বাংলাদেশের শেয়ার বাজারে সব উদ্যোক্তার শেয়ার কিনে লাভ করা যায় না। সত্য হলো বিনিয়োগকারীরা বেশির ভাগ স্বদেশীর শেয়ার কিনে শুধুই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। অনেক চটকদার কথা বলে ওই সব উদ্যোক্তা আইপিওর মাধ্যমে তাদের শেয়ারগুলো সাধারণ বিনিয়োগকারীদের বিক্রয় করেছেন। কিন্তু বছর দুই যাওয়ার পর ওই জন্য সুন্দর কথার পেছনের কদর্যই বের হতে থাকে। এক সময় যে শেয়ার বিনিয়োগকারীরা ৫০ টাকায় কিনেছেন, মাত্র দুই বছরের মধ্যে সেই শেয়ারের মূল্য এসে দাঁড়িয়েছে ১৫ টাকায় বা তারও নিচে। যারা ৪০-৫০ টাকায় ওই সব শেয়ার কিনেছেন তারা আর কোনো দিনই তাদের পুঁজি ফেরত পাননি। গত তিন বছরে যে ক’টি কোম্পানি জনগণের কাছে IPO (Initial Public Offering বিক্রয় করেছে, সব ক’টি কোম্পানির শেয়ারই এখন অনেক কম মূল্যে বেচাকেনা হচ্ছে। এসব আইপিওর কোনো কোনোটি জুয়ার হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে।
অন্য সত্য হলো এসব উদ্যোক্তা তাদের হাতে থাকা শেয়ারগুলোও বেচে দিয়েছেন। কিন্তু তারপরও তারা কোম্পানির ব্যবস্থাপনায় আছেন। সেটা কিভাবে সম্ভব? এ দেশে সবই সম্ভব। বোর্ড অব ডাইরেক্টর্স খোঁজে যারা কোম্পানি বানাচ্ছেন, তাদের কোনো শেয়ার হোল্ডিং নেই। থাকলেও অতি নগণ্য পরিমাণের। আর এটাই বড় উপাদান হিসেবে কাজ করছে যেন ওই সব কোম্পানির শেয়ার মূল্য পড়ে গেছে। প্রথম দুই-এক বছর এই সব কোম্পানি মোটামুটি একটা মুনাফা দিচ্ছেও, পরে এসে তাদের মুনাফা বণ্টনের পর মূল্যে ঠেকেছে। অনেক বিনিয়োগকারী এসব প্রতারক উদ্যোক্তা থেকে সাবধান হয়েছেন। কিন্তু সেটা অনেক দেরিতে। তাদের লোকসান তারা কোনো দিনই পুঁজিবাজার থেকে তুলতে পারবেন না।
আমি যখন বিনিয়োগকারীদের সামনে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ নিয়ে নিজের বক্তব্য তুলে ধরি, তখন বলি কোনো শেয়ার কিনলেই সেটা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো কার শেয়ার কিনছেন। ম্যানেজমেন্টে যারা আছেন তাদের না জেনে কোনো শেয়ার কিনবেন না। কারণ হলো, অধিকতর সুন্দর চেহারার পেছনে লুকিয়ে আছে প্রতারণার এক অভিন্ন লক্ষ্য। তবে বাংলাদেশেও অনেক উল্টো উদ্যোক্তা আছেন, যারা সৎ এবং যারা শেয়ারবাজারে পুঁজি দিয়েছেন সেসব হাজার হাজার ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার প্রতি তাদের দায়বদ্ধতার কথা মনে রাখেন। এমন একজন ব্যক্তির কথা বলছি। যিনি আজকে প্রয়াত। তার নামটা না বলাই ভালো, তবে তাকে দেখেছি সৎ এবং পরিশ্রমী হিসেবে। কোনো দিনই শেয়ার বিনিয়োগকারীদের ঠকাননি। সম্ভবত ১৯৯৫ সালের দিকে তার ওষুধ কোম্পানির শেয়ারও প্রিমিয়ামে বাজারে আছে। মনে হয় আটগুণ প্রিমিয়ামে এসেছিল। প্রথম তিন বছর শেয়ারের মূল্য তেমন বাড়েনি। অন্য শেয়ারের মূল্য আকাশচুম্বী হয়ে গেলেও সেই ওষুধ কোম্পানির শেয়ারের মূল্য তেমন বাড়েনি। ১৯৯৭ সালের দিকে? তখন আমি ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের এক ব্রোকার হাউজে গেলাম হাউজের মালিকদের সাথে বাজার নিয়ে কথা বলার জন্য। মালিকেরা আমার পূর্ব পরিচিত ছিল। সেখানে গিয়ে ওই ওষুধ কোম্পানির একটি বার্ষিক প্রতিবেদন পেলাম। ১০-১৫ মিনিটের