১৯৭১ জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি, মার্চ আমরা শুনছি, পেপার পড়ছি। মুজিবের আন্দোলনের কথা। এলো মার্চ মাস। ৭ মার্চ মুজিবের ভাষণ। ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে।
তার পর সব অফিস বর্জন। আমার স্বামী ও কোয়ার্টারে আরো সবাই অফিস যান না, মহাখুশি, পাকিস্তানিরা আমাদের পূর্ব বাংলাকে স্বায়ত্তশাসনে দিয়ে দিলো আর কি! আলোচনা চলছে। আমার সংসার, কোলে ছোট সন্তান নিয়ে অস্থির। শুনি ইয়াহিয়া-মুজিব আলোচনা হচ্ছে। কাগজ পড়ি চট্টগ্রাম বন্দরে শ্রমিক বিদ্রোহ। গাজীপুর গুলি হয়েছে, এসব খবর। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের রাতের কথা জীবনে ভোলার নয়। সেই রাতে সন্তানেরা সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। রাত প্রায় ১১টার মতো হবে। আমি ও আমার স্বামী বারান্দায় দাঁড়িয়ে ঢাকা শহরের দিকে দেখছি। আমরা শহর থেকে বাইরে তেজগাঁও বিজি প্রেস কোয়ার্টারে থাকতাম। আমার স্বামী বিজি প্রেসে মনো অপারেটার ছিলেন। আমরা থাকতাম তিনতলায়। ২৫ মার্চের হত্যার কিছু পরে আমার স্বামীর একজন সহকর্মী ও তেজগাঁও এলাকার একজনÑ মুকুল ভাই সবাই তাকে বড় ভাই বলে ডাকত। এই দু’জন আমাদের বাসায় আসে। আমার দুই ছেলেমেয়ে মুকুল ফৌজের সদস্য ছিল। আমার বাসায় এসে বাবু ভাই আমার মেয়েকে ডেকে বলল, সেতারা আজ রাতে কী যে হবে তার ঠিক নেই। আমরা সবাই যেন একসঙ্গে প্রশ্ন করলাম। কেন ব্যাপার কী? বাবু ভাই বললেন, কেন দেখলেন না। এখন প্লেন উঠে গেল। ওই প্লেনে ইয়াহিয়া উঠে চলে গেল। আলোচনা চলল না। আওয়ামী লীগের কর্মীরা তেজগাঁও ঢোকার সব রাস্তার ওপর প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। আস্ত পাথর সব রাস্তার ওপর ফেলেছে। তেজগাঁও রেলগেট লাইনের ওপর বিরাট লম্বা এক মালগাড়ি দাঁড় করিয়ে রেখেছে। আমরা এসব দেখে এলাম। সামান্য আলোচনার পর ওরা চলে গেল। রাত ১১টার পর আমরা ঘুমাতে গেলাম। হঠাৎ মেশিনগান আর প্রচণ্ড বোমার শব্দে ঘুম ভেঙে গেল। রাত কত হবে ঘড়ি দেখার কথা আর মনে নেই। ছেলেমেয়েরাও তখন জেগে উঠেছে। ছোট ছোট শিশু ভয়ে কান্না জুড়ে দিয়েছে। আমরা থাকতাম তিনতলায়। প্রচণ্ড বিস্ময়ে আর ভয়ে আমি দ্রুত বিছানা ছেড়ে উঠতে গেলাম, বিছানা ছেড়ে উঠতে গেলে আমার স্বামী আমার হাত ধরে বললেন, শিগগিরই সন্তানদের নিয়ে মেঝেতে শুয়ে পড়ো। বারান্দায় তখন বাতাসে বাংলাদেশের পতাকা উড়ছে। আগের দিন রাতে বসে ওই পতাকা তৈরি করেছি। তখন খুব কম