ঈদে আনন্দ অপরিসীম। কেননা ঈদ শব্দটির মধ্যেই এক ধরনের আনন্দের আলোকচ্ছটা রয়েছে। এ কারণে ‘ঈদ’ আওয়াজটি শোনার সাথে সাথে আনন্দের সেই আলোকচ্ছটা ঠিকরে বেরিয়ে আসে; মানুষের ভেতরটা আন্দোলিত হতে থাকে; আনন্দের অনুরণ ঘটে; মনে শিহরণ জাগায়; আত্মা পুলক অনুভব করে। তখন ঝলকে ওঠে মানুষের মন, সমাজ, সংস্কৃতি। মানুষ ভাসতে থাকে নিরন্তর এক ভালো লাগায়; চোখে-মুখে ফুটে ওঠে আনন্দের দীপ্তি। কিন্তু ঈদে বেদনাও লুকিয়ে থাকে। সেই লুকানো বেদনায় নিভৃতে মানুষ নীল হতে থাকে; গুমরে কাঁদে। এই নীল হয়তো সহসা চোখে পড়ে না; আনন্দ যতটা চোখে পড়ে। আনন্দের প্রকাশ ঘটে দুর্দান্তভাবে। বেদনা প্রকাশ হয় সন্তর্পণে। বেদনার গতি মন্থর; আনন্দ উল্লম্ফ। তবুও আনন্দ-বেদনা পরস্পর সাথে সাথে চলে। কথায় বলে ‘হাসির পরে কান্না আসে দুখের পরে সুখ’। এই তত্ত্বকথা কে কখন কোথায় প্রথম বলেছিল জানা নেই। তবে পবিত্র কুরআন শরিফে সূরা আল ইনশিরাহ’র ৫, ৬ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘অতঃপর কষ্টের সাথে অবশ্যই আরাম রয়েছে; নিশ্চয়ই কষ্টের সাথে আরাম রয়েছে।’ এই আয়াতকে স্মরণ করেই হয়তো এই তত্ত্বকথাটি বলা হয়েছে। অতএব, আনন্দ-বেদনার পথচলা আগু-পিছু। মানবজীবনের বেশির ভাগ সময়টা বেদনার, অল্প কিছু সময় আনন্দের। ঈদ সেই অল্প সময়ের মধ্যকার এক আনন্দ, অনুভূতি; তাতেও বেদার নীল দংশন মাঝে মধ্যে পরিদৃষ্ট। কোনো কোনো আনন্দের জোয়ারে যখন মানুষ ভাসে সেই সময়ে অন্য কোনো বেদনা আরো নিদারুণ হয়ে করুণভাবে আত্মপ্রকাশ করে। এ সময় কষ্টগুলো সিসার মতো গলতে থাকে, বেদনায় মানুষ মুষড়ে যায়; উবু হয়ে বসে। তেমনি এক আনন্দ-বেদনার নাম ঈদ। ঈদে যে বেদনা থাকে সেই বেদনার নীল আজ বিশ্ব মুসলিমদের ঘরে ঘরে ঈদের দিনে অশ্রু ঝরায়।
মুসলমানদের ঈদ উৎসব বয়সের দিক দিয়ে নবীন কিন্তু বৈশিষ্ট্যের দিক দিয়ে গাম্ভীর্যপূর্ণ উৎসব। ঈদকে নবীন বলা হচ্ছে এ জন্য যে, মুহাম্মদ সা:-এর মদিনা জীবন থেকে ঈদের পথচলা। এর আগে পৃথিবীতে অনেক ধরনের আনন্দ উৎসব উদযাপিত হতো। যেমন- ইহুদিদের নওরোজ, পৌত্তলিকদের মিহিরজান, ওকায মেলা প্রভৃতি। এগুলো ছিল ভিন্ন ধর্মের মানুষদের জন্য। মুসলমানদের আকিদা ও বিশ্বাসের সাথে এসব উৎসবের মিল পাওয়া যায় না। সে জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে মুহাম্মদ সা: মুসলমানদের জন্য আয়োজন