১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে আমরা বিজয়পতাকা উড়িয়েছি। তার আগে ছাত্রনেতা আ স ম আবদুর রব স্বাধীনতার হাওয়ায় উড়িয়ে দিয়েছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা। স্বাধীন পতাকার পতপত শব্দে সারা দেশের মানুষ স্বাধীনতার প্রত্যাশায় বুক বাঁধে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অগ্নিঝরা ভাষণে অসহযোগ আন্দোলন প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে। অবশেষে ২৬ মার্চে চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার থেকে ভেসে আসে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের কণ্ঠ। বঙ্গবন্ধুর পক্ষে উচ্চারিত হয় স্বাধীনতার ঘোষণা। বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানি শাসকদের লৌহ কারাগারে অন্তরীণ থাকলেও জেনারেল মুহাম্মদ আতাউল গনি ওসমানীর নেতৃত্বে গড়ে ওঠে মুক্তিযুদ্ধের ১১টি সেক্টর। প্রত্যেকটি সেক্টরে যোগ্য নেতৃত্বে এগিয়ে চলে মুক্তিসংগ্রাম। বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর মতো অনেক সাহসী প্রাণের গর্জনে কেঁপে ওঠে পাকবাহিনীর অন্তর। জেলে, চাষি, মুটে, মাঝি থেকে শুরু করে দেশের অভিজাত শ্রেণীর মানুষেরাও নেমে পড়ে মুক্তিযুদ্ধে। হাজারো প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও ১৬ ডিসেম্বর অর্জিত হয় মুক্তির লাল সূর্য, স্বপ্নের স্বাধীনতা, আমাদের প্রাণের চেয়ে প্রিয় লাল-সবুজের পতাকা।
স্বাধীনতার আন্দোলন কিন্তু শুরু হয়েছিল অনেক আগেই। ব্যবসার নাম করে আমাদের ভূখণ্ডে ঢুকে পড়েছিল অনেক বেনিয়া। পর্তুগিজ, ওলন্দাজ, ফরাসি, দিনেমার ও ইংরেজসহ অনেক ধান্দাবাজ গ্রুপ। এদের মধ্যে পর্তুগিজদের হাতে আমাদের অনেক নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছিল। আরাকানের মগদের সাথে মিলিত হয়ে তারা আমাদের দেশকে লুট করে নিত। হাজার হাজার যুবক-যুবতিকে অপহরণ করে বহু দূরে নিয়ে দাস-দাসী হিসেবে বিক্রি করত। তাদের স্বেচ্ছাচারিতার কারণেই ‘মগের মুল্লুক’ শব্দটির প্রচলন হয়ে এসেছে। তবে ওরা অনেক চেষ্টা করেও এ দেশের শাসন ক্ষমতা হাতে নিতে পারেনি। আমাদের স্বাধীনতা কেড়ে নিয়েছিল ইংরেজ কোম্পানি। এদের হাত ধরেই আমাদের ঘাড়ে চাপিয়ে বসে ব্রিটিশ শাসন। ১৯০ বছর ধরে ওরা আমাদের শোষণ-বঞ্ছনার শিকলে বেঁধে রেখেছিল।
ব্রিটিশরা ছিল খুব কৌশলী। ওরা নিজেরা কোনো দোষ ঘাড়ে নিত না। মুসলিম শাসনামলে আমাদের দেশে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার সাথে মিল ছিল। হিন্দু-মুসলমানদের কোনো ধরনের রেষারেষি, বিভেদ কিংবা কোনো রকম গণ্ডগোল ছিল না। সবাই মিলেমিশে থাকত। যার যার ধর্ম সবাই স্বাধীনভাবে পালন করত। সুখ-দুঃখে সবাই এক হয়ে থাকত। সুলতান, সম্রাট, কিংবা নবাবেরা দেশ পরিচালনা করলেও সাধারণ জনগণ রাজনীতির ব্যাপারে খুব একটা আগ্রহ প্রকাশ করত না। তারা শান্তি ও নিরাপত্তার সাথে নিজেদের জীবন-জীবিকা পরিচালনা করত। কিন্তু সুকৌশলে হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে বিভেদের দেয়াল তৈরি করে দেয় ব্রিটিশেরা। হিন্দুদের নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধা দেয়ার নামে তাদের মুসলিমবিদ্বেষী করে তোলে। অন্য দিকে মুসলমানদের ক্ষমতাই শুধু কেড়ে নেয়নি, চাকরি-বাকরি ও লেখাপড়ার সুযোগ-সুবিধা থেকে শুরু করে সব ধরনের অধিকার থেকে তারা বঞ্চিত করে। সেই সাথে পিছিয়ে পড়া অসহায় মুসলমান জাতির ওপর চাপিয়ে দেয় নানা ধরনের খাজনা, ট্যাক্স ও সেলামি। তখন দাড়ি রাখলে কিংবা টুপি পরলে কিংবা মসজিদে আজান দিতেও খাজনা দিতে হতো। মসজিদে জামাতে নামাজ আদায় করাও কষ্টকর ছিল। ফলে প্রায় সব মসজিদেই পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের পরিবর্তে শুধু জুমার দিনই নামাজ আদায় করা হতো। দেশের বিভিন্ন স্থানে জুমায়ও আদায় করা হতো ট্যাক্স দিয়ে। ফলে মসজিদগুলো নামাজ শূন্য হয়ে পড়ে। আর শুধু জুমার নামাজ আদায় করা হতো বলে মসজিদকে জুমাঘর বলে আখ্যায়িত করা হতো। এখনো উত্তর বাংলার বিভিন্ন জনপদে মসজিদকে জুমাঘর নামেই ডাকা হয়। মুসলমান ঘরে সন্তানদের আকিকা দিয়ে মুসলমানি নাম রাখতেও খাজনা দিতে হতো। খাজনা না দিলে মুসলিম ছেলেমেয়েদের বিয়ে শাদীও দেয়ার অনুমতি ছিল না। এভাবে স্বাধীনতা শব্দটি মুসলমানদের জীবন থেকে পুরোপুরি হারিয়ে যায়। অবশেষে দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে গর্জে ওঠেন অনেকেই। মীর নেসার আলী তিতুমীর গড়ে তোলেন ‘বাঁশের কেল্লা’। দলবলসহ শহীদ হয়ে তিনি প্রমাণ করে গেলেন ‘জীবনের চেয়ে স্বাধীনতার মূল্য অনেক বেশি’। এ ছাড়াও বিভিন্ন পর্যায়ে স্বাধীনতার আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন হাজী শরীয়তুল্লাহ, ফকির মজনু শাহ, সৈয়দ আহমদ ব্রেলভিসহ বালাকোর্টের হাজারো শহীদ এবং গাজী।
১৮৫৭ সালে সংঘটিত হয় ‘সর্বভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রাম, যা ‘সিপাহী বিদ্রোহ’ নামে পরিচিত। তবুও স্বাধীনতার সূর্যের দেখা পাইনি আমরা। অবশেষে হাজী মুহাম্মদ মহসিন ও মুন্নুজানের মতো বেশ কিছু দানবীরের শিক্ষা বিস্তার প্রয়াস এবং বেগম রোকেয়া সাখাওয়াতের মতো বিদুষী নারীদের প্রচেষ্টার পাশাপাশি স্যার সৈয়দ আহমদ খান, নবাব আবদুল লতিফ ও সৈয়দ আমির আলীর মতো কিছু চিন্তাশীল মানুষের ঐকান্তিক সাধনায় আমরা আরো একধাপ এগিয়ে যাই স্বাধীনতার পথে। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ নামে পরিচিত বাংলা বিভক্তিকরণের মধ্য দিয়ে ঢাকা হয়ে ওঠে বাংলাদেশের উন্নয়নের প্রাণকেন্দ্র। আবারো জেগে ওঠে মুসলমানেরা। শিক্ষা-সংস্কৃতিতে নিজেদের অবস্থান ফিরে আনার চেষ্টা চলে প্রাণপণে। পশ্চিম বঙ্গের মানুষের নানামুখী আন্দোলনে ১৯১১ সালেই তা রদ করা হলেও মাত্র ছয় বছরেই বাংলাদেশের মানুষ স্বপ্নকে দৃঢ় করতে পেরেছে। মুসলিম লীগসহ নানা ধরনের রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠনও প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে। ১৯২১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় স্বপ্নের ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়’।
শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকসহ বাংলার অনেক নেতা গর্জে ওঠেন স্বাধীনতা আদায়ের জন্য। অবশেষে স্বাধীনতার মন্ত্রে উজ্জীবিত মানুষ ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার সূর্যের দেখা পায়। প্রতিষ্ঠিত হয় পাকিস্তান নামক একটি স্বাধীন রাষ্ট্র। নিজেদের বোধ-বিশ্বাস ও সাহিত্য-সংস্কৃতির আলোকে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর সুযোগ ঘটে। কিন্তু অচিরেই পাকিস্তানি শাসকেরাও বৈরী আচরণ শুরু করে আমাদের সাথে। প্রথমেই আঘাত হানে আমাদের মাতৃভাষার ওপর। আমরা অবশ্য এ বিষয়ে সচেতন ছিলাম শুরু থেকেই। তাই তো পাকিস্তান স্বাধীন হওয়ার সাথে সাথেই বাংলা ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘পাকিস্তান তমদ্দুন মজলিস’।
ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, দেওয়ান মুহাম্মদ আজরফ, অধ্যাপক আবদুল গফুরসহ অসংখ্য গুণী বুদ্ধিজীবী এ মজলিসে শরিক হন। দানা বেঁধে ওঠে ভাষা আন্দোলন। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানি বাহিনীর গুলিতে শহীদ হন আবদুস সালাম, আবুল বরকত, আবদুল জব্বার, শফিউর রহমান, রফিকউদ্দিন আহমেদসহ অনেকে। স্বাধীন পাকিস্তানে বসবাস করেও আমরা স্বাধীনতার স্বাদ পুরোপুরিভাবে গ্রহণ করতে পারিনি। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আমরা পূর্ববাংলায় একচ্ছত্র বিজয়সহ সমগ্র পাকিস্তানে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও তারা আমাদের হাতে ক্ষমতা দিতে চায়নি। আমরাও ছিলাম দৃঢ় প্রত্যয়ী। তাই তো আবারো আমাদের গর্জে ওঠা স্বাধীনতার জন্য। অবশেষে আমাদের রাজনীতি আর ক্ষমতা গ্রহণের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকল না। পরিণত হয় স্বাধীনতার সংগ্রামে। তারপর মুক্তিযুদ্ধ। ডিসেম্বরে বিজয়ের উল্লাস।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে আমাদের যে প্রতিবেশী রাষ্ট্র্র বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল। তাদের এ ঋণ স্বীকার করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।