বাড়ি ছিল যার ওপর বাংলাদেশের নতুন পতাকা উড়ছে। বিজি প্রেস কোয়ার্টারের তিনতলার বারান্দায় দাঁড়ালে সম্মুখে বাংলাদেশের খাদ্য গুদাম তার পেছনে আছে রেললাইন। বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখতাম ট্রেন যাচ্ছে। ইঞ্জিনের ওপর উড়ছে বাংলাদেশের নতুন পতাকা। যা হোক, সেই মুহূর্তে কী করা যায়। সন্তানদের বাবা বললেন, পাকবাহিনী আক্রমণ করেছে বাঙালিদের ওপর। আমি পতাকা খুলে ফেলি। তিনি হামাগুড়ি দিয়ে সেই পতাকার কাছে গিয়ে বারবার চেষ্টা করে শেষ পর্যন্ত বাঁশটা ভেঙে নিয়ে এলেন। সামনের খাদ্যগুদামের ওপর দিয়ে ছোট ছোট অগ্নিগোলক ছোটাছুটি করছে। চার দিকে নিñিদ্র, আমাদের বিদ্যুৎ লাইন কেটে দিয়েছে। মুহুর্মুহু গুলি ও বোমার শব্দ। তার সাথে চার দিকে কুকুরের চিৎকার পরিস্থিতি পরিবেশ ভয়ঙ্কর ভীতিকর করে তুলেছিল। বর্তমানে খাদ্যগুদামের ছাদের ওপর দিয়ে গুলি চলছে। যেন মনে হচ্ছে কেউ হাতে হারিকেন নিয়ে ছোটাছুটি করছে। আমি প্রথমত তাই মনে করে বাইরে ছুটে যাচ্ছিলাম। আমার স্বামী হাত ধরে টেনে ঘরে ঢুকিয়ে বললেন, ওগুলো হারিকেনের আলো নয়, গুলি চলছে তারই আলো। ভয়ে থরথর কাঁপছি আর দোয়া ইউনুস পড়ছি। এমন পরিস্থিতি জীবনে কখনো কল্পনাও করিনি। সন্তানেরা বুকের কাছে জড়িয়ে দু’জন বসে রাত কাটালাম। শেষ রাতের দিকে দূরের রাস্তায় ভারী কিছু চলার শব্দ শুনেছিলাম। পরে শুনেছিলাম ও শব্দ ট্রাংকের রাজারবাগ পুলিশ ব্যারাক আক্রমণ করার জন্য নিয়ে যাওয়া হয়েছে। সকাল ৬টায় রেডিওতে শুনলাম ৭২ ঘণ্টা কারফিউ দেয়া হয়েছে। দুশ্চিন্তায় খাওয়া দাওয়া কিছু করার ইচ্ছা দূর হয়ে গেছে। শুধু মনে হচ্ছে, রাত কি দুঃস্বপ্নের মধ্যে কেটেছে? সে রাতের কথা মনে হলে আজো আতঙ্কে শিউরে উঠি। সেই রাতে শহরের দিক থেকে শুনতে পাই বহু মানুষের ভয়ার্ত আর্তচিৎকার। তার সাথে গ্রেনেট বোমা ও গুলির আওয়াজ। সেই মুহূর্তের মানসিক অবস্থার বর্ণনা বোধ হয় সঠিক দিতে পারব না। এই ৭২ ঘণ্টার কারফিউ সময়ে ঘরে মানুষের যে কিভাবে কেটেছে তা একমাত্র আল্লাহ ভালো জানেন। অনেকের ঘরে হয়তো খাদ্যদ্রব্য নেই। কারো বাজার নেই। এ অবস্থায় কল্পনা করা যায়, কী থেকে কী হবে। আমার মতো অনেক মানুষের খাওয়ার স্পৃহা ছিল না। এমনি উৎকণ্ঠা উদ্বেগ নিয়ে ৭২ ঘণ্টা কোনো রকমে কাটল। তারপর কারফিউ উঠে গেলে সে আরেক দৃশ্য। রাজধানী ঢাকা থেকে মানুষ পালাতে লাগল। পিল পিল করে পিঁপড়ার সারির মতো লোক চলেছে অবিরাম। ছোট ছোট ছেলেমেয়ে কোলে কাঁধে। পোঁটলা পুঁটলি