করলেন ঈদ। তখন থেকেই ঈদ বৈশিষ্ট্যগুণে স্বতন্ত্র উৎসবে পরিণত হলো। ঈদের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য হলো আত্মিক সংযম ও আর্থিক ত্যাগের সমন্বিত অনুশীলন। রমজানের অনুশীলন হলো অধিক আহার পরিত্যাগ করা, লোভ ও কাম থেকে ধৈর্যধারণ করা, দান-সাদকা করে বিত্তহীন মানুষদের সাথে থাকা আর ঈদুল আজহাতে কোরবানির মাধ্যমে ত্যাগের মহিমাকে প্রতিষ্ঠিত করা। এসব করতে পারার মধ্যে যে গভীর আনন্দ রয়েছে সেই আনন্দের আনুষ্ঠানিক রূপ হচ্ছে ঈদ। অর্থাৎ ত্যাগ ও সংযম করতে পারার মধ্য দিয়ে আনন্দ উদযাপন করার নামই ঈদ। এ জন্যই ঈদ পৃথিবীর অন্যান্য প্রাচীন ও আধুনিক উৎসবগুলো থেকে স্বতন্ত্র ও ভিন্নমানের অন্য মাত্রার উৎসব।
পৃথিবীর যে প্রান্তেই ঈদ উদযাপিত হোক না কেনো ঈদের আবেদন একই থাকে। তবে অঞ্চলভেদে, পরিবারভেদে ঈদের গাম্ভীর্যে কিছুটা পরিবর্তন আসতে পারে। যেমন ফিলিস্তিন, লেবানন, মিসর, সিরিয়া, কাশ্মির, শ্রীলঙ্কা, চিনের উইঘুর, মিয়ানমার বা কক্সবাজারের উখিয়া, বালুখালী রোহিঙ্গা ক্যাম্প প্রভৃতি সঙ্কটপূর্ণ অঞ্চলে ঈদের গাম্ভীর্য ম্লান হতে পারে। এসব অঞ্চলের মুসলমানেরা পৃথিবীর নোংরা রাজনীতির শিকার। মানবতা, মানবকল্যাণ ইত্যাদি মানবহিতৈষী বিষয়াদি রাজনীতির পরাকাষ্ঠে অন্তরীণ হয়ে পড়েছে। পৃথিবীসুদ্ধ চলছে জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে প্রতিহিংসা। মুসলিম জাতীয়তাবাদকে কোণঠাসা করে রাখতে নিরন্তর ষড়যন্ত্র চলছে। সেই ষড়যন্ত্রে পড়ে মুসলিম বিশ্বের কোথাও কোথাও ঈদের আবেদন-নিবেদন ম্নান হচ্ছে। ঈদের দিনে আনন্দের পরিবর্তে মুসলমানদের চোখ অশ্রুভারী হয়ে উঠছে। সন্তানহারা বাবা-মা, মা-বাবা হারা সন্তান-সন্ততি, আত্মীয়হারা আত্মীয়, ঘরবাড়ি হারা মানুষ, বাস্তু ভিটে থেকে উচ্ছেদ হওয়া মানুষ, গোলার আঘাতে ছিন্নভিন্ন হওয়া পঙ্গু মানুষ, নাগরিকত্ব হারা দেশহীন মানুষ, বড় অসহায়ভাবে কোনো রকমে খেয়ে না খেয়ে বেঁচে আছে। কোনো মতে বেঁচে থাকা মুসলমানদের কাছে ঈদ বেদনার অশ্রু হয়ে ফোঁটা ফোঁটা টপটপ করে গড়িয়ে পড়ছে। আপনজনকে হারানোর বেদনা মানুষের কাছে আনন্দের দিনগুলোতে বেশি অনুভূত হতে থাকে। সে জন্য মুসলিম বিশ্বের সঙ্কটপূর্ণ অঞ্চলগুলোতে ঈদের মৌলিক আবেদন ফ্যাকাশে হতে বাধ্য হয়েছে। ঈদ হয়ে উঠেছে বিষণœ, বিবর্ণ। মুসলিমও বিবর্ণ হয়ে উঠেছে। বিবর্ণ মানুষগুলো