এখানে-সেখানে সামান্য ব্যতিক্রম হলেও সহজেই অনুমেয় অন্যায়ভাবে অর্থলিপ্সা পূরণ ও জনগণের ওপর অত্যাচার-নির্যাতনের মূল হাতিয়ার হলো ‘ক্ষমতা’। তাহলে স্বাভাবিক নিয়মেই প্রশ্ন জাগে, ক্ষমতা আসলে কি? ক্ষমতার সংজ্ঞা কী? ক্ষমতা বৈধ কি অবৈধ তার নির্ধারক কে? এর সোজা উত্তর পাওয়া দুরূহ। কেননা ক্ষমতার আকৃতি-প্রকৃতি ও গঠন অনেকটাই গণতন্ত্রের মতোই বহুরূপী ও বহুমাত্রিক। তবে ক্ষমতাকে সহজ-সরল অর্থে বিবৃত করা যেতে পারে। যেমন, প্রাচীনকালে শারীরিক শক্তি ও প্রাতিজনক (Private) সেনাবল ব্যবহার করে জনগণকে দমন করে রাখার সামর্থ্যকে বলা যায় ক্ষমতা। অথবা জোরপূর্বক ক্ষমতা প্রয়োগ করে জনগণকে বাধ্য করতে পারলে ক্ষমতার প্রয়োগকে সাধারণ মানুষ বৈধ বলে মেনে নিতেন। অর্থাৎ জোরপূর্বক ক্ষমতাপ্রাপ্ত হলেও যত দিন জনগণকে বাধ্য রাখা যেত তত দিন তার ক্ষমতা বৈধ। এক কথায় বলা প্রজাতান্ত্রিক সরকারের ধ্যান-ধারণার পূর্বে, অর্থাৎ অতীতে ক্ষমতার মূল উৎস ছিল শক্তি বা বলপ্রয়োগ।
তবে আধুনিক যুগে ক্ষমতা বলতে যা বোঝায় তা নিরূপিত হয়, ‘সংবিধানে নির্ধারিত আইনসম্মতভাবে অর্জিত ও অর্পিত কর্তৃত্বাধিকার’ প্রাপ্তির মধ্য দিয়ে। অর্থাৎ বাহ্যিক ভারসাম্যবিধায়ক সীমারেখার আওতায় কোনো গোষ্ঠী বা দলের নিজেদের নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব অর্জন করা এবং ‘আইনসম্মত কার্যব্যবস্থা’ গ্রহণের মাধ্যমে নাগরিকদের কার্যকলাপ ও প্রতিক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণে রাখার সামর্থ্য অর্জন করা। তবে ক্ষমতা অর্জন ও ব্যবহারের পরিপ্রেক্ষিতে বাহ্যিক ভারসাম্যবিধায়ক ব্যবস্থা বলতে ‘যে দল বা গোষ্ঠী ক্ষমতায় থাকে, তাদের কর্তৃত্বাধিকার প্রয়োগে সংবিধানে বর্ণিত ও আরোপিত বিধিনিষেধ ও সীমারেখার চৌহদ্দির ভেতরে থেকে সীমিত ক্ষমতার প্রয়োগ ও অনুশীলনকে’ বোঝানো হয়। সহজ-সরল কথায়, যে দল সরকার নিয়ন্ত্রণ করে তারা যেমন আইনসম্মতভাবে জনগণকে নিয়ন্ত্রণ করার অধিকার অর্জন করে, তেমনি ক্ষমতাসীনদের কার্যকলাপ ও ক্ষমতার ব্যবহার, বিধি-বিধানও আইনসম্মতভাবে নিয়ন্ত্রিত থাকবে।
সামাজিক মূল্যবোধ, নিয়মবিধি ও উচ্চমানের নৈতিকতার কারণে ক্ষমতাসীনেরা কোনো কোনো সময় হয়তো ক্ষমতার অপব্যবহার করে বিরোধীদের অধিকার হরণের মানবীয় প্রবণতা থেকে নিবৃত্ত থাকতে পারেন। অথবা ক্ষমতা অপব্যবহারের আবেগকে সংযত রাখতে পারেন। সেটা সীমিত সংখ্যক ক্ষমতাপ্রাপ্তদের বেলায় সত্য হলেও সাধারণত নিয়মের ব্যতিক্রম। কেননা মানুষের চিরাচরিত স্বভাবধর্মের স্বাভাবিক প্রবণতার (ক্ষমতালিপ্সা) কারণেই ক্ষমতাসীনেরা সুযোগ পেলেই আরো বেশি ক্ষমতা নিজ করায়ত্তে সঞ্চিত (কুক্ষিগত) করতে চান এবং সুযোগ পেলেই কুক্ষিগত ক্ষমতার অপব্যবহার করেন। সে জন্যই বিভিন্ন বাহ্যিক নিয়ন্ত্রণ, যেমন ক্ষমতার পৃথকায়ন (Separation of Powers), ভারসাম্যের বিধান ও বিভিন্ন প্রতিবিধায়ক ভারসাম্য (Checks and Balances) ব্যবস্থার মাধ্যমে ক্ষমতা বৃদ্ধি, প্রয়োগ এবং প্রয়োগের প্রক্রিয়া ও ক্রিয়াপ্রণালীতে সীমারেখা টেনে ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করার মাধ্যমে ক্ষমতার অপব্যবহারে বাধা সৃষ্টি করা অতীব জরুরি ও অত্যন্ত গুরুত্ব¡পূর্ণ বিষয়। দুর্বল, ক্ষমতাহীন ও বিরোধীদের মৌলিক অধিকারের একমাত্র রক্ষাকবচ হলো প্রতিবিধায়ক ভারসাম্যের মাধ্যমে ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ।
