শিক্ষার মূল ভিত্তি প্রাথমিক শিক্ষা হলে, মাধ্যমিক শিক্ষা হচ্ছে তার মেরুদণ্ড। আর এই মেরুদণ্ডের অবস্থা নড়বড়ে। যার পরিপ্রেক্ষিতে দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো যোগ্য শিক্ষার্থী পাচ্ছে না। এর একমাত্র কারণ, দেশের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে মানসম্পন্ন শিক্ষা ব্যবস্থাপনা ও কারিকুলাম সঙ্কট। এ অভাব কাটিয়ে উঠতে নীতি-নির্ধারক এবং মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষার নিয়ন্ত্রকরা সক্রিয় ও সচেতন নন। সবাই দায়সারাভাবে পরিস্থিতি ও সময় অতিবাহিত করছেন। ফলে মোটা দাগে মারাত্মক ক্ষতি ও সর্বনাশের মুখে পড়ছে দেশের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা স্তর। মারাত্মক ক্ষতের সৃষ্টি হচ্ছে দেশের শিক্ষার।
দীর্ঘস্থায়ী বহুবিধ সমস্যা আর নানাবিধ সঙ্কটের কবলে দেশের মাধ্যামিক ও উচ্চ শিক্ষা স্তর। মেধাবী শিক্ষকের অভাব, প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণের ঘাটতি, পর্যাপ্ত অবকাঠামোর অভাব, স্বল্প বেতন ইত্যাদি সমস্যার কবলে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষাব্যবস্থা। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, মাধ্যমিক পর্যায়ে ৭৬ শতাংশ শিক্ষক সৃজনশীল প্রশ্নপত্র তৈরির সময় গাইড ব্যবহার করেন। শিক্ষার্থীরা শুধু পুঁথিগত বিদ্যায় বেড়ে উঠছে। দেখা যাচ্ছে, ডবল জিপিএ ৫ পেয়েও অনেকেই উচ্চশিক্ষার সুযোগ পাচ্ছে না। বেশির ভাগ শিক্ষার্থীই এখন বেড়ে উঠছে নোট-গাইডের ওপর নির্ভর করে।
সম্প্রতি বিশ্বব্যাংক দেশের প্রাথমিক শিক্ষার মান ও এর হাল-হকিকত সম্পর্কে যা বলেছে তা আশঙ্কাজনক ও ভয়াবহ। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের যা শেখানো হচ্ছে তা পর্যাপ্ত নয় এবং গুণগত মান ভালো নয়। দেশের প্রাথমিক শিক্ষা স্তরের তৃতীয় শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের মধ্যে মাত্র ৩৫ শতাংশ শিক্ষার্থী বাংলা পড়তে পারে। তাও এদের পড়ার মান খুব খারাপ। অর্থাৎ ৬৫ শতাংশ শিক্ষার্থী বাংলাই পড়তে পারেন না।’... অন্য বিষয়গুলো যেমন ইংরেজি-গণিত সম্পর্কে সেখানে কোনো পর্যালোচনা ছিল না। এ হচ্ছে দেশের প্রাথমিক শিক্ষার চিত্র। অথচ প্রাথমিক শিক্ষা খাতে সরকার রাজস্ব তহবিল থেকে এবং বিশ্বব্যাংকসহ অন্যান্য দাতা সংস্থা থেকে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করা হচ্ছে। সে তুলনায় দেশের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা খাতে সরকারের বিনিয়োগ খুবই নগণ্য। মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার মান উন্নয়নে একমাত্র বিশ্বব্যাংক কয়েকটি প্রকল্পে কিছু বিনিয়োগ করে থাকে। তবে এখন পর্যন্ত তারা এ খাত সম্পর্কে কোনো পর্যবেক্ষণ দেয়নি। তবে, তাদের অর্থায়নকৃত প্রকল্পে নানা অনিয়ম সম্পর্কে বেশ কিছু অভিযোগ ছিল।
মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষার কারিকুলাম নির্ধারণ করে সরকার। এ কারিকুলাম নিয়ে নানা বিতর্কের পরও এটি কতটুকু মেধার বিকাশ ঘটায় তা নিয়ে ভাবনার অবকাশ রয়েছে। শিক্ষার্থীদের ওপর চাপিয়ে দেয়া এ কারিকুলাম তার বা তাদের পরবর্তী শিক্ষাজীবনে বা বাস্তব জীবনে এটি কতটুকু কাজে লাগছে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে গত ৮-১০ বছর আগে চালু করা সৃজনশীল পদ্ধতি। সৃজনশীল পদ্বতি কী? তা শিক্ষকরাই বোঝেন না। শিক্ষার্থীদের মুখস্থ বিদ্যা ও নোট-গাইড থেকে বের করে আনতে সৃজনশীল পদ্ধতি চালু হলেও দুঃখজনক সত্য, শিক্ষকরাই এখন নোট-গাইডনির্ভর হয়ে পড়েছেন। তারা পাঠদান এবং পরীক্ষার প্রশ্ন করেন নোট-গাইড দেখে।
