১৯৭১ সাল বাঙালি জাতির ইতিহাসে রক্তস্নাত মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অজস্র ত্যাগের বিনিময়ে প্রাপ্ত মাতৃভূমির স্বাধিকার আদায়সহ নিজেদের অস্তিত্ব মজবুত করার এক স্মরণীয় ও ঐতিহাসিক সাল। বাঙালিদের অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে ১৯৪৭/৪৮/৫২/৬৯ সাল পেরিয়েও বাঙালির অস্তিত্ব তখন হুমকির সম্মুখীন। পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্তির লক্ষ্যে দল-মত নির্বিশেষে যখন বাঙালির নিজস্ব স্বাধীন ভূখণ্ড বাংলাদেশ প্রাপ্তির প্রত্যাশায় সোচ্চার। তখন পাকিস্তান শাসক বাহিনী নিজেদের অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখতে মরিয়া হয়ে ওঠে। নানাভাবে অত্যাচার-নিপীড়ন চালাতে থাকে। তখন সচেতন দেশপ্রেমিক বাঙালিরা বিদ্রোহী হয়ে প্রতিবাদ জানায় পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে। পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ ঐতিহাসিক পল্টন ময়দানে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিশাল জনসভায় দেশপ্রেমিক বাঙালির উদ্দেশ্যে বজ্রকণ্ঠে আহ্বান জানান মাতৃভূমিকে শত্র“মুক্ত করতে যুদ্ধ ছাড়া কোনো উপায় নেই। কাজেই যার যা আছে তাই নিয়ে শত্র“দের বিরুদ্ধে মোকাবেলা করতে হবে। সেই আহ্বানে একদিকে যেমন বাংলার অসংখ্য দেশপ্রেমিক নওজোয়ান মুক্তিযুদ্ধে যোগদান করল। অন্য দিকে, দেশীয় কিছু সুবিধাবাদী, লুটেরা, স্বার্থবাজ মানুষ স্বাধীনতার বিরোধিতা তথা আখের গোছাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।
তৎকালীন পাকিস্তান শাসকগোষ্ঠী যখন অনুভব করল বাঙালি সম্মিলিতভাবে আন্দোলনকে বেগবান করছে স্বাধীনতা প্রাপ্তির প্রত্যাশায়, তখন ২৫ মার্চ-১৯৭১-এ গভীর রাতে মরণ ছোবল হানল। মানুষ কত হিংস্র-বর্বর-নির্মম হতে পারে তার জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত স্থাপন করল পাকবাহিনী। ২৬ মার্চ থেকে শুরু হলো রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ। দীর্ঘ ৯ মাস পাক বাহিনী ও আমাদেরই প্রতিবেশী মুখোশধারী শয়তানেরা বর্বরতার শেষ সীমায় পৌঁছে এ দেশের জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে নারী-পুরুষকে নির্যাতন, খুন, ধর্ষণ, সম্পত্তি লুণ্ঠন করে মীর জাফরকেও হার মানিয়েছে। ইতিহাসদৃষ্টে জানা যায়, ৯ মাসের মুক্তিযুদ্ধে হায়নাদের হাতে ৩০ লাখ মানুষকে আত্মাহুতি দিয়ে, দুই লাখ মা-বোনের সম্ভ্রম আর দেড় কোটি মানুষের সর্বস্ব হারানো ও শরণার্থী হওয়ার বিনিময়ে অর্জিত আজকের এই স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র বাংলাদেশ। যদিও মুক্তিযুদ্ধের সময় সঠিক নিহত ও লাঞ্ছিতদের হিসাব পাওয়া যায়নি, হয়তো যাবেও না কোনো দিন। কেননা স্বাধীনতার দীর্ঘ দিন পরও যেখানে মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা নিয়ে বিতর্ক চলেছে। আজো নতুন নতুন করে সরকার বদলের মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা পরিবর্তনের কাজ চলছে! এভাবে জানি না আর কত দিন চলবে? নতুন প্রজন্ম আজ কোথায় পাবে স্বাধীনতা যুদ্ধের মহান সৈনিকদের সঠিক তালিকা? সুবিধাবাদী মহল দলীয় প্রভাবে নিজেদের সনদকে পাকাপোক্ত করছে আর অসহায় গরিব প্রকৃত দেশপ্রেমিক মুক্তিযোদ্ধারা আজো করুণার পাত্র হয়ে বেঁচে থেকে তামাশা দেখছে, কী নিষ্ঠুর পরিণতি?