এই বাহ্যিক নিয়ন্ত্রণ বা ভারসাম্য বিধানের অর্থ হলো সাংবিধানিকভাবে ক্ষমতার নির্মিতি বা কাঠামোতে স্বতন্ত্র অনেক শাখা-প্রশাখা সৃষ্টি করে শাসকগোষ্ঠীর ক্ষমতাকে যৌক্তিক পর্যায়ে বিভিন্ন বিভাগে (শাখা-প্রশাখায়) বিভক্ত করে দেয়া। সেই সাথে সরকারের অভ্যন্তরীণ কাঠামোকে এমন কৌশলে সাজাতে হবে, যার আওতায় সরকারের শাখা-প্রশাখাগুলো পারস্পরিক সম্পর্ক ও সম্মতিক্রমে নিজ নিজ বা স্বকীয় অবস্থানে থেকে প্রাপ্ত ক্ষমতা ব্যবহার বা প্রয়োগ করার নিশ্চয়তা বিধান করবে। অর্থাৎ বিধিবিধানের আওতায় প্রতিটি শাখা এক দিকে নিজ ক্ষমতা প্রয়োগ করবে অন্য দিকে ক্ষমতাপ্রাপ্তরা চিত্রায়িত সীমারেখার গণ্ডির ভেতরে থাকতে বাধ্য হবে। এই কৌশলের প্রথম সারিতে হলো রাষ্ট্রের অপরিহার্য বা মৌলিক শাখাগুলোর মধ্যে ‘ক্ষমতার পৃথকায়ন (Seperation of Powers) বা ক্ষমতার স্বতন্ত্রায়ন’ নিশ্চিত করা, যেমন নির্বাহী, আইন প্রণয়নকারী ও বিচার শাখা। দ্বিতীয় সারিতে হলো ‘সংবিধানসম্মতভাবে বিধায়ক ও প্রতিবিধায়ক ভারসাম্য (Checks and Balances’ সৃষ্টি করা।
একটি সামাজিক কাঠামোর মধ্যে মানুষ নিজেদের ঐক্যবদ্ধ করে সেই সমাজবুননটকে রক্ষা ও শান্তিপূর্ণ রাখার অভিপ্রায়ে সমষ্টিগতভাবে আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হবে, এটি আদর্শিক ও কল্পিত ধ্যানধারণা মাত্র। এই কল্পিত ধারণা মানুষের স্বাভাবিক চরিত্রের প্রকৃতিদত্ত বৈশিষ্ট্য এবং স্বাধীনতা ও অধিকারের ধারণার সাথে নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত। জেফারসন, ম্যাডিসন, লক, হবস সবাই যুক্তিতর্কের মাধ্যমে ব্যক্তি মানুষের সার্বভৌম ক্ষমতা ও সব মানুষের সম-অধিকারের পক্ষে মতামত উপস্থাপন করেছেন। তাঁরা বিশ্বাস করতেন, ‘স্রষ্টা সব মানুষকে সমান করে সৃষ্টি করেছেন। জন্মসূত্রে স্রষ্টা তাদের কতকগুলো অবিচ্ছেদ্য ও অলঙ্ঘনীয় অধিকার দিয়েছেন। এগুলো খর্ব ও হরণযোগ্য নয় বা অলঙ্ঘনীয়’। অধিকারগুলোর অন্তর্ভুক্ত রয়েছে : ক. ‘জীবনীশক্তি (বেঁচে থাকার অধিকার); খ. স্বাধীনতা (নিপীড়ন থেকে মুক্তি এবং স্ব-ইচ্ছায় কাজকর্ম বা চলাফেরা করা) ও গ. সুখ-তৃপ্তি (যেকোনো অভীষ্ট জড়-অজড় বস্তু) অন্বেষণের অধিকার’। অধিকারগুলোর সুরক্ষা কেবল তখনই সম্ভব যখন ক্ষমতাপ্রাপ্তদের ক্ষমতা ব্যবহারের ওপর যৌক্তিক বাহ্যিক নিয়ন্ত্রণ থাকে। ক্ষমতার পৃথকায়ন, ক্ষমতার ভারসাম্য ও প্রতিবিধায়ক ভারসাম্য মানুষের এসব প্রকৃতিদত্ত অধিকারের রক্ষাকবচ।

মানুষের অধিকার ও সরকার ব্যবস্থা
আদর্শিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বলা যায় যে, রাষ্ট্রের আবির্ভাব ও সরকার প্রতিষ্ঠার বিশেষ লক্ষ্য, আদর্শ ও প্রধান উদ্দেশ্য হলো ‘মানুষের জন্মগত অধিকারের নিশ্চয়তা ও নিরাপত্তা বিধান করা’। সে জন্যই যারা ক্ষমতাপ্রাপ্ত হবেন (যাদের হাতে ক্ষমতা ন্যস্ত করা হবে) এবং ক্ষমতা পরিচালনা করবেন (শাসন করবেন), তাদের সেই ক্ষমতার মূল উৎস ও ভিত্তি হবে, যাদের (জনগণ) পরিচালিত বা শাসন করবেন, তাদের (জনগণ) অনুমতি ও সম্মতির ভিত্তিতে। যদি মানুষের