জীবনটা বড্ড বিচিত্র, মর্মান্তিক ও ক্ষণস্থায়ী। আল্লাহ তায়ালার হুকুমে যেকোনো সময় যেকোনো মুহূর্তে বিনা নোটিশে মৃত্যু আপনার, আমার তথা সব জীবের শিয়রে এসে দাঁড়াতে পারে। এখানে কে শাসক, কে প্রজা, কে গরিব, কে ধনী, কে সুন্দর, কে কুৎসিত, কে ছোট, কে বড়, কে শক্তিশালী, কে দুর্বল কিছুই কেউই রেহাই পাবে না। আমরা যখন নশ্বর পৃথিবীতে মিছে স্বপ্নে বিভোর হয়ে সাজানো গোছানো কাজে মত্ত, তখনই ধেয়ে আসতে পারে ঘনকালো নিকষ প্রলঙ্করি ঝড়। যেখানে মৃত্যুর মতো ভয়ঙ্কর, নিষ্ঠুর, নির্মম কালো হাতছানিতে প্রস্তুত হয়ে অনুমতির জন্য সর্বদা অপেক্ষমাণ যমদূত আজরাইল আ:। সেখানে জ্ঞান, বিবেক, বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষদের এত দাপট কেন? কেন যৌবন, জীবন, আচার, ব্যবহার, ওঠা, বসা, লেন, দেন আর কথা, বার্তায় ভণ্ডামি? কেন ঠকানোর প্রবণতা? কেন চালাকি? কেন ক্ষমতার দ্বন্দ্ব? কেন মুখে রাসূল সা:-এর স্মিত, মুচকি, মিষ্ট হাসির পরিবর্তে ধিকৃত ইবলিশের অট্টহাসী? কেন হাজারো মানুষের দুঃখ, কষ্ট, বেদনা, হাহাকার, জুলুম-নির্যাতন, আমাদের হৃদয়কে জাগ্রত করে না? কেন মুসাফিরের মানসিকতা বিবর্তিত হয়ে চাকচিক্য আর বিলাসিতার লোলুপ দৃষ্টি? কুরআন, হাদিস বিবর্জিত, আদর্শহীন ব্রিটিশ প্রণোদিত বস্তুবাদী নৈতিকতা গ্রাসী শিক্ষা গোটা মানবসভ্যতাকে বিপথগামী করে ফেলল। তথাকথিত শিক্ষার মোকাবেলায় কুরআন, সুন্নাহর জ্ঞানার্জনের ক্ষেত্র তৈরিতে উদ্যোগ নেই কেন? কোন দিকটি আমাদের মুখে হাসি ফুটাল? প্রতিদিন প্রতি প্রহরে আমাদের চোখের সামনেই এই মর্মান্তিক, লোমহর্ষক, হৃদয়গ্রাসী বাস্তব চিত্র ডানে, বামে, সামনে, পেছনে, দূরে কাছে, ঘরে অহরহ ঘটে যাচ্ছে। এরপরও সব সৃষ্টিকুলই এই কঠিন বাস্তবতা থেকে বিস্মৃত!
আমরা কত বড় আহাম্মক! বোধশক্তিহীন! আমরা বাস্তবতা অস্বীকারকারী নির্বোধ সৃষ্টি! মাটির দুনিয়াতে শত সহস্রগুণ অধিক বিশাল বিশাল জীবজন্তু সৃষ্টি করে আল্লাহ মানুষের অনুগত করে ছড়িয়ে দিয়েছেন। যার একটি প্রাণীও আজ অবধি এক মুহূর্তের জন্যও আল্লাহর আইন অতিক্রম করেনি। যদি তারা আল্লাহর নিয়ম ভঙ্গ করত তাহলে তাদের নিষ্ঠুর, নির্মম পেষণিতে বিবেক, বুদ্ধিদীপ্ত মানুষেরা অনেক পূর্বেই নিশ্চিহ্ন হয়ে যেত। যখন যাকে ইচ্ছা, আল্লাহ তাকে মাটির পৃথিবীর জীবনাবসান করবেন। এই ব্যাপারে তিনি কারো পরোয়া করেন না, ধার ধারেন না। তিনি যত দিন আপনাকে, আমাকে আয়ু দিয়েছিলেন তার সৎ ব্যবহার করলাম কি না তিনি ততটুকুরই হিসাব নেবেন। এ ক্ষেত্রে আল্লাহ তায়ালা তার বার্তাবাণীতে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বুদ্ধিদীপ্ত, জ্ঞানী মানবমণ্ডলীকে উদ্দেশ্য করে স্পষ্ট, পরিষ্কার ও সাবলীল ভাষায় বলেছেন, ‘প্রত্যেক জীবকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে।’ (আল-কুরআন) তিনি পরাক্রমশালী, একচ্ছত্র নিরঙ্কুশ ক্ষমতার অধিকারী। তিনি পবিত্র বার্তায় আমাদের এ মেসেজও জানিয়ে দিয়েছেন, ‘বলুন, আল্লাহ এক-অদ্বিতীয়, আল্লাহ অমুখাপেক্ষী ; তিনি কাউকে জন্ম দেননি এবং তাকেও জন্ম দেয়া হয়নি এবং তার সমতুল্যও কেউ নেই।’ (সূরা ইখলাস : ১-৪) কতই না শাশ্বত, চিরন্তন স্পষ্ট বক্তব্য। পৃথিবীর সৃষ্টিকাল কেউ জানে না, অথচ সূচনাকালে আল্লাহ তায়ালা আদম আ: থেকে শুরু করে অদ্যাবধি কত জীবের প্রাণ হরণ করেছেন তার পরিসংখ্যান কারো জানা নেই। মানুষের তথা সব জীবের প্রাণ দান, হরণ একমাত্র তারই হাতে। কোনো প্রাণকে হরণ করলে কারো কাছে আল্লাহ তায়ালাকে জবাবদিহি করতে হয় না, যদি জবাবদিহি করা লাগত তাহলে অনেক আগেই মহান আল্লাহ আটকে যেতেন। (নাউজুবিল্লাহ)। এই একটা বিষয় থেকেই আমরা আল্লাহ তায়ালাকে চিনে নিতে, বুঝে নিতে, উপলব্ধি করে নিতে, অনুভব করে নিয়ে মনের কোঠায় স্থান করে তার হুকুম পালন করে তার সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারি। মৃত্যুর মতো বাস্তবতাকে এড়িয়ে উচ্ছৃঙ্খল, বাধা বন্ধনহীন, অনৈতিক যাচ্ছেতাই জীবন পরিচালনা করা কোন বিবেক-বুদ্ধিসম্পন্ন নর-নারীর কাজ হতে পারে না। মনে রাখতে হবে মৃত্যু ভয়, কবর, হাশর, ফুলসিরাতের আল্লাহ তায়ালার কঠোরতার পয়গাম পাওয়ার পর আর অফুরন্ত নেয়ামতে পূর্ণ দশটা পৃথিবীতুল্য একটা জান্নাত লাভের প্রত্যাশা লালনকারীদের অপরাধপ্রবণতা, কলুষিত মানসিকতা, হত্যা, খুন, অপহরণ, গুম, ছিনতাই, ব্যভিচার, হিংসা, বিদ্বেষ, অহমিকা, লোভ, মিথ্যা, বানোয়াট, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কল্পকাহিনী মানসপটে বাসা বাঁধতে পারবে না। ইমানের দাবিদারদের হৃদয়জুড়ে উপচে পড়বে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের নিরলস প্রচেষ্টা। তার দ্বারা সমাজ, তথা আল্লাহ তায়ালার সৃষ্টিকুল উপকৃত হতে থাকবে। প্রিয় হাবীব হজরত মুহাম্মদ সা: বলেছেন, ‘যে মানুষের প্রতি রহম করে না, আসমানবাসী তাকেও রহম করবেন না।’ প্রিয়নবী সা: আরো বলেছেন, ‘কল্যাণ কামনাই হচ্ছে দ্বীন’ মৃত্যুর ভয়াবহতা, মর্মান্তিকতা, হৃদয়বিদারক ও বাস্তবতা দেখেও যদি কেউ সৃষ্টজীবের কল্যাণ কামনা করতে না পারেন, তাহলে আপনি, আমি কেউই মৃত্যুকে সঠিকভাবে উপলব্ধি করতে পারেননি।
হজরত জাবীর ইবনে আবদুল্লাহ্ রা: থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সা: বলেন, ‘যে ব্যক্তি মানুষের প্রতি রহম করে না, আল্লাহ তার প্রতি রহম করেন না।’ (বুখারি, মুসলিম)
অথচ মানবতা আর আল্লাহ তায়ালার সৃষ্টিকুলের কল্যাণকামী সে যেই হোক তার সুনাম, সুখ্যাতি সবার মাঝে ব্যাপকভাবে স্বল্পসময়ের ব্যবধানে আকাশে-বাতাসে সর্বমহলে ছড়িয়ে জনপ্রিয়তার শীর্ষে স্থান করে দেবে। এই দায়িত্ব আল্লাহ তায়ালাই বহন করবেন। মানুষের কল্যাণ, কল্যাণকামী মানুষের মহৎ কর্মকাণ্ডে যদি আপনার মানসপটে ঈর্ষার জন্ম দেয়, তাহলে মন থেকে দ্রুত তা দূরীভূত করার জন্য সচেষ্ট হন। তা না হলে যত ভালো আমলই করুন, সেটা আল্লাহ গ্রহণ না করলে সব কিছুই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে। এ ক্ষেত্রে আল্লাহ তায়ালাকে ধৈর্যশীল পেয়ে যারা ভালো কাজ করে তাদের বিরোধিতা করবেন, তাদের মানুষের কাছে ঘৃণার পাত্র বানানোর অপচেষ্টা করবেন, অথবা তাদের থেকে দূরে থাকবেন, কিংবা তাদের হিংসায় দূরে ঠেলবেন বা মন যা চাইবে অবলীলাক্রমে তাই করে যাবেন তা কিন্তু আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না। এ রকম অপরাধমূলক কাজ মানুষেরা তখনই করেন, যখন আল্লাহ তায়ালা ও তাঁর শক্তি এবং ক্ষমতার ব্যাপারে বিস্মৃত থাকেন। এজন্যই আল কুরআনে বলা হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহর পাকড়াও অত্যন্ত মজবুত’। (আল কুরআন)।
