে। কারণ এই সময়টাই ছিল তাঁর সাহিত্য জীবনের প্রস্তুতিপর্ব এবং লেখালেখির সূচনাপর্ব। কলকাতার জীবনে যার বহিঃপ্রকাশ আমরা দেখতে পাই। ১৯২০ সালে বাঙালি পল্টন ভেঙে দিলে নজরুল তাঁর বেডিংপত্র নিয়ে কলকাতায় আসেন ঠিকই, কিন্তু তাঁর কোথাও ওঠার মতো জায়গা ছিল না। আশ্রয় দেয়ার মতো মুসলিম আত্মীয়-স্বজনও তাঁর কলকাতায় ছিল না। অসহযোগ ও খেলাফত আন্দোলন নিয়ে সবাই ব্যস্ত ছিলেন। ব্রিটিশ শাসনে ক্ষমতাচ্যুত মুসলিম শক্তি শুরু থেকেই পক্ষপাতিত্বের কারণে ধ্বংসের প্রান্তসীমায় পৌঁছে গিয়েছিল। অন্যদিকে নব্য শাসকদের পৃষ্ঠপোষকতাধন্য প্রভাবশালী হিন্দু সমাজ তখন ব্রিটিশদের সঙ্গে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায় হিসেবে ভারতবর্ষের একচ্ছত্র কর্তৃত্ব লাভ করার জন্য ভীষণ ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল। এ রকম পরিস্থিতিতে কমরেড মুজফ্ফর আহমদ নজরুলকে সাময়িকভাবে হলেও ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতি’এর কার্যালয়ে থাকার ব্যবস্থা করে দেন। অগত্যা সেখানে থেকেই সাহিত্য ও সাংবাদিকতার জীবন শুরু করেন নজরুল। বছর দু’য়ের মধ্যে নজরুলের গান এবং কবিতা ঝড় তোলে কলকাতায়। সবাই নড়েচড়ে বসতে বাধ্য হলেন। ‘বিদ্রোহী’ কবিতা লিখে নজরুল রাতারাতি খ্যাতির চূড়ায় উঠে যান। এরপর বিপুল ভক্ত এবং প্রচুর নিন্দুক নজরুলের প্রশংসা ও নিন্দায় লেগে যায়। নিন্দুকদের হিংসা ও গাত্রদাহের কারণ ছিল, নজরুলের মতো অভাজনের কবিতার দুর্লভ জনপ্রিয়তা এবং যুগপ্রবর্তক কবি হিসেবে প্রচার পাওয়া। কিন্তু সত্যিকার জহুরি কি সোনা চিনতে ভুল করে? তাই সঙ্গত কারণেই রবীন্দ্রনাথকে পাশে পেয়ে যান নজরুল। তাঁর সৃজনীশক্তির প্রতি গভীর আস্থা ছিল বলেই রবীন্দ্রনাথ ‘ধূমকেতু’র আত্মপ্রকাশকে স্বাগত জানিয়ে আশীর্বাণী পাঠান। যে আশীর্বাণীতে কবিগুরু বলেন : “আয় চলে আয়, রে ধূমকেতু,/ আঁধারে বাঁধ অগ্নিসেতু,/ দুর্দিনের এই দুর্গশিরে/ উড়িয়ে দে তোর বিজয় কেতন।/ অলক্ষণের তিলক রেখা রাতের ভালে হোক না লেখা,/ জাগিয়ে দেরে চমক মেরে/ আছে যারা অর্ধচেতন।”
কবিগুরুর এই দিকনির্দেশনামূলক আশীর্বাণী আবেগপ্রবণ নজরুলকে প্রবল আত্মপ্রত্যয়ী করে তোলে। যদিও আত্মবিশ্বাসের পরিচয় তিনি ইতঃপূর্বে ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় দিয়েছেন। এবার তিনি নতুন আত্মপ্রত্যয় নিয়ে লিখলেন ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ শীর্ষক একটি বিস্ফোরক কবিতা। এখানে কবিতাটির কয়েকটি চরণ তুলে ধরা হলোÑ “আর কতকাল থাকবি বেটি মাটির ঢেলার মূর্তি আড়াল?/ স্বর্গ যে আজ জয় করেছে অত্যাচারী শক্তি চাঁড়াল।