স্বাভাবিক মনোবৃত্তি (the natural faculty of mind) ও আদর্শ (Ideals) এবং প্রকৃতিদত্ত বিচার (Natural Justice), মানুষের লিপ্সা, পাপাচার ও ধৃষ্টতার প্রবণতাকে নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য পর্যাপ্ত হতো অথবা যদি মানুষ কোনো অন্যায়, অবিচার, অশুভ কাজ বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি না করত বা মানুষ সাধারণ নিয়মেই ক্ষমতালোভী বা ক্ষমতার অপব্যবহার করে ধনলিপ্সা পূরণে সচেষ্ট না হতো তাহলে নিজেরাই সম্মতি-অনুমতি দিয়ে, নিজেরাই সরকার প্রতিষ্ঠা করে সেই সরকারের প্রতি আনুগত্য ঘোষণা করার কোনো প্রয়োজন হতো না। অর্থাৎ নিজ সম্মতিতে প্রতিষ্ঠিত সরকারকে, নিজের জন্মগতসূত্রে পাওয়া অলঙ্ঘনীয় অধিকারগুলোকে নিয়ন্ত্রণ বা খর্ব করার কর্তৃত্ব দেয়ার কোনো আবশ্যকতাই থাকত না।
মানব জাতির জন্য সরকার ব্যবস্থা যেসব অসাধারণ ও মহা-উপকারী সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টি করেছে সেগুলোর মধ্যে অন্যতম প্রধান হলো ‘বিচারব্যবস্থার প্রতিষ্ঠা ও আইন প্রয়োগের মাধ্যমে মানবসমাজে শৃঙ্ঘলা বজায় রাখা।’ সরকার ব্যবস্থা নিয়ে ডেভিড হিউম (১৭১১-১৭৭৬) বলেছেন, ‘মানুষের জন্য সরকার ব্যবস্থা এক বিরাট সুযোগ-সুবিধা ও মহান উপকারী আবিষ্কার।’ তবে এই সরকার ব্যবস্থার আবিষ্কার হঠাৎ কোনো ঘটনা নয়। এটা ঘটেছে শত শত বছরে আবর্তন-বিবর্তনের মাধ্যমে। প্রাথমিকপর্যায়ে এ ব্যবস্থা ছিল অস্তিত্ব¡রক্ষামূলক, পরে দাসপ্রথাভিত্তিক এবং তারপর কৃষিভিত্তিক আদি উপজাতি সমাজ ব্যবস্থাপনা। অর্থাৎ একেক সময় একেক পর্যায় বা স্তর অতিক্রম করে বর্তমান অবস্থায় পৌঁছেছে। যেমন ঐশীবাণীর (বিস্ময়কর তথ্যের প্রকাশ) কর্তৃত্ব, পুরোহিত বা মৌলতান্ত্রিক রাষ্ট্র (ধর্মরাষ্ট্র), রাজতন্ত্র, উপনিবেশবাদ, সামন্তবাদী, গণভোগতান্ত্রিক, অভিজাততন্ত্র এবং সর্বশেষে উদার গণতন্ত্র।
মানুষের জটিল মস্তিষ্কে উদ্ভাবনের নিপুণতার মাঝে ব্যাখ্যা রয়েছে তার প্রস্তর যুগের জীবন ধারণের জান্তব অবস্থা থেকে যৌক্তিক মানবস্তরে উত্তরণের পথ। মানব সমাজ এই সুদীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে বর্তমান অবস্থিতিতে পৌঁছার মূল শক্তি হলো মানুষের উদ্ভাবনী ক্ষমতার সুফল। এটি অর্জিত হয়েছে অসীম ধৈর্যে, এক যন্ত্রণাদায়ক ধীর প্রক্রিয়ায় হাজার হাজার বছরের এক বেদনার্ত পরিস্থিতিতে, মানুষের চাতুর্য ও কৌশল প্রয়োগে কষ্টদায়ক প্রক্রিয়া ও অভিজ্ঞতা অর্জনের মাধ্যমে। নব্যপ্রস্তর যুগের মানুষ আর আজকে আধুনিকতা-উত্তর একুশ শতকের মানুষের মধ্যে যে পার্থক্য, সেটা হলো নব্যপ্রস্তর যুগের মানুষকে বাস করতে হয়েছে প্রকৃতির জিম্মি হিসেবে অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে আর আধুনিক যুগের মানুষ সেদিনের তুলনায় অপেক্ষাকৃত অনেক বেশি স্বস্তি ও নিরাপত্তার মাঝে বাস করছে। নিরাপত্তা ও নিরাপত্তাহীনতা এবং নিশ্চয়তা ও অনিশ্চয়তা এগুলোর মধ্যকার যে পার্থক্য সেটাই হলো বর্তমান সামাজিক অবস্থিতি ও শাসনব্যবস্থা। এভাবেই মানব সমাজ একেক সময়কালে বিভিন্ন স্তর ও পর্যায় থেকে আবর্তন-বিবর্তনের মধ্য দিয়ে, ঘুরপাক খেতে খেতে ক্রমান্বয়ে আজকের আধুনিক, সুসঙ্গত ও সঙ্গতিপূর্ণ প্রজাতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থার বিকাশ ঘটাতে সামর্থ্য অর্জন করেছে। বর্তমান অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায় যে উদার গণতন্ত্রভিত্তিক প্রজাতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থা ক্রমান্বয়ে বিকশিত হওয়ার মাধ্যমে উৎকর্ষ লাভ করে দিন দিন বিভিন্ন জনসমাজে আধিপত্য বিস্তার লাভ করছে।