মনে রাখবেন পক্ষপাতের ব্যাপারে আল্লাহ তায়ালা সজাগ, নির্লিপ্ত থাকলেও আল্লাহ হুঁশিয়ারি করে বলেছেন, ‘আমি সত্যবাদীদের সাথে আছি।’ (আল কুরআন) তিনি আরো বলেছেন, ‘আমি সত্যবাদীদেরকে ভালোবাসি।’ (আল কুরআন) অন্যত্র বলেছেন, ‘সত্যবাদীদের সাহায্য করা আমার দায়িত্ব।’ (আল কুরআন) অযোগ্যতা, অশিক্ষা, অদূরদর্শিতা, বংশীয় খাসলত আর নি¤œ মানসিকতার কারণে প্রতিহিংসার মতো ঘৃণ্য অপরাধের জন্ম হয়। এই বিষয়ে আল্লাহর হাবিব হজরত মুহাম্মদ সা: পরিষ্কার ভাষায় বলেছেন, ‘আগুন যেমন মুহূর্তের মধ্যে সবকিছুকে ভস্মীভূত করে দেয়, তেমনিভাবে মুহূর্তের ব্যবধানে হিংসাগুলো মানুষের নেক আমলসমূহ নিঃশেষ করে দেয়।’ যেমন আমরা সচরাচর সমাজে, দেশে অনেক মানুষকে দেখতে পাই, নামাজি হওয়া সত্ত্বেও তার আচরণে অশ্লীলতা বিরাজমান। অথচ মহান আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, ‘নিশ্চয় নামাজ মানুষকে অশ্লীল ও গর্হিত কাজ থেকে বিরত রাখে।’ (সূরা আনকাবুত) নামাজি হওয়ার পরও যদি এরকম দেখা যায়, তাহলে বুঝতে হবে আমরা নামাজের মর্মার্থ, নামাজের গুরুত্ব, নামাজের আদব, নামাজের উৎকর্ষতা অর্জন করতে পারিনি। ঠিক তেমনিভাবে ভয়ঙ্কর মৃত্যু যদি আমাদের মানসিকতায় ভালো কাজের প্রতি উৎসাহ আর মন্দ কাজগুলো থেকে বিরত না করে তা হলে মৃত্যুকেও আমরা গুরুত্বহীন মনে করব। মৃত্যুকে এড়িয়ে চলার মতো ধৃষ্টতা দেখাচ্ছি। এটা চাট্টিখানি বোকামি নয়। আমাদের মনের গোপনীয়তায় যা সবার অগোচরে লালন করি, তা ইচ্ছায় হোক অনিচ্ছায় হোক আমাদের দৈনন্দিন আচার-আচরণে, আমল-আখলাকের মধ্য দিয়ে প্রকাশিত হয়। মনের গভীরে থাকা আল্লাহ তায়ালার পছন্দের বিপরীত চিন্তাচেতনা, মানসিকতা মানবসমাজে প্রকাশিত হলে ক্রমান্বয়ে প্রভাবশালী, গণ্যমান্য মানুষটি হেয়প্রতিপন্নতার দিকে ধাবিত হয়। এ ক্ষেত্রে পৃথিবীর মাটিতে মানুষের কী করণীয়, কিভাবে করতে হবে তার সারমর্ম আল্লাহ তায়ালা বলে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘তোমাদের রাসূল তোমাদের জন্য যা এনেছেন, তা পরিপূর্ণরূপে গ্রহণ করো আর যা নিষেধ করেছেন তা বর্জন করো।’ (সূরা হাশর : ৭)
তাই আসুন! শপথ করি, আমাদের কর্ম হোক সুন্দর গঠনমূলক, সময় কাটুক সৃষ্টিকুলের কল্যাণে, অর্জিত তাকওয়ার আলোকে পরিচালিত হোক আমাদের জীবন। শেষ বিদায় হোক মানুষের ভালোবাসা আর দু’চোখের অশ্রু বিসর্জনের মধ্য দিয়ে। এমনতর উৎকৃষ্টতম, সুন্দর সাবলীল, অনুপম উজ্জ্বল আচরণের মৃত্যু হোক আমাদের ভাগ্যে। কবর, হাশর, জাহান্নাম, জাহান্নামের নির্মমতা আর জান্নাতের নেয়ামতরাশি থেকে যেন বিস্মৃত না হয় আমাদের হৃদয়। হ