/ দেব শিশুদের মারছে চাবুক, বীর যুবাদের দিচ্ছে ফাঁসি;/ ভূ-ভারত আজ কসাইখানা, আসবি কখন সর্বনাশী?” জ্বালাময়ী ভাষায় লেখা এ রকম রাজনৈতিক কবিতা বাংলা সাহিত্যে দুর্লভ। হজম করার মত সহনশীলতা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী শাসকদের ছিল না। এই কবিতায় ব্রিটিশ শাসকদের বিরুদ্ধে নজরুল গুরুতর অভিযোগ তোলেন। রাখঢাক না করে বলেন, ভারত শাসন করতে তারা ভূ-ভারতকে কসাইখানা করে ছেড়েছে। ভারতের সাহসী সন্তানদের চাবুক মেরে, ফাঁসি দিয়ে, দ্বীপান্তরে পাঠিয়ে তারা এক বিভীষিকার রাজত্ব কায়েম করে বসেছে। আর হিন্দু সমাজ এতকাল ধরে যেসব দেব-দেবীর পূজা করে আসছে অশুভ শক্তি দমনে সেসব দেব-দেবী কোনো ভূমিকাই রাখছেন না। তাই শক্তিরূপিণী দেবী দুর্গার আগমন উপলক্ষে নজরুল তাঁর তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন আলোচ্য কবিতায়। কবিতাটিতে নজরুল কাউকে ছাড় দেননি। এমনকি কারারুদ্ধ বিপ্লবীদের কাছে রবিরশ্মি পৌঁছায়নি বলে আক্ষেপ প্রকাশ করতেও কুণ্ঠিত হননি। যেমন : ‘রবির শিখা ছড়িয়ে পড়ে দিক হতে আজ দিগন্তরে,/ সে কর শুধু পশলো না মা অন্ধ কারার বন্ধ ঘরে।’ আবার বিপ্লবীদের ভূমিকাকে ব্যঙ্গ করা হয়েছে ‘বারি-ইন্দ্র বরুণ আজি করুণ সুরে বংশী বাজায়,/ বুড়িগঙ্গার পুলিন বুকে বাঁধছে ঘাঁটি দস্যু রাজায়’ এ দু’টি চরণে। আর হিন্দু দেব-দেবীদের অক্ষমতা আর ধার্মিকদের ভণ্ডামি ও ক্ষমতার কাছে নতজানু হওয়ার অনাকাক্সিক্ষত চরিত্র উন্মোচনে যেসব অপ্রিয় সত্য বলা হয়েছে কবিতাটিতে তা এখানে উল্লেখ করা থেকে বিরত রইলাম। আগ্রহী পাঠক, কবিতাটি পড়লে সবকিছু বুঝতে পারবেন। স্পষ্টভাষী কবি হিসেবে তাঁর এই পক্ষপাতহীনতা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। কিন্তু তাঁর তো মাথায় রাখা উচিত ছিল ধূমকেতু একটি অর্ধসাপ্তাহিক পত্রিকা। পাঠকপ্রিয় হলেও কতটুকুই বা শক্তি ছিল পত্রিকাটির! সম্পাদক হিসেবে নজরুলের নৈতিক বল ছাড়া অন্য কোনো বলই তো ছিল না। রাজনৈতিক নেতৃরা যেখানে স্বাধীনতার দাবি তুলতে আড়ষ্ট, স্বরাজ বলতে কে কি বোঝাতেন তা অস্পষ্ট, নজরুল সেখানে স্বাধীনতার দাবিতে একেবারে স্বচ্ছ ও স্পষ্ট। এটা তাঁর চরিত্রের উজ্জ্বল দিক। যা বিশ্বাস করতেন, তাই তিনি অকপটে প্রকাশ করতেন। তার মধ্যে কোনো লুকোছাপা ছিল না। কিন্তু নিজের ভালো-মন্দ নিয়ে ভাবারও তো প্রয়োজন ছিল। ভাবপ্রবণতা কবিদের মানায়; কিন্তু শক্তি সাধ্যের ওপর বাঁক-কৌশল নির্মাণ করতে না পারলে যে বিপদ নেমে আসে, নজরুল সেটা অচিরেই হাড়ে হাড়ে টের পান। অবশ্য ইতিহাস যারা সৃষ্টি করেন তাদের খুব সাবধান হতে দেখা যায় না।