গণতন্ত্রের মৌলিক বুনিয়াদ - স্বাধীনতা ও সমতা
কোনো না কোনোভাবে বর্তমান শাসনব্যবস্থা বিশেষ করে উদার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাপনাকে বলা যায় ‘মানুষের রাজনৈতিক ধ্যানধারণা ও আশা-আকাক্সক্ষার প্রতিফলনের এক সুসঙ্গতিময় মঞ্চ’। উদার গণতন্ত্র এখন বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চল ও সংস্কৃতিতে বিভিন্নরূপে প্রতিষ্ঠালাভ করেছে ও ক্রমান্বয়ে বিস্তার লাভ করছে। ব্যক্তি স্বাধীনতা (নিপীড়ন থেকে মুক্তি ও স্ব-ইচ্ছায় কাজ বা চলাফেরা করার অধিকার) ও সমতা (সমঅধিকার) এ দুই প্রধান নীতিকে মূল ভিত্তি করে উদার গণতন্ত্রের মৌলিক বুনিয়াদ রচনা করা হয়েছে। বিগত অর্ধ শতকে (দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী) গোটা বিশ্বে উদার গণতন্ত্রভিত্তিক সরকার ব্যবস্থার বৈধতা লক্ষণীয়ভাবে সর্বসম্মতি লাভ করেছে।
গণভোগতন্ত্র (Communism) পতনের পর থেকে অনুমেয় যে, উদারনৈতিক গণতন্ত্র (Liberal democracy) আপাতত অন্য যেকোনো তন্ত্র, মতাদর্শ, মতবাদ ও প্রতিযোগী রাষ্ট্রীয় শাসন ব্যবস্থাগুলো যেমন বংশানুক্রমিক শাসন (Hereditary), রাজতন্ত্র (Monarchy), অভিজাততন্ত্র (Aristrocracy) ফ্যাসিবাদতন্ত্র, একনায়কতন্ত্র (Dictatorship), সর্বগ্রাসী শাসনতন্ত্র (Totalitarian), প্রভুত্বতন্ত্র (Authoritarian) ও সমাজতন্ত্রের (Socialism) সাথে প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হয়েছে। ফ্রান্সিস ফুকুইয়ামার মতে, উদারনৈতিক গণতন্ত্র হয়তো মানবজাতির ভাবতত্ত্ব বা ভাব-আদর্শিক আবর্তন-বিবর্তনের শেষ বিন্দু বা শিখরে পৌঁছেছে। তাই বলা যায়, বর্তমান সরকারব্যবস্থার গঠন ও আদর্শ হলো তার চূড়ান্ত চেহারা। তিনি আরো যুক্তি-তর্ক দিয়ে ব্যাখ্যা দিয়েছেন যে, সব ধ্যানধারণা ও মতাদর্শকে একত্রে এনে বিচার করলে অন্যসব ভাবতত্ত্ব ও আদর্শের বিপরীতে উদারনৈতিক গণতন্ত্র এমন এক আদর্শিক শাসনব্যবস্থা যা বহু মৌলিক দিক থেকে এক স্ব-বিরোধিতামুক্ত শাসন ব্যবস্থা।
এ ছাড়াও উদার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা যেমন একদিকে স্বাধীনতা ও সমতা এই দ্বৈত মূলতত্ত্ব ও নীতির অনুকূল অন্য দিকে উদার অর্থনীতির (মুক্তবাজার অর্থনীতি) মূলতত্ত্বের সাথে খাপ খায়। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যেসব দেশ ও জাতি উদার গণতন্ত্রের মূলতত্ত্ব ও উদার অর্থনীতি, এই যমজ আদর্শিক নীতিকে যুগপৎ স্বীকৃতি দিয়ে বা উদার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নীতি (অর্থনৈতিক স্বাধীনতা) অনুসরণ করেছে, সেসব দেশ ও সমাজ দ্রুত পার্থিব সম্পদ সৃষ্টি করে নিজেদের সমৃদ্ধিশালী করার এক নজিরবিহীন উদাহরণ সৃষ্টি করেছে। একই সাথে সেসব দেশ বা সমাজ নিজেদের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের গতি ত্বরান্বিত করতে সক্ষম হয়েছে। উদ্যোগ, বিনিয়োগ এসবই আইনের শাসন ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতানির্ভর। সে জন্যই আমরা ধরে নিতে পারি যে, উদারনৈতিক অর্থনীতির এই বিপ্লব বিশ্বের বহু দেশকে স্বাধীনতা ও সমতা ভিত্তিক সমাজের দিকে এগিয়ে যেতে প্রচণ্ডভাবে প্ররোচিত করেছে।
