যারা পাকিস্তানি আমলে বাংলাদেশকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দিতে গিয়ে এক প্রচণ্ড আন্দোলনের সূচনা করেছিলেন, তারা সবাই ছিলেন ইসলামপন্থী সাংস্কৃতিক আন্দোলনের পথিকৃৎ। তমদ্দুন মজলিসের একদল মুসলিম আদর্শবাদী তরুণই ভাষা আন্দোলনের উদ্গাতা। তারা বাংলাভাষা-সাহিত্যের অতীত ইতিহাস উত্তমরূপে জানতেন। তারা জানতেন সুদূর অতীতে বাংলা ভাষার উদ্ভবকালে ব্রাহ্মণ্যবাদী সংস্কৃতির প্রবর্তকরাই ভাষাকে অন্তর থেকে ঘৃণা করতেন। তারা চাইতেন প্রচলিত সংস্কৃতভাষার বিজয়। এই বিদ্বেষের হাত থেকে জনগণের ভাষা বাংলাকে মর্যাদা দিতে গিয়ে সুলতানি আমলের মুসলিম শাসকেরা প্রথম তাদের আর্থিক সহায়তা ও রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষতার হাত বাড়িয়ে দেন। মুসলিম শাসকের অভয় ও অর্থের প্রাচুর্য পেয়েই কৃত্তিবাস বাংলায় রামায়ণ রচনা করেন। কাজটি ছিল বাংলা ভাষার উত্থানের পক্ষে ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতির বিরুদ্ধে প্রথম বিদ্রোহ। দ্বিতীয় বিদ্রোহ পাকিস্তানি আমলে ঢাকার রাজপথে ফেটে পড়ে ১৯৫২ খ্রিষ্টাব্দের একুশে ফেব্রুয়ারিতে এবং বাংলা ভাষা রাষ্ট্রভাষার মর্যাদায় উন্নীত হয়।
এখন বাংলাদেশের অভ্যন্তরে রাষ্ট্রীয়ভাবে সর্বস্তরে এই ভাষার প্রচলনের তাগাদা চলছে। এই সরকারের আগেও যারা রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিলেন তারাও রাষ্ট্রীয় কাজকর্মে বাংলা ভাষাকেই প্রবর্তনে আন্তরিক চেষ্টা করে গেছেন। তারাও ভাষার গুরুত্ব বুঝতেন। এখন বলা যায়, রাষ্ট্রীয়পর্যায়ে বাংলা ভাষার কোনো প্রতিবন্ধকতা নেই। তবুও যে সমাজের সর্বক্ষেত্রে বাংলা মর্যাদা আশানুরূপ গুরুত্ব পাচ্ছে না, এর কারণ অর্থনৈতিক। ইংরেজি যেহেতু আন্তর্জাতিক লেনদেনে পৃথিবীর সব জাতির ভাববিনিময়ের ভাষা, সে কারণে এর অর্থনৈতিক ও আন্তর্জাতিক গুরুত্ব প্রায় সবারই জানা থাকায় মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর ছেলেমেয়েরা মরিয়া হয়ে ইংরেজি শিখতে ঝুঁকে পড়বেই। যারা ভাষা আন্দোলনের উত্তেজনায় একদা কম্পিত হয়েছিলেন, তাদের ছেলেমেয়েরাও এখন বাংলার চেয়ে ইংরেজিকেই বেশি গুরুত্বপূর্ণ ভাষা মনে করতে বাধ্য। এটাই বাস্তবতা। বাস্তববুদ্ধি না থাকলে বাংলাদেশকে একটা আধুনিক কল্যাণরাষ্ট্রে পরিণত করা সম্ভব নয়। তা ছাড়া ইংরেজি শেখাটা রাষ্ট্রভাষা বাংলার জন্য কোনো সমস্যা সৃষ্টি করছে না, বরং একটি আন্তর্জাতিক ভাষা জানাটা একজন বাংলাদেশী শিক্ষার্থীর জন্য একান্ত দরকার। বৈষয়িক ও প্রশাসনিক দিক