কবিতাটি প্রকাশের পরপরই নজরুলের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা ইস্যু হয়। পরিস্থিতি টের পেয়ে গ্রেফতার এড়ানোর জন্য তিনি আত্মগোপনে যেতে বাধ্য হন। কিন্তু তাঁকে আশ্রয় দেয়ার মতো শক্তিমান সুহৃদ কলকাতায় এ সময়ে কেউ ছিলেন বলে আমাদের জানা নেই। ‘বিপদে বন্ধুর পরিচয়’, এ কথার সত্যতাও নজরুল উপলব্ধি করেন। দু’সপ্তাহের ব্যবধানে অসহায় নজরুলকে পুলিশ কুমিল্লার কান্দিরপাড় থেকে গ্রেফতার করে কলকাতায় নিয়ে যায়। ১৯২২ সালের ২৩ লভেম্বর নজরুল গ্রেফতার হন এবং ২৫ নভেম্বর চিফ প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে তাকে হাজির করা হয়। শুনানির দিন ধার্য হয় ২৯ নভেম্বর। এ থেকে বোঝা যায়, বিনাবিচারে আটক রাখার আজকের রেওয়াজ ব্রিটিশ ভারতে ছিল না। থাকলে নজরুলের জেলজীবন যে আরো দীর্ঘায়িত হতো সে কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়।
আদালতে আত্মপক্ষ সমর্থন করে নজরুল নিজেই একটি লিখিত জবানবন্দী দেন। কলকাতার প্রেসিডেন্সি জেলে বসে ১৯২৩ সালের ৭ জানুয়ারি রোববার দুপুর বেলায় তিনি এই জবানবন্দী তৈরি করেন। এই জবানবন্দীটিও নজরুল প্রতিভার অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিদর্শন, বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ এবং ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
বিচারক ভারতীয় ফৌজদারি দণ্ডবিধির ১২৪-ক ধারায় নজরুলকে এক বছর সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত করেন। প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, আলীপুর সেন্ট্রাল জেলে প্রথম কয়েক মাস নজরুলের বেশ ভালোই কেটেছিল। বিশেষ শ্রেণীর কয়েদির মর্যাদা ও ব্যবহার পেয়েছিলেন নজরুল। কিন্তু একপর্যায়ে তাঁকে হুগলি ডিস্ট্রিক্ট জেলে পাঠিয়ে দেয়া হয় এবং বিশেষ শ্রেণীর কয়েদির মর্যাদা কেড়ে নিয়ে তাঁকে সাধারণ কয়েদি করা হয়। নজরুলকে যখন এভাবে হয়রানি ও অপদস্থ করা হচ্ছিল তখন একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে কলকাতার জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ‘বসন্ত’ গীতিনাট্যখানি ‘শ্রীমান কবি কাজী নজরুল ইসলাম স্নেহভাজনেষু’কে উৎসর্গ করেন। বসন্ত কাব্যনাট্যখানির একটি কপি আলীপুর জেলে বন্দী নজরুলের হাতে পৌঁছে দেয়ার জন্য রবীন্দ্রনাথ পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায়কে জোড়াসাঁকোয় ডেকে পাঠান।
