কে জি মোস্তফা
উদভ্রান্ত

আমাকে ব্যস্তবাগীশ মনে হতে পারে
সকালে উঠেই এত ব্যস্ত হয়ে পড়ি
যেন হাতে আর মোটেও সময় নেই
এক মুহূর্ত নষ্ট হলে আমার সৌভাগ্য
সামনের রাস্তা দিয়ে পালিয়ে যাবে নির্ঘাত।

তাড়াহুড়ো করে তাই উদভ্রান্ত পথিকের বেশে
প্রতিদিন ঘর থেকে সবেগে বেরিয়ে পড়ি
নিশ্চিতরূপে মনে হবে সমুদ্রের তলদেশে
তেল অনুসন্ধানে কিম্বা এভারেস্ট অভিযানে
গুরুত্বপূর্ণ কোন এক দলের সহযাত্রী আমি।

আসলে আমার গন্তব্যে পৌঁছার কোন তাড়া নেই
কেননা আমার নেই কোন সঠিক গন্তব্য
দেরি হওয়ারও আশঙ্কা নেই, কেন না
আমার নেই কোন সাক্ষাৎকার কর্মসূচি;
শুধু এক অন্ধ সময়ের মধ্য দিয়ে
শহরটা চরকি দিতে দিতে
নিজেকেই নিজে ধাক্কা মারি,
মনে হয় সাগর সৈকতে পড়ে থাকা
আমি এক নিঃসঙ্গ ঝিনুক, অথবা জ্বলন্ত
প্রদীপের চারপাশে ঘোরা পতঙ্গ বিশেষ।

আসলে কেউ-ই আশা করে না আমায়
তাড়াহুড়া করারও নেই কোন প্রয়োজন,
শুধু এক অনুজ্জ্বল আবেগের নির্দেশে
রুদ্ধশ্বাসে ছুটে চলেছি,ছুটেই চলেছি!

 

আসাদ চৌধুরী
শেষ পর্যন্ত পাখির সঙ্গে

‘তুমি কী সেলাই করো?’

‘স্মৃতি, আমি স্মৃতি সেলাই করি।
সময়ের আঘাতে-আঘাতে
ষড়যন্ত্রে, উদাসীনতায়
জামায় সুচের কাজ মুছে যাচ্ছে,
দীর্ঘশ্বাসগুলো মুছে যাচ্ছে।
আমি এসব সেলাই করি।’

‘তুমি কী খুঁজছো ওই ওঠোঁটে?’

‘ছায়া খুঁজি।
অগণিত করোটির মাঝে
যে শস্য সহাস্যে মেলেছিলো ডানা,
আমি তার সবুজ ছায়াটি খুঁজি;
না পেলে উড়াল দিই!’

‘ওই তো বন্দরে ভেড়ে উদার জাহাজ,
জাহাজে রয়েছে চাল, গম, রাজনীতি
আর সামান্য ষড়যন্ত্র।’

‘ভিক্ষায় ও-সব থাকে,
তবুও রয়েছে, দ্যাখো, বন্ধুত্বের বাণী,
এবং গুচ্ছ গুচ্ছ শুভেচ্ছা।
তুই ফিরে আয় পাখি,
আমি তোকে নাগরিকত্ব দেবো,
নগরের স্বর্ণ চাবি তুলে দেবো তোর হাতে।’

মানুষ আমি রাজনীতি খাই না, খেতে পারি না।
চাবি ও নগর খেতে পারি না।
বড়ই বিস্বাদ লাগে,
ষড়যন্ত্র আরো বেশি পচা...
শস্যহীন প্রান্তরের পাখিগুলো দূরে চলে যায়।
তবে কেন মিছেমিছি অতো দূর থেকে
এসেছিলি কুহকিনী পাখি?

 

হাসান হাফিজ
কী কী চায় স্বাধীনতা

দুর্গম বন্ধুর পথ পাড়ি দিতে হয়
পায়ে ফোটে কাঁটা
রক্ত ঝরে অবিরল
প্রাণোৎসর্গ করতে পারলে জয়
তার পর?
কাক্সিক্ষত মোকামে পৌঁছা সম্ভবপর তবেই নিশ্চয়
তার জন্যে কতো অশ্রু কতো ত্যাগ
ঝঞ্ঝাক্ষুব্ধ বিরুদ্ধ সময়
পার করা তমসাবিদীর্ণ রাত
অপেক্ষা কখন হবে রঙিন প্রভাত
ধীরে ধীরে... এ অর্জন কিছুতেই তাৎক্ষণিক নয়
রক্তস্রোতে অদ্ভুত প্লাবন
প্রতিবাদে প্রতিরোধে ঘৃণা জ্বলে
অতি আবশ্যক সেই দ্বন্দ্ব বিস্ফোরণ
স্বাধীনতাÑ জেদ চায় প্রতিজ্ঞা শপথ চায়
অধিক পছন্দ তার ধ্বংস ও প্রলয়
প্রাণমূল্যে অবশেষে থিতু হওয়া
এ সত্যের নাই কোনো তিলেক ব্যত্যয়!!