বাংলাদেশ অপার সম্ভাবনাময় একটি দেশ, এ কথা বারবার উচ্চারিত হয়ে আসছে। এই সম্ভাবনা প্রতিষ্ঠা পাবে বা বাস্তবায়ন ঘটবে তার শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি, শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন প্রচেষ্টা, নারীর অধিকার সংরক্ষণ, মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয় রোধ এবং দেশে রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলাসহ সংসদীয় গণতন্ত্রের বিকাশ ও প্রতিষ্ঠার পথ সুগম করার মধ্য দিয়ে। দেশ থেকে দুর্নীতির মূলোৎপাটন করে ন্যায়ভিত্তিক সমাজ ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। সে জন্য প্রয়োজন দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর সদিচ্ছা ও মানসিকতার পরিবর্তন, প্রয়োজন দেশে রাজনৈতিক সুস্থতা ফিরিয়ে আনা। আর এটা পারবে দেশের রাজনৈতিক দলগুলোই। মালয়েশিয়া ঘুরে দাঁড়াল, যুদ্ধবিধ্বস্ত ভিয়েতনাম ২৫ বছর যুদ্ধ করে ঘুরে দাঁড়াল, জাপান আণবিক বোমায় বিধ্বস্ত হয়েও ঘুরে দাঁড়াল, আমরা পারব না কেন? আমাদেরও পারতে হবে। গণতন্ত্র, অর্থনীতি ও দেশের উন্নয়ন-অগ্রগতিকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। কেবল তা হলেই ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে উঠবে।
সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের দিকে তাকালে আমাদের বিজয় দিবসের উল্লাস ম্লান হয়ে আসে। বিদেশী ভাষা ও সংস্কৃতির আধিপত্য আমাদের দেশজুড়ে। টিভি খুললেই ভিনদেশী চ্যানেলের আধিপত্য। বিনোদন মানেই ভিন্ন ভাষার গান-নাটক-সিনেমা। সংস্কৃতি মানেই অবিশ্বাসী ঘরানার মডেল। সাংস্কৃতিক বিনিময়ের নামে হিন্দি ভাষা ও সংস্কৃতির মাধ্যমে যে ভাষাগত-সাংস্কৃতিক কালোথাবা আমাদের ওপর পড়েছে তা উদ্ধারের কোনো বিকল্প নেই। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ এ থাবায় অনেকাংশেই পঙ্গু হয়ে গেছে। সেখানকার শিশুরা এখন আর বাংলাভাষা বলতেই পারে না বলা চলে। অফিসার থেকে শুরু করে মুদি দোকানদার পর্যন্ত সে জালেই বন্দী হয়ে পড়েছে। তাদের মুখে হয়তো হিন্দি নতুবা ইংরেজি। বাংলাভাষার জন্য এখন সম্ভাবনার পথ উন্মুুক্ত করতে পারে একমাত্র বাংলাদেশই। সে বাংলাদেশে যেভাবে ডোরেমন, মটুপাতলুর আগ্রাসন চলছে তাতে শিশুরা যেমন বাংলার চেয়ে হিন্দিতেই বেশি পারদর্শী হয়ে পড়েছে, তেমনি হিন্দি গান ও সিনেমার কবলে বাংলাদেশের যুবসমাজও আটকে গেছে বলা চলে। হিন্দি ও পশ্চিম বাংলার সিরিয়ালে নারীদের মনমস্তিষ্ক আটকে যাওয়ার কারণে পরবর্তী প্রজন্ম তাদের কাছে ঐতিহ্যের কোনো শিক্ষা পাচ্ছে না। এখনো হতাশাগ্রস্ত আমাদের মুক্তিযুদ্ধের অনেক সিপাহসালার। এখনো আমরা মাথা উঁচু করে ন্যায়সঙ্গত অধিকারের কথা বলতে ব্যর্থ হচ্ছি। অথচ স্বাধীনতা মানেই তো ন্যায়সঙ্গত অধিকার ফিরে পাওয়া। স্বাধীনতা মানেই তো দেশের কল্যাণে নিজের কল্যাণ খোঁজা। বিজয় মানেই নিরাপত্তার গ্যারান্টি। বিজয় মানেই বিশ্বাসের পতাকা হাতে নির্ভয়ে ও নির্বিঘেœ সামনে এগিয়ে চলা। স্বাধীনতা মানেই তো আমার স্বদেশ আমার জীবন। বিজয় মানেই আমার সবুজ স্বপ্নের বিনির্মাণ। ছেলেহারা মায়ের মতো আজো আমরা দৃপ্ত শপথে সে পথেই চেয়ে আছি।