বাংলাদেশ আজ বাংলা ভাষার চর্চা ও ব্যবহারের দিক দিয়ে ভারতের পশ্চিম বঙ্গকে ছাড়িয়ে গেছে অনেক পূর্বেই। যে কলকাতা ছিল বাংলা ভাষা চর্চা ও ব্যবহারে সর্বোচ্চ স্থানের অধিকারী- সে কলকাতা আজ তার সেই স্থান ও মান ধরে রাখতে বেশ কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে নিপতিত। কারণ ভারতের রাষ্ট্রভাষা হিন্দির দাপটে ও সর্বগ্রাসী তৎপরতা প্রবলতর হওয়ায় হিমশিম খাচ্ছে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য। কলকাতার নতুন প্রজন্ম এখন হিন্দি এবং ইংরেজির প্রভাব বলয়ে মাতৃভাষা বাংলা হারিয়ে যাওয়ার উপক্রমে খাবি খাচ্ছে। পক্ষান্তরে ঢাকা বা বাংলাদেশ এমন ঘোরতর চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন নয়। বরং বাংলা ভাষা প্রভাব বলয় ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি করে নিচ্ছে। এটা শুভ লক্ষণ বলেই প্রতীয়মান। তবে আমরা যারা বাংলা ভাষার চর্চা করছিÑ তাদের পূর্বের চেয়ে আরো বেশি সচেতনতার পরিচয় দিতে হবে। এটাই যা অনেক বেশি প্রয়োজন। বাংলা বানানে সতর্ক, শুদ্ধ-প্রমিত ভাষা ব্যবহারে সযতœ প্রয়াস চালাতে হবে। সব স্তরে পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন ও উন্নয়নে আরো বেশি উদ্যোগ নিতে হবে। বর্তমান বিশ্ব জ্ঞান-বিজ্ঞান তথা শিক্ষা সাহিত্যে সংস্কৃতি সভ্যতার নানা দিকে যে প্রভূত উন্নতি ও অগ্রগতি সাধিত হয়েছে সেসব জ্ঞান-বিজ্ঞানের বাহক যেহেতু প্রধানত ইংরেজি ভাষা সেহেতু ইংরেজি ভাষাটাও চর্চার মাধ্যমে আমাদের মাতৃভাষার ভাণ্ডারকে আরো সমৃদ্ধ করার নানাবিধ প্রকল্প গ্রহণ করাও অতীব প্রয়োজন। সাথে সাথে বিশ্বের সমৃদ্ধ প্রধান প্রধান ভাষাগুলোর কালজয়ী ক্লাসিক সাহিত্য বাংলায় অনুবাদেও আরো ব্যাপক পদক্ষেপ নিতে হবে।
বাংলাদেশের বাংলা একাডেমি যেসব প্রকল্প গ্রহণ করেছে তার সঙ্গে বেসরকারি উদ্যোগ গ্রহণও অত্যাবশ্যক, অর্থাৎ একটি সামগ্রিক উদ্যোগ গ্রহণ বিশেষ প্রয়োজন। সাথে সাথে বহির্বিশ্বের আনাচে-কানাচে বাংলাভাষী যেসব কমিউনিটি বা জনগোষ্ঠী অভিবাসী হিসেবে বসবাসরত তাদের সন্তানসন্ততি এবং নতুন প্রজন্মকে বাংলা ভাষা চর্চায় ব্যাপৃত রাখা যায় তার সুদূরপ্রসারী উদ্যোগ গ্রহণও জরুরি। বিদেশে বাংলা স্কুল-কলেজ প্রতিষ্ঠা, পুস্তকালয়ের মাধ্যমে আমাদের সাহিত্যের ব্যাপক প্রচার প্রসার ঘটানোর প্রয়াস চালানো উচিত। এটা যদি না করা হয়, একটি সমন্বিত প্রয়াস যদি এ ক্ষেত্রে গ্রহণ না করা হয়, তবে সেটা হবে আত্মহননের মতো অবিমৃশ্যকারিতা।
যে মাতৃভাষার জন্য একদল তরুণ জীবন দিলেন, রক্ত দিয়ে মাতৃভাষার মর্যাদাকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরলেনÑ তাদের সেই অবিস্মরণীয় ত্যাগ ও জীবন দান কখনো ব্যর্থ হবে না। ভাষা আন্দোলনের কারণেই এই দেশের জনগণের স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার পথ সুগম হয়ে ওঠে এবং ধীরে ধীরে পূর্ণ স্বাধীনতার সোপান তৈরি হয়ে যায়। অনেক রক্তের বিনিময়ে বিপুল বিশাল ত্যাগের কারণে বাংলাদেশ আজ স্বাধীন সার্বভৌম দেশে পরিণত হতে সক্ষম হয়েছে।
আজ আমরা প্রায় সবাই স্বাধীনতার সুফল ভোগ করছি। বিভিন্ন পদ ও পদবি গ্রহণ করে সুযোগ সুবিধার শতভাগ আদায় করে নিচ্ছি। অন্যদিকে আমাদের মধ্যে যারা একটু বেশি মাত্রায় সুযোগ সুবিধা নিয়ে কেউ ‘কলাগাছ’, কেউবা ‘কেউকেটা’ বনে গেছিÑ তাদের তো কথাই নেই। তারা ছেলেপেলেদের বিদেশ বিভূঁইয়ে পাঠাচ্ছি, পড়াচ্ছি অঢেল অর্থ সম্পদ ব্যয়ে। শিখাচ্ছি অন্য ভাষা। অন্য সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষক বানাচ্ছি। এতে মাতৃভাষা অবজ্ঞা করার প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে বৈকি? অন্য দেশ ও জাতির আদর্শ ও সংস্কৃতি আত্মস্থ করার মধ্য দিয়ে অন্য ভাষার, সংস্কৃতির একদম খাস নির্ভেজাল নিরেট তলপিবাহক সেজে বিদেশী অর্থের লোভ লালসায় যেন বুঁদ হয়ে পড়ছি। হায় মা-মাতৃভাষা ও মাতৃভূমির প্রতি এটা কি রকম ভালোবাসা! এ যে অনেক কিছু হারানোর কসরত চলছে মাত্র। এসব ভূমিকা আমাদের কে কোথায় নিয়ে ছাড়বে, তা গভীরভাবে ভেবে দেখা দরকার। এরি নাম ভাষা ও সংস্কৃতি প্রেমের পরাকাষ্ঠা হয় কিভাবে? এ যে স্পষ্ট এক প্রহসন মাত্র। অন্য দিকে আকাশ সংস্কৃতির কালো থাবায় আমরা আজ দিশেহারা। আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতি ভুলিয়ে দেয়ার সচেতন অপচেষ্টা খুবই ধীরেসুস্থে চালানো হচ্ছে। অথচ আমাদের নিজেদের আদর্শ ও সংস্কৃতির প্রচার ও প্রসার ঘটানো বেশি প্রয়োজন, সেটাই যেন ভুলে যাই। সেটাতেই যেন আমরা অক্ষম অসমর্থ হয়ে পড়ি। তাহলে মাতৃভাষার প্রতি প্রেম ও আকর্ষণ কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়! অথচ আমরা জাতি হিসেবে কম ত্যাগ-তিতিক্ষার সম্মুখীন হইনি আগে বরং আমাদের পূর্বসূরিদের আত্মত্যাগ ও উৎসর্গের সংখ্যা এবং ইতিহাস অনেক বড় ও বিস্তৃত। হ