 


শাহীন রেজা
যদি যাই

চলে যাবার জন্য কোনটা প্রকৃত সময় -রাত না দিন?
ধরো যদি রাত হয় তাহলে নক্ষত্রেরা
আমাকে পথ দেখাবে আর আমি জোনাক-টর্চ হাতে নিয়ে
নক্ষত্র-দেখানো পথে হেঁটে যাবো সুস্থির
আর যদি আকাশে মেঘ থাকে
বৃষ্টির ফোঁটাগুলো নেমে আসে বোঁটাছেঁড়া ডুমুরের মতো
তবে অন্ধকারে আমার দৃষ্টি হবে প্রিয় বাদুড়ের চোখ
আমি মাতাল পাখায় উড়তে উড়তে চলে যাবো
ভেজানো কপাটের দিকে
স্বর্গের দরজা বন্ধ থাকে, নরকেরও কি-কে জানে!
আর আমার যাত্রা যদি দিবালোকে হয় তাহলে অগ্নি আমাকে
টেনে নেবে আপন স্কন্ধে
আমি জ্যা-মুক্ত ধনুক হয়ে ছুটে যাবো স্বপ্নের দিকে
কবির স্বপ্ন মানেই তো কবিতা
আমি শব্দে শব্দে আঁকবো বিলয়ের গাঁথা
এবং ফেরাবো আমার সমস্ত সময় অনন্ত উজানে
ভরাপদ্মায় স্মৃতির বোয়াল হয়ে লিখে যাবো তোমার সে নাম; চির-আগ্রহে
কবির মৃত্যু আছে কবিতার নেই
সায়াহ্নে শালিক হয়ে মিশে যাবো এই আমি ধূলোর আঁধারে
যদি যাই রাত্রির চিহ্ন এঁকে ডাহুক শরীরে
আমাকেই খুঁজো তুমি শ্রাবণের ভিড়ে।

 


বুলান্দ জাভীর
তুষার কণা

তুষার কণা,
হে আমার হিমশীতল মেয়ে
সোনালি চশমা রাখ ডিপ ফ্রিজে
কাচে জমে ওঠে ঘন কুয়াশা
সাদা ছড়ি হাতে মাইল মাইল নির্জন রাস্তায়
পাশে দাঁড়িয়ে আছ।
তোমাকে নিয়ে যাচ্ছে আদিবাসীরা
দেবী মঞ্চে
তোমাকে খুব উৎফুল্ল দেখাচ্ছে
মাতাল নৃত্য, মাদলের দামামার মধ্যে
তুমি কত না নিঃসঙ্গ, নিজেও জান না।
চশমা খুলে ফেলে শক্ত করে আমার হাত ধরো
আমি তোমাকে লোকালয়ে নিয়ে যাচ্ছি।

 

সানাউল হক খান
প্রাগৈতিহাসিক মন

নিঃশব্দ পাতায় শব্দ! সে আমার বাবা
শিথানে পিপুল গাছ, মাটির আহ্লাদেÑ
রোদ উঠে, ছায়া নামে, বৃষ্টির নিনাদে
মৃত্তিকা সরব হয়ে ওঠে : মারহাবা।

তার বাৎসল্য আজ সবচেয়ে স্বাধীন
পরাধীন ভিখারির গলায় আধুলি
বেলা শেষে অবিশ্বাস হাতের মাদুলি
কর্মদোষে কুরে খাই পয়মন্ত দিন

‘সময়, সময়’ ডেকে ছোটে অসময়
আমিও ছুটছি সঙ্গে স্নেহধন্য পুত্র
প্রাগৈতিহাসিক মন থেকে ছিঁড়ে যায় সূত্র
দোষ-গুণ কেউ কারও চেয়ে কম নয়

নিঃশব্দ বুকের শব্দ একাকী জিকির
সেখানে অচল সব ফন্দি ও ফিকির

 