সময়ের প্রবহমান গতিতে অতিক্রান্ত হয়েছে বিজয়ের ৪৮টি বছর। ইতোমধ্যে ক’টি সরকার বদল হয়েছে। স্বাধীনতাকে পুঁজি করেই চলছে ক্ষমতা দখলের সুকৌশল। বাংলাদেশের সুদীর্ঘ ৪৮ বছরে ক্ষমতাপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপ্রধান বা দল কেউই মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতাকে অস্বীকার করেননি, তবে মহান মুক্তিযুদ্ধের গৌরবগাথা ইতিহাসের সঠিক মূল্যায়ন তো দূরের কথা, ইতিহাসকে বিকৃত ও দলীয়করণে ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে এ যাবৎ অসংখ্য প্রবন্ধ, নিবন্ধ, কলাম, সংবাদ পত্রপত্রিকায় প্রকাশ হয়েছে। বক্তৃতা হয়েছে, বেতার টেলিভিশনে বিভিন্ন তথ্যচিত্র প্রচার হয়েছে, চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে যাতে সহজেই বোধগম্য হতে পারে পাকিস্তানি বাহিনী ও তার এ দেশীয় দোসরদের কথা, যাদের হাতে নিমর্ম নৃশংসভাবে শহীদ হয়েছেন অসংখ্য বাঙালি নারী-পুরুষ। এ নৃশংসতা বিশ্বমানবতার ইতিহাসে একটি জঘন্যতম কালো অধ্যায়।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যার মধ্য দিয়ে স্বাধীনতার ইতিহাস বিকৃত হতে থাকে বাঙালির মাধ্যমেই। কিন্তু এখানে কি ছোট্ট একটা প্রশ্ন থেকে যায় না! দেশের জন্য যারা জীবন দিলো তৎকালীন সরকারের দীর্ঘ তিন বছর সাড়ে সাত মাসে তাদের নাম-ঠিকানা এবং বদ্ধভূমিগুলোর সঠিক তালিকা প্রণয়নসহ পবিত্র সীমানা সংরক্ষণ করাটা কি সত্যিই অসম্ভব ছিল? স্বাধীন বাংলাদেশে তখন জীবিত মুক্তিযোদ্ধারা সর্বস্ব হারিয়ে অনেকেই হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েন। হাতেগোনা কিছু লোকের পরিচালনায় মুক্তিযোদ্ধার তালিকা হয়। প্রাণের ভয়ে দেশত্যাগী সুবিধাবাদী কিছু মানুষ শান্ত পরিবেশে ভোগ-বিলাসে ভারতে মত্ত থেকেও স্বাধীনতার পর সম্পত্তির অধিকার আদায়ে দেশে ফিরে এসে মুক্তিযোদ্ধা দাবি করে, কেউ আবার ভারতে আত্মীয় বাড়ি থেকে এসে ভারতে মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষক, সংগঠক, পরামর্শদাতা হিসেবে নিজেদের নাম তালিকাভুক্ত করে প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা আদায়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। মুক্তিযুদ্ধে নিহত শহীদদের নাম তালিকাভুক্তকরণ কিংবা বধ্যভূমি নিয়ে তাদের কোনো অনুশোচনা ছিল না। আর যারা পরিবার-পরিজনদের লাশের স্তূপ দেখে, নিজের সাজানো সংসারকে আগুনের লেলিহান শিখায় দাউ-দাউ করে জ্বলতে দেখেও প্রিয় মাতৃভূমিকে শত্রুমুক্ত স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার জন্য যুদ্ধ করেছেন। নানাভাবে ত্যাগ স্বীকার করেছেন, পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা করেছেন, সেসব মুক্তিকামী প্রকৃত বাঙালি বিজয়ের আনন্দে উদ্বেলিত হয়েও পরবর্তীতে বাস্তবতার কাছে নিজের আস্তিত্বই খুঁজে পাননি। অতঃপর অনেকেই জীবনযুদ্ধে ধুঁকেধুঁকে মরেছেন, কেউ আবার ভাগ্যকে দোষারোপ করে অজস্র ত্যাগে অর্জিত প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন। সর্বস্ব হারিয়ে অনেক প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাকে দিনমজুর, রিকশাচালক, ফেরিওয়ালা এমন কি ভিক্ষা করতে দেখা গেছে। একাত্তরের অগ্নিঝরা সেই দিনগুলোতে দেশের স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে বিশেষ করে গ্রাম-বাংলার দরিদ্র্য সাধারণ পরিবারগুলো খাদ্য দিয়ে, আশ্রয় দিয়ে, বস্ত্র দিয়ে নিজেরা কষ্ট করে নানাভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা করেছেন। যার প্রেক্ষিতে বিরোধীচক্র তাদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিয়েছে, লুট করেছে, এমনকি খুন-ধর্ষণও করেছে। অস্ত্র নিয়ে যুদ্ধ না করলেও স্বাধীনতা আন্দোলনে তাদের ভূমিকা শ্রদ্ধার সাথে স্বীকার করতেই হবে। কিন্তু স্বাধীনতা পরবর্তীকালে বাস্তবে তাদের ত্যাগের কোনো মূল্যায়নই করা হয়নি।
অপর দিকে, এই স্বাধীন বাংলাদেশে কোনো কোনো অঞ্চলে তথাকথিত মুক্তিযোদ্ধাকে স্বাধীনতার পর আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হওয়ারও অনেক নজির রয়েছে। বাংলাদেশের মাটিতে আজ অনেকেই কোটিপতি হয়ে বিলাসবহুল জীবন যাপন করে মুক্তিযোদ্ধা ও দেশপ্রেমিক হিসেবে সামাজিক সম্মান ভোগ করছেন, কিন্তু স্বাধীনতা পূর্ব ইতিহাস, বর্তমান বিপুল অর্থের ও সম্পত্তির সূত্র উদঘাটন করতে গেলেই কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেরুবে। অবশ্য এরাই নিয়ন্ত্রণ করছে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক ক্ষমতা, বিধায় ওই আলোচনা ভস্মে ঘি ঢালা সমতুল্য। কেননা যার প্রতিফলন বাস্তবে কোনো দিনই হবে না।
ভাবতেও আশ্চর্য লাগে, রাজধানীতে বসে দলীয় প্রভাবে কাগজ-কলমে মুক্তিযুদ্ধের ৪৮ বছর পরও মুক্তিযোদ্ধাদের নতুন তালিকা রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রণয়ন হচ্ছে। দলীয় প্রভাবের কাছে ওই সব আত্মত্যাগী শহীদের ও হতাশাগ্রস্ত দেশপ্রেমিক মুক্তিযোদ্ধাদের আর কত প্রহসন সইতে হবে? সুদীর্ঘ ৪৮ বছর চলমান, দেশপ্রেমিক সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী, কলামিস্ট, সাংবাদিক তথা সচেতন মানুষ কী তথ্য দিয়েছে বর্তমান প্রজন্মকে? বিভ্রান্তকর তথ্য এই মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে আত্মত্যাগী শহীদদের অস্তিত্ব নিয়ে আলো-আঁধারের খেলার শেষ কোথায়?
