রাইসার পায়ে রশি লাগিয়ে খুঁটির সাথে বেঁধে রাখা হয়েছে। গরুর মতো করে। তিন ফিট পর্যন্ত চলতে পারবে। চুলগুলো এলোমেলো। কিছু খায় না। কাউকে দেখলে ফ্যালফ্যাল করে মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে আর কাঁদে। রাইসা এখন মাথা নিচু করে মাটির দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে দাগ কাটছে আর বিড় বিড় করে কী যেন বলছে। মাঝে মধ্যে চিৎকার করে উঠছেÑ ‘তোকে আমি খুন করে ফেলব।’ ডা: বলেছেন,বড় ধরনের মানসিক আঘাত। সময় লাগবে।
রাইসাদের চার ভাই চার বোনের বিশাল পরিবার হলেও গ্রামের কেউ বুঝতে পারে না যে এ বাড়িতে এত মানুষের বসবাস। চাচাতো ভাইবোন মিলে ২১ জন সদস্যের একান্নবতী পরিবার। আশপাশের ১০ গ্রামের মানুষ রাইসাদের পরিবারকে একটি আদর্শ পরিবার বলে মানে। চাচা বেঁচে নেই। রাইসার বাবা সবাইকে সমান সুযোগ দিয়ে লেখাপড়া করাচ্ছে। সে কৃষক হলেও তার সব ছেলেমেয়ে যেন সোনায় মোড়ানো। রাইসার রতœগর্ভা মা তাদের প্রত্যেকটি ভাই বোনকে গড়ে তুলেছেন আদর্শ মানুষ করে। প্রতিটি ভাই বোন পড়ালেখায় অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন। তিন ভাইবোন বৃত্তি পেয়েছিল ছাত্র জীবনে। সবাই এখন স্ব স্ব স্থানে উজ্জ্বল। আচার আচরণেও সবাই অমায়িক।
সবার ছোট হলে যা হয় আর কি! রাইসা অন্য সাত ভাই বোনের অনেক আদরের। বেশি আদর পেয়ে পেয়ে কিছুটা একরোখা হয়েছে। কারো কোনো অন্যায় দেখলে প্রতিবাদ করে বসে। তার মা তাকে নিয়ে সারাক্ষণ চিন্তা করেন। রাইসা ডিগ্রিতে পড়ে। কলেজে তাকে বুদ্ধিমতি আর প্রতিবাদী বলে সবাই মানে। মা তাকে মাঝে মধ্যে কড়া ভাষায় শাসন করে বলেন, তুই এখন বড় হয়েছিস সেটা কি বুঝিস? মেয়েদের এত রাগ থাকতে নেই। ধৈর্যশীল হতে হয়। না হলে জীবনে অনেক কষ্ট পেতে হয়।
গত বছরের কথা। রোজার ঈদের মধ্যে সব ভাই বোন বাড়িতে একত্র হয়েছে। প্রতি ঈদেই যেন বাড়িতে মিলন মেলা বসে। চার ভাই বোন ঢাকায় সেটেল্ড। বড় দুই বোন বিয়ে হয়েছে পাশের জেলার সম্ভ্রান্ত পরিবারে। রাইসার বড় ভাই ঈদের ২ দিন পর মসজিদ হতে জোহর নামাজ পড়ে এসে তার মাকে বলল, মা রাইসার বিয়ের ব্যাপারে এক পাত্র পক্ষ দেখতে চায়। মা বললেন ও এখন বড় হয়েছে। দিনকাল ভালো না। তুমি আসতে বল। রাইসা তো শুনে যেন তেলে বেগুনে জ্বলে উঠল। লেখাপড়া শেষ না করে আমি ওসব বিয়ে টিয়ে করব না। এ আমার এক কথা হু। মা বুঝিয়ে বললেন দেখলেই যে বিয়ে হয়ে যাবে এমন কোনো কথা নেই। আসতে চেয়েছে আসুক।
ছেলে আসতে পারেনি। ছেলের বাবা বড় ভাই দুলাভাই মিলে ৭-৮ জন এসেছে দেখতে। তাদের বউ দেখে খুব পছন্দ হয়েছে। ছেলে বড় ভাইকে মোবাইলে জানিয়েছে, তোমাদের পছন্দ হলে আমার আর দেখার প্রয়োজন নাই। আংটি পরিয়ে এনগেজমেন্ট করা হয়।
