মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশে বহু শতাব্দী ধরেই ঈদ এক প্রধান উৎসব হিসেবে উদযাপিত হয়ে আসছে। এই উৎসবের ধরন-ধারণ সময়ের সাথে সাথে নানাভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। কিন্তু এর মূল প্রকৃতি অপরিবর্তীত রয়ে গেছে। সকালের নামাজের সমাবেশ খুশি ও আনন্দে ভরপুর এক পুনর্মিলনীর প্রতীক। নামাজের পর আত্মীয়স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী ও বন্ধুদের বাড়িতে যাওয়া এবং আপ্যায়িত হওয়া দিনটিকে নতুন করে সৌহার্দ্য, সখ্য ও বন্ধুত্বের আবহে মুখর করে তোলে। যারা সচ্ছল ও সম্পদশালী তাদের আহারের জন্য বিচিত্র সব সুস্বাদু খাবার উৎসবকে আনন্দে ভরে তোলে। এমনকি যারা স্বল্প আয়ের মানুষ, এই বার্ষিক উৎসব উপলক্ষে তারাও সাধ্যমতো ভালো খাবারের আয়োজন করে। নতুন জামাকাপড়, জুতা ও অলঙ্কার সবার জন্যই বিশেষত শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের জন্য যেন এই দিন উপলক্ষে অবশ্য প্রয়োজনীয় জিনিস হিসেবে গণ্য করা হয়। সব কিছুই এই দিনে হয়ে ওঠে এক নতুন আনন্দময় সূচনার প্রতীক। যে চিরঞ্জীব আনন্দের ধারা ঈদ উৎসবের মৌলিক উপাদান তারই নবায়ন ঘটে এই দিনে।
সাম্প্রতিককালের বাংলাদেশে ঈদুল ফিতর যেন এক নতুন মাত্রায় ভূষিত হয়েছে। যা অতীতে ছিল পুরো সমাজের সার্বিক আনন্দের এক অনাড়ম্বর এবং সরল বহিঃপ্রকাশ, তা বর্তমানে লাভ করেছে বহু বিচিত্র মাত্রা। এখনকার ঈদে দেখতে পাওয়া যায় সংশ্লিষ্ট সবার ব্যাপক এবং আরো সক্রিয় অংশগ্রহণ। সন্দেহ নেই, বেড়ে ওঠা জনসংখ্যা এর পেছনে ক্রিয়াশীল একটি কারণ। যেখানে ষাটের দশকে জনসংখ্যা ছিল চার কোটি এবং ১৯৭০ দশকে বাংলাদেশ ভূখণ্ডের জনসংখ্যা ছিল সাত কোটি তা এখন পৌঁছেছে ১৬ কোটির কোঠায়। কেবল জনসংখ্যা বৃদ্ধিই এই উৎসবের রূপ পরিবর্তনের মূল বা একমাত্র কারণ নয়। নাগরিকদের এক অংশ যা তুলনামূলকভাবে সংখ্যায় কম অথচ বিত্তে ও সম্পদে গুরুত্বপূর্ণ, তারা এই পরিবর্তনের প্রধান ভূমিকা পালন করেছে। এদের অর্জিত যে নয়া অর্থ ও সম্পদ এসেছে, ফলে বেড়েছে টাকার সরবরাহ। এই অর্থ সাম্প্রতিককালের ঈদের সময় এদের নতুন এবং দামি জামাকাপড়, গয়না, জুতা, অন্যান্য উপহারসামগ্রী যথেষ্ট কেনার সামর্থ্য এনে দিয়েছে। এসবই এখনকার ঈদকে সঞ্জীবিত করেছে। কয়েক লাখ লোকের হাতে যে বাড়তি অর্থ জমা হয়েছে, উৎসব উপলক্ষে তার অংশ, যার