মাথায় নিয়ে যে যে পথে পারছে ঢাকা ছেড়ে যাচ্ছে। আমরা বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখি আর আফসোস করি, হায় কাছাকাছি আমাদের কেউ নেই। আমার বাবার বাড়ি সেই সুদূর সাতক্ষীরায়। অসহযোগ আন্দোলনে তখন গাড়ি ট্রেন সব বন্ধ। আমার বড় মেয়ে সে তখন ইডেন বিশ^বিদ্যালয়ের ডিগ্রি প্রথম বর্ষের ছাত্রী। সে ভয়ে কাঁদতে আরম্ভ করল। সান্ত্বনা দেই ভয় কী মা, আল্লাহ আমাদের রক্ষা করবেন, তিনিই একমাত্র ভরসা, ভয় করো না। বিজি প্রেস কোয়ার্টারে আমাদের আশপাশে যারা ছিল তারাও চলে গেল। আমাদের তাদের সঙ্গে যাওয়ার জন্য অনেক করে বলল। তাদের বাড়ি ঢাকার কাছাকাছি। আমার স্বামী বারবার সবার অনুরোধ না করে দিয়েছেন, বলেছেন না আমরা কোথাও যাবো না। যদি বেঁচে থাকি সবাই একসাথে বাঁচব, মরি সবাই একসাথে মরব। যাদের সঙ্গে যাবো তাদেরও দুর্দিন। তার ওপর বিব্রত হতে চাই না। ভয় নেই আল্লাহ আছেন। আর আমরা সরকারি ফ্ল্যাটে থাকি। আমরা সরকারের কর্মচারী। সরকার আমাদের ওপর অত্যাচার করলে সরকার নিজেই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সত্যিই তাই, ঢাকায় যতগুলো সরকারি কোয়ার্টার ছিল কোনোটাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। কিন্তু ভয়ে কেউ থাকেনি। কাছাকাছি যাদের বাড়ি আছে তারা সবাই চলে গিয়েছিল। যেমন মুন্সীগঞ্জ, নরসিংদী, বুড়িগঙ্গার ওপারে যেসব গ্রাম, আমাদের ফ্ল্যাটে চারতলায় প্রতি তলায় পাঁচটি পরিবার মোট ২০০ পরিবার, তার মধ্যে মাত্র চারটি পরিবার ছিলাম। প্রতি তলায় একজন করে। আমার মতো কারো বাড়ি কাছাকাছি কেউ নেই। কেউ অসুস্থ। এমনি করে অন্য ফ্ল্যাটগুলোতেও একই অবস্থা। ৭২ ঘণ্টা কারফিউ উঠে গেলে আমার ছেলেসহ অন্য ছেলেরা ছুটে বেরিয়ে পড়ল শহরের অবস্থা দেখার জন্য। তারা ফিরে এসে অশ্রুসজল চোখে দেখে আশা দৃশ্য বর্ণনা করল। তাদের বর্ণনা দেয়া আমার সাধ্য নয়। কত মানুষ যে পাকসেনারা মেরেছে তা এক আল্লাহ জানেন। সব সাধারণ গরিব বস্তিবাসী, রিকশাওয়ালা, পথচারী, ঢাকার শাঁখারীপট্টি ছিল হিন্দুপ্রধান এলাকা ও ব্যবসায়ী। শুনেছি সেই রাতে কামান দিয়ে সেই মহল্লা ধ্বংস করে দিয়েছিল। তার পরের এক মাস রাতে ঘুম হারাম হয়ে গিয়েছিল। শুধু ভয় কখন কার ওপর মুসিবত আসে। চার দিক থেকে নানা রকম খবর আসে, নানা বিভীষিকাময়। এর মধ্যে এপ্রিল মাসের ৪ তারিখে মনে হয়, হঠাৎ একদিন দেখি এক খানা ভাড়াটে ট্যাক্সি এসে বাসার সামনে থামল। অবাক হয়ে দেখছি কী ব্যাপার। ওমা দেখি আমার এক ননদের