বর্তমান প্রজন্মের দাবি শুধু গণতান্ত্রিক সরকারের কাছেই নয়, সচেতন জাতির বিবেকের কাছেও। আপনারা নিজ নিজ এলাকার প্রবীণদের সাথে আলোচনা করে, অনুসন্ধান চালিয়ে মুক্তিযুদ্ধের অজানা তথ্য, শহীদদের নাম, বীরাঙ্গনাদের নাম ও বধ্যভূমির পরিচিতি সংগ্রহ করে সংবাদপত্রের মাধ্যমে দেশ ও জাতির কাছে তুলে ধরুন। দেশপ্রেমিক এলাকাবাসীর সহায়তা নিয়ে স্বাধীনতা ও বিজয় দিবসে এলাকাভিত্তিক স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস তুলে ধরতে সাহিত্য সঙ্কলন প্রকাশ করুন। নিজ জেলায় স্থানীয় পত্রিকায় ওই তথ্য প্রকাশে সমস্যা হলে দেশের বিভিন্ন জেলার সাহিত্য পত্রিকাগুলোতে মুক্তিযুদ্ধের অজানা তথ্যসংবলিত প্রতিবেদন পাঠিয়ে দিন। কিছু পত্রিকা প্রকাশ না করলেও স্বাধীনতার সপক্ষ ও দেশপ্রেমিক সম্পাদকের দৈনিক, সাপ্তাহিক পত্রিকায়, সাহিত্য সংগঠন সাময়িকীতে অবশ্যই তা প্রকাশ হবে।
বর্তমানে বাংলাদেশে বেশ ক’টি আকাশ চ্যানেল চালু রয়েছে। বিজ্ঞানের উন্নতিতে আজ পৃথিবী প্রায় প্রতিটি ঘরের মধ্যে টেলিভিশনের মাধ্যমে বিরাজ করছে। স্যাটেলাইট চ্যানেল পরিচালকদের কাছেও জাতির প্রার্থনা শুধু আগে নির্মিত মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র ও বিভিন্ন বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান প্রচার করেই দায়মুক্ত হবেন না। আপনাদের ভ্রাম্যমাণ প্রতিনিধি নিয়োগ করে গ্রাম-বাংলার সর্বত্র অনুসন্ধান চালিয়ে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস, মুক্তিযোদ্ধা, বীরাঙ্গনা ও শহীদ পরিবারের বর্তমান পরিণতি, বধ্যভূমির ঠিকানা সনাক্তকরণ করে প্রামাণ্য প্রতিবেদন আকারে বাঙালি তথা বিশ্ব বিবেকের সামনে তুলে ধরুন। নবপ্রজন্মকে জানতে দিন নিজ নিজ এলাকার তৎকালীন চিত্র ও প্রতিবেশীদের অবস্থান। পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে যেসব আত্মত্যাগী শহীদ পরিবার ও মুক্তিযোদ্ধা, বীরাঙ্গনা অন্য দেশে কিংবা অন্য জেলায় আশ্রয় নিয়ে আজো বেঁচে আছেন, ওই সব প্রতিবেদন তাদের ব্যথাহত প্রাণে কিছুটা হলেও আত্মতৃপ্তি দেবে। নবপ্রজন্ম জানবে তাদের পূর্বপুরুষদের সত্যিকারের পরিচয়। দেশ ও জাতির আগামী প্রজন্ম পাবে শত বছরের বাংলার গর্বিত সন্তানদের আত্মত্যাগের ইতিহাস। এই মহান দায়িত্ব পালনেও রাষ্ট্রীয় সর্বাত্মক সহযোগিতা অপরিহার্যতার দাবি রাখে।