পরিমাণও কয়েক শ’ কোটি খরচ করার ফলে কেনাকাটা সারা দেশেই এক নতুন বিশাল মাত্রা পায়। আজকের বাংলাদেশে ঈদ মাত্র এক দিনের ব্যাপার নয়, বরং এই উৎসব এখন যেন মূলত এবং কার্যত এক মাসব্যাপী বা তার চেয়েও বেশি দিন ধরে স্থায়ী আনন্দের ঋতুর রূপ লাভ করেছে। যারা সচ্ছল ও সম্পদশালী, তাদের জন্য কেনাকাটার পর্ব শুরু হয় প্রথম রমজান থেকেই। রমজানের মাসব্যাপী সংযম ও ত্যাগের সময়ের সাথে যেন তাল মিলিয়ে চলে নতুন ভোগ্যসামগ্রী ও উপহার সংগ্রহের পালা।
যাদের তেমন কোনো সঙ্গতি নেই, যাদের আয়-উপার্জন তুলনামূলক অনেক কম, তারাও ঈদ উপলক্ষে ব্যস্ত থাকে সেসব উপহার কেনাকাটায়, যার দাম তাদের আয়ের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। ঈদ তার আগমনের বার্তা সবখানে রেখে যায় : মহানগর ও শহরে জনাকীর্ণ ও ব্যস্ত সরণিতে, যুগপ্রাচীন গ্রামীণ বাজারে, পরাক্রমশালী ও বিত্তবান ব্যক্তিদের প্রাসাদে এমনকি দরিদ্র ও বঞ্চিতদের কুঁড়েঘরের আঙিনায়।
আজকের বাংলাদেশে ঈদ কেন এই বিশাল এবং বিরাট মাত্রা লাভ করেছে? আকার-আয়তনে এবং প্রাবল্যে যে পরিবর্তন এসেছে তার পরিমাপই বা কী? এর কোনো সহজ-সরল উত্তর নেই। তা হলেও স্মৃতির দীর্ঘ পথপরিক্রমায় হয়তো এ প্রশ্নের কোনো উত্তর পাওয়া যেতে পারে।
প্রবীণ প্রজন্মের সদস্যদের মনে পড়তে পারে তাদের প্রথম কৈশোরের কলকাতায় উদযাপিত ঈদের কথা। অবিভক্ত বাংলার রাজধানীতে সেই ঈদ ছিল এমন এক সংখ্যালগিষ্ঠ সম্প্রদায়ের উৎসব, যা ছিল বিশেষ করে সেই সংখ্যালঘু কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ মানবগোষ্ঠীর আনন্দ ও খুশির সময়। সে সম্প্রদায়ের আদিবাস ছিল এমন এক উপমহাদেশে, যা ছিল তখনো অবিভক্ত এক বহুজাতিক, বহু ধর্মানুসারী, বহু ভাষাভাষী বিশাল মানবগোষ্ঠীর বাসভূমি। মূলত ধর্মীয় এই উৎসব এমন এক বিচিত্র সমাজে পালনের যে আনন্দ তা ছিল অনাড়ম্বর অথচ সখ্যের প্রীতিতে উজ্জ্বল। বিশেষ এক ধর্মের উৎসব হয়েও তা সহাবস্থানকারী অন্যান্য ধর্মের অনুসারীদের বোধ এবং অনুভবের বাইরে ছিল না, তারাও এই উৎসবে অভিনন্দন এবং আনন্দ দেয়া-নেয়ায় ব্যস্ত হয়ে উঠত। আজকের মতোই সেদিনও নতুন জামাকাপড়, জুতা এবং সুস্বাদু খাবারের সমারোহ ছিল। সব উপহারের মধ্যেই ছিল মা-বাবার স্নেহ ও ভালোবাসার মায়াময় পরশ। ধন ও ঐশ্বর্য এবং আরম্ভর সব কিছুকে ছাপিয়ে যেত না। সব অমূল্য উপহারই ছিল সেই ভালোবাসায় দীপ্ত, যা ছিল মহামূল্যবান মণিমুক্তার মতোই উজ্জ্বল।