তিনি এলে ভক্তজন পরিবৃত রবীন্দ্রনাথ পবিত্র বাবুকে বললেন, ‘জাতির জীবনে বসন্ত এনেছে নজরুল। তাই আমার সদ্যপ্রকাশিত ‘বসন্ত’ গীতিনাট্যখানি ওকেই উৎসর্গ করেছি। বইখানা নিজের হাতে তাকে দিতে পারলে আমি খুশি হতাম, কিন্তু আমি যখন নিজে গিয়ে দিয়ে আসতে পারছি না, ভেবে দেখলাম, তোমার হাত দিয়ে পাঠানোই সবচেয়ে ভালো, আমার হয়েই তুমি বইখানা ওকে দিও।’ এরপর রবীন্দ্রননাথ একখানা বইয়ে নিজের নাম দস্তখত করে পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায়ের হাতে তুলে দিয়ে বললেন, ‘তাকে বলো, আমি নিজের হাতে তাকে দিতে পারলাম না বলে সে যেন দুঃখ না করে। আমি তাকে সমস্ত অন্তর দিয়ে অকুণ্ঠ আশীর্বাদ জানাচ্ছি। আর বলো, কবিতা লেখা যেন কোনো কারণেই সে বন্ধ না করে। সৈনিক অনেক মিলবে, কিন্তু যুদ্ধে প্রেরণা জাগাবার কবিও তো চাই।’
নজরুলের হাতে বসন্ত গীতিনাট্যখানা পৌঁছালে নজরুল তা কপালে ঠেকিয়ে বুকে চেপে ধরেন। রবীন্দ্রনাথের কাছ থেকে কবিপ্রতিভার স্বীকৃতি পাওয়াটা ছিল নজরুলের জন্য এক দুর্লভ প্রাপ্তি। এই প্রাপ্তি তাঁর জেল জীবনের জ্বালা-যন্ত্রণা এবং অনশন-ক্লেশ দূর করে দেয়। এরই প্রেরণায় নজরুল রচনা করেন তাঁর অমর কবিতা ‘আজ সৃষ্টি সুখের উল্লাসে’। কবিতাটির শুরু এ রকম : ‘আজ সৃষ্টি সুখের উল্লাসে-/ মোর মুখ হাসে মোর চোখ হাসে মোর টগবগিয়ে খুন হাসে/ আজ সৃষ্টি সুখের উল্লাসে।’
কেউ আপত্তি তোলেননি। নজরুল-রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কের টানাপড়েন বিষয়ে যাঁরা সম্যক ধারণা রাখেন তাঁরা স্বীকার করবেন যে রবীন্দ্রনাথকে কেন্দ্র করে কবি সাহিত্যিকদের যে বৃত্তটি গড়ে উঠেছিল সেই বৃত্তের সদস্যদের লক্ষ্য ছিল বিশ্বকবিকে নজরুলবিরোধী ভূমিকা পালনে প্ররোচিত করা। কখনো কখনো তাঁরা এ কাজে সফলও হয়েছেন। কিন্তু তাদের পক্ষে রবীন্দ্রনাথকে এ কাজে ব্যবহার করা সহজ ছিল না। কারণ বিশ্বকবির প্রতি নজরুলের শ্রদ্ধা-ভালোবাসার খবর রবীন্দ্রনাথের অজানা ছিল না। নজরুল যে রবীন্দ্রনাথের একজন খাঁটি ভক্ত এ কথা একদিন কবি ও কথাশিল্পী মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়ের কাছ থেকে শোনার পর রবীন্দ্রনাথ হেসে বলেছিলেন, ‘যাক, আমার আর ভয় নেই তা হলে।’
এই প্রেক্ষাপট বিবেচনায় রেখে আমরা নির্দ্বিধায় বলতে পারি যে, রবীন্দ্রনাথ বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের বৃহত্তর স্বার্থের কথা বিবেচনা করেই নজরুলকে কবি হিসেবে সম্মান দিয়েছেন। ঘনিষ্ঠজনদের দ্বারা অনুরুদ্ধ হয়েও অনশন ভাঙতে তিনি নজরুলকে চিঠি পাঠাননি সত্য, কিন্তু তাঁর দীর্ঘ অনশনে শঙ্কিত হয়ে আলিপুর কেন্দ্রীয় কারাগারের ঠিকানায় টেলিগ্রাম পাঠিয়েছিলেন। যদিও কারা কর্তৃপক্ষ সে টেলিগ্রাম নজরুলের হাতে পৌঁছে না দিয়ে অশালীন আচরণ করেছিল। নজরুলকে অনশন ব্রত ভাঙার অনুরোধ জানিয়ে রবীন্দ্রনাথ যে টেলিগ্রাম পাঠিয়েছিলেন সেখানে তিনি যুক্তি দেখিয়েছিলেন ‘বাংলা সাহিত্যে নজরুলের প্রয়োজন রয়েছে।’ তাই এই প্রয়োজনের নিরিখেই নজরুলের প্রতি রবীন্দ্রনাথের অনুরাগের বিষয়টি বিচার্য হওয়া বাঞ্ছনীয়।