ফুকুইয়ামা আরো তর্কযুক্তি দেখিয়ে বলেছেন, আধুনিক প্রাকৃতিক বিজ্ঞান স্বাভাবিক নিয়মেই অর্থনৈতিক উৎপাদনের জন্য এক নয়া দিগন্তের সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে। জ্ঞান ও নিত্য-নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করে সীমাহীন সম্পদ সৃষ্টি ও সৃষ্ট সম্পদ উত্তরোত্তর বৃদ্ধির সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। ফলে মানুষের চিরসম্প্রসারণশীল ভোগবাসনার সন্তুষ্টি বিধানের সম্ভাবনাকে অবারিত করেছে। তিনি যুক্তি দেখিয়ে আরো বলেছেন যে, ‘কোনো দেশ বা জাতি যখন অর্থনৈতিক উন্নয়নের মাধ্যমে আধুনিকায়নের পথে এগিয়ে যাবে, সে দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের চেহারা ক্রমেই একে অন্যের সাথে সদৃশ হয়ে উঠবে। এসব দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনা হবে অনুরূপ। এটা হবে জাতীয় পর্যায়ে একতাবদ্ধ, কেন্দ্রায়িত রাষ্ট্র (কেন্দ্রায়িত ক্ষমতা নয়) ও দ্রুত নগরায়নের ভিত্তিতে। এই প্রক্রিয়ায় সমাজের বহু আচার-রীতি-প্রথা ও ঐতিহ্য বিলীন হয়ে যাবে বা বদলে যাবে। সেই সাথে কাজের দক্ষতা ও ক্রিয়াকলাপের ভিত্তিতে পারিবারিক ও সমাজ ব্যবস্থা এক নতুন রূপ নেবে। এসব দেশের নাগরিকরা সার্বজনীন শিক্ষা লাভ করবে।’
ম্যাডিসন, জেফারসন, ম্যাসন, ফ্রাঙ্কলিন, লেনোইর ও সমসাময়িক কালের অন্যান্য চিন্তাবিদ যে ধরন ও গঠনের প্রজাতান্ত্রিক নীতির ধ্যান-ধারণা দিয়েছিলেন, সম্ভবত সেসব ধ্যান-ধারণাই কালপরিক্রমায় উদারনৈতিক গণতন্ত্রের রূপ নিয়েছে। যদিও সুসঙ্গত ও পূর্ণাঙ্গতার পথ ধরে এগিয়ে আসার পথে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অনেক অসঙ্গতি লক্ষ করা যায়। এমনকি যে ‘স্বাধীনতা ও সমতার’ মৌলিক ধারণাকে ভিত্তি করে পাশ্চাত্য বিশ্বে প্রজাতান্ত্রিক ধ্যান-ধারণা ও দর্শন গড়ে উঠেছে, সেই পাশ্চাত্যের মাত্র দুই-একজন ইতালীয় মানবতাবাদী ছাড়া ষোলো শতক পর্যন্ত অন্য কোনো দেশের চিন্তাবিদদের লেখায় প্রজাতন্ত্রবাদের এই দুই মূল নীতি কোথাও স্থান পায়নি। যারা লিখেছেন তারাও হয়তোবা নিরুপায় হয়ে লিখেছেন।
তাদের মূল লক্ষ্য ছিল সর্বাত্মক নিয়ন্ত্রণবাদী ক্যালভিনীয় ধর্মমতের বিরুদ্ধে। তাদের মতবাদ পর্যালোচনা করলে বোঝা যায় যে, তারা আসলে ক্যালভিনীয় ধর্মমতের বিপক্ষে স্বাধীনতা ও সমতাকে মানুষের জন্য এক নতুন আশ্রয়স্থল হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। যাই হোক, গণতন্ত্র নিয়ে অনেক বাগি¦তণ্ডা এখনো আছে। তবে নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, গণতন্ত্রের প্রক্রিয়া ইতোমধ্যে অনেক দূরের পথ পাড়ি দিয়ে সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে ও নানা আকার-প্রকারের অসঙ্গতি দূর করে বর্তমানে উৎকর্ষ লাভ করেছে। অন্য দিকে সতেরো শতকের সূচনা পর্বে ইউরোপীয়রা রাষ্ট্রের একটি নতুন ধারণা গড়ে তোলেন। তাদের মতে ‘রাষ্ট্র হবে এমন এক বৈশিষ্ট্যময় রাজনৈতিক সত্তা’, যেখানে কেবল শাসকরা নয় বরং প্রজাদেরও (নাগরিক) বাধ্যতামূলক কিছু অধিকার, দায়িত্ব ও কর্তব্য থাকবে। এই ধারণার ভিত্তিকে অবলম্বন করেই আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের বুনিয়াদের পত্তন ঘটে।

