কবি রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘স্বাধীনতাহীনতায় কে বাঁচিতে চায় হে, কে বাঁচিতে চায়। দাসত্ব শৃঙ্খল আজি কে পরিবে পায় হে, কে পরিবে পায়।’ ব্রিটিশ আগ্রাসনের প্রেক্ষাপটে বাঙালির স্বাধিকার চেতনায় অনুরূপ উচ্চারণ বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। স্বাধীনতা উদ্ধারের জন্য ভারতীয়রা মরিয়া হয়ে ওঠে। একের পর এক আন্দোলন-সংগ্রাম, বিক্ষোভ-বিদ্রোহ, অসহযোগ-হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হতে থাকে। অতঃপর শত-সহস্র নিপীড়ন-নির্যাতন, জেল-জুলুম, হত্যা-গুম, নির্বাসন-অপহরণ ইত্যাদি পেরিয়ে স্বাধীনতা অর্জিত হয়। তারপর দীর্ঘ পথপরিক্রমা পেরিয়ে পাকিস্তান বাংলাদেশ সৃষ্টির ইতিহাস আমরা সবাই কমবেশি জানি। স্বাধীনতা হচ্ছে একটা জাতিগোষ্ঠীর মৌলিক স্বত্ব অধিকারের চাওয়া-পাওয়া। নিজের মতো করে নিজের মধ্যে পরিপূর্ণভাবে বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা। ধর্ম-কর্ম, শিক্ষা-দীক্ষা, অন্ন-বস্ত্র, বাসস্থান-চিকিৎসা ইত্যাদি ব্যাপারে একটা অবাধ স্বতঃস্ফূর্ততা বাঞ্ছনীয়। মূলত স্বাধীনতার সংজ্ঞা নিয়েও তর্কবিতর্কের কোনো সীমা-পরিসীমা নেই। তবে যুগে যুগে অন্যায়-অবিচার, শোষণ-অত্যাচার জেঁকে বসলেই মানুষ আপন অধিকার প্রতিষ্ঠায় সোচ্চার হয়ে ওঠে। অর্থাৎ, এ ক্ষেত্রে মানুষ আপন অধিকারের কিছু মৌলিক প্রশ্নে আপস করতে রাজি নয়। এ জন্য তারা যেকোনো ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত। প্রাচীন ও মধ্যযুগব্যাপী আমরা মানুষের এই মুক্তিসংগ্রামের চিত্র প্রত্যক্ষ করি।
আজ থেকে দেড় হাজার বছর আগে চর্যাপদের এক কবি বলেন, ‘নিতি নিতি সিআলা সিহে সমজুঝইÑ অর্থাৎ, প্রতিদিন শৃগাল ও সিংহ যুদ্ধ করে। এ হচ্ছে শোষক-শোষিতের চিরায়ত দ্বন্দ্ব সঙ্ঘাতের চিত্র। যা অনাদিকাল থেকে মানব সমাজে অব্যাহত রয়েছে। আর এরই রোষানলে প্রাণ বিসর্জন দিয়েছেন সক্রেটিস, যিশু, ক্ষুদিরাম, তিতুমীরসহ অনেক আদর্শিক ব্যক্তিপুরুষ। অতঃপর মানবমুক্তির সর্বময় জয়জয়কার ঘোষণার মধ্য দিয়ে এলো আধুনিক যুগ। ফরাসি বিপ্লবের সর্বপ্লাবী চেতনার প্রণোদনা দারুণভাবে উদ্দীপক হিসেবে কাজ করেছে। এর মধ্যে ব্যক্তিচেতনা, দেশপ্রেম, নারী স্বাধীনতা, মূল্যবোধ, ইতিহাসচর্চা, ঐতিহ্যবোধ, মানবিকতা ইত্যাকার বোধবুদ্ধি লুকিয়ে আছে। মূলত মানুষের সর্বময় মুক্তিবার্তা নিয়েই আধুনিকতার যাত্রাপথ সূচিত হয়। কিন্তু তবুও আমরা প্রতিনিয়ত স্বাধীনতা-প্রশ্নে থমকে দাঁড়িয়েছি। যা আজো নির্মমভাবে অব্যাহত রয়েছে। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে আমরা একটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছি। এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু কথায় আছে, স্বাধীনতা অর্জনের চেয়ে রক্ষা করা কঠিন। আমাদের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে এখনো অনেক সাম্রাজ্যিক ষড়যন্ত্র অব্যাহত রয়েছে। যথাযথভাবে স্বাধীনতার চর্চা-অনুশীলন না থাকলে তা যেকোনো সময় মুখ থুবড়ে পড়তে পারে। বরং সব সময় এ ব্যাপারে সতর্ক থাকা দরকার। প্রতিনিয়ত সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ, মাদক বিস্তার, দেশদ্রোহিতা ইত্যাকার পরিস্থিতি আমাদের ক্রমে অস্থিতিশীল করে চলেছে। এ ব্যাপারে অধিকতর মনোযোগী হওয়া প্রয়োজন। বিশেষত, শিক্ষা, বিচারব্যবস্থা, চিকিৎসাপদ্ধতি, বাক-স্বাধীনতা, গণতন্ত্র, ইতিহাসচেতনা, ঐতিহ্যবোধ, মূল্যবোধÑ স্বাধীনতার মৌল ভিত্তি হিসেবে পরিগণিত। এর মধ্যে শিক্ষা হচ্ছে মূলীভূত প্রাণদায়িনী শক্তি। এর অভাবে কখনো একটি জাতিসম্প্রদায় স্বাধীনতার সুফল ভোগ করতে পারে না। এর মধ্য দিয়েই জাতির সংহত-সহাবস্থান সম্ভবপর হয়ে ওঠে।
এ শিক্ষা নিয়ে যুগে যুগে ষড়ন্ত্রের কোনো শেষ নেই। ভারতবর্ষে সেই অনাদিকাল থেকেই এর প্রকোপ লক্ষণীয় এবং এরই ধারাবাহিকতা শত-সহস্র বছরব্যাপী বিদ্যমান রয়েছে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশেও। এই অশুভ তৎপরতা থেকে আমরা মুক্ত হতে পারিনি। হাজার বছরের পুঞ্জীভূত সমস্যার বোঝা এখনো আমাদের বয়ে বেড়াতে হচ্ছে।
স্বাধীনতার প্রায় অর্ধশত বছর পেরিয়ে গেলেও আজ পর্যন্ত একটি অভিন্ন জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন করা সম্ভব হয়নি। ক্রমে মতদ্বৈতার রেষারেষি আমাদের সিদ্ধান্তহীনতার চোরাবালিতে খামচে ধরে। এ ব্যাপারে দল-মতের ঊর্ধ্বে উঠে জাতীয় স্বার্থসংহতি সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। নইলে অস্তিত্ববিনাশী নানারকম রাহুগ্রাস আমাদের পেয়ে বসবেÑ এতে কোনো সন্দেহ নেই। শিক্ষা মূলত হৃদয়গত ও মস্তিষ্কপ্রসূত সমন্বয়ের মধ্য দিয়ে অর্জিত হয়ে থাকে। একটির অভাবে অন্যটি বরাবরই অসম্পূর্ণ থেকে যায়। অর্থাৎ, এর সুষম সমন্বয় বা সুগভীর মেলবন্ধন ছাড়া প্রকৃত শিক্ষা অর্জন সম্ভব নয়।
একদিকে আছে মস্তিষ্কপ্রসূত তথ্যপ্রযুক্তি, কারিগরি, ব্যবহারিক ও অন্য দিকে রয়েছে মানবিক শিক্ষার প্রয়োগ অর্জন। মানবিক শিক্ষার মধ্যে কলাবিদ্যা, সংস্কৃতিচর্চা, নান্দনিক বোধবুদ্ধি মননশীল উৎকর্ষ ইত্যাকার প্রয়াস পদক্ষেপ। এর মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীর মানবিক বোধবুদ্ধির বিকাশ ঘটে থাকে। একটা পরিশীলিত মনস্বিতা নিয়ে সে বেড়ে ওঠে। দয়া-মায়া, স্নেহ-প্রেম, ঔচিত্য মূল্যবোধ তার অঙ্গভূষণ হয়ে দাঁড়ায়। নিবিড় মমত্ববোধ এ শিক্ষার মধ্যে একটা বলয় তৈরি করে দেয়। ফলে একটা মানবিক পৃথিবী রচনা করা সম্ভবপর হয়। এর অভাব ঘটলেই নির্মম পাশবিকতা প্রতিনিয়ত দৈত্যের মতো হানা দিয়ে বেড়ায়। মানুষ হয়েও হিংস্রতায় যাবতীয় পাশবিকতাকে