বাংলার সাহিত্যাকাশে নজরুলের যখন উদয় হয় তখন তাঁকে ঘিরে ধূমকেতুর মতো ভীতি ও বিস্ময় জেগেছিল। প্রথম বিশ্বসমরের রক্তস্নাত রুদ্রতা-বনৃত্য নজরুলের রক্ত-ধারায় ঢেউ তুলেছিল। একটা ঘোরের মধ্যে থেকে তিনি তখন লেখালেখি শুরু করেন। অন্যকে নকল করার, অভিধান ঘেঁটে শব্দ খোঁজার সময় তাঁর ছিল না। তাঁর কলম থেকে যা বেরিয়েছিল তা তাঁর অন্তরের উপলব্ধিÑ জীবন সংগ্রামে পোড় খাওয়া হৃদয়বান আত্মার অকৃত্রিম অনুভব। একেবারে খাঁটি সৃষ্টি। প্রকৃতির মতো স্বচ্ছ, সুন্দর। নজরুলের আত্মার ভেতরে সত্য ও সুন্দর গল্প হয়ে, কবিতা হয়ে, গান হয়ে, সুর হয়ে, ছন্দ হয়ে শিল্পরূপ লাভ করেছিল। যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সৈনিকের সাজে কলকাতায় এসে নবযুগে, ধূমকেতুতে, লাঙলে, গণবাণীতে নজরুলের লেখায় সত্য, সুন্দর ও ন্যায় রুদ্র তেজে বিপ্লব ও বিদ্রোহের বাণী হয়ে প্রকাশ পায়। আবার গান লিখে, সুর দিয়ে তিনি যে অর্থ-বিত্ত, সম্মান, অভিনন্দন এবং ভক্তদের ভালোবাসা পেয়েছিলেন সে সম্পর্কে নজরুলের নিজের ভাষ্য হচ্ছে, “এই সম্মান পাওয়ার কারণ, সাহিত্যিক ও কবিদের মধ্যে আমি প্রথম জেলে যাই, জেলে গিয়ে চল্লিশ দিন অনশন ব্রত পালন করি, রাজবন্দীদের ওপর অত্যাচারের জন্য। এই অপরাধে আমাকে জেলের নানা রকম শৃঙ্খল-বন্ধন ও লাঞ্ছনা সহ্য করতে হয়। এই সময় রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘বসন্ত’ নাটক আমায় উৎসর্গ করেন। এই আশীর্বাদ মালা পেয়ে আমি জেলের সব জ্বালা-যন্ত্রণা, অনশন-ক্লেশ ভুলে যাই। আমার মত নগণ্য তরুণ কবিতা লেখককে কেন তিনি এত অনুগ্রহ ও আনন্দ দিয়েছিলেন, তিনিই জানেন।”
নজরুল নিজেকে ‘নগণ্য তরুণ কবিতা লেখক’ মনে করলেও রবীন্দ্রনাথ বুঝতে পেরেছিলেন নজরুলের ঐতিহাসিক ভূমিকা। সাহিত্য যে নতুন দিকে বাঁক নিতে যাচ্ছে; সমাজ ও সভ্যতার যে রূপান্তর ঘটতে চলেছে তার সুস্পষ্ট আভাস টের পেয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। আর নজরুল যে সেই অনাগত কালের সাহিত্যধারার প্রতিভূ হতে চলেছেন সেটাও তিনি বুঝতে পেরেছিলেন। তাই তাঁর ভক্তরা কে কি মনে করল না করল সেসব উপেক্ষা করে তিনি নজরুলকে তাঁর আশীর্বাদের মালা পরিয়ে বড় মন ও দূরদৃষ্টির পরিচয় দিয়েছিলেন। এ ছাড়া ধূমকেতুকে আশীর্বাণী পাঠিয়ে তিনি যে দিকনির্দেশনা দিয়েছিলেন তা সার্থকভাবে পালন করতে গিয়ে নজরুলকে জেলে যেতে হয়। এই ঘটনা রবীন্দ্রনাথকে বেদনাক্রান্ত করে তোলে। আর সেই বেদনাবোধ থেকে রবীন্দ্রনাথ নজরুলের দুর্দিনে তাঁর পাশে গিয়ে দাঁড়ান। অনুজের প্রতি অগ্রজের এই ভালোবাসা আজও ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত হয়ে আছে।
