ধর্মেরও নান্দনিকতা আছে? থাকতেই হবে। কারণ যা সবচেয়ে সুন্দর তাই নান্দনিকতার আকর। যে বেহেশ্তে যাব বলে সবার আকাক্সক্ষা ও জীবনের প্রস্তুতি, সেখানে যেতে হলে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হবে সুন্দরের চর্চা, সেটাই নান্দনিকতা। সুন্দরকে চিনব না, বেহেশ্তের পথ পাবো কেমন করে, যে পথ সুগন্ধে ম ম, যে পথ সুন্দরের চেয়ে সুন্দর, যা কখনো দেখিনি। ধর্ম যদি জীবনকে ধারণ করে, তবে ধর্মই হবে নান্দনিকতার চরম অভীষ্ট।
নন্দন অর্থ পুত্র। আবার আরেকটি অর্থ আছে, তা হলো বেহেশ্তের উদ্যান। অভিধান মতে যা আনন্দের, যা তৃপ্তির, যা অনুভূতিকে করে স্বর্গীয় সুষমায় পরিপূর্ণ, তাই নান্দনিক। ভোর থেকে শুনছি আজান, যে আজান আমাকে আহ্বান করে সুন্দরের দিকে, অর্থাৎ প্রথম নান্দনিক আহ্বান সেটাই নির্ধারণ করবে আমার দিনটি হবে বেহেশ্তি না দোজখের নির্ধারক। সূর্যোদয়ের আগেই ঘটে গেল আমার জীবনে নান্দনিকতার প্রথম দিকচিহ্ন। আমি কোন দিকে যাবো? ধর্মকে যদি আমরা এই চোখে দেখি, তা হলে আমাদের জীবন হবে সত্যিকার আনন্দের স্পর্শে স্পর্শিত। ধর্মের যে সুন্দর দিকটি সেটি সম্বন্ধে আমাদের আলোচনা একপেষে। কোনো দিন গিয়ে শুনিনি মসজিদে খুৎবা হচ্ছে নান্দনিকতা নিয়ে। যারা মসজিদে এসেছি তারা শব্দটির অর্থই বুঝতে পারিনি। যারা কুরআন পাঠ করি সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মসজিদে ও অন্যত্র তাদের মধ্যে অনেকেই আছেন যারা না বুঝে পড়ে যাচ্ছি। এতে অনেক ফায়দা আছে, কিন্তু সত্যিকার ফায়দা তারাই পাবেন যারা এর অর্থ অনুধাবনে সচেষ্ট, যারা সবচেয়ে ভালো অনুবাদটি সংগ্রহ করেছেন এবং দিনরাত তা পাঠ করে অন্বেষণ করছেন কোনটি সুন্দর প্রার্থনা, সুন্দর প্রার্থনা কাকে বলে, প্রার্থনার স্বাদ কী, প্রার্থনা করলে কী হয়, যে প্রার্থনা আমি করলাম তারপর আমি কী পেলাম। এই এতগুলো বিবেচনার পর খুঁজে পাওয়া যাবে নান্দনিকতাকে। বিদেশে প্রায়ই যাই। সেখানে নওমুসলিমরা যখন দীর্ঘক্ষণ ধরে অজুতে সময় দেন, তখন অবাক হয়ে যাই তাদের বিবেচনা দেখে। তারা বলেন, আমরা শিখেছি অজু সালাতের অর্ধেক। তাই আমাদের দৈহিক পবিত্রতা অর্জনের জন্য এত সচেষ্ট আমরা এবং পরের ভাগে অর্থাৎ সালাতে আমরা সমভাবে রুকু সিজ্দায় অবনত। এটাই নান্দনিকতার আহ্বান।
কুরআন পড়তে বসেছি। সুরজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন নেই। তবুও যদি তা হয় এমন তেলাওয়াত যা চার পাশ থেকে হাজার হাজার ফেরেশ্তাকে আহ্বান করে তাহলে তা নিশ্চয়ই সবচেয়ে ভালো তেলাওয়াত। একদিন নবী করিম সা: একটি কিশোরকে আহ্বান জানালেন একটি সুরা তেলাওয়াতের জন্য। কিশোর অবাক। কিভাবে তাকে আহ্বান জানান হচ্ছে জগতের শ্রেষ্ঠ একজন মানুষের কাছ থেকে তেলাওয়াত করার জন্য। নবী সা: কিশোরকে কানে কানে বললেন, তুমি কি জান কেন তোমাকে আমি তেলাওয়াত করতে ডেকেছি? ছেলেটি উত্তর দিতে পারল না। নবী সা: আবার তাকে কানে কানে বললেন, স্বয়ং আল্লাহ্ তোমার তেলাওয়াতে সন্তুষ্ট, তাই তিনি তোমার কণ্ঠের তেলাওয়াত শুনতে চেয়েছেন, এটাই তেলাওয়াতের নান্দনিকতা। এবার বুঝুন, আল্লাহ্ও নান্দনিকতার প্রয়াসী।
