পৃথিবী আপন অক্ষে ঘূর্ণায়মান। কালের প্রবহমানতায় পালাক্রমে ক্রমশ ঘুরছে দিন-রাত, সপ্তাহ, মাস, পক্ষ, বছর ও যুগ। বছরের পরিক্রমায় ঘুরে এলো আরেকটি বাংলা নববর্ষ সন। বাংলা ভাষাভাষী হিসেবে, বাঙালি হিসেবে নববর্ষের উৎস আমাদের জানা প্রয়োজন। বাংলা সন প্রবর্তনের আছে সুদীর্ঘ পটভূমি। সাল শব্দটি ফারসি। আর সন শব্দটি আরবি। বঙ্গাব্দ শব্দটি হলো আধুনিককালের। আগে গ্রামবাংলায় বঙ্গাব্দ বলা হতো। এখন কেউ তা বলেন না। এখন সাল বা সন। বলেন। ১৫৭৬ খ্রিষ্টাব্দে বাংলাদেশ মোগল সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল। সম্রাট আকবর ছিলেন মোগল সাম্রাজ্যের অধিপতি। তখন সারা ভারতবর্ষে হিজরি সনের প্রচলন ছিল। সম্রাট তার দরবারের জ্যোতির্বিজ্ঞানী-পণ্ডিত ফতেউল্লাহ সিরাজিকে বিশেষভাবে দায়িত্ব দিলেন ১৫৮৪ খ্রিষ্টাব্দে। সিরাজি সাহেব দায়িত্বপ্রাপ্তির পর সৌর মাসের হিসাব অনুযায়ী চন্দ্র মাসের পরিবর্তে হিজরি সনকে ৩৬৫ দিনে রূপান্তরিত করেন এবং বাংলা সন প্রচলন করেন। তিনি ১৫৮৫ খ্রিষ্টাব্দে সম্রাট আকবরের কাছে সুপারিশ পেশ করলে সম্রাট তা অনুমোদন করেন। তিনি ফরমান জারির মাধ্যমে বাংলা সন অনুযায়ী খাজনা আদায়ের ঘোষণা দেন ১৫৮৫ খ্রিষ্টাব্দের ১০ মার্চ, ৯৩৩ হিজরির ৮ রবিউল আউয়াল। সম্রাট আকবর ৯৬৩ হিজরি বছরটিকে বাংলা সন ৯৬৩ রূপে চালু করেন। সম্রাটের সিংহাসনে আরোহণের তারিখ ছিল ২ রবিউস সানি, শুক্রবার ৯৬৩ হিজরি, ১৫ ফেব্রুয়ারি ১৫৫৬ খ্রিষ্টাব্দ। বাংলা সন চালু হয়েছিল শুক্রবার ২৯ জমাদিউল আউয়াল, ৯৬৩ হিজরি, ১০ এপ্রিল ১৫৫৬ খ্রিষ্টাব্দ অর্থাৎ বাংলা সালের শুরু ১ বৈশাখ ৯৬৩ বঙ্গাব্দ। বর্তমানে যে বাংলা বর্ষপঞ্জি চালু আছে, তা ১৯৬৩ সালে বাংলা একাডেমিতে বহুভাষাবিদ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর তত্ত্বাবধানে গঠিত কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী। ১৯৬৬ সালে ১৭ ফেব্রুয়ারি এ কমিটি সরকারের কাছে বাংলা বর্ষপঞ্জি সংস্কারের জন্য চূড়ান্ত রিপোর্ট পেশ করেছিল। তন্মধ্যে ছিল বাংলা মাস গণনার সুবিধার্থে বৈশাখ থেকে ভাদ্র মাস পর্যন্ত প্রতি মাসে ৩১ দিন এবং আশ্বিন থেকে চৈত্র মাস পর্যন্ত ৩০ দিন। চার দিয়ে যে সন বিভাজ্য তা হবে লিপ-ইয়ার বা অতিবর্ষ। লিপ-ইয়ার চৈত্র মাস হবে ৩১ দিন। ১৯৮৮ সালের ১৯ জুন ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর সুপারিশ অনুযায়ী গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার বাংলা মাস চালু করে। এভাবে বাংলাদেশে বাংলা বর্ষপঞ্জি প্রচলিত হয়েছে।
আমরা ফ্যাশনে ষোলআনা খাঁটি বাঙালিত্বের ভাব ফুটিয়ে তুলি ১ বৈশাখে, আর বাকি ৩৬৪ দিন থাকি বৈরী পরিবেশে অন্য জীবনযাপনে। আমরা নতুন বস্ত্র, পাঞ্জাবি, শাড়ি পরিধান করি বহু বর্ণিল একটি মনোভাবে আলো ছড়িয়ে পড়ে। নববর্ষের আগমনের বৈশাখী সঙ্গীত শুনি এবং নৃত্যের তালে তালে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানকে পূর্ণ করি। পুষ্পিত শুভেচ্ছা জ্ঞাপন করি একে অপরকে। বাংলা নববর্ষ আমাদের দেশে সবচেয়ে বড় অসাম্প্রদায়িক উৎসব। কারণ এটি বিশ্বব্যাপী