মনে পড়ে ঢাকার সন্নিকটে প্রায় ২০ মাইল দূরে প্রবাহমান নদ-নদী এবং এঁকেবেঁকে চলা খালের ওপারে ছায়া সুনিবিড় শ্যামল গ্রামে ঈদ উদযাপনের স্মৃতি। ছায়াময় গাছের নিচে সেই ছোট মসজিদটি, সরল ও সহজ এবং পরিচ্ছন্ন জামাকাপড়ে ভূষিত গ্রামীণ জনসাধারণের ভিড় রঙ-বেরঙের জামাকাপড়ে সজ্জিত হাসিখুশি শিশুর সমাবেশ এবং সুস্বাদু অথচ তুলনামূলক কমমূল্যের খাদ্যসামগ্রী এবং অনিঃশ্বেস আনন্দ। এই ছিল সেই গ্রামীণ ঈদের জীবন্ত রূপ।
মনে পড়ে, মধ্য সত্তরের দশকে লন্ডনে উদযাপিত ঈদগুলোর কথা। রিজেন্ট পার্কের বিখ্যাত মসজিদে ঈদের জামাত ছিল বহু জাতি ও বর্ণের এক বিচিত্র ও বর্ণিল মিলনমেলা। তারা পরস্পর অবদ্ধ ছিল একই বিশ্বাসে বিশ্বাসী সখ্যে এবং একই আনন্দ উৎসবের অংশীদারের প্রীতি ও ভালোবাসায়।
১৯৫০ এবং ৬০ দশকের ঢাকায় ঈদের কথাও স্মরণে উজ্জ্বল। ঢাকা তখন ছিল একটি প্রাদেশিক রাজধানী। সে নগরী পরিকল্পনা অনুযায়ী দ্রুতগতিতে বাড়লেও ছিল স্বল্প জনঅধ্যুষিত। বহুতল ভবন নামধারী দানবীয় স্থাপনারও কোনো চিহ্ন এই সরল-সহজ নগরীতে ছিল না। ঢাকার ঈদ তখন সারা পূর্ব বাংলার ঈদের মতোই সরল, অনাড়ম্বর এক আনন্দময় উপলক্ষ, বিশাল জনগোষ্ঠীর ভারে তা ছিল না বিব্রত ও ব্যতিব্যস্ত।
স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর সব কিছু পরিবর্তিত হয়েছে। অবশ্য মূল উপাদানগুলোতে আসেনি কোনো রদবদল। মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের চার উপাদানের মধ্যে সমাজতন্ত্রের প্রভাব কার্যত অবষিত হয়েছে। সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়ন ও তার পূর্ব ইউরোপীয় মিত্রদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের ফলে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু, মুক্তিযুদ্ধের অন্যান্য নীতিÑ গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ এবং ধর্মনিরপেক্ষতা অটুট রয়ে গেছে। ধর্মনিরপেক্ষতা বা সঠিকভাবে বলতে গেলে অসাম্প্রদায়িকতা এখনো বাংলাদেশী সমাজের এক প্রধান বৈশিষ্ট্য।
কিন্তু প্রধানত মুসলিম জনগোষ্ঠীর অধিবাস হিসেবে বাংলাদেশ সামাজিক গতিশীলতার প্রভাবে ইসলাম ধর্মের শক্তিশালী অথচ নীরব উপস্থিতিতে বৈশিষ্ট্যময়। বাংলাদেশের মুসলমানেরা ধর্মভীরু, ধর্মপ্রাণ হলেও ধর্মান্ধ নয়। এদেশের ইসলামিক মূল্যবোধ এবং রীতি ও প্রথার বিস্তার ও প্রাবল্য এই সত্যেরই পরিচায়ক। ঈদের মতো ধর্মীয় উৎসবের জন্য আগ্রহ ও উৎসাহের ব্যাপকতা এই বাস্তবতারই অভিব্যক্তি।