বর্তমান প্রজন্ম তৎকালীন সময়ে অবস্থার প্রেক্ষাপটে মহান স্বাধীনতা আন্দোলনে কে কী ভূমিকা রেখেছিল তার বিচার করতে চায় না। তারা শুধু জানতে চায় মহান মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস। সব দীনতা-হীনতা ভুলে যাদের আত্মত্যাগে অর্জিত আজকের এই স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ। যাদের প্রাণের বিনিময়ে আমরা পেয়েছি সমাজের বিভিন্ন স্তরে নিজ নিজ অস্তিত্বের সম্মান, তাদের কাহিনী লিখতে সুষ্ঠু নীতিমালা প্রণয়ন ও বাজেট বরাদ্দ করে একদিকে জাতিকে দিন সঠিক ইতিহাস, অপর দিকে আত্মশুদ্ধির সুযোগ দিন বিরোধীদের। দলীয় প্রভাবে শুধু নতুন করে তালিকা প্রস্তুত করে আত্মত্যাগী শহীদদের ও হতাশাগ্রস্ত দেশপ্রেমিক মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মদান কখনোই মুছে ফেলা যাবে না। প্রকৃত এবং পবিত্র আত্মদান কখনোই বৃথা যায় না, মুছে যায় না। অতএব সচেতন মানুষ বুঝতে পেরেছে স্বাধীনতার সূবর্ণ জয়ন্তী পালন করেও আর মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে শহীদদের ও বীরাঙ্গনাদের নাম সঠিকভাবে জাতি জানতে পারবে না। শুধু এটুকুই আত্মতৃপ্তি যে সে দিনের প্রত্যাশা ছিল স্বাধীন-সার্বভৌম মাতৃভূমির অধিকার। অন্য কোনো প্রতিদানের আশায় ওইসব সাধারণ মানুষ আত্মোপলব্ধি থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তা করেনি। জীবন যন্ত্রণায় ধুঁকে ধুঁকে তারা কালের গর্ভে হারিয়ে গেছেন, তবে আমাদের বাংলাদেশের পতাকার লাল সূর্য আর সবুজের মাঝে তারা অম্লান হয়ে আছেন, থাকবেনও চিরদিন। বিজয়ের ৪৮ বর্ষ পূর্তিতে সে দিনের ভূমিষ্ঠ সন্তান আজ স্বমহিমায় সমুজ্জ্বল হয়ে বাংলাদেশের বুকে রাষ্ট্র পরিচালনাসহ বিভিন্ন দফতরে নিয়োজিত রয়েছেন। সদ্য ভূমিষ্ঠ সন্তানটি আজ ফুলে-ফলে সুশোভিত হয়ে সমাজে বিচরণ করছে, কিন্তু যাদের মহান আত্মত্যাগে প্রাপ্ত এই সুজলা সুফলা সোনার বাংলাদেশ সেই আত্মত্যাগীদের সম্মানে আমরা কতটুকু সুবিচার করছি, মনুষত্বের দায়বদ্ধতা কতটুকু কাজ করছে সুস্থ বিবেকে একটু ভেবে দেখছি কী?