বাঙালি সংস্কৃতির স্বীকৃত উৎসব হিসেবে উদযাপন করা হয়। আমরা মনে-প্রাণে বাঙালি সংস্কৃতির অনুষ্ঠান বর্ষবরণকে হৃদয় দিয়ে উপভোগ করি। পান্তাভাত, ইলিশ মাছ, দই-মিষ্টি, নানা ধরনের পিঠা পরিবেশন করি। নববর্ষকে অনুষ্ঠানসর্বস্ব করলেও চলে না। তবে আন্তরিক উপলব্ধি দিয়ে বাঙালিত্বকে অনুশীলন করাই মূল কথা। লাখো শহীদের রক্তে অর্জিত স্বদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌম প্রায় হুমকির সম্মুখীন। অপশক্তি আজো এ দেশে শান্তি ও উন্নয়নের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। বাঙালি সংস্কৃতির উৎসবগুলোকে কটাক্ষ করছে বাধাগ্রস্ত করছে ও হামলা করছে।
প্রসঙ্গক্রমে, প্রয়াত মনীষী ড. আহমদ শরীফের একটি উক্তি স্মরণ করছি : ‘ছোট বেলায় শুনতাম ‘বিদেশী তাড়াও, সুখ আসবে। বিদেশী বিতাড়িত হলো, কিন্তু সুখ এলো না। তারপর শুনলাম ‘বিধর্মী হঠাও, সুখ আসবে। দাঙ্গা-হত্যার মাধ্যমে তাও হয়েছিলো আংশিকভাবে, কিন্তু সুখ এলো না। শেষবার শুনলাম ‘বিভাষী বিতাড়নে সুখ আসবে’ কিন্তু আসেনি, বরং যন্ত্রণা বেড়েছে নানাভাবে। ভাত-কাপড় ও নিরাপত্তার অভাবপ্রসূত যন্ত্রণাই মুখ্য।’Ñ (দর্শন চিন্তা গ্রন্থের সঘাত প্রসূন প্রবন্ধের ৮২ পৃষ্ঠা থেকে)। বাস্তবে আমরা নানারকম দ্বান্দ্বিক বিষয়ের সাথে সঙ্ঘাত করে যাচ্ছি প্রতিনিয়ত। হয়তো মৃত্যুর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত আমাদের ব্যক্তিক জীবনে এসব অমানবিক সমস্যার মোকাবেলা করেই জীবন অবসান হবে। স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণের মাধ্যমে বাংলাদেশের জনগণ দল-মত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে ঐক্যবদ্ধভাবে বাংলাদেশকে বিশ্ব মানচিত্রে সগর্বে আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠা করেছে। জাতীয় জীবনে অনৈক্য, বিভক্তি, দ্বন্দ্ব-সঙ্ঘাত, সহিংসতা, দুর্যোগ-দুর্নীতি যেন আমাদের সঙ্গী হয়ে আছে। এসব নেতিবাচক বিষয়ের অবসান ছাড়া জাতীয় উন্নয়ন, নিরাপত্তা ও শান্তি প্রতিষ্ঠা করাও সম্ভব নয়।
রাজনৈতিক দলগুলোকে এ কথা ভাবতে হবে। বাঙালির শিকড়লগ্ন ঐতিহ্য এ ভাবনার ক্ষেত্রকে বলিষ্ঠ করতে পারে। আমরা বাঙালি না বাংলাদেশী সেই অযথা বিতর্ক বাদ দিয়ে বাঙালি ঐতিহ্যকে ও ঐতিহ্যকে জাতীয় সংস্কৃতির সত্তায় উজ্জ্বল করতে হবে।
জাতীয় জীবনে সংঘটিত কলঙ্কিত ঘটনাগুলো যেন আর পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সে জন্য নববর্ষের আকক্সক্ষায় আমাদের উজ্জীবিত হতে হবে। বাঙালির কল্যাণ কামনায় শপথে দীপ্ত হতে হবে। নববর্ষ হোক মানুষের জীবনে শান্তির উদ্বোধক। পরিসমাপ্তি ঘটুক সব হিংসা-বিদ্বেষ, ত্রাস-হুমকি ও অনিরাপত্তার।
নববর্ষ জাতীয় জীবনে প্রতিষ্ঠা করুক গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক আদর্শ, অসাম্প্রদায়িক বাঙালি সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হোক সর্বজনীন মানবাধিকার। ১৯৭১ সালের আগে বাংলার একটি চিত্র কবি অমিয় চক্রবর্তী দেখিয়েছেন; যেখানে শান্তি, সম্প্রদায়-সম্প্রীতি ও আন্তরিক ভালোবাসার মিশ্রণ রয়েছে। আদর্শিক বাংলাদেশ কবির ভাষায় এভাবে রূপায়িত :