দেশের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষাব্যবস্থা মূলত পরিচালিত ও নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে বেসরকারি ব্যবস্থাপনায়। সরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হচ্ছে মাত্র তিন থেকে পাঁচ শতাংশ। বেসরকারি উদ্যোগে পরিচালিত প্রায় ৭৫ শতাংশ শিক্ষাব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ ও পরিদর্শন এবং কিছু খবরদারির মধ্যেই সরকার বা শিক্ষা মন্ত্রণালয় দায়িত্ব শেষ করছে। এটি আদৌ কাম্য নয়।
প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের সব শিক্ষার্থীকে বিনামূল্যে পাঠ্যবই সরবরাহকে সরকারের বড় অর্জন ও সাফল্য হিসেবে চিহ্নিত করলেই দায়িত্ব এড়ানো যাবে না। সরকার ও নীতিনির্ধারকদের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষার ব্যাপারে আরো গভীর মনোযোগী এবং প্রো-অ্যাকটিভ হতে হবে। সরকার গত এক বছরে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের কয়েক শতাধিক স্কুল-কলেজ সরকারিকরণের ঘোষণা দিয়েছে। এতেই সমস্যার সমাধান হবে না। শিক্ষার মান বাড়াতে এটি কিছুটা ভূমিকা রাখলেও পুরোপুরি নয়। যে যোগ্যতা-নীতিমালা ভিত্তিতে সরকারিকরণের পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছিল, তা-ও পুরোপুরি মানা হচ্ছে না। সরকারিকরণের ক্ষেত্রে তদবির-রাজনৈতিক বিবেচনাকে প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে, এটি কাম্য নয়। শিক্ষা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বিবেচনার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক মতাদর্শ বা রাজনৈতিক পছন্দ-অপছন্দ বিবেচনায় নেয়া দূরদর্শী সিদ্ধান্ত হতে পারে না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কোনো একক শ্রেণী-গোষ্ঠী-মতাদর্শের সন্তানরা পাঠ গ্রহণ করেন না। দেশে এখনো হাজার হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে, যার শিক্ষকরা নিয়মিত বেতন পান না। শিক্ষক যারা রয়েছেন, তারা প্রশিক্ষিত ও মানসম্পন্নও নন। অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোও নেই। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্বীকৃতি-অনুমোদন দিয়েই যেন শিক্ষা বোর্ডগুলো দায়িত্ব শেষ করে। এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। যেসব শর্ত ও নীতিমালা অনুসরণ করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অনুমোদন দেয়া হয়, তা প্রতিপালন হচ্ছে কি না, তা দেখভাল করার যেন কেউ নেই। মাধ্যমিক স্তরে সরকারি-বেসরকারি সব স্কুলেই বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক নেই। সবখানেই ইংরেজি-বিজ্ঞান-গণিতের শিক্ষকের অভাব প্রকট। ফলে বাংলার শিক্ষক সমাজবিজ্ঞান ও পড়াচ্ছেন। ধর্মের শিক্ষক গণিতের ক্লাসে পাঠদানে বাধ্য হচ্ছেন। এরূপ চিত্র অহরহ। উচ্চ মাধ্যমিক বা কলেজ পর্যায়ের অবস্থা আরো করুণ ও ভয়াবহ।
