তোমরা হয়তো লালগির্দি পাখির নাম খুব বেশি শোননি। এর কারণ আছে। তা হলো, এ পাখি আমাদের দেশে খুব কমই দেখা যায়। যদিওবা মাঝে মধ্যে এদের দেখা যায় ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন এলাকায়। তা আবার কম-বেশি দেখা যায় শীতের সময়। এরা মানুষের চোখে খুব কমই ধরা পড়ে বলে লালগির্দিকে রীতিমতো বিরল ধরনের পাখি বলে থাকেন বিশেষজ্ঞরা।
সুদর্শন এ পাখির নাম সাদাটুপি বা ধলাটুপি লালগির্দি। কারণ এদের মাথার উপরের অংশ ধবধবে সাদা বা ফর্সা। এদের বুকের অংশ দূর থেকে প্রায় লাল দেখায় বলে অনেকে লালগির্দি বলে থাকেন। যদিওবা দেহতল কমলা-বাদামি। তবে শরীরের বেশির ভাগ অংশই লাল-কালোর মিশেল। এদের পিঠ, ডানা, গলা, ঘাড়, মুখমণ্ডল, লেজের আগা মিশমিশে বা উজ্জ্বল কালো। কোমর, দেহের নিচের অংশ, লেজ কমলা-বাদামি রঙের। ডানা-ঢাকনির নিচটাতে কমলা-বাদামি ফোঁটা। তা কালোও। আরো কালো এদের পা, পায়ের পাতা, চোখ ও চঞ্চু বা ঠোঁট। পুরুষের মাথার টুপিটি স্ত্রীর বা মেয়ের তুলনায় বেশি বড়। দেহের কালো রঙও বেশি চকচকে থাকে। অবশ্য তা হয় প্রাপ্ত বয়সে। তা দেখে এমন পুরুষ লালগির্দিকে স্ত্রী লালগির্দি মনে করে থাকেন অনেকে। ধলাটুপি লালগির্দি দৈর্ঘ্যে হয় ১৮ সেন্টিমিটার থেকে প্রায় ২০ সেন্টিমিটার। আর ওজন ২৫ থেকে ৪২ গ্রাম। তবে স্ত্রী ও পুরুষে তেমন বেশি পার্থক্য নেই দেখায়; যে কারণে অনেকে এর স্ত্রী-পুরুষ বুঝতে ভুল করেন। এ পাখিকে পতঙ্গভূকও বলা হয়ে থাকে। অনেক সময় উড়ন্ত কীটপতঙ্গ ধরে খায়; যে কারণে অনেকে ধলাটুপি লালগির্দিকে চটকদার বা ফ্লাইক্যাচার বলে থাকে।
শুনলে ভালো লাগবে, পৃথিবীতে এক বিশাল জায়গা এ পাখির বিচরণভূমি। এদের দেখা যায় প্রায় ৩৮ লাখ বর্গকিলোমিটার জায়গাজুড়ে। এদের বেশি দেখা যায় আফগানিস্তান, পাকিস্তান, তাজিকিস্তান, ভুটান, কম্বোডিয়া, নেপাল, মিয়ানমার, লাওস, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, তিব্বত প্রভৃতি অঞ্চলে। এসব জায়গার নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলের বনেও কম-বেশি দেখা যায় এদের। বিশেষজ্ঞরা এ পাখিকে ‘ন্যূনতম বিপদগ্রস্ত’ বলে ঘোষণা দেন। অর্থাৎ এদের সংখ্যা বিগত কয়েক দশক ধরে কমছে না, বাড়ছেও না। অর্থাৎ রয়েছে সংখ্যায় প্রায় অপরিবর্তিত। তা জানিয়েছে আইইউসিএন বা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব ন্যাচার। বাংলাদেশও ন্যূনতম বিপদগ্রস্ত বলে ঘোষণা দিয়েছে এ প্রজাতিটিকে।
শীতে এদের কম-বেশি দেখা যায় সিলেটের মাধবকুণ্ড ও চট্টগ্রাম বিভাগের পাহাড়ি পাথুরে জলাশয়, ঝরনা প্রভৃতি নয়নাভিরাম স্থানে। কখনো একা, কখনো জোড়ায় জোড়ায় বিচরণ করতে দেখা যায়। এপ্রিল থেকে আগস্টÑ এ সময়ে বেশ বড় আকারের বাসা বানায় এরা পাথরের নিচে কিংবা শিলামুখের গর্তে। আবাস এলাকায় বাসা বানায় শুকনো ঘাস, শ্যাওলা, পশম, পাতা, খড়কুটো প্রভৃতি দিয়ে। ডিম পাড়ে তিন থেকে ছয়টি। ডিমের রঙ নীল-সবুজ মিশেল। ডিমে তা দেয় স্ত্রী একাই। তবে ছানাদের সার্বিক দেখভাল করে স্ত্রী-পুরুষ মিলেমিশে। এ পাখির ইংরেজি নাম হোয়াইট কেপড রেডস্টার্ট। হোয়াইট কেপড ওয়াটার রেডস্টার্টও বলা হয়ে থাকে। এরা মুসসিকাপিডা গোত্রের। প্রজাতি সি. লিউকোসেফালাস। বিরল ধলাটুপি লালগির্দিদের আয়ুষ্কাল তিন থেকে চার বছর।