এ কালের ঈদে যে বিপুল উৎসাহ এবং সক্রিয় অংশগ্রহণ এই উৎসবকে সজীব ও মুখর করে তোলে, তার আরেকটি কারণ হতে পারে এ দেশের বিপুলসংখ্যক সাধারণ মানুষের নিত্যদিনের জীবনে আনন্দ ও খুশির উপকরণ ও পথের অভাব। অন্যান্য সময়ে যা দুর্লভ, সেই উপভোগ ও আনন্দকে বিশাল জনগোষ্ঠীর হাতের কাছে যেন পৌঁছে দেয় ঈদুল ফিতরের বার্ষিক উৎসব।
বাংলাদেশে ঈদের এক লক্ষণীয় বৈশিষ্ট্য হলোÑ এই সময় ঢাকাসহ অন্যান্য নগরী প্রায় জনশূন্য হয়ে যায়। ঈদ উপলক্ষে লাখ লাখ মানুষের গ্রামীণ বাসস্থলে ফেরত যাওয়া এই সমাজের প্রধানত গ্রামীণ ভিত্তিরই পরিচয় দেয়। দ্রুত এবং ব্যাপক নগরায়ন সত্ত্বেও এ দেশের শহরে বসবাসকারী লোকের এক বিশাল অংশ আসলে গ্রামেরই মানুষ। ঈদের দীর্ঘ ছুটিতে ঢাকার অর্ধেক অধিবাসীই তাদের গ্রামের বাড়িতে ফিরে যায়। ঈদে ঢাকার এই জনবিরল রূপ এ নগরীর অতীত, বিশেষ করে ১৯৬০-এর দশককে মনে করিয়ে দেয়।
শহরের বিশাল জনগোষ্ঠীর এই সাময়িক বসতি ত্যাগ এবং গ্রামে প্রত্যাবর্তন আমাদের পল্লীর দরিদ্র মানুষের উপেক্ষিত এবং বঞ্চিত জীবনের কথাও মনে করিয়ে দেয়। ঈদ উপলক্ষে লক্ষাধিক টাকা মূল্যের সব দামি জিনিসের চটকদার বিজ্ঞাপন মানুষকে দিশাহারা করে। হৃদয়বিদারক দারিদ্র্য ও অভাবের পাশাপাশি কিছুসংখ্যক বিত্তবান মানুষের এই বিবেচনাহীন জাঁকজমক মনে নিদারুণ দুঃখ এনে দেয়। শীতকালের ফসলের মওসুম ছাড়া অন্য সময়ে ঈদ উদযাপিত হলে অনেক পল্লী এলাকাতেই দেখা যায় মর্মান্তিক দারিদ্র্য এবং ক্ষুধার করুণ চিত্র। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে কোনো একটি ঈদের সময় এক মর্মস্পর্শী কবিতা রচনা করেছিলেন। সে কবিতা পড়লে মনে হতে পারে আজকেও এ দেশে দুর্দিনের অবসান হয়নি, এমনকি ঈদের দিনেও। সেই বিষাদময় কবিতায় নজরুল লিখেছিলেনÑ
‘বেলাল, বেলাল হেলাল উঠেছে
পশ্চিম আসমানে
লুকাইয়া আছো লজ্জায় কোন
মরুর গোরস্থানে...
হের ঈদগাহে চলেছে কৃষক
যেনগো মৃতের প্রায়
বেলাল তোমার কণ্ঠে
বুঝিবা আজান থামিয়া যায়।’
কবি আরো লিখেছেনÑ এই কৃষকদের মধ্যে একজন কিছুদিন আগে তার শিশুপুত্রকে হারিয়েছেন, রোগে-অনাহারে সেই শিশু অকালে চলে গেছে লোকান্তরে। কবি তাই প্রশ্ন করেছিলেনÑ
‘চাঁদ হয়ে আজ
উঠেছে কি সেই
শিশু-পাঁজরের হাড়?’ হ