সবার ছোট বোন। এমনি এমনি কী আর বিয়ে হয়? সবাই মিলে মহাধুমধামে বিয়ের আয়োজন করে। পরের শুক্রবার বিয়ে। আশপাশের মানুষকে দাওয়াত করা হয়। পাত্রের চেহারাও মাশা’আল্লাহ দেখার মতো। ওষুধ কোম্পানির বড় চাকুরে। চট্টগ্রামে থাকে। রাইসাকে যেন একেবারে সোনার গহনায় জড়িয়ে দিয়েছে।
দেখতে দেখতে সব যেন খুব দ্রুত করেই হয়ে গেল। বিয়ের তিন দিন পরই রাইসার হাজব্যান্ড চট্টগ্রামে চলে যায়। ওষুধ কোম্পানির অনেক বড় অফিসার। অনেক দায়িত্ব তার। কথা বলারও টাইম নেই। মোবাইলে কথা কম বলে। আর ১০ জনের মতো বউ পাগল না। স্বামীর বাড়িতে রাইসার শ্বশুর শাশুড়ি তাকে মেয়ের মতো আদর করে। তার একমাত্র জা তাকে ছোট বোনের মতো ভালোবাসে। তার জা খুবই ফর্সা সুন্দরী মহিলা। সবাই পরী বলে ডাকে। দুই মেয়ে হয়েছে অথচ এখনো দেখে মনে হয় যেন বিয়েই হয়নি। মধুকেও মানে রাইসার হাজব্যান্ডকেও সে খুব ভালোবাসে।
এক মাস পর মধু নতুন বউয়ের কাছে আসে। অনেক জার্নি করে এসেছে। রাত ১১টায় বাড়ি পৌঁছে। গ্রামে ১১টা মানে অনেক রাত। রাইসার জন্য অনেক আকাক্সক্ষার রাত। রাতে বউয়ের হাতের রান্না মজা করে খায় মধু। রাইসা এক দৃষ্টিতে মধুর দিকে তাকিয়ে থাকে। মানুষটা তো সত্যি অনেক সুন্দর! প্রথম তিন দিনে ভালো করে দেখা হয়নি। খেয়ে ক্লান্ত শরীরে ঘুমাতে যায়। রাইসা ভাবছিল একটু জড়িয়ে ধরতে কিন্তু লজ্জায় ধরে না। নাহ, আজ থাক লোকটা আজ খুব ক্লান্ত। মধু নাক ডাকিয়ে ঘুমায়। রাইসার ঘুম আসে না। মনে মনে আল্লাহ্র কাছে শুকরিয়া করে। এত সুখ তার কপালে ছিল তা ভাবতেও পারেনি।
চারদিকে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক। সুনসান নীরবতা। দূরে শিয়াল ডেকে যাচ্ছে। হঠাৎ একটি কাকের ডাক শোনা যায়। রাইসা ভাবে এ কি বিভ্রম নাকি সত্যি সত্যি! মাঝ রাতে কাকের ডাক! না সত্যিই তো মনে হচ্ছে। আরো দু’বার কাকটা কর্কশ স্বরে ডেকে উঠল। অসময়ে কাকের ডাক শুনে রাইসার মনটা খুব খারাপ হয়ে যায়। ঘুম আসে না চোখে। হঠাৎ, মধু বিছানায় উঠে বসে। রাইসা ঘুমিয়েছে কিনা বুঝতে চেষ্টা করে। ডাক দেয় না। আস্তে করে দরজা খুলে বাইরে যায়। প্রায় আধা ঘণ্টা আর খবর নেই। পাশের ঘরেই রাইসার জা থাকে দুই মেয়ে নিয়ে। রাইসার ভাসুর ঢাকায় থাকে। ক্লিনিকে চাকরি করে। পদ ছোট হলেও মাইনে পায় ভালো। প্রতি বছর এলাকায় জমি কেনে। রাইসা ঘর থেকে বাইরে এসে লম্বা বারান্দায় দাঁড়ায়। পাশের রুমে ডিম লাইট জ্বলছে। পাকা মেঝে টিনশেড ঘর। টিনের ফাঁক গলে রাইসা ডিম লাইটের হালকা আলোয় স্পষ্ট দেখতে পায় মধু তার ভাবীকে জড়িয়ে ধরে আছে। তার ভাবী মধুর বুকের ওপর মাথা রেখে অঝোরে কাঁদছে। মধু তাকে আদর করছে। ওরা দু’জনই বস্ত্রহীন। রাইসার মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ে। রাইসা বেহুঁশ হয়ে বারান্দায় পড়ে যায়।
সাধারণ সম্পাদক, কেন্দ্রীয় প্রিয়জন
রাইসার পায়ে রশি লাগিয়ে খুঁটির সাথে বেঁধে রাখা হয়েছে। গরুর মতো করে। তিন ফিট পর্যন্ত চলতে পারবে। চুলগুলো এলোমেলো। কিছু খায় না। কাউকে দেখলে ফ্যালফ্যাল...
