১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি একটি স্বপ্নের ঠিকানা দিয়ে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশ হবে একটি আদর্শ রাষ্ট্র।’ উপরন্তু তার আরেকটি স্বপ্ন বহুল উচ্চারিত, ‘সোনার বাংলা’। অর্থাৎ আমাদের পথের ঠিকানায় আছে দুটি গন্তব্যÑ আদর্শ রাষ্ট্র ও সোনার বাংলা। এ দু’টো স্বপ্ন রূপায়িত হলেই বাংলাদেশ অবশ্যই একটি মানবিক রাষ্ট্রে পরিণত হতো।
আজ এতদিন পর দেখি, আমাদের স্বপ্ন অপরিবর্তিতই আছে। কিন্তু স্বপ্ন রূপায়ণের প্রয়াস প্রশ্নবিদ্ধ এবং নানাভাবে সীমিত। আমার মনে হয়, মানবিক রাষ্ট্র সৃষ্টিতে নেতৃত্বের অবদান সবচেয়ে বেশি। নেতৃত্বের গণসম্পৃক্ততা এবং গণআদর্শভিত্তিক দূরদর্শী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমেই এমন একটি রাষ্ট্রের পথে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব। কিন্তু আমাদের সমস্যা হচ্ছে, এমন দর্শন ও দূরদর্শিতার অভাব। এর ফলে নজরকাড়া প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও কাক্সিক্ষত উন্নয়ন এখনো সুদূর পরাহত। কারণ আমাদের সমাজে ধনবৈষম্য বিরাজমান ও ক্রমবর্ধমান, যা নিরসনে সরকারের আদর্শ ও দর্শনভিত্তিক কোনো পদক্ষেপ নেই। একটি বৈষম্যপূর্ণ সমাজের ভিত্তিতে মানবিক রাষ্ট্রের কাঠামো নির্মাণ অসম্ভব ও অযৌক্তিক।
গত ১০ বছরের বেশি সময়ের মধ্যে শিক্ষার গাণিতিক ব্যাপ্তি ঘটেছে। পাসের হার বেড়েছে, কিন্তু শিক্ষিতের হার কমেছে। শিক্ষাব্যবস্থাপনার সাথে যারা সম্পৃক্ত, তাদের শিক্ষা সম্পর্কে মৌলিক কোনো ধারণা নেই। সত্যি বলতে কি, আমি দেশের বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার চালচিত্র ও ভবিষ্যৎ নিয়ে দারুণ শঙ্কিত। কারণ শিক্ষা ধসে গেলে বৈষয়িক প্রবৃদ্ধি ও উন্নতি অর্থহীন হয়ে পড়ে। আমার মনে হয় না শিক্ষাসম্পৃক্ত নীতি-নির্ধারকরা আমাদের শিক্ষার গলদ ও সঙ্কট সম্পর্কে সচেতন ও অবহিত। শিক্ষাব্যবস্থাপনায় ও শিক্ষার উপাদানে আমূল সংস্কার না করলে সামনে ভয়াবহ দিন অপেক্ষা করছে। লক্ষণীয়, পাসের ক্রমবর্ধমান হার শিক্ষার গুণগত মান নির্ধারণের সূচক নয়। তারপরও কথা আছে, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় কৃত্রিমভাবে ভালো ফলের বিস্ফোরণ ঘটানো হচ্ছে। পাঠ্যপুস্তকের সাম্প্রদায়িকীকরণ হচ্ছে। অবৈজ্ঞানিক ও অযৌক্তিকভাবে কওমি মাদরাসার দাওরায়ে হাদিস ডিগ্রিকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রির সমমান হিসেবে সরকারের স্বীকৃতির ফলে শিক্ষাব্যবস্থা এক দারুণ সঙ্কটে পড়েছে। কিন্তু স্নাতকোত্তর পর্যায়ের ডিগ্রি নিয়েও কওমির শিক্ষার্থীরা চাকরির বাজারে প্রবেশ করতে পারবে? কওমি মাদরাসার যে পাঠ্যক্রম, তা বাংলাদেশের চাকরির বাজারের সম্পূর্ণ অনুপযোগী। সুতরাং সিদ্ধান্তটি এক চরম অবিমিষ্যকারিতা।
বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীদের বর্তমানে হাল-হকিকতও সন্তোষজনক নয়। বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা সরকার ও দল নিরপেক্ষ থেকে দেশ ও জনগণের জন্য হওয়া উচিত। ভালো কাজে সরকারের প্রশংসাও করতে হবে, একই সাথে মন্দ ও বিতর্কিত কাজের জন্য সমালোচনাও করতে হবে। এভাবে সরকারের ত্রুটি ও ভ্রান্তি নির্দেশ করতে হবে। কিন্তু বর্তমানে বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবী দলভিত্তিক বিভাজনের শিকার। ফলে তারা কাক্সিক্ষত ভূমিকা পালন করতে ব্যর্থ হচ্ছেন। সরকারের পক্ষে বা অন্ধ বিরোধিতা কোনোটিই তাদের কাছ থেকে কাম্য নয়।
১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি একটি স্বপ্নের ঠিকানা দিয়ে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশ হবে একটি আদর্শ রাষ্ট্র।’ উপরন্তু তার আরেকটি স্বপ্ন বহুল উচ্চারিত, ‘সোনার বাংলা’। অর্থাৎ আমাদের...