বেদনাভারাক্রান্ত হৃদয়ে ঈদ উদযাপন করছে। ঈদের পুরো দিন ভেতরে ভেতরে তাদের চোয়াল গড়িয়ে যায় চোখের নোনা জলে; স্মৃতিতে ভেসে ওঠে প্রিয়জন, আপনজন, আত্মীয়-অনাত্মীয়ের নিথর মুখ, রক্তাক্ত শরীর। বিগত হওয়া কিংবা পড়ে থাকা এসব নিথর মুখ আর রক্তে ভেজা শরীর ক্ষতবিক্ষত হয়েছে মানবসৃষ্ট নিষ্ঠুর আঘাতে। হিংস্রতার শিকার হয়ে কেউ করেছে মৃত্যুবরণ। আহত হয়ে কেউ কেউ পঙ্গুত্ব স্বীকার করে নিয়েছে। নানাবিধভাবে বিপন্ন হওয়া এসব মানবজীবনের পুরোটাই বেদনাশ্রুতে সিক্ত; সেখানে ঈদের উষ্ণতা অপ্রত্যাশিত বেদনাকে ধুয়ে দিতে পারে না।
ঈদ সবার জীবনেই আনন্দের ফল্গুধারা বইয়ে দেবে এমন প্রতিশ্রুতি নিয়েই বারবার ফিরে আসে। কিন্তু শেষ পর্যন্তু সে প্রতিশ্রুতি রক্ষা হয় না। সবার জীবনে, প্রত্যেকের বাড়িতে ঈদ সমানভাবে আনন্দ বিলাতে পারে না। কারণ যে শিক্ষায় ঈদ উদযাপন হওয়ার কথা সে শিক্ষা থেকে মানুষ নিজেকে সরিয়ে নিয়েছে। মানুষ এখন বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে পুঁজিবাদের নিষ্ঠুর আচরণে গা ভাসিয়ে দিয়েছে। সেখানে মানবতা, নৈতিক মূল্যবোধ, আত্মত্যাগ, পরমতসহিষ্ণুতা, আর্তমানবতার সেবা প্রভৃতি বিষয়গুলো অন্তরীণ হয়ে পড়েছে আর ব্যক্তিস্বার্থের উৎকর্ষ সাধন হয়েছে। ফলে আর্থিক শোষণ ও ক্ষমতার তাড়নে পড়ে দুর্বল ও সহায় সম্বলহীন মানুষগুলো অশান্তির দাবানলে শরীরে ও মনে জ্বলে পুড়ে ভস্ম হচ্ছে; এসব মানুষের ঘরে ও মনে ঈদের আনন্দের পরিবর্তে বেদনার বিষাদ বাসা বাঁধবে এটাই স্বাভাবিক। জেলে রয়েছেন রাজনৈতিক পতিপক্ষের নেতা-নেত্রী, প্রতিপক্ষের রোষানলে পড়ে খুন হয়েছেন ছাত্র, শিক্ষক, নিয়ন্ত্রণহীন সড়কে প্রাণ হারিয়েছে অসংখ্য যাত্রী, ধর্ষিতা হয়ে কেউ মৃত্যুবরণ করেছে; কেউ ধর্ষিতা হয়ে বিচার না পেয়ে লজ্জা, ঘৃণা ও উপেক্ষা নিয়ে ঘরের কোণায় নিজেকে আবদ্ধ রেখেছে; দেশে গত এক বছরে শত শত নিরপরাধ শিশু বলাৎকারের শিকার হয়েছে; যে কৃষক রোদে পুড়ে বৃষ্টিতে ভিজে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে উৎপন্ন করা ফসলের ন্যায্যমূল্য না পেয়ে ক্ষোভে. দুঃখে, কষ্টে, হতাশায় নিজের হাতে ফলানো সোনালি ধানক্ষেতে নিজেই আগুন দিয়েছে সেসব কৃষকের ঘরে ঈদের আনন্দ ফিকে না হয়ে পারে না। এসব পরিবারে ঈদ হয়ে উঠবে বেদনাক্লান্ত বিষাদের ভাগাড়। ঈদের দিন কেউ তাদের খোঁজ করার