স্বাধীনতা ও জনসার্বভৌমত্ব
মধ্যযুগের (1050-1450) শেষের দিকে ও শিল্প-সাহিত্যের নবজাগরণের (Renaissance - 1500-1600) যুগে স্বাধীনতা ও সমতাভিত্তিক প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ধারণাটি দ্রুত প্রসার লাভ করে। আঠারো শতকের দিকে ইতালীয় প্রজাতন্ত্রগুলোতে এই নব্য-আদর্শের প্রথম বাস্তবায়ন ঘটে। পরবর্তীকালে আদর্শগুলো অন্তত দু’টি ইউরোপীয়ান দেশ, যেমন ইংল্যান্ড ও নেদারল্যান্ড আইনের মাধ্যমে চর্চা শুরু করে। তারও পরে পশ্চিম ইউরোপের বিভিন্ন দেশ ও যুক্তরাষ্ট্র (আমেরিকা) ক্রমান্বয়ে স্বাধীনতা ও সমতাভিত্তিক প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্রীয় আদর্শে সাড়া দিয়ে শাসন ব্যবস্থায় সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী রাজতন্ত্র প্রথা প্রত্যাখ্যান করে। অতএব বলা যায়, সেই সময় থেকেই গণতান্ত্রিক বিপ্লবের যাত্রা শুরু। দার্শনিক হেগেল (১৭৭০-১৮৩১) যথেষ্ট যুক্তিতর্ক দিয়ে বিষয়টি এভাবে বর্ণনা করেছেন, ‘প্রভুত্ব (Lordship) ও দাসত্বের (Slavery) মধ্যে যে জন্মগত বিরোধ ও অসঙ্গতিপূর্ণ সম্পর্ক এতদিন বিদ্যমান ছিল, শেষ পর্যন্ত ফরাসি ও আমেরিকান বিপ্লবের মধ্য দিয়ে এর পরিসমাপ্তি ঘটেছে।’ তিনি বলেছেন, ‘প্রভুত্ব ও দাসত্ব’ সম্পর্কের ওপর ভিত্তি করে এতদিন যে শাসন ব্যবস্থা মানব সমাজে বিদ্যমান ছিল, গণতান্ত্রিক বিপ্লবের মধ্যদিয়ে তার ইতি ঘটেছে। অর্থাৎ এর মধ্য দিয়ে যে আখ্যান রচিত হয়েছে সেটা জনসার্বভৌমত্বের নীতিমালা ও আইনের শাসন, যেখানে প্রতিটি মানুষ অন্যের মর্যাদাকে স্বীকার করে নিয়েছে। সেই সাথে রাষ্ট্র তার নাগরিকদের ন্যায্য ও নীতিসম্মত অধিকারগুলোকে মেনে নিয়ে মানুষের প্রকৃতিদত্ত অধিকার ও মর্যাদাকে স্বীকৃতি দিয়েছে।’
অতীতে জেফারসন, হ্যামিল্টন, ম্যাডিসন, ম্যাসন ও আধুনিক যুগে হবস (Hobes), লক (Locke), হায়েক (Hayek), হেগেল (Hegel) ও অন্যেরা হয়তো বিশ্বাস করতেন, ‘মানুষের প্রকৃতিদত্ত অধিকার (Natural rights) বা জন্মগত অধিকারের বিষয়টি ‘ব্যক্তি পরিমণ্ডলের একান্ত স্বাধীনতাকে বোঝায়। মানুষের এই জন্মগত অধিকারগুলোকে খর্ব হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করা গেলে, মানুষ নিজের সৃজনশীলতা ও মননশীলতাকে ব্যবহার করে নিজেকে ধনী ও সম্পদশালী করে তুলতে পারবে। সেই সাথে তাদের অন্তরে (Soul) যে কামনা-বাসনা-অভিলাষ সর্বদা লুকায়িত, সেই অভিলাষগুলোকে পরিতৃপ্ত করতে সক্ষম হবে।’ অন্যদিকে ফুকুইয়ামা যুক্তিতর্ক দাঁড় করিয়ে ব্যাখ্যা দিয়েছেন যে, ‘ব্যক্তি স্বাধীনতার’ যে ‘ইচ্ছা, আকাক্সক্ষা ও অভিলাষ’, সেটাই হলো উদার রাজনীতি (গণতন্ত্র) ও উদার অর্থনীতির (মুক্তবাজার) মধ্যকার ব্যবধান বা হারানো সূত্র।’

স্বাধীনতা, সমতা ও আত্মমর্যাদা