অর্ধসাপ্তাহিক ধূমকেতুর উদয় হয়েছিল ‘রাতের ভালে অলক্ষণের তিলক রেখা’র মতোই। দেশনেতারা যখন স্বরাজের আশা জাগাতে তৎপর ধূমকেতু তখন পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি তুলে সেই আশাকে আশঙ্কায় রূপ দিতে ব্যস্ত। তাই স্বরাজপ্রত্যাশীরা ধূমকেতুর নিন্দা করলেন, গালি দিলেন; কিন্তু ধূমকেতুর সারথিকে সেসবের কোনো কিছইু স্পর্শ করল না, ধূমকেতুর ভয়াল নিশান হাতে নিয়ে তিনি এগিয়ে চললেন। তাঁর কারা-শুদ্ধি হলো এবং শেষ পর্যন্ত ধূমকেতু অন্ধকারে হারিয়ে গেল। কিন্তু এর সারথির জীবনে রেখে গেল আনন্দ-বেদনার এক অক্ষয় চিহ্ন। নজরুল তখন আলিপুর কেন্দ্রীয় কারাগারের স্মৃতিচরণ করতে গিয়ে লিখেছেন, “একদিন সহকারী জেলার এসে আমাকে খবর দিতে গিয়ে বললেন, ‘আরে মশাই, আপনি তো নোবেল প্রাইজ পেয়ে গেলেন, আপনাকে রবি ঠাকুর তাঁর ‘বসন্ত’ নাটক উৎসর্গ করেছেন।’ পাশেই দাঁড়িয়েছিলেন আরো দু’একজন কাব্য বাতিকগ্রস্ত রাজকয়েদি। আমার চেয়েও বেশি হেসেছিলেন সেদিন তাঁরা। আনন্দে নয়, যা নয় তাই শুনে। কিন্তু ঐ আজগুবি গল্পও সত্য হয়ে গেল। বিশ্বকবি সত্যি সত্যিই আমার ললাটে ‘অলক্ষণের তিলক-রেখা’ এঁকে দিলেন। অলক্ষণের তিলক রেখাই বটে, কারণ এরপর থেকে আমার অতি অন্তরঙ্গ রাজবন্দী বন্ধুরাও আমার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে বসলেন। যারা এতদিন আমার এক লেখাকে দশবার করে প্রশংসা করেছেন, তারাই পরে সেই লেখার পনেরোবার করে নিন্দা করলেন। আমার হয়ে গেল ‘বরে শাপ’।”
জেলের ভেতরে থেকেই নজরুল জানতে পারেন যে, তার এই দুর্লভ প্রাপ্তিতে বাইরেও একটা ‘বিপুল ঈর্ষাসিন্ধু’ ফেনায়িত হয়ে উঠেছে, যা নজরুলকে ভীষণ কষ্ট দিয়েছিল। নজরুল এ সম্পর্কে তাঁর প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে গিয়ে লিখেছেন, ‘সত্য-সুন্দরের পূজারী বলে যারা হেঁইয়ো হেঁইয়ো করে বেড়ান, তাদের মনও ঈর্ষায় কালো হয়ে ওঠে। বুঝতে পারলাম শুধু আমি, বাইরের এই লাভে অন্তরের কত বড় ক্ষতি হয়ে গেল আমার। মনে মনে কেঁদে বললাম, ‘হায় গুরুদেব! কেন আমার এত বড় ক্ষতিটা করলে।’
আবু হেনা মোস্তফা কামাল ছিলেন বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের একজন ধীমান অধ্যাপক, সেই সঙ্গে কবি, সঙ্গীত স্রষ্টা ও শিল্পী হিসেবেও ছিলেন খ্যাতিমান। সুতরাং কাব্যের স্বতন্ত্র পরিমণ্ডল সৃষ্টিতে নজরুলের সিদ্ধি মূল্যায়নে তার সিদ্ধান্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সঙ্গীত ও সুরস্রষ্টা নজরুল সম্পর্কে অভিমত দিতে গিয়ে সঙ্গীতে নজরুলের প্রস্তুতিপর্ব সম্পর্কে তিনি জীবনীকারদের নীরবতার প্রসঙ্গ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। অধ্যাপক হেনা, ওস্তাদ কাদের বক্স, জমির উদ্দিন খান প্রমুখের কাছে নজরুল ঠিক