মসজিদে একত্র দৈনন্দিন পোশাকে, লুঙ্গি, পাজামা, ফতুয়া পরে। আল্লাহ্ চেয়ে রয়েছেন তাঁর বান্দাদের দিকে যেন সবচেয়ে সুন্দর আচ্ছাদনটি গায়ে জড়িয়ে তাঁর সামনে উপস্থিত হই। জীবনের প্রয়োজনে সবচেয়ে ভালো কাপড় পরিধান করে উপস্থিত হই উচ্চাসীনদের কাছে। কেন? যেন খানিকটা বেশি উপকৃত হই, যেন পরিবেশটা সুন্দর হয় আমাদের পক্ষে। আর মসজিদের বেলা? এখানেই নান্দনিকতার প্রশ্ন। আমি যাবো আমার সর্বোৎকৃষ্ট পোশাকে যেন প্রভুর কাছে গ্রহণযোগ্য হয় আমার আচ্ছাদন।
সিজদাটি হবে ভক্তি দিয়ে, শ্রদ্ধা দিয়ে, আকুতি দিয়ে পরিপূর্ণ। এই সিজদা যেন আমার শ্রেষ্ঠ উপহার হয়। এটাই নান্দনিকতা।
আমাদের অভিধানে নান্দনিকতা চেতনা ও চেতনার সংশ্লিষ্ট আবেগের যে মূল্যবোধ, সেটিরই অধ্যয়ন। আবেগ দিয়েই এর স্বাদ অন্বেষণ। নান্দনিকতা অ্যাক্সিওলজির অন্তর্গত। এটি দর্শনের একটি শাখা, যা শিল্পের দর্শনের সাথে ঘনীভূত। বিশ^ সম্পর্কে নানা ধারণা এবং নানা পদ্ধতি এই অধ্যয়নের অন্তর্গত। ইংরেজিতে নন্দনতত্ত্বকে বলা হয় Aesthetics যেখানে মিলেছে সৌন্দর্য, শিল্প, স্বাদ এবং সৌন্দর্য সৃষ্টি। সৌন্দর্যতত্ত্বের ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে আমাদের সাহিত্যে। এর মধ্যে বিষয়বস্তুর সীমা অনেক সময় সীমার বাইরে চলে যায়। আমাদের যে সৌন্দর্যানুভূতি তা একেকজনের একেক রকম, শিল্পকলার বিচারও এক মাপে চলে না। নীতিশাস্ত্রের সাথে আছে সৌন্দর্যতত্ত্বের সমন্বয়।
সৌন্দর্যের সাধনা মানুষের আদি সাধনার অন্তর্ভুক্ত। আমাদের মধ্যে বস্তুবাদী ধারণা আছে, আর আছে ভাববাদী। ভাব অনেক সময় বস্তুকে অতিক্রম করে। যাকে দেখা যায় না সে ভাবের জগতে। যাকে দেখা যায় সে সুন্দর হলেও অনেক সময় অসুন্দরকে প্রতিনিধিত্ব করে।
সরল করে বলতে হলে যখন প্রভুর সামনে দাঁড়াই, তখন আর সব সৌন্দর্য বিলীন হয়ে যায়। তখন তাঁর চেয়ে আর কিছু সুন্দর হতে পারে না। যারা বস্তুবাদী, সেই সৌন্দর্যের সন্ধান কোনো দিনই পাবেন না। সোজা কথায় বলতে চাই যে সুন্দরকে আমরা সবাই পেতে পারি। এটা গুটি কয়েক মানুষের জন্য হতে পারে না। সুন্দর আকাশ, সুন্দর পাহাড়, সুন্দর নদী, সুন্দর সমুদ্র, সুন্দর নারী, সুন্দর শিশু এবং সুন্দর পুরুষ আমাদের চোখের সামনে। যখন ধর্মের কাছে আসি তখন সেই ধর্ম আমাদের সবকিছুকে সৌন্দর্যের চরম শিখরে নিয়ে যায়। সেটাই ধর্মবাদীদের নান্দনিকতা। তাই বড় কথায় না গিয়ে ছোট কথাই বলা যায় : আমাদের মনের মধ্যে লুকিয়ে আছে সৌন্দর্যের পরাকাষ্ঠা। আমাদের কলবেই প্রভুর অবস্থান। সেটাই চূড়ান্ত কথা। হ
ধর্মেরও নান্দনিকতা আছে? থাকতেই হবে। কারণ যা সবচেয়ে সুন্দর তাই নান্দনিকতার আকর। যে বেহেশ্তে যাব বলে সবার আকাক্সক্ষা ও জীবনের প্রস্তুতি, সেখানে যেতে হলে সবচেয়ে...