মধ্যে ওই প্রতিবেদনের প্রয়োজনীয় অংশগুলো পড়ে নিলাম। দেখলাম শেয়ারটা ইস্যুমূল্যের অনেক নিচে বেচাকেনা হচ্ছে। এর মনে হলো, শেয়ারটির ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল। ব্রোকারকে বললাম, আমার জন্য ২০০ (১২ টাকা .... মূল্যের দুই হাজার) শেয়ার কেনার জন্য। ব্রোকার বললেন, গত সপ্তাহ এই শেয়ারের বাজারমূল্য আরো কম ছিল। আমি বললাম, থাকতে পারে তুমি জান। সে আমাকে দুই হাজার শেয়ার কিনে দিলো, তখনকার মূল্যে ৫৬০ টাকা করে আর বর্তমানের ১০ টাকা অভিহিত মূল্যে ৫৬ টাকা করে। তখন সব শেয়ারই কাগজে শেয়ার ছিল। আমি শেয়ারগুলোকে নিয়ে নাম পরিবর্তন করে আলমারিতে ফেলে রেখেছিলাম।
আমার ব্যক্তিগত কারণে এ মূল্য বাড়লেও ওগুলো বেচা হয়নি। বেচা না হওয়াটাই আমার জন্য স্বর্ণ স্তম্ভ হিসেবে ওগুলো যেন এসেছে ২০ বছর পর ওই সব শেয়ারকে ৫০ গুণ বেশি মূল্যে বেচেছি। ভাবতে পারেন শতকরা হিসাবে ১০০ গুণ। তবে তখনো আমি উদ্যোক্তাকে জানলেও কাছ থেকে জানার সুযোগ হয়নি। কাছ থেকে জানার সুযোগ হলো যখন তখন তিনি আমাকে বললেন যে, প্রফেসর আমাদের নির্মিতব্য নতুন ওষুধ ফ্যাক্টরিটা কি দেখতে যাবেন? আমি বললাম, কখন কিভাবে? তিনি বললেন, আপনি আগামী বৃহস্পতিবার সংসদ ভবনের দক্ষিণ-পূর্ব দিকে রাস্তার মোড়ে এসে দাঁড়াবেন সকাল ৮টায়। আমি ওখান থেকে আপনাকে তুলে নেবো। কথামতো আমি দাঁড়িয়ে রইলাম। ৮টা ১০ মিনিটে গাড়িতে করে তিনি এসে হাজির। সাথে এক বীমা কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক। আমরা তিনজন রওনা দিলাম কালিয়াকৈরের দিকে, নির্মিতব্য নতুন ফ্যাক্টরি দেখার জন্য। যেতে যেতে গাড়ি যখন কালিয়াকৈর বাজারে পৌঁছল তখন সেই ওষুধ কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং ড্রাইভার গাড়ি থেকে নেমে গেলেন। আমাদের বললেন, ১০ মিনিট অপেক্ষা করতে। ঠিক ৮ মিনিট পর তিনি ফিরে এলেন। ফিরে এলেন হাতে কিছু ডাঁটাশাক নিয়ে। বললেন, এখন এগুলোই তাদের প্রধান খাদ্য। ভাবলাম এত বড় শিল্পপতি। সাথে কোনো সাহায্যকারী নেই। ড্রাইভারকে তো বলতে পারতেন ডাঁটাশাক আনার জন্য। কিন্তু সেটা তিনিই করলেন এবং নিজেই গেলেন, নিজেই ১০ টাকা মূল্যের ওই ডাঁটার আঁটি এনে বলছেন এগুলোই এখন তার শিশুদের খাবার। আমি ভাবলাম, এই লোকটা গ্রেট, এর শেয়ার কিনে আমি ভুল করিনি। সম্ভব হলে আরো কেনা দরকার। ফ্যাক্টরিতে পৌঁছে যা দেখার দেখলাম এই ফ্যাক্টরি দু’টি বড় মাপের ওষুধ তৈরি কেন্দ্র। দুপুরে তিনি খেতে দিলেন। কোরমা পোলাও রোস্ট বিরানি নয়। ভাত ডাল সবজি, একটু মাছ। হাত মুছতে দিলেন একটি তাওয়েলে। পুরনো তবে পরিষ্কার। আমার ধারণা বদ্ধমূল হতে লাগল। এই ব্যক্তির হাতে শেয়ার বিনিয়োগ করেছি। বিনিয়োগ নিরাপদ। যিনি নিজে হিসাব করে চলেন, সে অন্যের পুঁজি বাতাসে উড়াবেন না। এর সাথে আমি ওই কোম্পানির আরো কিছু শেয়ার কিনেছিলাম এবং বেশ লাভ করেছিলাম। আমার সেই অভিজ্ঞতা আজো আমি অন্যদের বলি। আজকে তিনি প্রয়াত। তার ছেলেরা শক্ত হাতে রেখে যাওয়া ব্যবসাকে ধরে রেখেছেন। তাদের শেয়ার নিয়ে আজ পর্যন্ত কোনো বিনিয়োগকারী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে শুনিনি। উদ্যোক্তা আর প্রতারক উদ্যোক্তার মধ্যে এইখানেই তফাৎ। হ