আলেকজান্ডারের সুফিয়া খালা। সুফিয়া খালা মানেই চমক। নতুনত্ব। ওনার সব কিছুতে তারা বিনোদিত হয়। আলেকজান্ডাররা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করেÑ কবে সুফিয়া খালা আসবেন! সুফিয়া খালা স্কুলশিক্ষিকা। বিদ্যারতন হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষিকা। শিক্ষিকা হিসেবে তার অনেক নাম-ডাক। মানুষ বলে, ওনার কথা শুনলেই ছাত্ররা ভালো ছাত্র হয়ে যায়। তিনি নিজে যোদ্ধা। যোদ্ধা তৈরি করতে পছন্দ করেন। যে স্কুলেই যান, জাদুর কাঠি নিয়ে যান। তার জাদুর কাঠির স্পর্শে সব তছনছ হয়ে যায়। বাউন্ডেলে ছেলেরাও লেখাপড়ায় মনোনিবেশ করে। লেখাপড়ার দারুণ আগ্রহ ছাত্রদের মনে জাগ্রত হয়। প্রচ্ছন্ন প্রতিযোগিতা থাকে সবার মাঝে। কে কাকে ছাড়িয়ে যাবে। টানটান উত্তেজনা। শিক্ষকতাকে তিনি মন থেকে গ্রহণ করেছেন। ব্রত হিসেবে নিয়েছেন। শিক্ষকতাই তার ধ্যানজ্ঞান। সব ছাত্র মনখুলে তার সাথে কথা বলতে পারে। তিনি বিভিন্ন সময় তার ছাত্রদের রুমে ডেকে কথা বলেন। তাদের সমস্যা শোনেন। পরামর্শ দেন। এত ব্যস্ততার মাঝেও তিনি সময় করে আলেকজান্ডারদের বাড়িতে আসতে ভোলেন না। নিজের হাতে রান্না করা নানা খাবার নিয়ে আসেন। প্রতিবারই কোনো-না-কোনো নতুন খাবার আনবেনই। তার রান্নাতেও জাদু। আলেকজান্ডারের মা বলেন, ‘সুফিয়ার হাতের গরুর গোশত রান্না জগদ্বিখ্যাত। এই স্বাদ আর কারো রান্নায় নেই।’ সামনের সোমবার সুফিয়া খালা আসবেন। সবার মাঝে ঈদ- ঈদ ভাব।
আলেকজান্ডারদের বাড়ির পুবদিকে ছোট্ট একটি ফলের বাগান। ফলের বাগান না বলে একে আমবাগানই বলা যায়। বিভিন্ন জাতের আমগাছ বাগানকে বিশিষ্টতা দান করেছে। আলেকজান্ডারের মায়ের সবচেয়ে পছন্দের ফল আম। তাই অনেক দুর্লভ জাতের আমগাছ এ বাগানে আছে। বাগানের দক্ষিণ পাশে স্বচ্ছপানির বিশাল পুকুর। পুকুরের মাঝখানে কয়েকটি সাদা শাপলা বৃত্তাকারে ফুটে আছে। শাপলার সাথে পাল্লা দিয়ে কিছু হেলেঞ্চা লতাও ভাসছে। পুকুরের দুই ধারে শান বাঁধানো ঘাট। এক ঘাটে পানসি নৌকা বাঁধা। এই নৌকায় চড়ে তারা অনেক মজা করে। মাঝে মধ্যে ছোটখাটো অনুষ্ঠান এই নৌকাতে বসে করে।
বোশেখের মাঝামাঝি। ভ্যাপসা গরম। সুনসান রাত। চার দিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার। গাছের ডালে ডালে অন্ধকারের কালো চাদর। মাটিতে কালো পিচের মতো অন্ধকার বিছানো। পানিতেও গাঢ় অন্ধকার মেশানো। আলেকজান্ডারের বাবা বললেন, ‘অন্ধকারের একটা সৌন্দর্য আছে। সবাই শুধু জোছনা উপভোগ করে। অন্ধকারও অনেক উপভোগ্য। চলো, আজ আমরা নৌকায় বসে অন্ধকার উপভোগ করব।’ তার কথায় সবাই বেশ মজা পেল। পুরো পরিবার নৌকায় উঠে বসল। ঝিরঝিরে দখিনা হাওয়া। বেশ আরামদায়ক। শুরু হলো গানের প্রতিযোগিতা। এমন সময় আলেকজান্ডার বলল, ‘সুফিয়া খালা থাকলে বেশ মজা হতো।’ সবাই একবাক্যে তার কথায় সায় দিলো। আলেকজান্ডারের বড় আপু বলল, ‘আচ্ছা মা, সারাজীবন তোমার কাছে শুনে এলামÑ সুফিয়া খালা তোমার ছোট বোন। কিন্তু নানু বলেন, তার চার মেয়ে। সুফিয়া খালা তোমার বোন হলে তো তোমরা পাঁচ বোন হতে। সুফিয়া খালা তোমার কেমন বোন? এ কথা শুনে তার মা নীরব হয়ে গেলেন। অন্ধকারময় নীরবতা। তিনি বললেন, ‘সে আমার আপনার চেয়েও আপন। সে আমার মায়ের পেটের বোন না। কিন্তু তাকে আমরা পর বলতে পারি না। যার সাথে আত্মার সম্পর্ক হয় সে-ই আপন। যার সাথে আত্মার সম্পর্ক হয় না সে কাছের হলেও পর।’ আলেকজান্ডারের বড় আপু বললÑ ‘মা, তাহলে কিভাবে তিনি তোমার বোন হলো?’ আলেকজান্ডারের মা তার শৈশবে ফিরে গেলেন। শুরু করলেন ফেলে আসা দিনের গল্প বলা :
প্রতি জ্যৈষ্ঠ মাসে আমরা গ্রামের বাড়ি যেতাম। ওখানে আমাদেরও একটা বাগানবাড়ি ছিল। খুব মজা হতো। হইচই হতো। আমাদের অনেকগুলো চাচাতো ভাইবোন ছিল। তাদের কাছে আমাদের খুব কদর ছিল। আমরা যা করতাম তাতেই তারা খুশি হতো। বিস্মিত হতো। তাদের সাথে অনেক ছোটাছুটি করতাম। শহরের ব্যস্ততা ছেড়ে গ্রামের উদার আকাশের নিচে ছোটাছুটি খুব ভালো লাগত। কিন্তু ভালো লাগার বিষয় খুব অল্পদিনের হয়। দেখতে দেখতে আমাদের চলে আসার সময় হয়ে যেত। বাবার ছুটি, আমাদের ছুটি ফুরিয়ে যেত। বাবা তাড়া দিতেন। আমরা চলে আসতাম। গ্রামের মিষ্টি দিনগুলোর কথা মনে করে সারা বছর বিনোদিত হতাম। একবার বাড়ি থেকে আসার সময় সুফিয়াকে সাথে করে আনা হলো। সুফিয়া আমার বয়সী। ফুটফুটে চেহারা। দেখলেই ভালোবাসতে ইচ্ছে করে। আমরা বুঝে গেলাম আমাদের নতুন কাজের মেয়ে। আমাদের বাড়িতে সব সময় দু-তিনজন কাজের মেয়ে থাকত। বাবা বলতেন, ‘তাদের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করবে না। তারাও তোমাদের মতো মানুষ। অভাবে পড়ে কাজ করতে এসেছে। তাদের সাথে ভালো ব্যবহার করবে।’ আমাদের সাথে প্রায় সব কাজের মেয়েরই খুব সখ্য থাকত। সুফিয়া এক দিনেই আমাকে জয় করে নিলো। তার রুচিবোধ, আচার-আচরণ আমার খুব ভালো লাগত। তা ছাড়া, চেহারায়ও একটা আভিজাত্যের ছাপ ছিল। দেখলেই মনে হয় ভাগ্যবিড়ম্বিত শিশু। গ্রাম থেকে আসার পথে গাড়িতে ও আমার পাশে বসেছিল। বিকেলের মিষ্টি রোদ রাস্তার দুই ধারে গাছের ওপর পড়েছে। পুব দিকের চষা জমিতে গাছের ছায়া নানা নকশা তৈরি করেছে। ও আমাকে আঙুর দিয়ে দেখিয়ে বলল, ‘দেখ, কত সুন্দর নকশা! আমার মা কাঁথায় এ রকম নকশা আঁকতে পারত।’ বলেই চুপসে গেল। আমি তার শিল্পমনের পরিচয় পেলাম। সাথে এও বুঝে গেলাম তার মা আজ অতীত। পরে শুনেছি কয়দিন আগে-পিছে তার মা-বাবা মারা গেছেন। আমি তখন ক্লাস ফোরে পড়ি। আমি স্কুলে যাইÑ ও আমার ব্যাগ গুছিয়ে দেয়। স্কুল থেকে আসার পর স্কুলের গল্প শুনতে চায়। শুনে খুব খুশি হয়। মাঝে মাঝে তার চোখ সজল হয়। আমি টের পাই। ও একদিন বলে, সেও স্কুলে পড়ত। ক্লাস থ্রি পর্যন্ত পড়েছে। স্কুলে পারুল নামে তার এক বান্ধবী ছিল। তারা দু’জন সব সময় একসাথে থাকত। এ কথা বলে আনমনা হয়। মাঝে মাঝে কী যেন বলতে চায়। আবার বলে না। আমি তার মন পড়তে পারলাম। মাকে বললাম, ওকেও আমার স্কুলে ভর্তি করে দাও। আমরা দু’জন একসাথে স্কুলে যাবো। এ কথা বলার সাথে সাথে আমার চোখ দিয়ে দরদর করে পানি পড়তে লাগল। আমার কান্না মাকে স্পর্শ করল ভীষণভাবে। পরদিনই তার জন্য নতুন জামাকাপড় এলো। সাথে স্কুলব্যাগ। ও আমার বোন হয়ে গেল। আমরা একসাথে স্কুলে যাই। একসাথে আসি। ও বাড়িতে অনেক কাজ করত। আমরা মানা করলেও করত। দিনে দিনে আমরা হরিহর হয়ে গেলাম। একদিন স্কুল থেকে আসার পথে ফুল চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়লাম। বাবা আমাকে আচ্ছামতো বকলেন। আমার প্রচণ্ড মন খারাপ হলো। সুফিয়া আমাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলল, ‘মা-বাবা তো এ জন্যই। আমরা ভুল করলে আমাদের শোধরাবেন। শাসন করবেন।’ আমি বললাম, ‘আমার মা কখনো এভাবে বকে না।’ সে একটা মৃদু হাসি দিয়ে বলল, ‘মায়ের শাসন চাঁদের আলোর মতো আর বাবার শাসন সূর্যের আলোর মতো।’ এত ছোট্ট বয়সে সে এত সুন্দর করে কথা বলত আমরা মুগ্ধ হতাম। আমরা আমাদের মা-বাবাকে যেভাবে ডাকতাম। সেও সেভাবে ডাকত। ও আমার চেয়ে লেখাপড়ায় ভালো ছিল। তাতে আমার মোটেও হিংসা হতো না। ইচ্ছে করলে আরো বেশি বেতনের চাকরি করতে পারত। তার ইচ্ছে ছিল শিক্ষক হওয়ার। নিজেকে অন্যের মাঝে প্রতিস্থাপন করার। সে খুব কৃতজ্ঞ। তার জন্য আমি একদিন কেঁদেছি। কে জানত, আমার জন্য সে জনম জনম ধরে কাঁদবে!
আলেকজান্ডারের সুফিয়া খালা। সুফিয়া খালা মানেই চমক। নতুনত্ব। ওনার সব কিছুতে তারা বিনোদিত হয়। আলেকজান্ডাররা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করেÑ কবে সুফিয়া খালা আসবেন! সুফিয়া খালা...
