গাছে গাছে জবাফুল ফুটে উঠল। টকটকে লাল, ধবধবে সাদা আর গোলাপি জবা। সেই ফুলের সাথে কথা বলছিল ঝলমলে রঙিন ডানার একটি প্রজাপতি। কথা বলতে বলতে হঠাৎ সে নূপুরের শব্দ শুনতে পেল এবং সেদিকে ঘুরে তাকাল। সোনার মতো আলো ছড়ানো একটি ছোট্ট মেয়ে। ফুলেরা মিষ্টি হেসে মেয়েটিকে স্বাগত জানাল। প্রজাপতি অবাক হয়ে গেল। ফুলেরা প্রজাপতিকে বললÑ ও প্রতিদিন আমাদের বাগানে আসে, আমাদেরকে সুন্দর সুন্দর গান শোনায়। প্রজাপতি বলল, তাই! ফুলেরা বলল, হ্যাঁ অবশ্যই তাই। প্রজাপতি বললÑ এই যে সোনার ছোট্ট মেয়ে, নাম কী তোমার? মেয়েটি বলল, ওমা, তুমি কথা বলতে পারো? প্রজাপতি বলল, পৃথিবীর সব প্রাণীই কথা বলতে পারে; কিন্তু তারা সবার সাথে কথা বলে না। তোমাকে আমার খুব ভালো লেগেছে, তাই আমি তোমার সাথে কথা বললাম। মেয়েটি বলল, আমার নাম স্বর্ণপাখি। প্রজাপতি বলল, বাহ খুব সুন্দর নাম তোমার! তুমি আমাকে একটি গান শোনাও। স্বর্ণপাখি মিষ্টিসুরে গাইতে শুরু করলÑ প্রজাপতি প্রজাপতি তুমি এক আলোর জ্যোতি, হারিয়ে যাবো তোমার সাথে, সোনামাখা এই প্রভাতে, হারিয়ে যাবো অনেক দূরে, মিষ্টি-মধুর গানের সুরে। প্রজাপতি বলো তুমি, আমায় নেবে সঙ্গে তুমি? বন্ধু হবো আমরা দু’জন, গল্প গানে করব কূজন। প্রজাপতি প্রজাপতি, তুমি তো এক আলোর জ্যোতি, ছোট্ট মেয়ে স্বর্ণপাখি, তোমার হাতে দু’হাত রাখি। আমরা দু’জন বন্ধু হলাম, ভালোবেসে আকাশ ছুঁলাম।
এমন সময় বাগানে উপস্থিত হলো মালী, সে স্বর্ণপাখিকে দেখে ভীষণ রেগে গেল। রাগে গজগজ করতে করতে বললÑ তুমি আবার এ বাগানে এসেছ? তোমাকে না বলেছি, কখনোই এই বাগানে আসবে না। স্বর্ণপাখি বললÑ আমি তো তোমার বাগানের গাছের ফুল ছিঁড়ি না, শুধু ঘুরে বেড়াই আর গান গাই। মালী বলল, তবুও তুমি এ বাগানে আসবে না। যাও, এক্ষুনি চলে যাও। স্বর্ণপাখি মন খারাপ করে বাগান থেকে চলে গেল। প্রজাপতি খুব কষ্ট পেল, সে মালীর দিকে রাগী চোখে তাকাল। মালী বলল, তোমার কত বড় সাহস; তুমি আমার দিকে রাগী চোখে তাকাও। সে প্রজাপতিকে ধরার জন্য হাত বাড়াল। প্রজাপতি তার রঙিন ডানা মেলে দিলো আকাশে, তারপর বাতাসে ভাসতে ভাসতে বললÑ মালী আর কখনোই তোমার বাগানে আমি আসব না। শুধু আমি না সব প্রজাপতি, মৌমাছি আর পাখিদেরও বলে দেবো। তারা কেউই তোমার বাগানে আসবে না। ফুলদেরও বলে দেবো, তোমরা ফুটবে না। মালী এ কথা শুনে ফিক করে হেসে বললÑ ইস, প্রজাপতির কথায় বাগানে ফুল ফুটবে না; বলে কী যত্তসব! প্রজাপতি কিছুই বলল না, হুস করে উধাও হয়ে গেল।
সত্যি সত্যিই বাগানে ফুল ফোটা বন্ধ হয়ে গেল আর শুকিয়ে গেল বাগান। মালী আকাশের দিকে তাকিয়ে কাঁদতে লাগল আর কাঁদতে লাগল। ঝলমলে রঙিন ডানার প্রজাপতি উড়ে যাচ্ছিল, উড়তে উড়তে হঠাৎ সে দেখতে পেল মালীকে। মালী কান্নাভেজা চোখে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে, প্রজাপতির খুব মায়া হলো। সে মালীর কাছে গিয়ে বললÑ সত্যিই কি তুমি তোমার ভুল বুঝতে পেরেছ? মালী কাঁদো কাঁদো কণ্ঠে বললÑ হ্যাঁ, প্রজাপতি ভাই, আমি আমার ভুল বুঝতে পেরেছি। প্রজাপতি বলল, তাহলে প্রতিজ্ঞা করো আর কখনো কারো সাথে এ রকম ব্যবহার করবে না। মালী বলল, আমি প্রতিজ্ঞা করলাম। প্রজাপতি বলল, তুমি স্বর্ণপাখির কাছে ক্ষমা চাইবে, হ্যাঁ অবশ্যই চাইব। প্রজাপতি এ কথা শুনে গাছে গাছে উড়তে লাগল আর গান গাইতে লাগলÑ বন্ধু আমার স্বর্ণপাখি, কোথায় গেলে ভাই, ফিরে এসো, ফিরে এসো তোমার দেখা চাই। সোনার মতো আলো ছড়িয়ে উপস্থিত হলো ছোট্ট মেয়ে স্বর্ণপাখি। মালী স্বর্ণপাখিকে দেখে তার হাত ধরে বাগানের ভেতরে নিয়ে গেল। তারপর অপরাধী কণ্ঠে বলল, ক্ষমা করে দাও স্বর্ণপাখি, ভুল হয়ে গেছে আমার। স্বর্ণপাখি মিষ্টি হেসে বললÑ ঠিক আছে। প্রজাপতি ও স্বর্ণপাখি তারা দু’জন দু’জনকে দেখে খুব খুশি হলো এবং খুশিতে নাচতে শুরু করল। তখন ঝাঁকে ঝাঁকে উড়ে এলো পাখি, প্রজাপতি আর মৌমাছিরা। মালী এই দৃশ্য দেখে বেশ অবাক হলো। সে বাগানের সামনে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করল, আজ থেকে আমার বাগানের দরজা সবার জন্য উন্মুক্ত।
গাছে গাছে জবাফুল ফুটে উঠল। টকটকে লাল, ধবধবে সাদা আর গোলাপি জবা। সেই ফুলের সাথে কথা বলছিল ঝলমলে রঙিন ডানার একটি প্রজাপতি। কথা বলতে বলতে...