থেকে ইংরেজির জন্য খানিকটা উদারতা থাকলে, আমরা এতে দোষ দেখতে পাই না। বাংলা প্রবর্তনের আইনগত চাপের মুখে যদি ইংরেজির মতো আন্তর্জাতিক ভাষার প্রতি আমাদের জাতির কোনো অবহেলার সৃষ্টি হতো এবং ইংরেজি জাতির কাছে মর্যাদাহীন পর্যায়ে নেমে যেত, তবেই বিপদের আশঙ্কা ছিল। সেটা যখন হয়নি তখন বুঝতে হবে আবেগ আমাদের একেবারে বৈষয়িক বুদ্ধিহীন করে ফেলেনি। রাষ্ট্রভাষা বাংলার বিপদ মূলত অভ্যন্তরীণ দিক থেকে আসছে না। কারণ রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলাকে খাটো করে দেখার মতো কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব বাংলাদেশে নেই। আমরা থাকতেও দেবো না। বলা যায়, রাষ্ট্রভাষা বাংলার কোনো শত্রু নেই।
রাষ্ট্রভাষা বাংলার কোনো শত্রু না থাকলেও সাহিত্যভাষা বাংলার কিন্তু শত্রুর অভাব নেই।
দেশ বিভাগের পর থেকেই এ দেশের কবি-সাহিত্যিকেরা ঢাকাকে আধুনিক জীবনের কেন্দ্রভূমি ধরে নিয়ে সাহিত্য সাধনা শুরু করেন। ফলে বাঙালি মুসলমান সমাজের জীবনচিত্র, সংগ্রাম ও সাহসীকতার ওপর শুরু হয় এক ধরনের নতুন সাহিত্য সৃষ্টি। প্রথম দিকে তা পাকিস্তানি আদর্শবাদের স্বপ্ন দ্বারা আপ্লুত থাকলেও তবুও যে ঘটনা গত ৭০০ বছর ধরে এ অঞ্চলে মুসলিম সমাজ জীবন প্রতিষ্ঠা পাওয়ার প্রারম্ভকাল থেকে ঘটেনি, মুসলমানদের জীবন-সংগ্রাম ও সামাজিক উত্থান-পতন নিয়ে গল্প-উপন্যাস এবং কাব্য রচনা, এরই সূত্রপাত হয়।
বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর এই সাহিত্যধারা সম্পূর্ণ এক নতুন শক্তিতে বলীয়ান হয়ে ওঠে। আর এই নতুন শক্তি হলো ঢাকাকেন্দ্রিক আঞ্চলিক অনার্য শব্দসম্ভারে সজ্জিত এক আধুনিক বাংলা ভাষা। এই ভাষা কলকাতার সংস্কৃত ঘেঁষা মুসলমানের মুখে আরবি, ফার্সি শব্দবর্জিত চির সাম্প্র্রদায়িত ব্রাহ্মণদের দ্বারা রচিত বাংলা ভাষা থেকে সম্পূর্ণভাবে পৃথক এক তেজোদ্দীপ্ত বাংলা ভাষা যা হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান প্রতিটি ধর্ম সম্প্রদায়ের মাতৃভাষা। সহজবোধ্য ও স্বাভাবিক গতিসম্পন্ন। এই ভাষার সাহিত্য রচয়িতাদের আঙ্গিকসিদ্ধি কলকাতাকেন্দ্রিক লেখকদের মতো দক্ষ না হলেও জীবনচিত্রণে অকপট। তারা তৃতীয় বিশ্বের অন্যান্য সদ্য স্বাধীন জাতিগুলোর মতোই স্বাজাত্যবোধে উদ্দীপ্ত।
ঢাকার প্রকাশকেরা ঢাকার আধুনিক লেখকদের বই ছেপে প্রকাশনার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে তরুণ সাহিত্যপ্রতিভাকে উৎসাহিত করে তুলেছিলেন। ফলে ঢাকাকেন্দ্রিক এক সতেজ সাহিত্যভাষা স্ফুটনোন্মুখ হয়ে উঠতে আমরা দেখেছিলাম।