কতদিন তালিম নিয়েছিলেন সে সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার মতো কোনো তথ্য না পেয়ে লিখেছেন, ‘তথাপি বাংলা কবিতার মতো বাংলা গানেও নজরুল যে একটি ভিন্ন ও সচ্ছল ধারার প্রবর্তন করতে সক্ষম হলেন, তার একমাত্র ব্যাখ্যা তাঁর প্রতিভার অলৌকিকতার ভেতরই মেলে। আন্তরিক প্রযতœ ও নিষ্ঠার ফলে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে যে দখল একজন শিল্পী অর্জন করেন নজরুল তা অবলীলায় অধিকার করেছিলেন ন্যূনতম প্রয়াসে। উপরন্তু, আশৈশব দেশজ সঙ্গীতের যেসব ধারায় তিনি অবগাহন করেছেনÑ যেমন বাউল, কীর্তন, ঝুমুর, সাঁওতালিÑ তাকে নিপুণ হাতে প্রয়োগ করেছেন সুরসৃষ্টির ক্ষেত্র।’
‘পাষাণের ভাঙালে ঘুম/ কে তুমি সুরের ছোঁয়ায়’ Ñএ প্রশ্নের উত্তরে নির্দ্বিধায় বলা যায়, নজরুলই তাঁর সুরের ছোঁয়ায় পাষাণসদৃশ বঙ্গীয় মুসলিম সমাজের ঘুম ভাঙিয়েছিলেন। এ প্রসঙ্গে কবি আল মাহমুদ বলেছেন, ‘নজরুল ছিলেন তার কালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রেমের কবি।’ আর এ কারণেই ‘মানব প্রেমের বিপুল বৈচিত্র্য দেখা যায় তার গানে।’ আল মাহমুদ আরো বলেছেন, ‘বাংলা সঙ্গীতের ধারায় মধ্যপ্রাচ্যের আরবি, ফারসি গানের সুর নজরুলই আমদানি করেন। এ কাজ আর কেউ করতে পারেননি।’ নজরুল ইসলামী ঐতিহ্যের ভেতর থেকে এলেও কীর্তন আর শ্যামাসঙ্গীতে তিনি যে নৈপুণ্যের স্বাক্ষর রাখেন তা দেখে বিস্ময় জাগে হিন্দুমনে। আবার গোঁড়া মুসলিম সমাজ তাকে কাফের ফতোয়া দিলেও তারা নজরুলের ‘তোরা দেখে যা আমিনা মায়ের কোলে/ মধু পূর্ণিমারই সেথা চাঁদ দোলে’ অথবা ‘রমজানের ঐ রোজার শেষে এল খুশির ঈদ’- এ জাতীয় গান শুনে চমকে ওঠে। এত সুন্দর ইসলামী গান বঙ্গীয় মুসলিম সমাজ নজরুলের আগে কখনো শোনেনি। সত্যি বলতে কি, কীর্তনে, ইসলামি গানে এমনকি আধুনিক সঙ্গীতের বাণী রচনায় নজরুল যে কল্পনা শক্তির পরিচয় দেন তার তুলনা চলে কেবল রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে। উদাহরণ হিসেবে তাঁর একটি বিখ্যাত গানের বাণী এ প্রসঙ্গে উদ্ধৃত করা যায়Ñ ‘মোর প্রিয়া হবে এসো রাণী দেব খোঁপায় তারার ফুল/ কর্ণে দোলাব তৃতীয়া তিথির চৈতী চাঁদের দুল।’
আমাদের বিশ্বাস, কবিতায় ও গানে নজরুল প্রায় সমান অবদান রেখে গেছেন। সবার মধ্যে সাম্য ও স্বাধীনতার চেতনা সঞ্চারেও তার ভূমিকা ছিল অনন্য। নজরুলের কাহিনী মূলত একজন প্রতিভাবান সাহসীকবি ও শিল্পীর কাহিনী। আমাদের জাতীয় ইতিহাসে নজরুলের জীবন কাহিনী কখনো ম্লান হওয়ার নয়। আমাদের জাগরণে, সংগ্রামে, বিদ্রোহে, প্রেমে, সৃজনে ও মননে নজরুল যেহেতু অন্তহীন অনুপ্রেরণার উৎস সেহেতু তাঁর চর্চায় ও অনুশীলনে আমাদের আরো বেশি মনযোগী হওয়া বাঞ্ছনীয়। হ