আমি জন্মেছিলাম সাবেক কুমিল্লা জেলার ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের মৌড়াইল নামক মহল্লার এক বাড়িতে। বাড়িটিকে আজো মোল্লাবাড়ি বলে ডাকা হয়। জন্মেছিলাম একটি প্রাচীন রক্ষণশীল ধর্মীয় পরিবারে। ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদিতে নেতৃত্বদান, বস্ত্র, দারু ও গন্ধদ্রব্যের ব্যবসায়ই ছিল পূর্বপুরুষদের জীবিকার উপায়। সুলতানি আমল থেকে শুরু করে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমল পর্যন্ত এরা ধর্মীয় লেখাপড়া ও ব্যবসা-বাণিজ্য উপলক্ষে সারা উপমহাদেশে ঘুরে বেড়াতেন। বলা যায়, এরা ছিলেন যাযাবর শ্রেণীর আলেম। ইংরেজি শিক্ষার প্রতি বিদ্বিষ্ট এরা আরবি-পারসিকেই শিক্ষার বাহন করে নিয়েছিলেন। এরা বাংলাও ভালো জানতেন, কারণ নিজের দেশে যেহেতু জনগণের মধ্যে সহজ ভাষায় শরিয়তের নিয়মকানুন চালু করতে চাইতেন, সে কারণে দেশী ভাষা অর্থাৎ বাংলা ভাষার প্রতিও এদের পক্ষপাত ছিল। আমার দাদা জারি-সারি ও মর্সিয়া লিখতেন।
শিক্ষা ও ব্যবসায় উপলক্ষে যেহেতু এরা উপমহাদেশের স্থান থেকে স্থানান্তর বাজার, কসবা ও হাটে ঘুরে বেড়াতেন, সে কারণে এদের হৃদয় ছিল খোলামেলা। এরা জাতিভেদ ও ভাষাভেদের তোয়াক্কা করতেন না। কেউ কেউ আবার অন্য প্রদেশ থেকে স্ত্রীও গ্রহণ করেছিলেন। মোট কথা আমাদের পরিবারটি ছিল একটি অদ্ভুত ধরনের জগাখিচুড়ি পরিবার। সাদা-কালোর মিশেল ছিল এতে। ছিল নানা ভাষা ও আদব-কায়দার মিশেল। কিন্তু একটা ব্যাপারে এরা অত্যন্ত স্পর্শকাতর ছিলেন। বিষয়টা হলো, আমার পূর্বপুরুষদের আচরণীয় ধর্ম ইসলাম। কোরআন-হাদিসের বরখেলাপ কোনো কিছু এরা সইতে পারতেন না। ব্রিটিশ আমলে হাজী শরীয়তুল্লাহর সংস্কার আন্দোলনকে এরা জানমাল ও হৃদয় দিয়ে সমর্থন করেছিলেন। এ কারণে দুর্গতিও কম পোহাতে হয়নি। এরা অতীতে ব্রিটিশ সরকারের অধীনে কোনো চাকরি গ্রহণকে ঘৃণার সাথে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। যদিও এ দম্ভ শেষ পর্যন্ত টেকেনি তবুও দেড় শতাব্দী পর্যন্ত তারা তাদের জেদ বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন।
এই রহস্যজনক মানুষদের ছিল কবিতার প্রতি অসাধারণ অনুরাগ। এরা সবাই কবিতা আবৃত্তি করতে জানতেন। আরবি কাসিদা ও পারসি বয়াত এদের মুখে মুখে ফিরত। কথায় কথায় এরা কবিতা আবৃত্তি করতেন। ধর্মীয় ওয়াজ-নসিহতের সময় এমন সব কবিতা আবৃত্তি করে শ্রোতাদের তাক লাগিয়ে দিতেন, যা শ্রোতারাও মুখস্থ করে ঘরে ফিরত। ধর্মপ্রচারের সুবিধার জন্যই এরা কাব্যচর্চা করতেন। সে কবিতা যে ভাষাতেই রচিত হোক না কেন। এদের অন্দর মহলও কবিতার রস থেকে বঞ্চিত ছিল না। মেয়েরাও দু-চারটি পারসি ছত্র স্বামী-দেওরদের সাথে ঠাট্টা-মশকরায় অকপটে ব্যবহার করতে জানতেন।
এই ছিল আমার পারিবারিক পরিবেশ। এদের মধ্যেই ১৯৩৬ খ্রিষ্টাব্দের ১১ জুলাই এক বর্ষণের রাতে আমার জন্ম হয়। আমার কৈশোরকালেই আমাদের পরিবার তথা আমার অভিভাবকদের স্থায়ী জীবিকার ক্ষেত্রগুলোতে ভাঙন ধরে। আমাদের ছিল কাপড় ও পাদুকার দোকান। দোকান ফেল মারে। যৎসামান্য জমিজমার ওপর ভর করে সংসার চালাতে আমার বাপ-মায়ের অসহনীয় কষ্ট হতো। নিঃসীম দারিদ্র্য নেমে আসে আমাদের ঘিরে। এর মধ্যে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের ঢেউ মফস্বল শহরগুলোতে আছড়ে পড়লে আমি এতে জড়িয়ে পড়ি। ভাষা কমিটির একটি লিফলেটে আমার চার লাইন কবিতার উদ্ধৃতির গন্ধ শুঁকে পুলিশ এসে আমাদের বাড়িতে হানা দেয়। আমার বাপ তখন অসুখে শয্যাশায়ী। পুলিশ বাড়ি তছনছ করে আমাকে খোঁজে। আমি তখন দশম শ্রেণীর ছাত্র। গাঢাকা দিই। এক জেলা থেকে অন্য জেলা, এক শহর থেকে অন্য শহর। এভাবে ঘুরতে ঘুরতে ১৯৫৪তে ঢাকায় এসে হাজির হই।
আমার একটি জীবিকার তখন একান্ত দরকার। আমার কয়েকটি গল্প-কবিতা তখন এখানকার পত্রপত্রিকায় হঠাৎ প্রকাশ পাওয়ায় আমি স্থির করি সাহিত্যচর্চাই আমার জীবনের ব্রত হবে। এই ব্রত উদযাপনের জন্য একটি সহায়ক জীবিকা খুঁজতে থাকি। এ সময় আমার পূর্বপরিচিত এক গল্প লেখক লুৎফর রহমানের শরণাপন্ন হই। তিনি আমাকে রোকনুজ্জামান খান (দাদা ভাই)-এর সাথে পরিচয় করিয়ে দেন। দাদা ভাই আমার অবস্থা শুনে আমাকে দৈনিক মিল্লাতের প্রুফ সেকশনে একটি চাকরির ব্যবস্থা করে দেন। পরে আমি নিজের চেষ্টায় নজমুল হকের সাপ্তাহিক কাফেলায় সহসম্পাদকের শূন্য পদে যোগদান করি। এভাবেই আমার ঢাকায় স্থায়ী বসবাস ও সাহিত্যচর্চার দৈব সুযোগ সৃষ্টি হয়। তখনো বয়েস কৈশোরের সীমা অতিক্রম করেনি।