ফরিদ আহমদ দুলাল
আরাধ্য মৃত্তিকা

কাছেপিঠে তুমি নেই মানে আমি নির্ভার-নিশ্চিন্ত নই
শহরের সদর সড়ক হয়ে তোমার বিষাদে আমিও বিষণœ রই
দূরে গিয়ে বুঝি বুকের গহিনে তোমার মুখর স্মৃতি বই।
আমার কৈশোরানন্দ শিমুল তুলোর আকাশে উড়াল
পুকুরের জল ছুঁয়ে থাকা সিঁদুরে আমের ডাল
রঙিন গামছার-জালে মাছধরা-খেলা ইজমালি পুকুরে ডুবে
পশ্চিমাকাশে যে সূর্য ডোবে পরদিন ভোরে সে উঠেছে পুবে;
অনিন্দ্য রাজকুমারী তুমি সিথানে-পৈথানে সোনা ও রূপোর কাঠি
আবাদি জমিনে ঢেলা নিয়ে খেলা প্রতিকণা যার খাঁটি
তাই তো তোমার নাম দিয়েছি মৃত্তিকা যার বুকে আনন্দ-বিষাদে হাঁটি।
সর্বত্র মৃত্তিকা তুমি প্রেমৈশ্বর্যঋদ্ধ বিরাজিত বিশ্বময়
ভালোবেসে তোমাকে আমার হারাবার নেই ভয়
তোমার স্মৃতি যে একাত্তর বীর-বাঙালির যুদ্ধের সময়।

আমার আরাধ্য সুন্দর যখন দরজায় কড়া নেড়ে ডাকে,
পৃথিবীর যাবতীয় ঐশ্বর্য তখন গড়ায় ধুলায়
অন্ধকার রাত ভেঙে পূর্বাকাশে সন্দীপন দেখা যায়
ভালোবাসা হীরকদ্যুতিতে উঁকি দেয় চিরল পাতার ফাঁকে।
করতলে রেখে যতবার অপলক চোখে দেখি পৃথিবীকে,
ততবার বুঝি এ পৃথিবী অনাত্মীয় নয়
দুর্লঙ্ঘ পাহাড়-সমুদ্র-অরণ্য-নদী যেখানে বিস্ময়
বারেবারে ফিরে আসি বারেবারে দেখি আত্মার স্বজন মৃত্তিকাকে।

 

 

তমিজ উদ্দীন লোদী
দাহ ও দাহ্যের জাঁতাকলে

পোড়াবার জন্যে যতোটা আগুন চেয়েছো
তার চেয়ে বেশি আগুন দিয়েছি তোমাকে
দাহ ও দাহ্যের জাঁতাকলে
তুমি কতোটা পোড়ালে তাকে ও তোমাকে?

দৃশ্যমান আগুনের চেয়েও ভয়ঙ্কর কোনো অদৃশ্য আগুন
তোমাকে পোড়ালো বলো কোন ফাঁকে?
যে পাঁকে তুমি ছিলে, সে ছিল, উভয়ে বিপাকে;
সে থেকে উঠে এলে, নাকি পোড়ালে দ্বিগুণ?

কে তবে পাড়া মাত করে
কোরাসের মতো করে বলে, আগুন! আগুন!

 

হাসান আলীম
ফুলকে ছুঁইতে চাই

ফুলকে ছুঁইতে চাই, পারি না কিছুতেই-
পরম আবেগে আমি পকেটে লুকাতে চাই,
পারি না পরশ নিতে
উতলা চৈতি হাওয়ায় সুবাসেরা উড়ে যায়।
নিকটে বাগানে ফুল চারদিকে তারকাঁটা
কখনো যাবে না ছোঁয়া নিষেধের নির্দেশনা।
পাখিটা খাঁচায় পোরা ছাড়তে পারি না তাকে
থমকে থমকে ডাকে, কখন সকাল হবে?
ভয়ের কালো গোলাপ অজগর হয়ে আসে
বিমূর্ত সময়গুলো চলে যায় ভালোবেসে।
বলতে পারি না যা বলার
লিখতে পারি না যা লেখার,
স্বাধীনতা, স্বাধীনতা,
কোথায় কলম খাতা।

 


দিলীপ কির্ত্তুনিয়া
এই পাখি

এই পাখি গাছেই মানায়।
শিশুটিকে পাখি আঁকার পরে বললামÑ
একটা ভালো ডাল এঁকে দাও।
একটা সুন্দর ফুল এঁকে দাও।
আর আকাশকে দিয়ে দাও উপর থেকে ঢেকে।
যদি কখনো উড়তে চায় পাখি
তার মানে এই ছবির পাখি
হোক না সে অচল ডানা, স্থির রঙ
পাখির সাথে সাথে তার পরিবেশটাও যেন পায়।
এই নীলÑ এই মেঘ বাতাস।
ছবিতেও যেন পাখি না হয় অসহায়
যেন বুঝতে পারে পাখি
মানুষ সর্বত্রই তার বন্ধু।

 