মেয়ে তার বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে জামাতাসহ গাড়ি থেকে নামছে। জানতাম ও মিরপুরে থাকত। তাড়াতাড়ি ছুটে গেলাম, বাসায় ঢুকে একটু শান্ত হয়ে তাদের খবর জানলাম। ননদের মেয়েকে সবাই ডাকে কচি বলে। সে বলল, আমি তিন দিন এক বিহারির বাড়িতে লুকিয়ে তার পর সেই বিহারি ভদ্রলোক অনেক কষ্টে ভয়ে লুকিয়ে তার বাড়ি থেকে আমাদের বের করতে পেরেছে। ঢাকায় আর কার কাছে যাবো, তাই আপনার কাছেই এসেছি। তিন দিন আগের সেই সকালে আটা-রুটি মাখা ছিল নাশতার জন্য, সেই রুটি আর খাওয়া হয়নি। বিহারিরা ওই এলাকা আক্রমণ করলে ভয়ে ছোট ছেলেরা কান্নাকাটি আরম্ভ করল। আল্লাহর অসীম রহমতে সেই বিহারির শত্রুর মধ্যে একজন বিহারি মহৎ বলতে হবে তাকে। তিনি আমার পাশের ফ্ল্যাটে থাকতেন। তিনি ছুটে এসে আমাদের নিয়ে তার বাসায় একটা ঘরে আশ্রয় দিলেন। অন্য বিহারিরা এসে তাকে প্রশ্ন করল, এই বাসায় যে বাঙ্গালি ছিল তারা কোথায় গেল। তিনি অবলীলায় মিথ্যা বলে দিলেন জানি না। মিরপুরে বহু লোক বিহারিদের হাতে নিহত হয়। আমার সেই ভাগ্নি আসন্ন প্রসবা ছিল, উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় তার অবস্থা কাহিল। সেই তিন দিন আগের আটা মাখা হাত ভালো করে ধোয়াও হয়নি। গোসল নেই ঘুম নেই এক কাপড়ে খালি হাতে শুধু প্রাণ হাতে করে এসেছে। আল্লাহ আর যাই হোক আমাদের ওপর অবিচার করতে পারেন না। আমার এখানে আসার ১৫ দিন পর তার এক পুত্রসন্তান জন্ম হয়। তাকে আবার সেই আজিমপুর ম্যাটারনিটি হাসপাতালে নিয়ে যাই, সেখানে তার সন্তান জন্ম হয়। দুটো মেয়ে নিয়ে জামাই মেয়ে দু’জন তার পর কচির ছোট ভাই একজন, সে করাচিতে চাকরি করত, সে চলে এসে বোনের কাছে ছিল। এই পাঁচজন লোক বিছানা নেই বালিশ নেই পরনের কাপড় নেই। কী অবস্থা তাদের। সঙ্গে শুরু হলো আমার ও তাদের কী পরাবো, কোথায় এত মানুষের থাকার জায়গা দেবো। দুই রুমের ঘর, আমার বড় ছোট ছেলেমেয়ে। সে এক নিদারুণ অবস্থা মানুষের গেছে। শুধু আমার নয়, বহু মানুষের। তিন মাস আমার এখানে থেকে পরে একটু ঢাকার অবস্থা স্থিতি হলে তার পর অন্যখানে বাসা ভাড়া করে চলে যায়। সেই ১৯৭১ সালের স্বাধীনতাযুদ্ধে মানুষের মধ্যে এমন একটা অনুভূতি দেখেছি যে সঙ্কল্প ও দৃঢ়তা নিয়ে মানুষ দেশ স্বাধীন করেছিল, আজ আর তা দেখি না। কারণ কী? এখন এ দেশটাকে নিয়ে নিজেরাই কাড়াকাড়ি মারামারি করে। তাকে গড়ে তোলা, সবাই মিলেমিশে দেশটাকে সুন্দর শক্তিশালী করার যে প্রয়োজন, তা আর কারোর মনে নেই। হ