বাংলাদেশে সৃজনশীল পদ্ধতি মেধা বিকাশে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারছে না। সৃজনশীল পদ্ধতিটা শিক্ষকরা তেমন বোঝেন না, ছাত্রদেরও বোঝাতে পারেন না। পরীক্ষার সময় এটা একটা অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি করে এই জন্য যে, কী প্রশ্ন করবেন তা প্রশ্নকর্তা নিজেও বোঝেন না। ফলে তিনি নোট, গাইডবুকের ওপর নির্ভর করেন। ফলে এই পদ্ধতিতে মেধার সঠিক মূল্যায়ন হচ্ছে না।
সৃজনশীল পদ্ধতি চলবে না। সৃজনশীল কোনো কাজ দিচ্ছে না। মাল্টিপল চয়েসও ঠিক না। বই থেকে সরাসরি প্রশ্ন থাকবে, ছেলেমেয়েরা লিখে জবাব দেবে। এই বিষয় সম্পর্কে সে যা জানে সেটা লিখবে। এর মাধ্যমে তার জ্ঞানের পরিচয় পাওয়া যাবে। তার ভাষাজ্ঞানেরও পরীক্ষা হবে। ভাষাজ্ঞানটাও শিক্ষাব্যবস্থার একটা জরুরি অংশ।
সৃজনশীল পদ্ধতিটা শিক্ষকরাও তেমন বোঝেন না। ছাত্রদেরও বোঝাতে পারেন না। পরীক্ষার সময় এটা একটা অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি করে এই জন্য যে, কী প্রশ্ন করবেন প্রশ্নকর্তা নিজেও তা বোঝেন না। ফলে তিনি গাইডবুক, নোট এগুলোর ওপর নির্ভর করেন। সেখান থেকেই তিনি এই প্রশ্নের ধারণা তৈরি করেন। প্রশ্ন হওয়া উচিত বই থেকে, ছাত্ররা যা পড়েছে। সৃজনশীলের আগে ‘মাল্টিপল চয়েস’ নামে একটা পদ্ধতি ছিল, সেটাও ঠিক ছিল না। ওখানে দেখা যেত একটা ‘টিক’ দিয়েই নম্বর পেয়ে যেত। এর অসুবিধার দিকটা হলো, এটার জন্য তো ওভাবে ঠিকমতো পড়ানোও হয় না।
দ্বিতীয়ত হলো, কেউ বোঝে না। আর তৃতীয়ত হলো, ছাত্ররা নম্বর পাওয়ার ওপরই জোর দেয়, কিভাবে বেশি নম্বর পাওয়া যাবে। বিষয়ের বাইরে গোটা বইটা যে পড়বে, বুঝবে সে ব্যাপারে কোনো আগ্রহই নেই। এখন ছাত্রদের লিখতে উৎসাহিত করতে হবে। যেটা সে বুঝল, সেটা সে সঠিকভাবে লিখতে পারে কিনা। তাহলে বোঝা যাবে সে জানে কি না এবং সে নিজের বোঝাটাকে প্রকাশ করতে পারে কি না। লেখার ওপর জোর দিতে হবে। সে জন্য সৃজনশীল দরকার নেই, মাল্টিপল চয়েসেরও দরকার নেই। সরাসরি প্রশ্ন হওয়া উচিত।
এখন পরীক্ষার ফল প্রকাশ হয় গ্রেডিং পদ্ধতিতে। আগে ছিল বিভাগ। না, এটার খুব প্রয়োজন ছিল বলে আমার মনে হয় না। আগের পদ্ধতিটা যে খারাপ ছিল তা আমার মনে হয় না। এখানে বোঝাও যায় না ছাত্রটার মেধাটা কেমন, অন্যদের মধ্যে তার অবস্থানটা কী। এগুলো খুবই বিভ্রান্তিকর। আগেরটায় সরাসরি নম্বর জানা যেত, কে কতটা ভালো করল বোঝা যেত, আসলে আগেরটাই ঠিক ছিল বলে আমার মনে হয়।