প্রয়োজন মনে করবে না। এসব হতভাগা মানুষদের দুঃখে, কষ্টে, বিষাদে, বেদনায় আকাশ বাতাশ ভারী হয়ে উঠবে। কিন্তু ঈদের দিন ফটকাবাজ, কর্তৃত্ববাদী, দখলদার, দস্যু, টাউট, বাটপার, রাজনৈতিক দুর্বৃত্ত, রূপপুর পারমাণবিকের বালিশ বাহিনী, ঠক দেশপ্রেমিক, ঘুষখোর পুলিশ, আমলা, ব্যাংক ডাকাত, অরোজাদার নাস্তিক, বিনোদ-বিনোদিনীদের আনন্দের বাঁধভাঙা যে বন্যা বইবে সেই স্রোতে ক্ষতিগ্রস্ত ওই সব মানুষের আর্তনাদ সবার অলক্ষে ভেসে যাবে। এসব দেখে বেদনাস্নাত ক্লান্ত মানুষগুলো গভীর আগ্রহে ঈদের দিনটির সূর্যাস্তের জন্য প্রহর গুনবেন। যত তাড়াতাড়ি দিনটি শেষ হবে তত তাড়াতাড়ি তারা হাঁফ ছেড়ে বেঁচে উঠবেন। ঈদের দিনে ক্ষতিগ্রস্ত এসব পরিবারের শিশুদের মুখচ্ছবি আরো করুণ হয়ে ধরা পড়ে। বড়দের মুখের দিকে তারা ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকে। চারপাশের কোলাহল এই শিশুদের কাছে টানে না। পরিবারের বড়দের হাসি-আনন্দের সাথে ছোটদেরও যে আনন্দ বাড়ে। সেই বড়দের চোখে-মুখে যখন বেদনা-বিষাদের রেখা ফোটে তখন এমনিতেই শিশুমনে সেই বিষাদের আঁচড় লাগে। শিশুমনের আনন্দও নিষ্প্রাণ মলিন হতে থাকে। এসব পরিবারের শিশুরা ঈদকে আসলরূপে উপলব্ধি করতে পারে না।
ঈদের আনন্দ আনন্দ হয়ে আসে না ফকির, মিসকিন, গরিব, দুঃখী, ছিন্নমূল মানুষের ঘরে। যাদের ঘরে দু’বেলা দু’মুঠো খাবার জোটে না তারা নিরন্তর বঞ্চিত হতে থাকে ঈদের আনন্দ থেকে। ছেলেমেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে মুখাপেক্ষী হতে হয় পরের দুয়ারে। নতুন জামাকাপড়, একমুষ্টি ভালো খাবার জোগাড় করতে গিয়ে কর্তাব্যক্তিকে বারবার নিজ কপালে চপেটাঘাত করতে হয়। যত ক্ষোভ আর কষ্ট রয়েছে সব অদৃষ্টের ওপর চেপে দিয়ে নিজের জন্য সান্ত্বনা খোঁজেন। খাদ্য-বস্ত্রের সঙ্কুলান না হলে নীরবে চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে যায়। তখন ঈদের আনন্দের লেশমাত্র তারা অনুভব করতে পারে না। এসব মানুষের জীবনে ঈদ হয়ে ওঠে দলা পাকানো কষ্টের আধার। ঈদের দিন সন্ধ্যা নামলে তাদের কিঞ্চিত মুক্তি মিলে। ছেলেমেয়ে স্বামী-স্ত্রী একসাথে নিকষ অন্ধকারে বসে জীবনের হিসাব মেলায়। এভাবে পরের বছর আবার ঈদ! সে চিন্তায় তাদের শরীর হিম হয়ে ওঠে। হিম ধরা রক্তে ঈদের উষ্ণতা নিয়ে মুসলিম বিশ্ব কবে প্রকৃত ঈদ উদযাপন করবে তার নিশ্চয়তা কে দেবে? হ