‘সেই বাংলাদেশে ছিল সহগ্রের একটি কাহিনী
কুরআনে পুরাণে শিল্পে, পালা-পার্বণের ঢাকে-ঢোলে
আউল-বাউল নাচে; পুণ্যাহের সানাই রঞ্জিত।
রোদ্দুরে আকাশতলে দেখ কারা হাটে যায়, মাঝি
পাল তোলে, তাঁতী বোনে, খড়ে-ছাওয়া ঘরের অঙ্গনে
চির দিন বাংলাদেশ।’
(উচ্চমাধ্যমিক বাংলা সঙ্কলন ১৯৯৮ সাল, সঙ্কলন ও সম্পাদনা- ড. মাহবুবুল হক ‘বাংলাদেশ’ অমিয় চক্রবর্তী, পৃষ্ঠা-৪০৭)।
কুরআন, পুরাণ, শিল্প-সাহিত্য, পালা-পার্বণ, ঢাক-ঢোল, আউল-বাউল, সানাই, মাঝি, তাঁতি অর্থাৎ মধুময় মিশ্রিত চির দৃষ্টান্ত স্থাপনের বাংলাদেশ বাস্তবে দেখেছিলেন তিনি। সেই চিরায়ত বাংলা, লোকায়ত বাংলা, ঐতিহ্যময় বাংলা, বাঙালি সংস্কৃতির বাংলা আজ কোথায় যেন হারিয়ে যাচ্ছে। বোমা-গ্রেনেড, সন্ত্রাস, বিভেদ, সহিংসতার অন্ধকারে হারিয়ে যাচ্ছে নিরাপত্তা, কল্যাণ, ঐক্য, ঐতিহ্য আর সুস্থ জাতীয় সংস্কৃতি। ভারত বিভক্ত হয়ে পাকিস্তান রাষ্ট্রের সৃষ্টি হলো। বাঙালির অমানিশা দূর হলো না। শান্তিময় বাংলাদেশের সীমানায় অশান্তির বিষবাষ্প দশ দিগন্তে ছড়িয়ে পড়ল। সর্বত্র লক্ষ করা যাচ্ছে যুবমনের হতাশা, জনগণের অশান্তি, ধর্মের নামে হত্যার আয়োজন, রাজনৈতিক দলের পারস্পরিক বিরোধ, সামাজিক জুলুম, বৈষম্য, বঞ্চনা, নির্যাতন, সন্ত্রাস ছিল তার একটি বাস্তবচিত্র। মধ্যযুগের বিখ্যাত কবি ভারতচন্দ্র রায়ের (গুণাকর) বিখ্যাত উক্তি, ‘নগর পুড়লে কি দেবালয় এড়ায়।’ অর্থাৎ নগরে আগুন লাগলে সেখানে মন্দির-মসজিদ-গির্জা-প্যাগোডা যা-ই থাক না কেন, জ্বলে পুড়ে ছাই হয়ে যাবে। আমাদের অবস্থাও তাই। দেশে ভয়ঙ্কর অমানবিক হত্যাকাণ্ড ও জঙ্গি সন্ত্রাস সংঘটিত হলে আমরা কেউ সুস্থ, স্বাভাবিক ও সুন্দর জীবনযাপন করতে পারব না। কারো জীবনই নিরাপদ থাকবে না।
নববর্ষে এসে দেশের দুর্যোগময় অতীতের ঘটনাগুলোই বারবার মনে পড়ে। এ দেশে শান্তির সুবাতাস বইলে সবাই ভালো থাকবে। নববর্ষের দিনে জাতীয় শান্তি ও নিরাপত্তার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত হোক। সদাকাক্সক্ষার নবায়ন ঘটুক নতুন উদ্যম ও লক্ষ্য নিয়ে। আমরা মহান সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করি, যেন সব ধরনের, অমানিশা-দুর্যোগ কেটে শান্তিময়-উজ্জ্বল বাংলার হাস্যোজ্জ্বল মুখখানি আমাদের কাছে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়। আমাদের দেশের সব মানুষের হৃদয়ে প্রকৃত ভ্রাতৃত্বের বোধ জাগ্রত হোক। সব ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে দেশ গড়ার মহান দায়িত্ব পালনে নিজ নিজ অবস্থানে থেকে ব্রতী হই। নবর্বষ হোক আমাদের সেই লক্ষ্যে চালিত হওয়ার প্রথম দিন। আসুন, নববর্ষের শুভেচ্ছায় ও আশীর্বাদে সবাই আত্মপ্রত্যয়ী হই। কল্যাণময় জীবনের জন্য অঙ্গীকারবদ্ধ হই, সচেষ্ট হই শান্তি প্রতিষ্ঠায়। জাতীয় জীবনে নববর্ষ হোক শান্তির উদ্বোধক। হ
পৃথিবী আপন অক্ষে ঘূর্ণায়মান। কালের প্রবহমানতায় পালাক্রমে ক্রমশ ঘুরছে দিন-রাত, সপ্তাহ, মাস, পক্ষ, বছর ও যুগ। বছরের পরিক্রমায় ঘুরে এলো আরেকটি বাংলা নববর্ষ সন। বাংলা...