এই যে নতুন পদ্ধতিগুলো আসছে, তাতে কি শিক্ষার্থীদের মেধার সঠিক যাচাই হচ্ছে না। পাশাপাশি মেধার বিকাশে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে না। এখন সব গুরুত্ব হচ্ছে পরীক্ষায় নম্বর পাওয়ার ওপরে। ছাত্ররা ক্লাসরুমে ঠিকমতো পড়ে কি না, শিক্ষকরা ঠিকমতো ক্লাস নিচ্ছে কি না, সময় দিচ্ছেন কি না, শিক্ষকদের কতটা আগ্রহ আছে, তাদের প্রশিক্ষণ আছে কি না এবং তারা মনোযোগ দিয়ে পড়াচ্ছেন কি না এখন এইগুলো দেখা হয় না। শিক্ষক শিক্ষাব্যবস্থার কেন্দ্রে আছেন। শিক্ষক নির্বাচন এখানে খুব ভ্রান্ত পথে হয়, নানান প্রভাবে হয়। যার ফলে অযোগ্য লোকরা এখানে আসেন। এই অযোগ্য লোক আসার ফলে তাদের কোনোরকম প্রশিক্ষণ দেয়া হয় না। যদি শিক্ষক ভালো মতো না পড়ান, তাহলে পরীক্ষা দিয়ে কী হবে, কিসের পরীক্ষা হচ্ছে, ছেলেমেয়েরা তো পড়েইনি। তখন ছেলেমেয়েরা নোট বই, গাইড বইÑ এগুলোর ওপর নির্ভর করে, কোচিং সেন্টারে যায়, তারা মনে করে কোচিং সেন্টারে না গেলে পাস করা যাবে না। শিক্ষার্থীরা কোচিং সেন্টারকে যদি ক্লাসরুমের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে করে তাহলে সেটা শিক্ষাব্যবস্থার জন্য অশনি সঙ্কেত বলেই আমার মনে হয়। এখন ছেলেমেয়েদের তো আর সেভাবে পড়ানো হচ্ছে না, জানার ব্যাপারে উৎসাহিত করা হচ্ছে না। শুধু নম্বর পাওয়ার ব্যাপারে উৎসাহিত করা হচ্ছে। তা ছাড়া সাধারণ জ্ঞানের চর্চাকেও কোনোভাবে উৎসাহিত করা হয় না। সাধারণ জ্ঞানটা যে ক্লাসরুমে বা ক্লাসরুমের বাইরে জানানো হবে, সেটা একেবারে করা হচ্ছে না। এই থেকে বোঝা যাচ্ছে সাধারণ জ্ঞানের স্তরটা নেমে গেছে।
এরা শুধু নম্বর পাওয়ার ব্যাপারে আগ্রহী, অন্য কিছু জানার ব্যাপারে আগ্রহী নয়। অভিভাবকরাও চান, তাদের ছেলেমেয়েরা ভালো নম্বর নিয়ে আসুক। তারা পাঠ্যপুস্তক জানবে বা বাইরের জ্ঞান আহরণ করবে এটা অভিভাবকরা দরকারই মনে করেন না। তারা মনে করেন, গ্রেড কী পেল সেটাই মুখ্য। ভালো গ্রেড পেলে তারা মনে করেন, ছেলেমেয়েরা ভালো করেছে। কিন্তু শিক্ষাব্যবস্থা তো পাঠ্যপুস্তকে সীমাবদ্ধ নয়। তার তো সাধারণ জ্ঞান থাকতে হবে। না হলে একজন মানুষকে আমরা শিক্ষিত বলব কিভাবে? কাজেই আমরা শিক্ষিত মানুষ তৈরি করতে পারছি না বলেই আমি মনে করি।
গত কয়েক বছর ধরে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তি পরীক্ষা নেয়া হবে কিনাÑ এ নিয়েও বিতর্ক চলে আসছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বশেষ ভর্তি পরীক্ষায় মাত্র ৯ শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করেছেন। অন্যরা পাসই করতে পারেনি। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, বিশ্ববিদ্যালয়েও ভর্তি হবে মেধাক্রম অনুযায়ী। আসলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা কেমন হওয়া উচিত? বিশ্ববিদ্যালয়ে মেধাক্রম অনুযায়ী ভর্তি হওয়া উচিত না। এই মেধার উপর তো নির্ভরই করা যাচ্ছে না। শিক্ষার্থীরা যে সমস্ত গ্রেড নিয়ে আসছে, নম্বর নিয়ে আসছে তা তো বিশ্বাসযোগ্য না। বিশ্ববিদ্যালয়কে অবশ্যই ছাত্রদের বাছাই করার স্বাধীনতা দিতে হবে। মান অনুযায়ী ছাত্রদের ভর্তি করবে। সে কারণে পরীক্ষা ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার কোনো সুযোগই নেই বলে আমি মনে করি। কেননা তাহলে তো নির্ভর করতে হবে ওই যান্ত্রিক নম্বরগুলোর ওপরে। এটা তো কোনো নির্ভরযোগ্য উপায় নয়।
প্রথমত দেখতে হবে, উপযুক্ত শিক্ষকের ব্যবস্থা আমরা করতে পারছি কি না। উপযুক্ত শিক্ষক মানে যারা যোগ্য, যাদের আগ্রহ আছে এবং যারা সময় দিতে পারেন। আর সে জন্য শিক্ষকদের দুটো জিনিস নিশ্চিত করতে হবে। একটা হলো তাদের যথোপযুক্ত বেতন-ভাতা দিতে হবে এবং দ্বিতীয়ত সামাজিক যে সম্মান সেটা তাদের দিতে হবে। শিক্ষকদের সামাজিক সম্মান তো কমে গেছে। এর জন্য স্কুল-কলেজ বা যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আছে, সেখানে কী ঘটছে তার একটা জবাবদিহিতা থাকা উচিত।
বিশ্বের প্রায় সব দেশের শ্রেণিকক্ষেই চক আর ব্ল্যাকবোর্ড থাকে। শিক্ষক বা শিক্ষিকা সেই ব্ল্যাকবোর্ডে লিখে শিক্ষার্থীদের বোঝান। শিক্ষার্থীরা বেঞ্চে বসে বসে শোনে। তবে অনেক দেশই এই সাবেকি ব্ল্যাকবোর্ড এবং চক ছেড়ে দিয়েছে। আবার এমন দেশও আছে, যেখানে ছাত্রছাত্রীদের মাথার ওপরে কোনো ছাদ নেই। মাটিতে বসেই লেখাপড়া করতে হয় তাদের।
প্রতিটা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। আর এই জবাবদিহিতা শুধু সরকারিভাবে করা যাবে না, সেটা সামাজিকভাবেও করতে হবে। সামাজিকভাবে করার উপায় হলো, যে পরিচালনা কমিটি আছে, সেই কমিটি যাতে যথোপযুক্তভাবে গঠিত হয়। এতদিন এমপিরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান হতেন। এটা খুবই খারাপ একটা বিষয় ছিল। এটা বাদ হয়েছে, এটা ভালো। এখন দেখতে হবে, প্রকৃত শিক্ষানুরাগীরা ওই কমিটিতে নির্বাচিত হচ্ছেন কি না। টাকার জোরে বা টাকা উপার্জনের জন্য ওই কমিটিতে যাওয়া নিরুৎসাহিত করা উচিত। শিক্ষানুরাগী, সাবেক শিক্ষক, সমাজের যারা শিক্ষিত মানুষ তাদেরই পরিচালনা কমিটিতে আনা উচিত।
এসএসসি ও এইচএসসিতে যে পরীক্ষা পদ্ধতি আছে তা কি সঠিক মনে করছি না। আমার বক্তব্য হলো, এই যে সৃজনশীল পদ্ধতি এটা চলবে না। সৃজনশীল কোনো কাজ দিচ্ছে না। মাল্টিপল চয়েসও আমি পছন্দ করব না। আমি পছন্দ করব এমন পদ্ধতি যেখানে বই থেকে সরাসরি প্রশ্ন থাকবে, ছেলেমেয়েরা লিখে জবাব দেবে। এ বিষয় সম্পর্কে সে যা জানে সেটা লিখবে। এর মাধ্যমে সে তার জ্ঞানের পরিচয় দেবে এবং সে তার জ্ঞানকে প্রকাশ করতে পারছে কি না সেটাও ধরা পড়বে। তার ভাষা জ্ঞানটাও পরীক্ষিত হবে। ভাষা জ্ঞানটাও শিক্ষাব্যবস্থার একটা জরুরি অংশ বলে আমি মনে করি।