হার মানায়। কোনো রকম অনুশোচনা, মানবিকতা বা পাপবোধের কোনো বালাই নেই। এতে করে আমাদের যাবতীয় অর্জন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হতে বাধ্য। সাম্প্রতিক সমাজের যত্রতত্র অনুরূপ দৃশ্যপট চোখে পড়ে। এর ফলে আমাদের অস্তিত্বই হুমকির দ্বারপ্রান্তে এসে পৌঁছেছে। জঙ্গিবাদের সাম্প্রতিক কিছু কর্মকাণ্ড প্রত্যক্ষ করে তা খুব সহজেই অনুমান করা যায়। হলি আর্টিজান, শোলাকিয়া হামলাসহ সম্প্রতি নিউজিল্যান্ডের মসজিদে মুসল্লিদের ওপর আক্রমণ আমাদের স্তম্ভিত করে দেয়। মানুষের আচার আচরণ যেকোনো হিংস্রতম পাশবিকতাকে ছড়িয়ে যাচ্ছে।
এ ছাড়া মিয়ানমারে মানুষ হত্যার দৃশ্যচিত্র অবলোকন করে মানুষ বাকরুদ্ধ হয়ে পড়ে। পৃথিবীর ইতিহাসে এমন নিষ্ঠুর হত্যাযজ্ঞ সংঘটিত হয়েছে বলে আমাদের জানা নেই। এ রকম আরো অজস্র, উদাহরণ উদ্ধৃত করা সম্ভব। তবে এর উৎস ও কার্যকারণ নিয়ে আমাদের অচিরেই ভাবতে হবে। নইলে মারাত্মক আকার ধারণ করতে বাধ্য। মানুষ হত্যা যেন এখন খেলাধুলায় পরিণত হয়ে গেছে। এ ছাড়া মাদকাসক্তির ভয়ঙ্কর ছোবল এখন তৃণমূল পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। দেশের একেবারে প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত এর বিষবাষ্পে আর্তনাদ করছে। একেবারে মহামারীর মতো আমাদের ঘিরে ফেলেছে। মনে হচ্ছে, দেখার কেউ নেই। আমার সন্তানেরা ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে। বাবা-মায়ের লালিত স্বপ্নের শেষ নির্যাসটুকু হারিয়ে যাচ্ছে। এর সাথে আমাদের জাতিগত স্বপ্নাকাক্সক্ষার প্রদীপটুকুও নিভে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। এ অবস্থার অবসানকল্পে পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি। নইলে আমাদের রক্ষা করার আর কেউ অবশিষ্ট থাকবে না।
স্বাধীনতার ভাবনা প্রসঙ্গে এ রকম অজস্র অনাচার অসঙ্গতির কথা এমনিতেই এসে যায়। এ নিয়ে দেশের সচেতন মহল, পণ্ডিতবর্গ, মনোবিজ্ঞানী, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষসহ সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। এমন অবস্থায় কোনোক্রমেই আমাদের বসে থাকার সুযোগ নেই। কারণ, এর সর্বনাশা ছোবল থেকে কারোরই রেহাই পাওয়ার সুযোগ আছে বলে জানা নেই। ফলে সেখানে আমাদের সমূহ অস্তিত্বের সবটুকুই বিলীন হতে বাধ্য। এ অবস্থায় স্বাধীনতার স্বপ্নসুখ ও ভাবনাবিলাস কতটুকুÑ তা খুব সহজেই অনুমান করা যায়। কিন্তু এখান থেকে আমাদের এগোতেই হবে। এগোতে হবে সুস্থতা ও সুন্দরকে ধারণ করে। তবেই স্বাধীনতা হবে অর্থবহ। হ
কবি রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘স্বাধীনতাহীনতায় কে বাঁচিতে চায় হে, কে বাঁচিতে চায়। দাসত্ব শৃঙ্খল আজি কে পরিবে পায় হে, কে পরিবে পায়।’ ব্রিটিশ আগ্রাসনের প্রেক্ষাপটে...