জড় বা অজড় বস্তু মানুষের নিজের যা নেই, সেসব বস্তু চাওয়া ও পাওয়ার জন্য তার আত্মার (Soul) ভেতর লুকায়িত কামনা-বাসনা-অভিলাষ প্রচণ্ড প্ররোচনা যোগায়। এগুলোর প্রথম সারিতে আছে অর্থলাভের প্রবল আকাক্সক্ষা ও ক্ষমতার অভিলাষ। দ্বিতীয় সারিতে আছে সমাজে নিজ মর্যাদার স্বীকৃতিলাভের বাসনা। অন্য দিকে এগুলোর সাথে আবেগ-অনুভূতি, ক্রোধ, লজ্জা ও গর্বের মতো পার্থিব বিষয়গুলো জড়িত। এসব বিষয় মানব ব্যক্তিত্ব ও চরিত্রের অবিচ্ছেদ্য অংশবিশেষ। তাই এগুলো মানুষের ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক জীবনের জন্য অতীব গুরুত্ব¡পূর্ণ। দার্শনিক হেগেলের মতে, ‘আত্মমর্যাদার স্বীকৃতিলাভের সাথে জড়িত মানুষের কামনা-বাসনা ও আবেগ-অনুভূতির মতো বিষয়গুলো উদার রাজনীতি বা প্রজাতান্ত্রিক ধ্যান-ধারণার ঐতিহাসিক প্রক্রিয়াকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার পরিচালনা শক্তি।’
দর্শনের জনক প্লেটো সর্বপ্রথম এ বিষয়ে বিশদ বর্ণনা দেন। বিখ্যাত দ্য রিপাবলিক গ্রন্থে তিনি লিখেছেনÑ ‘মানুষের আত্মার (Soul) তিনটি অংশ আছে। একটি হলো কামনা-বাসনা-আকাক্সক্ষার অংশ। একটি যুক্তি বা হেতু প্রয়োগের অংশ। আর তৃতীয়টি হলো থাইমাস বা আত্মমর্যাদাবোধ।’ মানুষের প্রায় সকল আচার-আচরণই সত্যিকার অর্থে প্রথম দুই অংশের সমন্বয় বিশেষ। আগেই বলা হয়েছে, এ দু’টি হলো ‘আকাক্সক্ষা (অভিলাষ) ও যুক্তি’। আকাক্সক্ষা বা অভিলাষ মানুষকে কোনো জড় বা অজড়বস্তু পাওয়া বা আয়ত্তে আনার জন্য প্রবল ইচ্ছার জোগান দেয়, এমনকি ওই সব বস্তু খুঁজতে, চাইতে, পেতে বা জোর করে আয়ত্তে আনতে প্ররোচনা জোগায়। অন্যদিকে যুক্তি বা হেতু প্রয়োগ, মানুষকে এসব লক্ষ্যবস্তু পেতে বা আয়ত্তে আনার সর্বোত্তম উপায় কী হতে পারে, সেই সম্ভাব্য পথ খুঁজে বের করতে সাহায্য করে ও প্রেরণা জোগায়।
দার্শনিক হেগেলের মতানুযায়ী, মানুষের প্রকৃতিদত্ত (প্রাকৃতিক) চরিত্রের বৈশিষ্ট্য অন্যান্য জীবজন্তুর মতোই। প্রাকৃতিক নিয়মেই তাদের কিছু জড়-অজড় বস্তুর প্রয়োজন থাকে যেগুলো তাদের হাতে বা আয়ত্তে নেই। যেমন খাদ্য, আশ্রয়স্থল, সামাজিক মর্যাদার মতো আরো অনেক জড়-অজড় বস্তু। উদারনৈতিক অর্থনীতি ‘অভিপ্রায় ও অভিলাষ’ পূরণের পক্ষে যথেষ্ট ব্যাখ্যা দিতে সক্ষম হলেও উদারনৈতিক গণতন্ত্রের দুই যমজ নীতি ‘স্বাধীনতা ও সমতার’ পুরোপুরি ব্যাখ্যা দিতে এখনো অসমর্থ। তবে ফুকুইয়ামা এ ব্যাপারে যে ব্যাখ্যা দিয়েছেন, সেটা হলো ‘থাইমাস বা আত্মার তৃতীয় অংশ যা বেরিয়ে আসে আত্মমর্যাদাবোধের স্বীকৃতি লাভের দাবি থেকে’। এ বিষয়ে আরো বিশদ ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে তিনি বলেনÑ ‘শিল্পায়নে অগ্রগতির সাথে তাল মিলিয়ে সমাজও বদলে যায়। বিশেষ করে সমাজে সার্বজনীন শিক্ষা মানুষের আত্মার তৃতীয় গবাক্ষকে খুলে দেয় বলে ধারণা করা যায়। হয়তোবা আগেকার দিনে প্রভুত্বভিত্তিক শাসন ব্যবস্থায় দাসশ্রেণী, অশিক্ষিত ও দারিদ্র্যের কষাঘাতে জর্জরিত গরিব জনগোষ্ঠীর মধ্যে আত্মমর্যাদাবোধের স্বীকৃতি পাওয়ার তেমন কোনো অভিলাষ বা আকাক্সক্ষা ছিল না। তবে জ্ঞান ও প্রযুক্তিনির্ভর সমাজে উন্নত থেকে উন্নততর শিক্ষার মাধ্যমে জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের সাথে সাথে মানুষ বিশ্বজনীন চরিত্রের (Cosmopolitan) হয়ে ওঠে। তখন তাদের অভিলাষ বা চাহিদা কেবল ধনসম্পদে সীমিত থাকে না। তারা সামাজিক মর্যাদা, পদ-পদবি, সমাজে সুবিধাজনক অবস্থান ও নিজ দৃষ্টিভঙ্গির স্বীকৃতি চায়।’