হায়াৎ সাইফ
মোহ

আজ কোন মোহ নেই তার
মোহনাও নেই নদীটার
আজ তাই নাব্য কোনো বারিধারা ঢুঁড়ে
হঠাৎ সেঁদিয়ে যাই সাহারার বালুর ভিতরে।

তুমি তাই পানি নও
তুমি মরীচিকা,
মরকত মণি নও, ভাঙা কাঁচা
তুমি মোর অবরোহ মোহ,
নাকানিচোবানি দিয়ে কানামাছি খেলা
অন্তহীন ক্ষোভের আঁধারে সারারাত।

 


জাফরুল আহসান
দেখা না দেখা

কখনো দেখিনি আলোর শরীর তোমার মতোন করে,
চাইনি কখনো পাখির পালক ঘরহীন কোনো ঘরে।
ছুঁইনি কখনো একটি হৃদয় নরম কোমল বুক,
দেখিনি কখনো তুমি ছাড়া আর কোনো নারীর চিবুক।

দেখিনি কখনো ধানসিঁড়ি নদী জীবনের উল্লাস
ছুঁইনি কখনো গলিত জোসনা ফেলে আসা বিশ্বাস।
পরখ করিনি ফেরি করে ফেরা চিরচেনা আশ্বাস
দেখিনি কখনো তুমি ছাড়া কারো হৃদয়ের নিঃশ্বাস।

ছুঁইনি কখনো ফুলের শরীর বৃষ্টিভেজা কদম,
বুঝতে পারিনি দহনের জ্বালা সে যে কতটা গরম।
শুনিনি কখনো ঝিনুকে লুকানো মুক্তার চিৎকার,
দেখেছি শুধুই আমার জন্য তোমার অহঙ্কার।

দেখা না দেখার ছলে তোমাকেই দেখি প্রান্ত সীমায়,
তুমি ছাড়া আর কেহ নাই সখী আমার প্রতীক্ষায়।

 


শাহজাদা বসুনীয়া
আমার স্বাধীনতা

আমার মুখের প্রতিটি বলিরেখায় নগ্নভাবে
প্রকাশিত হয়েছেÑ আমি ভালোবাসি স্বাধীনতাকে।
ধীরে ধীরে নিস্তব্ধ রাতের নিঃসঙ্গতার মত
ছড়িয়ে থাকে সেই ভালোবাসা চেতনার রন্ধ্রে রন্ধ্রে।
আমার হৃদয়ে সেই ছড়ানো ভালোবাসার আলো
যেনো নিভু নিভু প্রদীপ শিখার আভা।
ভালোবাসার জ্বলন্ত শিখার মধ্যে তার সমতে
ধীর গতিতে পড়ে গিয়ে
সেই অনুভূতির আগুন নি®প্রভ হয়ে যায়।
কেনো সেই ভালোবাসার অসারতা?
কেনো দিগন্ত প্রসারী বিবেক, উন্মুক্ত ও
সাদা ঝকঝকে আত্মার নিস্তব্ধতা?
কত অনাবিল শান্তির আমেজ,
কত স্নেহশীতল শান্তির নীড়,
কত কলহাস্য মুখরিত অঙ্গের রূপ
অবলোকন করা এখনও বাকি রয়েছে।
তাই আজ...
বিস্ময়াভূত অস্ফুট চিৎকারÑ তোমাকে ভালোবাসি।
অশান্ত কৈশোরের স্বপ্নকে যৌবনের কল্পনায়
মেখে দিয়ে আমার প্রেয়সী স্বাধীনতাকে
ভালোবাসবো অনাদিকাল থেকে অনন্তকাল।
আতঙ্কিত ও বিস্ময় বিমূঢ় চাহনিতে
আবার ভালোবাসবো আমার প্রেয়সী স্বাধীনতাকে।
যা জঘন্য নরমেধ যজ্ঞের ভয়াবহ ও
লোমহর্ষক হত্যালীলায় শিহরিত ও
রক্ত প্লাবনে প্লাবিত হয়েছে একাত্তরে ॥

 


সৈয়দ রফিকুল আলম
বিবর্ত

মোহিনী পেলব বিভা হারিয়েছো তুমি
স্মৃতিকাতর মন খুঁজে ফেরে বিবর্ত - সে কি?

ছিলে তো তমাল তণুকা বাতাস কেশরে ঝড়
তবু কেন আহা কল্প- মননে জাগে উন্মাদি ষড়?

তোমার চৈতন্যে ছায়া ছায়া রূপ দেখিবারে পাই
ছায়ার স্বপ্নে নিকষ আঁধার তুমি সেথা নাই

সময় বহিয়া যায় অতীতেরা বউ কথা কয় গর্দিশে
হারিয়েছো সব পিছুটান আশা, স্মৃতিতে খিল নিমেষে।