উচ্চ মাধ্যমিক কলেজগুলোতে লাখ লাখ শিক্ষার্থীর জন্য দুই বছরের যে কারিকুলাম নির্ধারিত রয়েছে, তা কোনো অবস্থায়ই কলেজ পর্যায়ে পাঠদান সম্পন্ন করতে পারে না। ফলে শিক্ষার্থীদের কোচিং নির্ভর হতে হচ্ছে। এখানেই একই সঙ্কট বিদ্যমান, মানসম্পন্ন শিক্ষকের। মেধাবীদের কেউই স্কুল বা কলেজ পর্যায়ের শিক্ষকতায় আগ্রহী হন না। কারণ বেসরকারি পর্যায়ের প্রতিষ্ঠানে পেশার প্রতি সুবিচার করে চাহিদামতো বেতনভাতা দেয়া হয় না। সরকারি পর্যায়ের কলেজ শিক্ষকরা পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (পিএসসির) অধীনে মেধার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে চাকরিতে যোগ দিলেও, সময়মতো পদোন্নতির নানা জটিলতায় একই পদে বছরের পর বছর পড়ে থাকতে হচ্ছে। ফলে আগ্রহী হলেও মেধাবীরা এ পেশায় আসতে নারাজ। ফলে সরকারি-বেসরকারি সব পর্যায়েই স্বল্প মেধাবীরাই শিক্ষাকতায় আসছেন। সরকারি পর্যায়ের শিক্ষকদের কিছুটা প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা থাকলেও, বেসরকারি স্কুল-কলেজ শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের ন্যূনতম কোনো সুযোগ নেই। ফলে মানসম্পন্ন শিক্ষকের হাহাকার থেকেই যাচ্ছে। মানসম্পন্ন শিক্ষক না থাকায় মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করাও অনেকাংশেই দুরূহ হয়ে পড়েছে। অপর দিকে বেসরকারি শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে রয়েছে নানা ধরনের জটিলতা, অনিয়ম, অব্যবস্থাপনাও স্বেচ্ছাচারিতা। এ সবের অবসানে সরকারকে মূলত শিক্ষা মন্ত্রণালয়কেই প্রো-অ্যাকটিভ হতে হবে।
সম্প্রতি সরকার বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগে বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষের (এনটিআরসিএ) সনদ বাধ্যতামূলক করলেও শুরুতেই তা বাধার মুখে পড়েছে। মেধার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েও বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকরা কলেজের চাকরিতে যোগ দিতে গিয়ে নানা জটিলতা এবং প্রতিষ্ঠানের চাঁদাবাজির মুখে পড়েছে। এ ছাড়া গত ১৪টি নিবন্ধন পরীক্ষায় মেধার যাচাইয়ে উত্তীর্ণ হয়েও লাখ লাখ শিক্ষক হতে আগ্রহী বেকার জীবন যাপন করছে। তাদের পদায়ন ও চাকরির নিশ্চয়তা দিতে পারছে না শিক্ষা মন্ত্রণালয়। অথচ এসব বেকার শিক্ষক হতে আগ্রহীর কাছ থেকে নিবন্ধন ও প্রত্যয়নে লাখ লাখ টাকা পরীক্ষা ও নিবন্ধনের নামে হাতিয়ে নিয়েছে সরকারি প্রতিষ্ঠান এনটিআরসিএ।
এ সব নানা প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে উঠে মানসম্পন্ন মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে হলে নীতিনির্ধারকদের দূরদৃষ্টিসম্পন্ন এবং দীর্ঘ মেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। শুধু উপরিভাগে প্রলেপ দিয়ে এসব সমস্যার সমাধান হবে না।
মানসম্পন্ন মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে সর্বাগ্রে প্রয়োজন মানসম্পন্ন শিক্ষক। মানসম্পন্ন এবং চাহিদার উপযোগী কারিকুলাম প্রণয়ন। মেধাবীদের শিক্ষকতা পেশার প্রতি আগ্রহী করে তোলা। তাদের বেতন-ভাতার নিশ্চয়তা এবং এর মাধ্যমে সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করা। দীর্ঘ মেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে মানসম্পন্ন শিক্ষক নিয়োগ এবং কারিকুলামে ব্যাপক পরিবর্তন করতে হবে। সব রাজনৈতিক বিতর্ক ও বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে চাহিদা এবং শিক্ষার্থীদের সক্ষমতাকে বিবেচনায় নিয়ে কারিকুলাম প্রণয়ন করতে হবে। পাশাপাশি নৈতিকতা ও দেশপ্রেম ও স্বাধীনতার চেতনাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে কারিকুলামকে ঢেলে সাজাতে হবে।
লেখক : সিনিয়র রিপোর্টার, নয়া দিগন্ত
শিক্ষার মূল ভিত্তি প্রাথমিক শিক্ষা হলে, মাধ্যমিক শিক্ষা হচ্ছে তার মেরুদণ্ড। আর এই মেরুদণ্ডের অবস্থা নড়বড়ে। যার পরিপ্রেক্ষিতে দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো যোগ্য শিক্ষার্থী পাচ্ছে না।...