ওপরের ব্যাখ্যা সত্যি বলে ধরে নেয়া যায়। কেননা মানুষের আত্মা যদি কেবল ‘অভিলাষ ও যুক্তি’ দিয়েই তৈরি হয়ে থাকে, তাহলে শিল্পবিপ্লব বা নবচেতনার সাথে তাল মিলিয়ে পৃথিবীতে ফরাসি বিপ্লব, প্রজাতন্ত্রের জন্য যুদ্ধ, ইত্যাদির কোনো কারণ থাকত না। আর আধুনিক যুগে, ফ্র্যাঙ্কোর স্পেন, আইয়ুব খানের পাকিস্তান, পার্ক চুং হির কোরিয়া, পেরোনের আর্জেন্টিনা, শাহ পাহলবির ইরান, সুহার্তোর ইন্দোনেশিয়া, মার্কোসের ফিলিপাইন বা মোবারকের মিসরের জনগণ প্রভুভক্ত একনায়কতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা ও বাজারমুখী সরকারেই তুষ্ট থাকার কথা ছিল। একনায়ক ও রাজা-বাদশাহরা অর্থনৈতিক উন্নয়নের মাধ্যমে বহুভাবে বহু দেশে অনুন্নত সমাজকে উন্নত সমাজে পরিণত করতে অবদান রেখেছেন। তারপরও জনগণ ব্যক্তি-স্বাধীনতা, সমতা ও সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য দেশে দেশে আন্দোলন সংগ্রাম করে উল্লিখিত একনায়কদের একে একে ক্ষমতা থেকে বিতাড়িত করেছেন।
এতে বোঝা যায়, মানুষের আত্মার মধ্যে একটি উগ্র মৌলিক (Thymolic) চেতনা বা গর্ববোধ আছে, যে চেতনা ও গর্ব জীবনমানের সাথে সংহতি রেখে স্বাধীনতা ও নিজ সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার উদ্দীপক হিসেবে কাজ করে। এই উদ্দীপনার মূলবস্তু হলোÑ ‘নিজ মূল্য, আত্মসম্মান, চরিত্রের উৎকর্ষ ও আত্মমর্যাদাবোধ’। এগুলোই মানুষকে ‘স্বাধীনতা ও সমতাভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য প্রচণ্ডভাবে প্ররোচিত করে ও প্রেরণা জোগায়।
পক্ষান্তরে এই প্রেরণার মূল উৎস ‘গণতান্ত্রিক সরকার বা প্রজাতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা’। এর কারণ হলো মানুষ ধারণা করেন যে, একমাত্র প্রজাতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা (কোনো না কোনোভাবে গণতান্ত্রিক শাসন) তাদেরকে অবুঝ বালকের মতো নয় বরং একজন বিকশিত মানুষ হিসেবে মূল্যায়ন করবে। তাদের একজন স্বাধীন সার্বভৌম ব্যক্তিসত্তার অধিকারী মানুষ হিসেবে মেনে নেবে। দাসত্বের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করবে।
অতএব গণতন্ত্র এক দিকে ‘স্বাধীনতা ও সমতা’, অন্য দিকে মানুষের ‘আত্মমর্যাদার’ অভিলাষ পূরণ করতে পারে। তবে উদার গণতন্ত্র বা প্রজাতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার সাথে আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের সম্পর্ক নিয়ে দীর্ঘ দিন ধরে অর্থনীতিবিদ ও সমাজতত্ত্ববিদদের মধ্যে তর্কবিতর্ক চলছে। এ বিষয়টি প্রশ্নাতীতভাবে এখনো মীমাংসিত হয়নি।
অতএব যারা সমাজকে গণতন্ত্রায়নের পূর্বে উন্নয়নের জোয়ার বইয়ের দেয়ার বিজয়োল্লাসে মত্ত তাদের বুঝতে হবে যে অবাস্তব, অন্যায্য ও বিভ্রান্তিকর কথাবার্তা বলে সাধারণ জনগণকে খুব বেশি দিন শান্ত বা বিশ্রামে রাখা যাবে না।
সমতা ও স্বাধীনতাকামী মানুষ নিজ অধিকার আদায়ে বেশি দিন চুপ থাকে না বা থাকতে পারে না। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম হওয়ার সম্ভাবনা নেই। হ