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে দুর্নীতি দমন অভিযানে আমরা লক্ষ করেছি টপ টু বটম দুর্নীতিগ্রস্ত। সরকার পরিবর্তনের পরপরই লক্ষ করছি, দীর্ঘ দিনের সাজাপ্রাপ্ত কুখ্যাত সন্ত্রাসী, গডফাদারেরা জেলখানা থেকে বেরিয়ে এসে সদম্ভে সমাজে বিরাজ করছে। দেশের বিভিন্ন জেলায় আত্মগোপনকারী সন্ত্রাসীরা দলীয় প্রভাবে ক্ষমতাসীন হয়ে শুধু সাধারণ মানুষকেই নয়, খোদ প্রশাসনের ঊর্র্ধ্বতন কর্মকর্তাদেরও লাঞ্ছিত করছে। জনগণকে পুঁজি করে ব্যক্তিস্বার্থের এই রাজনীতি বন্ধ না হলে আমাদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক মুক্তি যেমন আসবে না, তেমনি প্রকৃত স্বাধীনতার সুফলও বাঙালি জাতি পাবে না। শুধু দলীয় প্রভাবে স্বাধীনতা আন্দোলনকে নিয়ে সুবিধাবাদী মহলের ক্ষমতা পরিবর্তনের খেলা দেখতে হবে আমজনতাকে, আর রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতার মাঝে গা ভাসিয়ে চলতে হবে চলমান জোয়ারে।
পরিশেষে সর্বস্তরের দেশপ্রেমিক ও শান্তিপ্রিয় জনগণের উদ্দেশে দল-মত নির্বিশেষে মহান বিজয় দিবসের ৪৮তম বর্ষের মাহেন্দ্রক্ষণে এটুকুই প্রার্থনা জানাই, আপনারা পূর্বপুরুষদের স্মৃতি ও ঐতিহ্যকে স্মরণ করে যে আদর্শ ও লক্ষ্য নিয়ে মানুষের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার প্রত্যাশায় একটি স্বাধীন ভূখণ্ড প্রতিষ্ঠার মানসে বাংলাদেশ সৃষ্টিতে এ দেশের সচেতন দেশপ্রেমিক প্রায় প্রতিটি মানুষ পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষভাবে মহান স্বাধীনতা সংগ্রামে শরিক হয়েছিল তাদের প্রতি হৃদয়ের অর্ঘ ঢেলে আসুন আমরা মহামিলনের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে মাতৃভূমি বাংলার সুস্থ ও সম্ভাবনাময় জীবন প্রতিষ্ঠা করি। নইলে কালের করাল গ্রাসে নিজের তৈরি গর্তে নিজেই অবচেতন মনে ঢুকতে হবে। তখন অতীতের সব পাপ-অন্যায় অত্যাচারের মাধ্যমে গড়ে তোলা টাকার পাহাড় কিংবা ক্ষমতার দাপট বালির বাঁধের মতো ভেঙে যাবে। ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে প্রথমে নিজের চরিত্র নির্মল করে গড়–ন, পরে স্বজন-প্রিয়জন-আত্মজদের। পরিশেষে সবার সঠিক জীবন গড়ার দিকনির্দেশনা দিন। নইলে মীর জাফর, জগতশেঠদের মতো নির্মম পরিণতি অবশ্যম্ভাবী। অনেক ত্যাগে অর্জিত স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ সত্যি আজ সুজলা-সুফলা-শস্যশ্যামলা রূপসী বাংলাদেশ হয়েছে। অপর দিকে, হিংসা, রেষারেষি, দলাদলিতে শান্তিপ্রিয় বাঙালি আজ দিশেহারা। যে ছয় দফা দাবি নিয়ে মহান মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত হয়েছিল, ৯ মাস অনেক ত্যাগ, জীবন দিয়ে বিজয় অর্জন করেছিলাম সেই আদর্শ ও লক্ষ্য থেকে ক্রমেই সরে গিয়ে আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় গণতন্ত্রকে শ্বাসরুদ্ধ করে স্বেচ্ছাচারীভাবে চালানো হচ্ছে সব কাঠামো। আয়নার সামনে যেমন দেখানো যাবে, আয়নাও তেমনি দেখাবে। এটাই চিরন্তন সত্য। তা হলে আমরা শান্তিপ্রিয় সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ আগামীতে কোনো অশুভ সঙ্কেতের মুখোমুখি ভাবলেই গা শিউরে ওঠে। আমরা নিজ আয়ে নিজ বাড়িতে, নিজ শহরে বা স্বদেশে শান্তি নিরাপত্তা নিয়ে সদম্ভে বাঁচতে চাই। আমাদের প্রজন্মকে নিরাপদ বাসযোগ্য সমাজ ও দেশ উপহার দিয়ে স্বস্তিতে মরতে চাই। হ
